আগস্টে প্রয়াত দুই জগৎ বিখ্যাত বাঙালি

Facebooktwittergoogle_plusredditpinterestlinkedinmail

“ সাংস্কৃতিক স্বাধীনতা ছাড়া রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্বাধীনতা অর্থহীন। তাই মাটি ও মানুষকে কেন্দ্র করে গণমানুষের সুখ শান্তি ও স্বপ্ন এবং আশা-আকাঙ্খাকে অবলম্বন করে গড়ে উঠবে বাংলার নিজস্ব সাহিত্য-সংস্কৃতি। ”-বলেছিলেন জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমান! ক’জন সে কথা নিয়ে ভেবেছে ?

Desktop82

পঞ্চাশ – ষাট – সত্তর দশকের কবি সাহিত্যিক শিল্পী রাজনৈতিক কর্মীদের মতো আমাদের সংস্কৃতিকে ধারণ করার, ছড়িয়ে দেয়ার তাগিদ, পরিকল্পনা, প্রচেষ্টা ও লড়াই ছিল, তাই জঙ্গি নির্ভর ও জঙ্গি সমর্থক সমাজ গড়ে উঠতে পারেনি !

ধর্মব্যবসায়ীরা ধর্মান্ধরা মাকড়সার জাল বুনতে গিয়েও সফল হয়নি; সুবিধা করতে পারেনি !

তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের সংখ্যাগরিষ্ঠ সকল ধর্মমতের আর শ্রেণীর মানুষ তাই একাট্টা হয়ে লড়েছিল মুক্তিযুদ্ধে ।

মানুষ এক ধর্মের হলেও তার জাতিগত ও সংস্কৃতিগত বৈশিষ্ট্যের ফারাক বঙ্গবন্ধু তার অসমাপ্ত আত্মজীবনীতে তুলে ধরেছিলেন মাত্র কয়েকটি লাইনে ”‘প্রকৃতির সাথে মানুষের মনেরও একটা সম্বন্ধ আছে। বালুর দেশের মানুষের মনও বালুর মত উড়ে বেড়ায়। আর পলিমাটির বাংলার মানুষের মন ঐ রকমই নরম, ঐ রকমই সবুজ। প্রকৃতির অকৃপণ সৌন্দর্যে আমাদের জন্ম, সৌন্দর্যই আমরা ভালবাসি।”

পঁচাত্তর সালের পনের ই আগস্ট ইতিহাসের নৃশংসতম হত্যাকান্ড শুরু হয়ে চলতে থাকে সারা বছর, এর পর থেকে আমাদের বাংলাদেশের সংস্কৃতিকে আবার ‘মিনি পাকিস্তান’ এর আদলে বদলে দেয়ার চক্রান্ত শুরু হয় !

পঁচাত্তর সালের পর মুসলমানদের অনেকেই হীনমন্যতায় ভুগতে শুরু করেন ।তারা মনে করতে ও মনে করাতে চেষ্টা করেন যে তারা আরবদের বংশধর।

কিন্তু নৃবিজ্ঞান না ঘেঁটেই চেহারা দেখেই বলে দেয়া যায় এই সকল মানুষেরা বড়ো জোর মঙ্গোলিয়ান প্রজাতির লোক। চেহারায় মঙ্গোলিয়ানদের ছাপ প্রকট ।

ধর্ম পালনের চাইতে ধর্ম পালন দেখানোর প্রবণতা বাড়তে থাকে, রাষ্ট্র অনুপ্রেরণাসমেত, পঁচাত্তরের পর থেকে যুদ্ধাপরাধীরা দেশে রাজনীতি করার, ব্যবসা করার সুযোগ এবং পৃষ্টপোষকতা পায় । যে কারণে স্বাধীন দেশে নিষিদ্ধ ‘ধর্ম নিয়ে রাজনীতি’ করা দল গুলো আবার মাঠে নামার সুযোগ পায় !

শুরু হয় নতুন প্রজন্মের মগজ ধোলাই !

বাহাত্তরের পর থেকে জাতির ভেতর এমন একজন মানুষ জন্মাননি যাঁকে ঐতিহাসিক অনুকরণীয় চরিত্র বলা যেতে পারে।

যখন ই কোনো ক্ষেত্রে কেউ পাদপ্রদীপের আলোয় গেছে, তাদের আত্মা সেই রেট এ বিক্রি হয়ে গেছে !

তাদেরকে বড়জোর গ্যাংস্টার ও বিদেশীদের এজেন্ট বলা যায়।

যারা রাজনীতি, সাহিত্য, শিল্পকলা, ইতিহাস, ধর্ম সবকিছুকেই বিকৃত করেছে।

সাংস্কৃতিক চর্চা শুকিয়ে গেছে বাংলাদেশের নদী নালার মতো ।

আর সেই হ্যাজা চরে মধ্যপ্রাচ্যের টাকায় মধ্যপ্রাচ্যের সংস্কৃতি ,লেবাস এমনকি চুল দাড়ি সেঁধিয়ে গেছে ।

যখন একটু একটু বুঝতে পারছি আমরা, তখন কারো ছেলের কল্লা যাচ্ছে ; কারো ছেলে কল্লা নিচ্ছে !

লু স্যুন ডাক্তারী ছেড়ে লিখতে আসেন । লু স্যুন কে ?

লু স্যুন ছিলেন একজন চৈনিক সাহিত্যিক, যিনি তাঁর ছদ্মনাম ‘ঝোউ শুরেন’ নামেই অধিক পরিচিত। তাঁকে ধরা হয় বিংশ শতাব্দিতে একজন অন্যতম প্রধান চৈনিক সাহিত্যিক হিসেবে এবং একই সাথে ‘আধুনিক চৈনিক সাহিত্যের জনক’ রূপেও তাঁকে বিবেচনা করা হয়।

তিনি ছিলেন একাধারে ছোটগল্পকার, সম্পাদক, অনুবাদক,গদ্যলেখক এবং কবি।

চীনের সাংস্কৃতিক বিপ্লবের তিনি ছিলেন প্রধান সেনাপতি।

ছিলেন প্রস্তরের মতো দৃঢ়।

সকল রকম মোসাহেবি ও আজ্ঞানুবর্তিতা থেকে তিনি মুক্ত ছিলেন।

মানুষের মতো দেখতে হওয়া আর মানুষ হওয়ার মধ্যে বিস্তর পার্থক্য, জীবনের প্রতি পদে আমাদের প্রমান করতে হয় আমরা কতটা মানুষ আর কতটা না !

তার এই গল্পটা খুব মনে পড়ে যখন মীরজাফর, উমিচাঁদ, মুস্তাক, গয়েশ্বর রায় সহ বর্তমানে ছোট বড়ো মাঝারি আত্মা বিক্রেতাদের আমজনতা লম্ফঝম্প করতে দেখে !

”আমি স্বপ্ন দেখলাম, আমি একটা সংকীর্ণ গলি দিয়ে হাঁটছি। আমার পরনে ভিখারির মতো জীর্ণ পোশাক। একটা কুকুর আমার পিছনে ঘেউ ঘেউ করতে লাগল।
আমি ঘৃণাভরে পিছনে ফিরে তাকিয়ে চিৎকার করে উঠলাম : “এই! চুপ ! থুতু-চাটা নেড়ি কুত্তা!”
সে একটা চাপা হাসি হাসল। সে বলল, “আরে না ! এই বিষয়ে মানুষের সমান নই।”

১০ জানুয়ারি ১৯৭২ সালে বংগবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান লন্ডন থেকে দিল্লীতে যাত্রাবিরতি করে ঢাকা ফিরেন সেদিনই। দেশে ফিরে সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশের রাষ্ট্রভার গ্রহন করার পর বঙ্গগবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান প্রথম বিদেশ সফর করেন ভারতের পশ্চিমবঙ্গে।

ফেব্রুয়ারি ৬ তারিখ, ‘৭২ সাল থেকে শুরু করা ৩ দিনের সফরে বংগবন্ধু ও ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী কলকাতার ব্রিগেড প্যারেড গ্রাউন্ডে বিশাল জনসভায় ভাষণ দেন। লোক সমাগমের দিক থেকে সে জনসমুদ্রের আয়তনের রেকর্ড আজ পর্যন্ত অক্ষুন্ন আছে। আকাশবাণী ও দূরদর্শন থেকে বঙ্গবন্ধু –ইন্দিরার জনসভার ধারাবিবরণীর দায়িত্ব দেয়া হয়েছিল মহালয়া- পাঠখ্যাত বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্র, দেবদুলাল বন্দ্যোপাধ্যায় ও পঙ্কজ সাহা এই তিনজনকে।

কবি, ধারাভাষ্যকার ও গনমাধ্যমব্যক্তিত্ব পঙ্কজ সাহা এক সাক্ষাৎকারের সেদিনের সে জনসভার বর্ণনা দিয়েছেন এভাবে যে, “শেখ মুজিবুর রহমান তাঁর ভাষণের শুরুতেই রবীন্দ্রনাথের একটি কবিতা উদ্ধৃতি দিলেন।
তারপর জনতার সে বিশাল স্রোতের মধ্যে থেকে একটু পরপর আরো কবিতা পড়ার অনুরোধ করা হচ্ছিল শেখ মুজিবকে।

শেখ মুজিব জনতার সে অনুরোধে একের পর এক রবীন্দ্রনাথের কবিতা থেকে কিছু কিছু অংশ পাঠ করে শোনাতে লাগলেন। আমরা সবাই আশ্চর্য হয়ে শেখ মুজিবের রবীন্দ্র কবিতাপ্রীতি দেখে বিস্মিত হচ্ছিলাম। কলকাতা ব্রিগেড প্যারেডগ্রাউন্ডের সে ঐতিহাসিক জনসভা নিয়ে অনেক কিছু লেখা হয়েছে; কিন্তু রবীন্দ্রভক্ত শেখ মুজিবের কথা কোথাও উল্লেখ করা হয়নি”।

ষাটের দশকে যখন পাকিস্তান সরকার বাংলাদেশে রবীন্দ্রনাথের গান নিষিদ্ধ ঘোষণা করে, ‘৬৭’র ফেব্রুয়ারি,কারাগার থেকে মুক্ত হয়ে রেসকোর্সের ময়দানের জমায়েতে বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, ”আমরা এ ব্যবস্থা মানিনা, আমরা রবীন্দ্রনাথের বই পড়বোই, আমরা রবীন্দ্রসঙ্গীত গাইবোই, রবীন্দ্র সঙ্গীত এদেশে গীত হবেই’।

বঙ্গবন্ধুর সাথে রুখে দাঁড়ায় ছায়ানট, লেখক কবি শিল্পী সমাজ।

সাতষট্টির আন্দোলনের সব চাইতে স্থায়ী ফসল ‘আমার সোনার বাংলা’ গানটির যথাযোগ্য প্রতিষ্ঠা। সনজিদা খাতুন যিনি সহ শিল্পীদের নিয়ে, কণ্ঠে তুলে নিয়েছিলেন সেই গান ,তাঁর ভাষাতে – “এ গানকে আন্দোলনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ ভাবে যুক্ত করে দিলেন শেখ মুজিবুর রহমান।তাঁর জনসভায় এ গান না হলেই নয়। বক্তৃতাতে এই গানের বিশেষ উল্লেখ করে তিনি সাধারণ মানুষের কানে এই গানটি এবং সেই সূত্রে রবীন্দ্রনাথের নামটি তুলে দিয়েছিলেন”।

বঙ্গবন্ধুর জামাতা ড. ওয়াজেদ তার বইয়ে লিখেছেন, বঙ্গবন্ধু ১৯৬৯ সালে খাবার টেবিলে বসে বলেছেন, আমি যদি না ও থাকি, আর যদি দেশ স্বাধীন হয়,  তাহলে কবিগুরুর ‘আমার সোনার বাংলা গানটি জাতীয় সঙ্গীত কোরো”।

রমনার বটমূলে পহেলা বৈশাখের বর্ষবরণ অনুষ্ঠানে জাতি ধর্ম- বর্ণ- গোষ্ঠী, নারী- পুরুষ, ছোট- বড় নির্বিশেষ সকল শ্রেনী পেশার হাজার হাজার হাজার মানুষ এই অনুষ্ঠানে সমবেত হন।

মানুষ কে ভীত সন্ত্রস্ত করে  তার শেকড় থেকে বিচ্যূত করতে- এই জনস্রোত নিশ্চিহ্ণ করে দিতে  জঙ্গিরা ২০০১ সালের ১৪ এপ্রিল পহেলা বৈশাখে বোমা হামলা করে নৃশংস ভাবে হত্যা করে মানুষকে !

বাংলাদেশের মানুষ সংগ্রাম করে, প্রাণ দিয়ে  হাজার বছরের যে সংস্কৃতি বাঁচিয়ে রেখেছে, এমন শক্তিশালী সংস্কৃতিকে মেরে ফেলার সাধ্য কোনো জঙ্গিবাদের আছে কি ?

রবীন্দ্রনাথও আমাদের সংগ্রাম, আমাদের অর্জন !

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

eight + four =