অমর একুশের দিন আজ- বাঙ্গালীর চিরপ্রেরণার দিন

Facebooktwittergoogle_plusredditpinterestlinkedinmail

“রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন করিলি রে বাঙ্গালি, ঢাকা শহর রক্তে ভাসালি….” ভেবো না গো মা, তোমার ছেলেরা হারিয়ে গিয়েছে পথে-ওরা আছে মাগো হাজার মনের বিপ্লবী চেতনাতে..” মায়ের ভাষার প্রতি বাঙালীর অনুভূতি কত তীব্র ছিল তা প্রকাশ হয় মধ্যযুগের কবি আবদুল হাকিম লিখেছিলেন- যে সবে বঙ্গেতে জন্মি হিংসে বঙ্গবাণী/ সে সব কাহার জন্ম নির্ণয় ন জানি…।সত্যিই বাংলার তরুণদের মধ্যে বায়ান্নর একুশের চেতনা থেকেই আজকের বাংলাদেশ।আজ শহীদদের স্মরণে জাতীয় পতাকা অর্ধনমিত রাখা হয়েছে। একই সঙ্গে সর্বত্র উড়ছে শোকের কালো পতাকা।
সারা বাংলার এ প্রাপ্ত থেকে ও প্রান্ত ক্ষুব্ধ তরুণদের থেকে দাবি উঠেছিলো -” এই দেশে উর্দু নয়, বরং বাংলা , বাংলা এবং বাংলাই হবে একমাত্র রাষ্ট্রভাষা।” আজ সেই মহান অর্জনের কথা বিশেষভাবে স্মরণ করার দিন। মাথা নত না করার অমর একুশে আজ। ১৯৫২ সালের এই দিনে মায়ের ভাষার জন্য প্রাণ বিলিয়ে দিয়ে বিরল ইতিহাস গড়েছিল বাঙালী। প্রতিবারের মতো এবারও যথাযথ মর্যাদায় ভাবগাম্ভীর্যের সঙ্গে পালিত হবে মহান শহীদ দিবস। সর্বত্র সকলের কণ্ঠে আজ একই শোকসঙ্গীত- আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি/ আমি কি ভুলিতে পারি…। একই সঙ্গে সারা বিশ্ব আজ পালন করবে ‘ইন্টারন্যাশনাল মাদার্স ল্যাঙ্গুয়েজ ডে’।
অতুল প্রসাদ সেনের অমর গানের ভাষা চিরসত্য, “মোদের গরব মোদের আশা, আ-মরি বাংলা ভাষা-মাগো, তোমার কোলে তোমার বোলে কতই শান্তি ভালবাসা…। ”
মায়ের মুখের বুলি আক্রান্ত হলে মরিয়া হয়ে লড়াই করবে মানুষ। সেই দৃষ্টান্ত তুলে ধরে ইতিহাস তৈরি করেএছে বাঙ্গালি। বায়ান্নর ভাষা আন্দোলনে তীব্র প্রতিবাদ গড়ে তুলেছিল বাঙালী। ১৯৫২ সালের এই দিনে ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করে রাজপথে নেমে এসেছিল বাংলা মায়ের বিক্ষুব্ধ সন্তানরা। রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে মুখর ছাত্রদের রুখে দিতে নির্বিচারে গুলি চালিয়েছিল পুলিশ। সালাম, রফিক,বরকত, শফিক, জব্বারসহ নাম না জানা আরও অনেক শহীদের রক্তে শৃঙ্খলমুক্ত হয়েছিল দুখিনী বর্ণমালা। সেই থেকে ২১ ফেব্রুয়ারি অমর একুশে।যার স্মরণে পালিত হয় মহান শহীদ দিবস।

ভাষার অধিকারের পক্ষে লড়ার পাশাপাশি, ঔপনিবেশিক প্রভুত্ব ও শাসন শোষণের বিরুদ্ধে একুশ ছিল বাঙালীর প্রথম প্রতিরোধ। রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের মধ্য দিয়ে বাঙালী জাতিসত্তার যে স্ফুরণ ঘটেছিল তা-ই পরবর্তীতে বাঙালীর জাতিরাষ্ট্র বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠায় মনস্তাত্ত্বিক ও সাংস্কৃতিক প্রেরণা যোগায়। নিজ নিজ মাতৃভাষার প্রতি সম্মান জানানোর বিশেষ অনুপ্রেরণা হয়ে আসে ২১ ফেব্রুয়ারি। মহান শহীদ দিবস ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস উপলক্ষে পৃথক বাণী দিয়েছেন রাষ্ট্রপতি মোঃ আবদুল হামিদ ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। বিরোধীদলীয় নেতা রওশন এরশাদ ও বিএনপি চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়াও এ উপলক্ষে বাণী দিয়েছেন।

এ দিনে শহীদদের স্মরনে শুধু শোক পালন নয়। সকল অশুভ এবং অগণতান্ত্রিক শক্তির বিরুদ্ধে সম্মিলিত প্রতিরোধ গড়ে তোলার আহ্বানে আজ সারা দেশে পালিত হচ্ছে অমর একুশে। সমাজের সকল অন্যায় অসাম্য ধর্মান্ধতা সাম্প্রয়িকতার বিরুদ্ধে জ্বলে ওঠার নতুন শপথ নেবে বাঙালী। একুশের প্রথম প্রহর থেকে শুরু হয়ে গেছে নানা আনুষ্ঠানিকতা। জাতি কৃতজ্ঞ চিত্তে ভাষা শহীদদের স্মরণ করছে। ভাষা শহীদদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়ে একুশের প্রথম প্রহরে শহীদ মিনারে পুষ্পার্ঘ্য অর্পণ করেন রাষ্ট্রপতি মোঃ আবদুল হামিদ ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। বিরোধীদলীয় নেত্রী রওশন এরশাদও ফুল দিয়ে শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানান। এর পর পরই সর্বস্তরের জনতার ঢল নামে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে। দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে হাজার হাজার মানুষ ফুল দিয়ে ভাষার প্রতি নিজেদের ভালবাসার কথা জানাচ্ছে। নগ্নপায়ে অংশ নিয়েছে প্রভাতফেরিতে।
১৯৪৭ সালে দ্বি-জাতিতত্ত্বের ভিত্তিতে ভারতবর্ষ বিভক্ত হয়। জন্ম নেয় পৃথক দুই রাষ্ট্র ভারত ও পাকিস্তান। পাকিস্তানের দুই অংশ পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তান। সংখ্যাগরিষ্ঠ পূর্বাঞ্চলের মানুষ বাঙালী। মাতৃভাষা বাংলা। পশ্চি, পাকিস্তানে বহুভাষাভাষি মানুষ, বেশ কয়েকটি ভাষা প্রচলিত। পাকিস্তানের ক্ষমতাসীন মুসলিম লীগ নেতৃত্ব সমগ্র পাকিস্তানের মাত্র ৫ শতাংশের ভাষা উর্দুকে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা করার চক্রান্ত করে। এর অনেক আগেই পূর্ব পাকিস্তানে ভাষাচেতনার উন্মেষ ঘটেছিল।
বর্বর অত্যাচারী পাকিস্তানী শাসকগোষ্ঠী এই অনুভূতিকে সম্মান জানাতে অস্বীকার করে।এই অঞ্চলের মানুষকে পেছনে ফেলে রাখার প্রাথমিক ষড়যন্ত্র হিসেবে ভাষার উপর আঘাত হানে। মায়ের ভাষা বাংলা মুখ থেকে কেড়ে নেয়ার ষড়যন্ত্র শুরু হয়। বাংলা ভাষাভাষী মানুষের সকল অনুভূতি তুচ্ছ করে উর্দুকে পূর্ব পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা করার ঘোষণা আসতে থাকে শীর্ষ মহল থেকে। এমন ষড়যন্ত্রে হতবাক হয়ে পড়ে বাংলার মানুষ। বাঙালীর সে সময়ের মনোজগত তুলে ধরে কবি শামসুর রাহমান তাঁর কবিতায় এক শহীদ সন্তানের পকেটে রক্তভেজা চিঠির ভাষা তুলে ধরে লিখেছিলেন,” মাগো, ওরা বলে/ সবার কথা কেড়ে নেবে …./তোমার কোলে শুয়ে/ গল্প শুনতে দেবে না।/ বলো, মা,/ তাই কি হয়? ”

পশ্চিম পাকিস্তানীরা গণচেতনাকে স্তব্ধ করার ষড়যন্ত্রে অত্যাচার -নিপীড়ন অব্যাহত রাখে। ক্ষুব্ধ প্রতিবাদী বাঙ্গালী গেয়ে ওঠে -” সইমু না আর সইমু না- অন্য কথা কইমু না/যায় যদি ভাই দিমু সাধের জান/এই জানের বদলে রাখুম রে ভাই বাপ-দাদার জবানের মান, সইমু না…। ” সেই গানের সাথে সাথেই অকাতরে বিলিয়ে দিয়েছে প্রাণ। আর সেই সাথে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে বাংলাকে প্রতিষ্ঠা করে মাতৃভাষার মর্যাদা রক্ষা করেছে বাঙালী। ১৯৪৮ এবং ১৯৫২ সালের রক্তক্ষয়ী সংগ্রাম তার প্রমাণ ।
উর্দুভাষা চাপিয়ে দেবার জন্যে ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি পশ্চিম পাকিস্তান সরকার নিরীহ ছাত্রদের মিছিলে গুলি চালায়।রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবি ঠেকাতে ১৪৪ ধারা জারি করে পুলিশ। ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা রাজপথে নেমে আসে। মাতৃভাষা বাংলার দাবি চিরতরে স্তব্ধ করে দেবার স্বপ্নে ছাত্রদের মিছিলে নির্বিচারে গুলি চালায় পুলিশ। গুলিবিদ্ধ হয়ে শহীদ হলেন আবুল বরকত, আবদুল জব্বার ও আবদুস সালাম, শফিক, রফিকসহ নাম না জানা অনেকে। গীতিকবির ভাষায়- রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন করিলিরে বাঙালী/তোরা ঢাকার শহর রক্তে ভাসাইলি…। মায়ের ভাষার জন্য বিরল রক্তস্রোত। রাজপথ ভেসে গিয়েছিল তরুণ তাজা খুনে। ঘটনার প্রতিবাদে ক্ষুব্ধ ঢাকাবাসী ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হোস্টেলে সমবেত হন। পরদিন ২২ ফেব্রুয়ারি ছাত্রছাত্রীদের পাশাপাশি সাধারণ মানুষও রাজপথে নেমে আসেন।
স্বজন হারানোর স্মৃতি অমর করে রাখতে ২৩ ফেব্রুয়ারি রাতে মেডিক্যাল কলেজ হোস্টেল প্রাঙ্গণে শহীদদের স্মরণে গড়ে তোলা হয় স্মৃতিস্তম্ভ। ২৬ ফেব্রুয়ারি রাতে সেই স্মৃতির মিনার গুঁড়িয়ে দেয় পুলিশ। সেই সময়ে আলাউদ্দিন আল আজাদ লিখেছেন, ” স্মৃতির মিনার ভেঙ্গেছে তোমার? ভয় কী বন্ধু , আমরা তো আছি আট কোটি পরিবার..” ঠিক সেই চেতনাতেই গর্জে ওঠে বাঙ্গালী! ১৯৫৪ সালে প্রাদেশিক পরিষদ নির্বাচনে যুক্তফ্রন্ট জয়লাভ করে। ৯মে অনুষ্ঠিত গণপরিষদের অধিবেশনে ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত প্রস্তাব করেন পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা হিসেবে বাংলাকে স্বীকৃতি দেবার জন্যে । আর তার ভিত্তিতেই বাংলা রাষ্ট্রভাষার স্বীকৃতি পায়। পরবর্তীতে প্রবাসী বাঙ্গালী রফিকুল ইসলাম এবং আবদুস সালামের প্রচেষ্টায় ইউনিসেফের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পায় বাংলা ভাষা।আর তাই ইতিহাসের ধারাবাহিকতায় বাংলা ভাষা আন্তর্জাতিকমাতৃভাষা । আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের স্বীকৃতি পেয়ে বিশ্বজুড়ে পালিত হচ্ছে অমর একুশে।

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

thirteen + 8 =