আজ যেমন করে গাইছে আকাশ

Facebooktwittergoogle_plusredditpinterestlinkedinmail

ডাকঘরের সাত বছরের অমল, মাবাবা নেই, রোগে শীর্ণ বালক কবিরাজের কঠোর নিষেধাজ্ঞায় বাইরের জীবনকে শুধু দেখে জানালা থেকে,তাই মুক্তির প্রচন্ড আলোড়ন তাকে কল্পনার হাটে নিত্য ছেড়ে দেয়, গল্প সবার পড়া, পাঠকের সীমাও যেন কোনো সীমানা মানেনি !

অমলরা চিরকালই ছিল, এখনো আছে চার দিকে, কোচিং বা ভর্তির প্রতিযোগীতারত, চারদিকে উচু উচু অট্টালিকাতে আকাশ ঢাকা আর ফাকা মাঠ নেই কোথাও অনেক অমলরা এখনো ভাবে, কেউ ছবিতে বা টিভিতে দেখান বিদেশটাকে শান্ত সুন্দর সবুজ বলে, কিনবা কোনো অমলরা কোথাও বা ইট ভাঙছে, প্লাস্টিকের কারখানাতে হাপর টানছে বা অত্যাচারের কষাঘাতে বাচতে চেয়েও পারছেনা, নির্মমতায় ঢলে পড়ছে চিরঘুমে !

লোকে বলে ‘ডাকঘর’ (১৯১১) নাটকের অমল রবি পুত্র শমীন্দ্রনাথেরই আদলে গড়া। ইন্দিরা দেবী লিখেছেন ”লোকে বলে যে রবিকাকার ছোটো ছেলে শমীন্দ্রই বেশি তাঁর মতো দেখতে ছিলো। শমী অল্প বয়সেই বিসর্জনের মতো শক্ত নাটকের কবিতাও অনর্গল মুখস্থ বলতে পারতো। দুলে দুলে রবিকাকার উপাসনা করাও নকল করতো। হেমলতা বৌঠানের কাছে শুনেছি, বাপের টেবিলে বসে নাকি তাঁর মতো লেখক হবার অভিনয় করতো”।

শিশু সাহিত্যিক ও চিকিৎসক ইয়ানুস করজাক ছিলেন পোল্যান্ডের রাজধানী ওয়ারশ- তে একটি অনাথ আশ্রমের পরিচালক ৷ দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় দখলদার নাৎসিরা তখন পোল্যান্ডের তথাকথিত শুদ্ধি করণের কর্মসূচি নিয়েছে, সেদেশে বসবাসকারী ইহুদিদের চিহ্নিত করে পাঠিয়ে দেওয়া হচ্ছে কুখ্যাত ত্রেবলিঙ্কা এক্সটারমিনেশন শিবিরে ৷

ওয়ারশ-র ইহুদি বস্তির ওই অনাথ আশ্রমের বাচ্চাদেরও তখন গ্যাস চেম্বারে গণনিধনের জন্য ক্যাম্পে পাঠিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে ৷ অশউইজ কনসেনট্রেশন ক্যাম্প যার নাম, ইউরোপের ইতিহাসে এক মূর্তিমান আতঙ্ক অশউইজ কনসেনট্রেশন ক্যাম্প ৷

ডাঃ করজাক যদিও সুযোগ পেয়েছিলেন চিকিৎসক হওয়ার সুবাদে নিজের প্রাণ বাঁচানোর ৷ কিন্তু তিনি ঠিক করেন, অনাথ বাচ্চাদের সঙ্গেই থাকবেন ৷ আমৃত্যু ওই শিশুদের সঙ্গে ছিলেন ডাঃ করজাক ৷

ত্রেবলিঙ্কা নিধন শিবিরে, বাচ্চাদের দিয়ে তিনি ডাকঘর নাটকটি মঞ্চস্থ করিয়েছিলেন, কারণ একটাই, কিছু দিন পরেই তাদের গ্যাস চেম্বারে নিয়ে যাওয়া হবে, তার থেকে তাদের অন্যমনস্ক করে দেয়ার উদ্দেশ্যে রবীন্দ্রনাথের ডাকঘর নাটকের পোলিশ ভাষান্তর ! যাতে তারা মৃত্যুর জন্য প্রস্তুত হতে পারে। ওদের দিয়ে অভিনয় করিয়েছিলেন করজাক, নিজে অভিনয় করেছিলেন রাজবৈদ্যের ভূমিকায় ৷

রবীন্দ্রনাথের ডাকঘর বহু আগে থেকেই ইউরোপে পরিচিত ৷ রবীন্দ্রনাথ নাটকটি লিখে ছিলেন ১৯১২ সালে ৷ তার পরের বছরই আইরিশ কবি ইয়েটস এটি ইংরেজিতে অনুবাদ করেন ৷ লন্ডনের আইরিশ থিয়েটারে নাটক অভি ত হয় ৷ প্রথম সন্ধ্যায় দর্শকদের মধ্যে রবীন্দ্রনাথ নিজেও ছিলেন ৷ একাধিক ইউরোপীয় ভাষায় অনুদিত হয় ডাকঘর, অভিনীতও
হয় ৷

ফরাসি ভাষায় এটি অনুবাদ করেন অঁদ্রে জিদ ৷ শোনা যায়, যে রাতে প্যারিসের পতন ঘটছে, নাৎসি দখলে চলে যাচ্ছে ফ্রান্স, সেই রাতে ফরাসি বেতারে পড়ে শোনানো হয়েছিল জিদ-এর করা ডাকঘরের ফরাসি অনুবাদ !

রবীন্দ্রনাথের জন্মশতবর্ষে পরিচালক সত্যজিৎরায়কে দিয়ে যেমন একটি তথ্যচিত্র তৈরি করিয়েছিল ভারত সরকারের কেন্দ্রীয় তথ্য সম্প্রচার ও সংস্কৃতি মন্ত্রক, তেমন সার্ধশতবর্ষে ঋতুপর্ণ ঘোষকে একটি তথ্যচিত্র তৈরির দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল !

কোনও কিছুতে মোটা দাগ নেই যার সৃষ্টিতেও, তিনি হলেন ঋতুপর্ণ নিজে আর তার কাজ ! ঋতুপর্ণের শেষ খাটো ছবি ‘জীবনস্মৃতি’ নির্মাণ সম্পর্কে জানা যায়, ঋতুপর্ণ ঘোষ এক বছর আর কোনো কিছুতে মন না দিয়ে মগ্ন ছিলেন রবীন্দ্রনাথে, তার সেই মগ্ন চৈতন্যে শীষ দিয়ে উঠে আসে উপরি উক্ত তথ্যসূত্র, যা কারো জানা ছিলনা।যখন সবাই জানলো তখন তিনি অমলের মতোই মুক্তির দিগন্তে ধাবমান !

ছিন্নপত্রাবলীতে রবীন্দ্রনাথ লিখেছেন ”ইচ্ছে করে জীবনের প্রত্যেক সূর্যোদয়কে সজ্ঞানভারে অভিবাদন করি এবং প্রত্যেক সূর্যাস্তকে পরিচিত বন্ধুর মতো বিদায় দিই”।

রবীন্দ্রনাথের মা সারদাসুন্দরী দেবী যখন মারা যান তখন রবীন্দ্রনাথের বয়স মাত্র ১৩ বছর ১০ মাস। কাল ২৭ ফাল্গুন, ১২৮১ বঙ্গাব্দ (১০ মার্চ ১৮৭৪)। মার মৃত্যু নিয়ে রবীন্দ্রনাথ লিখেছেন– ‘প্রভাতে উঠিয়া যখন মা’র মৃত্যুসংবাদ শুনিলাম তখনো সে-কথাটার অর্থ সম্পূর্ণ গ্রহণ করিতে পারিলাম না।
বাহিরের বারান্দায় আসিয়া দেখিলাম, তাঁহার সুসজ্জিত দেহ প্রাঙ্গণে খাটের উপর শয়ান। কিন্তু মৃত্যু যে ভয়ংকর সে-দেহে তাহার কোনো প্রমাণ ছিল না– সেদিন প্রভাবের আলোকে মৃত্যুর যে-রূপ দেখিলাম তাহা সুখসুপ্তির মতোই প্রশান্ত ও মনোহর।’ [জীবনস্মৃতি]

রবীন্দ্রনাথ তাঁর জীবনস্মৃতির ‘মৃত্যুশোক’ অধ্যায়ে লিখেছেন ” আমার চব্বিশ বছর (আসলে বাইশ বছর এগারো মাস তেরো দিন) বয়সের সময় মৃত্যুর সঙ্গে যে-পরিচয় হইল তাহা স্থায়ী পরিচয়। তাহা তাহার পরবর্তী প্রত্যেক বিচ্ছেদশোকের সঙ্গে মিলিয়া অশ্রুর মালা দীর্ঘ করিয়া গাঁথিয়া চলিয়াছে। শিশু বয়সের লঘু জীবন বড়ো বড়ো মৃত্যুকেও অনায়াসেই পাশ কাটাইয়া ছুটিয়া যায়- কিন্তু অধিক বয়সে মৃত্যুকে অত সহজে ফাঁকি দিয়া এড়াইয়া চলিবার পথ নাই”।

স্ত্রী মৃণালিনী দেবীর মৃত্যুর দুই সপ্তাহ পরে শান্তিনিকেতন থেকে মোহিতচন্দ্র সেনকে লিখেছেন ” ঈশ্বর আমার শোককে নিষ্ফল করিবেন না। তিনি আমার পরম ক্ষতিকেও সার্থক করিবেন তাহা আমার হৃদয়ের মধ্যে অনুভব করিয়াছি। তিনি আমাকে আমার শিক্ষালয়ের এক শ্রেণী হইতে আর এক শ্রেণীতে উত্তীর্ণ করিলেন”।

পিতা, স্ত্রী, পুত্র, কন্যাসহ ঠাকুর পরিবারের একের পর এক নিকট আত্মীয়ের মৃত্যুর মিছিলের সামনে দাঁড়িয়ে সংবেদনশীল রবীন্দ্রনাথ অবিচল পদচারণারাত থাকলেও, মরণ রে তুহু মোম শ্যাম সমান বললেও, মৃত্যুর কিছু আগে ১৯৪১ সালের ৩০ জুলাই তারিখে তিনি তাঁর শেষ কবিতাটি লেখেন, যা তার দার্শনিক যাপনে সংশয়বাদকেই যেন বা প্রকাশ করে

তোমার সৃষ্টির পথ রেখেছ আকীর্ণ করি
বিচিত্র ছলনাজালে হে ছলনাময়ী।
মিথ্যা বিশ্বাসের ফাঁদ পেতেছ নিপুণ হাতে সরল জীবনে।
এই প্রবঞ্চনা দিয়ে মহত্ত্বেরে করেছো চিহ্নিত,
তার তরে রাখ নি গোপন রাত্রি।

সূত্র. রবি জীবনী, প্রশান্তকুমার পাল রবীন্দ্রনাথের মরণদর্শন, আবদুশ শাকুর, রবীন্দ্ররচনাবলী ও নেট

সৌজন্য : সাম্প্রদায়িকতাবিরোধী বাংলাদেশ

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

15 + 7 =