রবি. অক্টো. ২০th, ২০১৯

খবরে সংস্কৃতিতে

মুক্তিযুদ্ধকালীন সরকারের উপদেষ্টা মোজাফফর আহমদের প্রয়াণ:রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর শোক

মুক্তিযুদ্ধকালীন সরকারের উপদেষ্টা, মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক ও বাংলাদেশ ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টির (ন্যাপ) সভাপতি অধ্যাপক মোজাফফর আহমদ

মুক্তিযুদ্ধকালীন সরকারের উপদেষ্টা, মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক ও বাংলাদেশ ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টির (ন্যাপ) সভাপতি অধ্যাপক মোজাফফর আহমদ আর নেই। শুক্রবার বাংলাদেশ সময় রাত সাতটা ৪০ মিনিটে রাজধানীর অ্যাপোলো হাসপাতালে তিনি মারা যান। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৯৭ বছর।ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টির (ন্যাপ) সভাপতি ও মুক্তিযুদ্ধকালীন প্রবাসী সরকারের উপদেষ্টা অধ্যাপক মোজাফফর আহমদের মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করেছেন রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদ ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।শুক্রবার রাতে তারা পৃথক শোকবার্তা দেন। খবর বাসস ও ইউএনবি

অধ্যাপক মোজাফফর আহমদের মৃত্যুতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তাঁর শোক বার্তায় দেশের স্বাধীনতা, মুক্তিযুদ্ধ ও গণতান্ত্রিক আন্দোলনে এই নেতার ভূমিকাকে স্মরণ করেন। তিনি বলেন, দেশের প্রগতিশীল রাজনীতিতে তাঁর অবদান জাতি চিরদিন মনে রাখবে।

এ ছাড়া আওয়ামী লীগ, ন্যাপসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতারা শোক জানিয়েছেন।মোজাফফর আহমদকে তাঁর জন্মস্থান কুমিল্লার দেবীদ্বার উপজেলার এলাহাবাদে দাফন করা হবে বলে তাঁর একমাত্র কন্যা আইভী আহমদ জানিয়েছেন।

তিনি ১৯৭১ সালের মুজিবনগর সরকারের উপদেষ্টার দায়িত্ব পালন করেছেন। ব্রিটিশ শাসনামল থেকে শুরু করে পাকিস্তান শাসনামল শেষে স্বাধীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠাসহ বিভিন্ন আন্দোলনে তিনি নেতৃত্ব দিয়েছেন। তাঁর লেখা কিছু আলোচিত বই সমাজতন্ত্র কি এবং কেন, প্রকৃত গণতন্ত্র তথা সমাজতন্ত্র সম্পর্কে জানার কথা এবং মাওবাদী সমাজতন্ত্র ও কিছু কথা ।

অধ্যাপক মোজাফফর আহমদ গত কয়েক বছর ধরে নানা বার্ধক্যজনিত রোগে ভুগছিলেন। এর মধ্যে কয়েক দফা তিনি রাজধানীর হাসপাতালে চিকিৎসা নেন। সর্বশেষ গত ১৪ আগস্ট তাঁর স্বাস্থ্যের অবনতি হলে তাঁকে রাজধানীর অ্যাপোলো হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। গত চার দিন ধরে তিনি সংকটাপন্ন অবস্থায় হাসপাতালটির নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে ছিলেন। শেষ সময় পর্যন্ত প্রবীণ এই বাম নেতা তাঁর একমাত্র মেয়ে আইভী আহমদের বাসায় থাকতেন।

১৯২২ সালের ১৪ এপ্রিল কুমিল্লা জেলার দেবীদ্বার উপজেলার এলাহাবাদ গ্রামে অধ্যাপক মোজাফফর আহমদের জন্ম । চল্লিশের দশকে ‘পাকিস্তান উন্মাদনার’ বিপরীতে যে মুষ্টিমেয় মুসলমান তরুণ ছাত্রাবস্থায় বামপন্থায় দীক্ষা নিয়েছিলেন, মোজাফফর আহমদ তাঁদের একজন। ১৯৫১-৫২ সালে যখন ভাষা আন্দোলন হয়, তখন মোজাফফর আহমদ ঢাকা কলেজের শিক্ষক ছিলেন। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অর্থনীতি বিভাগে শিক্ষক হিসেবে যোগ দিলেও সেখানে বেশি দিন থাকেননি। ১৯৫৪ সালে যুক্তফ্রন্টের প্রার্থী হিসেবে পূর্ববঙ্গ ব্যবস্থাপক সভার সদস্য নির্বাচিত হন তিনি।

পূর্ববঙ্গ ব্যবস্থাপক সভার সদস্য হিসেবে মোজাফফর আহমদ স্বায়ত্তশাসনের পক্ষে জোরালো ভূমিকা রাখেন। মাওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানীর নেতৃত্বে ১৯৫৭ সালে ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি গঠিত হলে তিনি এর কেন্দ্রীয় নেতা হন। ১৯৫৮ সালে সামরিক শাসন জারি হলে মোজাফফর আহমদের নামে হুলিয়া জারি হয় এবং তিনি আত্মগোপনে চলে যান। এর আগেই তিনি নিষিদ্ধ ঘোষিত কমিউনিস্ট পার্টির সদস্য হন। ১৯৬৭ সালে ন্যাপ বিভক্ত হলে মস্কোপন্থী অংশের পূর্ব পাকিস্তান শাখার সভাপতির দায়িত্ব নিতে হয় তাঁকে।

মুক্তিযুদ্ধকালে মোজাফফর আহমদ মুজিবনগর সরকারে এবং আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সম্মেলনের পাশাপাশি বাংলাদেশ প্রতিনিধিদলের সদস্য হিসেবে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে যোগ দিতে নিউইয়র্ক যান তিনি। মোজাফফর আহমদের সম্পাদনায় ‘নতুন বাংলা’ নামে একটি সাপ্তাহিক পত্রিকাও প্রকাশিত হয়েছিল মুজিবনগর থেকে।

ঘটনাবহুল বিশ্বব্যবস্থায় অধ্যাপক মোজাফফর আহমদের রাজনৈতিক দর্শন, চিন্তাধারা ও দূরদর্শিতা বাস্তবাসম্মত এবং সময়োপযোগী বলে শুধুমাত্র জাতীয় পর্যায়ে নয়, আন্তর্জাতিকভাবেও প্রমাণিত হয়েছে। দেশপ্রেমে জাগ্রত রাজনৈতিক কর্মী সৃষ্টির প্রয়াসে মদনপুরে তার প্রতিষ্ঠিত উপমহাদেশের একমাত্র শিক্ষায়তন ‘সামাজিক বিজ্ঞান পরিষদ’। বাংলাদেশের রাজনীতিতে এমুহূর্তে প্রায় নিষ্ক্রিয় এবং বিভক্ত ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টির (ন্যাপ) একাংশের সভাপতি অধ্যাপক মোজাফফর নিজেকে ‘কুঁড়েঘরের মোজাফফর’ বলে পরিচয় দিতে ভালোবাসেন। বাংলাদেশের প্রগতিশীল-গণতান্ত্রিক রাজনীতির প্রবাদপ্রতিম এ ব্যক্তিত্ব নিজেকে সাদামাটাভাবে উপস্থাপন করতে ভালোবেসেছেন আজীবন। অধ্যাপক মোজাফফর আহমদ ব্যক্তিজীবনে কথাবার্তা বলতেন কিছুটা কৌতুক মিশিয়ে; কখনো থাকে প্রচ্ছন্ন হেঁয়ালির ছোঁয়া। তিনি কাছের মানুষদের কাছে একসময় বলতেন, “আমার নাম মোজাফফর আহমদ নূরী, আমি পথে পথে ঘুরি”।

আশির দশকে এরশাদবিরোধী আন্দোলনে সক্রিয় ভূমিকা পালনকারী এই প্রবীণ রাজনীতিক ১৯৮১ সালে ন্যাপ কমিউনিস্ট পার্টি ও একতা পার্টির মনোনীত প্রার্থী হিসেবে রাষ্ট্রপতি পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিলেন।

মোজাফফর আহমদের মৃত্যুতে শোক প্রকাশ করেছে বিএনপিসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠন।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।