‘আবার আসিব ফিরে,ধানসিঁড়িটির তীরে,এই বাংলায়’-নরেন্দ্র মোদী

Facebooktwittergoogle_plusredditpinterestlinkedinmail

Narendramodi DU

জীবনানন্দ দাশের আবার আসিব ফিরে,ধানসিঁড়িটির তীরে,এই বাংলায়’—কবিতা উচ্চারণ করে বাংলাদেশে আবার ফিরে এসে তরুণ প্রজন্মের সাথে আড্ডা এবং শাহজাদপুর রবীন্দ্রকুঠিবাড়ী , পদ্মায় নৌকাভ্রমণের ইচ্ছে ব্যক্ত করলেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি।  বললেন, “আমার ইচ্ছা করে, নোয়াখালিতে যাই যেখানে মহাত্মা গান্ধী তার সত্যাগ্রহ আন্দোলন করেছিলেন। আমার ইচ্ছা করে, কুঠিবাড়িতে গিয়ে রবি ঠাকুরের স্মৃতিবিজড়িত বাড়িতে ঘুরে আসি। ইচ্ছা করে পদ্মানদীতে নৌকায় ভেসে বেড়াই আর তরুণদের সাথে  আড্ডা দেই। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর প্রসঙ্গে তিনি আরও বলেন, আমাদের দুই দেশের জাতীয় সঙ্গীত একজনের লেখা এমন উদাহরণ পৃথিবীতে দ্বিতীয়টি নেই, আর তাই আমরা একসাথে পথ চলতে পারি।বললেন, বাংলাদেশের চলমান অগ্রগতি কেউ দমিয়ে রাখতে পারবে না ।

মোদি তাঁর বক্তব্যের শুরুতেই বাংলায় বলেন, ‘কেমন আছ? আমরা তোমার সাথে আছি। আমরা তোমাদের সাথে নিয়ে চলব।’ এ কথা বলার পর তিনি অতিথিদের কাছে জানতে চান ‘আমার বাংলা কেমন? ’
বক্তৃতা বাংলায় শুরু করলেও হিন্দিতে বক্তব্য দেন মোদি। এক সাথে বাংলায় অনুবাদ করে প্রতিটি লাইন শ্রোতাদের শোনানো হয় ।অনুষ্ঠানের শুরুতেই স্বাগত বক্তৃতা দেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক।

কোন কাগজপত্র সামনে না নিয়েই বাংলাদেশের প্রতিটি সাফল্যের কথা গর্বের সাথে তুলে ধরে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী বললেন, দু্‌ই দেশে একসাথে পথ চলার কথা বলতেই তিনি এদেশে এসেছেন। নরেন্দ্র মোদী তাঁর বক্তব্যে  বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে অভিনন্দন জানান বাংলাদেশের উন্নয়নে নারীর ক্ষমতায়ন এবং প্রগতির বিকাশের গুরুত্ব দেয়াতে।বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে ভারতের সৈন্যদের প্রাণ বিসর্জনের কথা তুলে ধরে বলেন,বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে বাংলাদেশের স্বাদীনতা অর্জনে ভারত তাদের সর্বোচ্চ দিয়ে পাশে থেকেছে।  জমি দখল বা পাকিস্তানের বিরুদ্ধে প্রতিশোধস্পৃহা কখনো কাজ করেনি ভারতের মধ্যে। এ সময়ে তিনি উল্লেখ করেন পাকিস্তান  জঙ্গী হানা এবং সন্ত্রাসের মাধ্যমে ভারতকে প্রতিমুহূর্তে জর্জরিত করছে। তবু ভারত বার বার প্রমাণ করেছে , ভারত সরকার বরাবরই শান্তির পক্ষে ।

স্থল সীমান্ত চুক্তি শুধুই জমি সংক্রান্ত কোনো বিষয় নয় জানিয়ে তিনি বলেন, সময় অনেক এগিয়েছে। সকালে  বাংলাদেশের কয়েকটি পত্রিকার হেডলাইন পড়েছেন, যেখানে লেখক স্থলসীমান্ত চুক্তিকে বার্লিনের দেয়াল ভেঙে ফেলার সঙ্গে তুলনা করেছেন বলে তার বক্তব্যে উল্লেখ করেন নরেন্দ্র মোদী। একই সাথে তিনি উল্লেখ করেনআমরা গরীব বলে ঐতিহাসিক এ সাফল্য সেভাবে মূল্যায়িত হচ্ছে না, যেভাবে হওয়া উচিত। তিনি বলেন , উন্নত বিশ্বে দীর্ঘ ৬৮ বছরের এমন জটিল বিষয়ের এমন সফল সমাধানের দৃষ্টান্ত নোবেল পুরস্কারের জন্য আলোচিত হতো। যা এক্ষেত্রে হয় নি।

ভারতের প্রধানমন্ত্রী বলেন, তিনি রাস্তায় একটি বিলবোর্ড দেখে আপ্লুত হয়েছেন। কেননা, সেখানে একটি মেয়ে বলছে, ‘আই অ্যাম মেড ইন বাংলাদেশ’ । মোদীর বক্তব্যে উচ্ছসিত প্রশংসায়  ক্রিকেটার  সালমা খাতুন এবং সাকিব আল হাসানের নাম উল্লেখ করেন । পোশাকে বাংলাদেশের দ্বিতীয় অবস্থানের কথা বলেন তিনি। এ দেশে নারীদের এগিয়ে যাওয়ার কথা বলতে গিয়ে এভারেস্ট জয়ী দুই নারী নিশাত মজুমদার ও ওয়াসফিয়া নাজরিনের নাম উল্লেখ করেন মোদী। বাংলাদেশের রাজনীতিতে প্রধানমন্ত্রী, বিরোধী দলীয় নেতা ও স্পীকার পদে নারীর আসীন থাকার কথাও তিনি উল্লেখ করেন। এ ছাড়া সীমান্তে হত্যা, ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক, পানি চুক্তিসহ বিভিন্ন বিষয় নিয়ে কথা বলেন মোদি।নরেন্দ্র মোদির বক্তৃতার বড় একটি অংশ জুড়ে ছিল জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে ভারতের সদস্যপদ না পাবার জন্য আক্ষেপ। দুই দিনের রাষ্ট্রীয় সফরে মোদি প্রথমবারের মতো শনিবার সকালে বাংলাদেশে আসেন। ৩৬ ঘন্টার ঝড়ো সফর শেষে রোববার রাত সাড়ে আটটায় তিনি ভারতে ফিরে যান।

রোববার সন্ধ্যায় ঢাকার বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক নিয়ে জনবক্তৃতায় এই প্রত্যয় ব্যক্ত করেন মোদি। অনুষ্ঠানটির আয়োজন করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।বাংলাদেশের বিকাশ যাত্রা কখনো থমকে দাঁড়াবে না মন্তব্য করে তিনি বলেন, এদেশের মোট জনসংখ্যার ৬৫ শতাংশ ৩৫ বছরের কম বয়সের। এটি স্বপ্ন সমান। যে দেশের এমন জনশক্তি রয়েছে, ইতিহাসের জন্য উৎসর্গ করার শক্তি আছে। সেদেশের উন্নতি কখনো থামবে না।এসময় বাংলাদেশের উন্নয়নের জন্য প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকেও শুভেচ্ছা জানিয়ে নরেন্দ্র মোদি বলেন, দেশের উন্নয়নের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী ও আমার চিন্তাধারা একই।

তিনি বলেন,  সমগ্র বিশ্ব একে অপরকে ছাড়া চলতে পারে না। তাই আগামীর জন্য নেপাল, ভূটান , বাংলাদেশ এবং ভারত এক হয়ে কাজ করতে হবে ; আসুন সেই লক্ষ্যে এগিয়ে যাই।বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বিষয়ে মোদি বলেন, এই দেশ ধারাবাহিকভাবে ৬ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছে। যা স্বাভাবিক বিষয় নয়।  এ সময় তিনি জোর দিয়ে বলেন ,নারী ও শিশু মৃত্যুর হার কমাতে ভারতকে বাংলাদেশের কাছ থেকে শিখতে হবে।

নরেন্দ্র মোদি বলেন, ‘আমাদের দুদিনের যাত্রা সফলভাবে শেষ হচ্ছে। এটি আমার এই সফরের শেষ কর্মসূচি। কিন্তু আমার মনে হচ্ছে, আমি সফর শুরু করতে চলেছি। আমার এই দুই দিনের সফরে বাংলাদেশের নাগরিকেরা, বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী ও মন্ত্রীরা যেভাবে আমাকে স্বাগত ও সম্মান জানিয়েছেন; এটা নরেন্দ্র মোদি নামের এক ব্যক্তির নয়, সোয়া শ’ কোটি ভারতবাসীর সম্মান।’
ভারতের প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘এই দুদিনের সফরের পর শুধু এশিয়া নয়, সমগ্র বিশ্ব খুব সূক্ষ্মভাবে ময়নাতদন্ত করবে। কেউ মাপকাঠি নিয়ে দেখবে কী পেলাম আর কী দিলাম। কিন্তু যদি একটি বাক্য আমাকে বলতে হয় আমি বলব, লোকেরা মনে করতেন আমরা খুব পাশাপাশি আছি। বিশ্বকে বলতে চাই, পাশাপাশি ও একই সঙ্গেই আছি।’
নরেন্দ্র মোদি বলেন, ‘সূর্য এখানে আগে ওঠে, এরপর আলো আমাদের (ভারত) ওখানে যায়। এখানে যত আলোই হোক আলো আমাদের ওখানেও যায়। আমাদের রাজ্যগুলোকে বাংলাদেশের কাছ থেকে শিখতে হবে। বাল্যবিবাহ, শিশুমৃত্যু এসব বিষয়ে শিখতে হবে। আমাদের দেশের কেউ সৈন্য ছিল যিনি বাংলাদেশের জন্য রক্ত দিয়েছিলেন। বাংলাদেশের স্বাধীনতার জন্যে আমার দেশের সৈন্যরা তাদের রক্ত দিয়েছেন, এর চেয়ে বেশি গৌরব আর কিছু থাকতে পারে না।’ মোদি বলেন, ‘আমি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ধন্যবাদ জানাব, তিনি একটিই লক্ষ্য বানিয়েছেন সেটি, প্রবৃদ্ধি। আর ধারাবাহিকভাবে ছয় শতাংশ প্রবৃদ্ধি ছোট ব্যাপার নয়।’
মোদি বলেন, ‘খুব কম লোক এটি চিন্তা করেছে যে, ভারত-বাংলাদেশের মধ্যে স্থলসীমান্ত চুক্তি হবে। এটি জমির সমাধান নয়, এটি সেই চুক্তি যা মনকে যুক্ত করেছে। বিশ্বে সব যুদ্ধই জমির জন্য হয়েছে। আজ পর্যটনমন্ত্রীর সঙ্গে আমার দেখা হয়েছিল, বুদ্ধ (গৌতম বুদ্ধ) ছাড়া ভারতও অসম্ভব। যেখানে বুদ্ধ রয়েছেন সেখানে যুদ্ধ হতে পারে না। তাঁরা জমির জন্য যুদ্ধ করতে পারে, আমরা না।’ মোদী বলেন, প্রথম বিশ্বযুদ্ধ, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ এবং বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে ভারত নিঃস্বার্থভাবে অংশ নিয়েছে মানবতার জন্যে। কোন জমি দখলের জন্যে নয়। ক্ষুব্ধ কন্ঠে মোদী বলেন, অন্য দেশের শান্তির জন্যে এবং মানবতার জন্যে  বারবার লড়াই করার পর ও জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী সদস্য করা হয় নি ভারতকে।

তিনি ইতিহাস তুলে ধরে বলেন,একাত্তরে পাকিস্তানের ৯০ হাজার সৈন্য কে আত্মসমর্পনে বাধ্য করেছিলো ভারত; পাকিস্তানের৯০ হাজার সৈন্যকে হাতে পেয়েও তাদের গুলি করে হত্যা ও করে নি , কারো কোন দুর্বলতম মুহূর্তে  কখনোই  জমি দখল বা প্রতিশোধপরায়ণতার দৃষ্টান্ত ও দেখায় নি ভারত।

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

one × 3 =