রবি. অক্টো. ২০th, ২০১৯

খবরে সংস্কৃতিতে

দূর্গাপূজা, উৎসব মুখরতা, শুভেচ্ছা শুভকামনা

উমা থেকে পার্বতী। তারপর পার্বতী থেকে দুর্গা। এই নামেই তিনি বেশি পরিচিত। ব্রহ্মবৈবর্ত পুরাণে আছে তিনি গিরিরাজ হিমালয়ের কন্যা ও পর্বতের অধিষ্ঠাত্রী দেবী, তাই তিনি পার্বতী । পরের অধ্যায়ে তিনি হয়ে ওঠেন দানব দলনী দশভুজা। আর তখনিই তার নাম হয় দুর্গা। দুর্গাপূজার সঠিক সময় হলো বসন্তকাল কিন্তু বিপাকে পড়ে রামচন্দ্র, রাজা সুরথ এবং বৈশ্য সমাধি বসন্তকাল পর্যন্ত অপেক্ষা না করে শরতেই দেবীকে অসময়ে জাগ্রত করে পূজা করেন। সেই থেকে অকাল বোধন হওয়া সত্ত্বেও শরতকালে দুর্গাপূজা প্রচলিত হয়ে যায় । দুর্গা শব্দের অর্থ হলো ব্যূহ বা আবদ্ধ স্থান। যা কিছু দুঃখ কষ্ট মানুষকে আবদ্ধ করে, যেমন বাধাবিঘ্ন, ভয় দুঃখ, শোক, জ্বালা, যন্ত্রণা এসব থেকে তিনি ভক্তকে রক্ষা করেন।

ইতিহাস থেকে প্রমাণ পাওয়া যায় প্রায় ২২০০০ বছর পূর্বে ভারতে প্যালিওলিথিক জনগোষ্ঠী থেকেই দেবী পূজা প্রচলিত হয়েছিলো। সিন্ধু সভ্যতায় এসে তা আরো অাধুনিক এবং বিস্তৃত হয়। এছাড়া প্রাচীন সাহিত্যের দিকে তাকালে অামরা দেখতে পাই মূল বাল্মীকির রামায়ণে দূর্গাপূজার কোন অস্তিত্ব নেই কিন্তু কৃত্তিবাসী রামায়ণে এর অস্তিত্ব বিদ্যমান।

মধ্যযুগের বাংলা সাহিত্যের অন্যতম শক্তিশালী কবি কৃত্তিবাস ওঝা  সংস্কৃত রামায়ণ বাংলায় অনুবাদ করার সময় মূল রামায়নের বাহিরে তৎকালীণ বাঙ্গালী সমাজে প্রচলিত বাংলার সামাজিক রীতিনীতি ও বিভিন্ন অনুসঙ্গ প্রবেশ করিয়ে ইচ্ছাকৃত ভাবে বাংলা রামায়ণ অারো অধিক সমৃদ্ধ করার চেষ্টা করেন।

তিনি কালিকা পুরাণের ঘটনা অনুসরণে ব্রহ্মার পরামর্শে রামের দূর্গাপূজা করার কথা উল্লেখ করেছেন। যেখানে শক্তিশালী রাবনের বিরুদ্ধে যুদ্ধ বিজয় নিশ্চিত করতে শরৎকালে শ্রী রামচন্দ্র কালিদহ সাগর থেকে ১০১ টি নীলপদ্ম সংগ্রহ করে প্রাক প্রস্তুতি গ্রহণ করে দেবী দূর্গার কৃপালাভ করেন বলে কৃত্তিবাস ওঝা বর্ণনা করেছেন। দুর্গাপূজার সবচেয়ে বিশদ বিবরণ পাওয়া যায় মার্কন্ডেয় পুরাণে। এই পুরাণের মধ্যে ১৩ টি অধ্যায় দেবীমহাত্ম্যম নামে পরিচিত। বাংলায় শ্রীশ্রী চন্ডি নামে সাতশত শ্লোক বিশিষ্ট দেবী মহাত্ম্যম পাঠ আছে যা দুর্গাপূজার প্রধান ও অবিচ্ছেদ্য অংশ। শ্রীশ্রী চন্ডি অনুসারে এই দেবীই `নিঃশেষদেবগণশক্তিসমূহমূর্ত্যাঃ` বা সব দেবতার সম্মিলিত শক্তির প্রতিমূর্তি।

দেবী দূর্গার বাহন সিংহ। বাংলায় দেবী দূর্গার যে মূর্তিটি সচরাচর দেখা যায় সেটি পরিবারসমন্বিতা বা সপরিবার দূর্গার মূর্তি।এই মূর্তির মধ্যস্থলে দেবী দূর্গা সিংহবাহিনী ও মহিষাসুরমর্দিনী, তাঁর ডানপাশে উপরে দেবী লক্ষী ও নিচে গণেশ, বামপাশে উপরে দেবী স্বরস্বতী ও নিচে কার্তিক।

সাধারণত আশ্বিন শুক্লপক্ষের ষষ্ঠ দিন অর্থাৎ ষষ্ঠী থেকে দশমী অবধি পাঁচ দিন দুর্গোৎসব অনুষ্ঠিত হয়। এই পাঁচটি দিন যথাক্রমে দূর্গাষষ্ঠী, মহাসপ্তমী,  মহাষ্টমী, মহানবমী ও বিজয়া দশমী নামে পরিচিত। সমগ্র পক্ষটি দেবীপক্ষ নামে অাখ্যায়িত।দূর্গাপূজা মূলত পাঁচদিনের অনুষ্ঠান হলেও মহালয়া থেকেই প্রকৃত উৎসবের সূচনা ও কোজাগরী লক্ষী পূজায় তার সমাপ্তি।

দুর্গাপূজা বাঙালি হিন্দু সম্প্রদায়ের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসব। বাংলার মহানগরীর দুর্গোৎসবগুলোর ইতিহাস ঘিরে আছে বাঙালির কৃষ্টি। দেবী দুর্গা ঢাকায় ঠিক কবে এসেছিলেন, তা বলা শক্ত। ইতিহাস বলে, বারোশো শতাব্দীতে বল্লাল সেন বুড়িগঙ্গা নদী পাড়ের জঙ্গলে দেবী দুর্গার একটি মূর্তি পান এবং ঢাকেশ্বরী মন্দির স্থাপন করেন।

এখন বাংলাদেশের ঢাকাসহ অন্যান্য জেলায় প্রায় ৩০ হাজারের বেশি দুর্গাপূজা হয়। এবার দুর্গা মর্ত্যে এসেছেন ঘোড়ায় চড়ে আর পিতৃগৃহ থেকে তিনি কৈলাসে ফিরে যাবেন দোলায় (দোলনা) চড়ে।

সেজেছে ঢাকেশ্বরী মন্দির, রমনা কালীমন্দির, রামকৃষ্ণ মিশন, বনানী পূজামণ্ডপ, কলাবাগান পূজামণ্ডপ, শাঁখারীবাজার, মিরপুর কেন্দ্রীয় পূজামণ্ডপ, বরোদেশ্বরী কালীমাতা মন্দির ও শ্মশান, সিদ্ধেশ্বরী কালিমাতা, ভোলানাথ মন্দির আশ্রম, জগন্নাথ হল, ঋষিপাড়া গৌতম মন্দির, গুলশান বনানী সর্বজনীন পূজা পরিষদ মণ্ডপ, বাসাবো বালুর মাঠ, লক্ষ্মী-নারায়ণ মন্দির পূজামণ্ডপ থেকে চট্টগ্রাম, রাজশাহী, রংপুর, খুলনা, ময়মনসিংহ, কুমিল্লা, সিলেট, বরিশাল, নারায়ণগঞ্জ, কুষ্টিয়ায় বড়বাজার মন্দির, মহাশ্মশান মন্দির, খোকসায় বিলজানি ‘রায়বাড়ি’ সর্বজনীন দুর্গামন্দির।

রাজধানী ঢাকাসহ সারা দেশের প্রতিটি পূজামণ্ডপের নিরাপত্তা রক্ষায় পুলিশ, আনসার, বিজিবি, র‌্যাবসহ অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা দায়িত্ব পালন করছেন । পুলিশ ও র‌্যাবের পাশাপাশি প্রায় প্রতিটি মণ্ডপে স্বেচ্ছাসেবক বাহিনীও দায়িত্ব পালন করছেন । ঢাকেশ্বরী মন্দির মেলাঙ্গনে মহানগর সর্বজনীন পূজা কমিটির উদ্যোগে কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণকক্ষ খোলা হয়েছে।

শারদীয় দুর্গাপূজা উপলক্ষে রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পৃথক বাণীতে দেশের হিন্দুধর্মাবলম্বীদের শুভেচ্ছা জানিয়েছেন। দুর্গোৎসব উপলক্ষে বাংলাদেশ পূজা উদযাপন পরিষদ, মহানগর সর্বজনীন পূজা কমিটি, হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিষ্টান ঐক্য পরিষদের নেতারা হিন্দু সম্প্রদায়সহ ধর্ম-বর্ণনির্বিশেষে দেশের সব নাগরিককে শুভেচ্ছা জানিয়েছেন।

আগামী মঙ্লগবার দুর্গাপূজা বিজয়া দশমী ২০১৯ উপলক্ষে বিজয়া শোভাযাত্রা অনুষ্ঠিত হবে। শোভাযাত্রাটি ঢাকেশ্বরী জাতীয় মন্দির থেকে শুরু হয়ে ওয়াইজঘাট গিয়ে শেষ হবে।

বিপুল সংখ্যক পুণ্যার্থী বিজয়া শোভাযাত্রায় অংশ নেবেন। ফলে শোভাযাত্রার রুট ও তার আশপাশ এলাকায় যানজটের সৃষ্টি হবে। এই যানজট পরিহারের লক্ষে গাড়ি চালক/ব্যবহারকারীদের ওইদিন বিকেল ৩টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত কিছু সড়ক পরিহারের অনুরোধ জানিয়েছে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি)। রোববার সন্ধ্যায় ডিএমপি কমিশনার মোহা. শফিকুল ইসলাম স্বাক্ষরিত গণমাধ্যমে পাঠানো এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এসব তথ্য দেন ঢাকা মহানগর পুলিশ।

সড়কগুলো হলো- ঢাকেশ্বরী জাতীয় মন্দির থেকে পলাশী বাজার-জগন্নাথ হল-কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার-দোয়েল চত্বর-হাইকোর্ট-সরকারি কর্মচারী হাসপাতাল-গোলাপ শাহ্ মাজার-গুলিস্তান (সার্জেন্ট আহাদ বক্সের সামনে)-নবাবপুর রোড-বাহাদুর শাহ্ পার্ক-পাটুয়াটুলী হয়ে ওয়াইজ ঘাট পর্যন্ত।

বিজয়া শোভাযাত্রার সময় এসব সড়ক পরিহার করে বিকল্প সড়কে যানবাহন চলাচল করাতে অনুরোধ করেছে পুলিশ। এ বিষয়ে নগরবাসী, যানবাহন মালিক ও শ্রমিকদের সর্বাত্মক সহযোগিতা কামনা করেছে ডিএমপি।

জ.শ. তিমির

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।