আজ চব্বিশে জানুয়ারি গণঅভ্যুত্থান দিবস

Facebooktwittergoogle_plusredditpinterestlinkedinmail

২০ জানুয়ারি তৎকালীন ‘পূর্ব পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় ছাত্র সংগ্রাম কমিটি’ পাকিস্তানি স্বৈরশাসক আইয়ুব খান সরকারের বিরুদ্ধে ১১ দফা কর্মসূচির দাবিতে ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করে ঢাকা মেডিকেল কলেজের সামনে মিছিল বের করলে পুলিশ ও ইপিআর বাহিনী মিছিলে বাধা দেয় ও হামলা চালায়। এ সময়ে তত্কালীন ছাত্র ইউনিয়ন মেনন গ্রুপের ছাত্রনেতা আসাদ ছত্রভঙ্গ মিছিলটি আবার সংগঠিত করে আগাতে শুরু করলে পুলিশ প্রথমে আসাদের ওপর বেওনেট চার্জ করে, এতে আহত হয়ে আসাদ মাটিতে পড়ে গেলে জনৈক বাঙালি পুলিশ কর্মকর্তা রিভলভার দিয়ে পয়েন্ট ব্লাঙ্ক-রেঞ্জ থেকে আসাদের বুকে গুলি করে। বিক্ষুব্ধ জনতা পরের দিন ২১ জানুয়ারি যে সকল স্থাপনায় বা স্থানে আইয়ুব খানের নাম ছিল, সেখানে ‘আসাদ’ বসিয়ে দেয়। সকল স্থানের পুন:নামকরণ কালের গর্ভে হারিয়ে গেলেও মিরপুর মোহাম্মদপুর রোডের বরাবর লিংক আইয়ুব গেটের নাম বদলিয়ে আসাদ গেট আজও ইতিহাসের সাক্ষী হিসাবে টিকে আছে । 

আসাদের মৃত্যু জনতার মিছিলের স্রোত বাড়িয়ে দেয়। ছাত্র-জনতার মিছিলে শহীদ আসাদের রক্তমাখা শার্ট দেখে কবি শামসুর রাহমান ‘আসাদের শার্ট’ কবিতাটি লেখেন ”আমাদের দুর্বলতা, ভীরুতা কলুষ আর লজ্জা,সমস্ত দিয়েছে ঢেকে একখন্ড বস্ত্র মান বিক; আসাদের শার্ট আজ আমাদের প্রাণের পতাকা’। মূলত,৬৯ এর গণঅভ্যুত্থানে চারটি হত্যা একাত্তরের মুক্তিসংগ্রামে বাঙালিকে ঐক্য বদ্ধ করেছিল।যথাক্রমে, ৬৯ সালের ২০ জানুয়ারি ছাত্রনেতা শহীদ আসাদ, ২৪ জানু য়ারি, সেনাবাহিনী গুলি চালালে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন মাত্র ষোল বছর বয়সের নব কুমার নবকুমার ইনস্টিটিউটের মেধাবী ছাত্র মতিয়ুর রহমান, ১৫ ফেব্রুয়ারি সার্জেন্ট জহুরুল হক কে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার আসামি) সেনানিবাসে ও ১৮ ফেব্রুয়ারি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের রিডার ড. শামছুজ্জোহাকে বিশ্ব বিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসে গুলি করে হত্যা করা হয়।

ওই সময় চিরায়ত যুবক কবি হেলাল হাফিজও লেখেন ‘নিষিদ্ধ সম্পাদকীয়’। তার প্রেক্ষাপট কবির নিজের মুখে ”সেটি ছিল ১৯৬৯ সালের জানুয়ারি মাস। টগবগে লাভার ভেতরে ফুটতে থাকা উত্তাল পূর্ব বাংলা ছাত্র-গণঅভূত্থানের সময়। ২১ জানু য়ারির বিকেলে শুনশান, নিস্তব্ধ এক অচেনা নগরীর পথ ধরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে এক বন্ধুর রুমে রাতটুকু কাটানোর জন্য রিকশা ধরে যাচ্ছি। এর আগের দিনই ২০ জানু য়ারি পাক-সামরিক জান্তার লেলিয়ে দেওয়া পুলিশ- ইপিআর বাহিনীর গুলিতে নিহত হয়েছেন ছাত্র নেতা আসাদ। পুরো ঢাকা শহর ক্ষোভের জ্বলছে। সারাদেশেই ছড়িয়ে পড়েছে গণ-বিক্ষোভ। প্রায় প্রতিদিনই পুলিশের গুলিতে কোনো না কোনো ছাত্র মারা যাচ্ছেন। তবু জনতার সংগ্রাম চলছেই। …রিকশায় বসে বন্ধুর ছাত্রবাসে ফিরতে ফিরতে এইসবই ভাবনা ঘুরপাক খাচ্ছিল মাথার ভেতর। এরপর করণীয় কী? যুদ্ধ কি সত্যিই আসন্ন? স্বাধী নতার সংগ্রাম শুরু হচ্ছে কবে? রিকশা যখন কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার চত্বর পেরিয়ে যাচ্ছে, তখন অস্থিরতার ভেতরেই বুড়ো মতোন রিকশাওয়ালা কেই জিজ্ঞাসা করি, আচ্ছা চাচা মিয়া,বলেন তো, এই যে ছাত্ররা প্রতিদিন মিছিলে গুলি খেয়ে মরছে, তবু আন্দোলন চলছেই, এর শেষ কোথায়? এখন কি করণীয়? বুড়ো রিকশাওয়ালা ঘাড় ঘুরিয়ে নিয়ে আমাকে এক নজর দেখে সেদিন যা বলেছিলেন, তা এখনো স্পষ্ট মনে আছে। সেদিন ওই বুড়ো আমাকে বলেছিলেন, বাবা, কিছু মনে করো না। আমার মনে হয়, অনেক ছাত্র খুন হইছে। এখন এর বিহিত করনের সময় হইছে। এখন ছাত্রদেরও উচিত হইবো কিছু পুলিশ-ইপিআর মাইরা ফেলা। কারণ, সব হত্যায় পাপ নাই’! 

‘এই কথা শুনে সেদিন আমার সর্ব শরীর কেঁপে উঠেছিল। কথাগুলো একদম কলজের ভেতরে গেঁথে যায়। বারবার মাথার ভেতর ঘুরপাক খাচ্ছিল বুড়ো রিকশাওয়ালার সেই কথাগুলো। কি যন্ত্রণায় মনে মনে ছটফট করতে করতে ভোর রাতে উঠে রুমের বাতি জ্বালাই। কাগজ-কলম টেনে নিয়ে একটানে লিখে ফেলি ওই কবিতাটি: “কোনো কোনো প্রেম আছে প্রেমিককে খুনী হতে হয়। যদি কেউ ভালোবেসে খুনী হতে চান তাই হয়ে যান, উৎকৃষ্ট সময় কিন্তু আজ বয়ে যায় । এখন যৌবন যার মিছিলে যাবার তার শ্রেষ্ঠ সময়, এখন যৌবন যার যুদ্ধে যাবার তার শ্রেষ্ঠ সময় ।”হেলাল হাফিজ জানান ”এখন যেখানে বিশ্ববিদ্যালয়ের মসজিদ, এর উল্টো দিকের মাঠের এককোনো তখন ঝুপড়ি একটি রেঁস্তোরা ছিলো। আমরা কবিসাহিত্যিক রা সেখানে বসেই আড্ডা দিতাম। ছফা ভাই প্রতি সকালে সেখানে আসতেন নাস্তা করতে। আমি দোকানটিতে গিয়ে ছফা ভাইয়ের জন্য অপেক্ষা করতে থাকি। তিনি এলে পকেট থেকে কবিতা লেখা কাগজটি বের করে তাকে দেখাই। ছফা ভাই কবিতা টি একবার-দুবার পড়েন। এর পর আবারো পড়েন। তারপর হঠাৎ উল্লাস করে আমাকে জড়িয়ে ধরেন। বলেন, হেলাল, তুমি বোধহয় তোমার জীবনের শ্রেষ্ঠ লেখাটি লিখে ফেলেছো ! এই কবিতাতেই তুমি আজীবন বেঁচে থাকবে।”

কথাসাহিত্যক সেলিনা হোসেনের কলমে সেই সময় দিয়ে ইতি, ‘কুর্মিটোলা সেনা নিবাসের অভ্যন্তরে যখন চলছিল ‘আগর তলা ষড়যন্ত্র মামলা’র বিচারের প্রহসন, বাইরে তখন আগুনের ফুলকি হয়ে জ্বলছিল মানুষের বিক্ষোভ। সরকার যতই ঘোষণা করে যে বিচ্ছিন্নতাবাদীরা পাকিস্তানকে বিচ্ছিন্ন করতে চায় ততই ফুঁসে ওঠে মানুষ। জাতীয়তাবাদী স্লোগান দিতে থাকে, ‘জয় বাংলা’ ‘তোমার আমার ঠিকানা পদ্মা মেঘনা যমুনা’ ‘তোমার দেশ আমার দেশ বাংলাদেশ বাংলাদেশ’ ইত্যাদি।”

 

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

four + four =