ইতিহাসের কলঙ্কময়, বেদনাবিধুর ও রক্তক্ষয়ী জেলহত্যা দিবস আজ

Facebooktwittergoogle_plusredditpinterestlinkedinmail

4 National  leaders Mourn Dayবেদনাবিধূর জেল হত্যা দিবস আজ। বাঙ্গালী জাতিস্বত্বা এবং সংস্কৃতি ধ্বংস করার ষড়যন্ত্রে  বঙ্গবন্ধু হত্যা এবং সেই ষড়যন্ত্রের ধারাবাহিকতা জাতীয় চার নেতার হত্যাকান্ড ।দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে কলঙ্কময়, বেদনাবিধুর ও রক্তঝরা একটি দিন। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট জাতির জনক বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যার প্রায় আড়াই মাস পর জাতীয় চার নেতাকে গ্রেফতার করে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের ভেতরে  ৩ নভেম্বর , ১৯৭৫ গুলি করে এবং বেয়নেট দিয়ে খুঁচিয়ে হত্যা করা হয় মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্বদানকারী ও অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম, প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ, অর্থমন্ত্রী ক্যাপ্টেন (অব.) এম মনসুর আলী এবং খাদ্য ও ত্রাণমন্ত্রী এএইচএম কামরুজ্জামানকে । ইতিহাসের কালো অধ্যায় এই হত্যাযজ্ঞের ঘটনায় সেদিন শোকার্ত হয়ে উঠেছিল বাঙালি জাতি, স্তম্ভিত হয়ে যায় গোটাবিশ্ব। সেই থেকে জাতি রক্তক্ষয়ী এ দিনটিকে ‘জেলহত্যা দিবস’ হিসেবে পালন করে আসছে। ঘাতকেরা রাষ্ট্রক্ষমতায় পুনর্বাসন করার কারণে  দীর্ঘ ২১ বছর এ বিচারপ্রক্রিয়া ধামাচাপা দেয়া ছিল। দিবসটি উপলক্ষে রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পৃথক পৃথক বিবৃতি দিয়েছেন। জাতীয় চার নেতার স্মৃতির প্রতি তাঁরা গভীর শ্রদ্ধা জানিয়েছেন।

জাতির জনককে হত্যার পর খন্দকার মোশতাক আহমদের নেতৃত্বে ষড়যন্ত্রকারীরা জাতীয় চার নেতাকে তাদের সরকারে যোগদানের প্রস্তাব দেন। কিন্তু বঙ্গবন্ধুর ঘনিষ্ঠ সহচর চার জাতীয় নেতা সেই প্রস্তাব ঘৃণাভরে প্রত্যাখ্যান করলে নির্মমভাবে তাঁদের জীবন দিতে হয়। কারাগারে দেশের এই সূর্যসন্তানদের ষড়যন্ত্রকারীরা প্রথমে গুলি এবং পরে বেয়নেট দিয়ে খুঁচিয়ে মৃত্যু নিশ্চিত করা হয়। জেল হত্যার পরদিন তৎকালীন উপকারা মহাপরিদর্শক (ডিআইজি প্রিজন) কাজী আবদুল আউয়াল লালবাগ থানায় একটি হত্যা মামলা করেন।

১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এসে মামলাটি পুনরুজ্জীবিত করার প্রক্রিয়া শুরু করে। মামলায় ১৯৯৮ সালের ১৫ অক্টোবর ২৩ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দেয় পুলিশ। ২০০৪ সালের ২০ অক্টোবর ঢাকা মহানগর দায়রা জজ মো. মতিউর রহমান মামলায় রায় দেন। রায়ে রিসালদার মোসলেম উদ্দিন, দফাদার মারফত আলী শাহ ও এলডি (দফাদার) আবুল হাসেম মৃধাকে (পলাতক) মৃত্যুদ- দেয়া হয়। এ ছাড়া বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলায় মৃত্যুপ্রাপ্ত চার আসামি সেনা কর্মকর্তা সৈয়দ ফারুক রহমান, সুলতান শাহরিয়ার রশিদ খান, বজলুল হুদা ও একেএম মহিউদ্দিন আহমেদসহ ১২ জনকে যাবজ্জীবন কারাদন্ড দেয়া হয়। সাবেক মন্ত্রী কেএম ওবায়দুর রহমান, শাহ মোয়াজ্জেম হোসেন, নুরুল ইসলাম মঞ্জুর ও তাহেরউদ্দিন ঠাকুরকে খালাস দেয়া হয়। ওই রায়ের বিরুদ্ধে আপিল হলে হাইকোর্ট ২০০৮ সালে দেয়া রায়ে মোসলেমের মৃত্যুদ- বহাল রাখেন। তবে মৃত্যুদ-প্রাপ্ত দুই আসামি মারফত আলী ও হাসেম মৃধাকে খালাস দেয়। এ ছাড়া যাবজ্জীবন কারাদন্ডপ্রাপ্ত ফারুক, শাহরিয়ার রশিদ, বজলুল হুদা ও একেএম মহিউদ্দিন আহমেদকেও খালাস দেন হাইকোর্ট।

হাইকোর্টের সেই রায়ের বিরুদ্ধে ২০০৯ সালের ১৪ সেপ্টেম্বর আপিলের আবেদন (লিভ টু আপিল) করে সরকার। ২০১১ সালের ১১ জানুয়ারি আপিল বিভাগ সরকার পক্ষের আপিল আবেদন মঞ্জুর করে আদেশ দেন। আদেশে নিম্ন আদালতে মৃত্যুদন্ডপ্রাপ্ত এবং  হাইকোর্টের রায়ে খালাস পাওয়া দফাদার মারফত আলী শাহ এবং এলডি (দফাদার) আবুল হাসেম মৃধাকে আত্মসমর্পণের নির্দেশ দেয়া হয়। আত্মসমর্পণ না করলে তাদের গ্রেপ্তার করতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে নির্দেশ দেয়া হয়।

২০১৩ সালের ৩০ এপ্রিল সেই আপিলের ওপর রায় দেন সুপ্রিমকোর্টের আপিল বিভাগ। রায়ে জেলখানায় জাতীয় চার নেতা হত্যা মামলায় বহিষ্কৃত দুই সেনা সদস্য দফাদার আবুল হাসেম মৃধা ও দফাদার মারফত আলী শাহকে নিম্ন আদালতের দেয়া মৃত্যুদন্ড বহাল রাখে আপিল বিভাগ। একইসঙ্গে তাদের খালাস দেয়া সংক্রান্ত হাইকোর্টের রায় বাতিল ঘোষণা করেন। অন্যদিকে জেল হত্যা মামলায় খালাস পেলেও লে. কর্নেল সৈয়দ ফারুক রহমান, লে. কর্নেল (অব.) শাহরিয়ার রশীদ খান, মেজর (অব.) বজলুল হুদা এবং লে. কর্নেল (অব.) একেএম মহিউদ্দিন আহমেদ বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলায় মৃত্যুদন্ডপ্রাপ্ত হওয়ায় ২০১১ সালের ২৭ জানুয়ারি তাদের ফাঁসির রায় কার্যকর করা হয়।

বঙ্গবন্ধুর আনুষ্ঠানিক স্বাধীনতা ঘোষণার পর পরই পাকিস্তানের সামরিক জান্তা ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রাতে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমান কে তাঁর ঐতিহাসিক ধানমন্ডির বাসভবন থেকে গ্রেপ্তার করে। পরে দীর্ঘ ৯ মাস রক্তক্ষয়ী স্বাধীনতাযুদ্ধকালীন সৈয়দ নজরুল ইসলাম বাংলাদেশ সরকারের অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। মুক্তিযুদ্ধকালীন বাংলাদেশ সরকারের মুজিবনগর সরকারের সমধিক পরিচিত প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তাজউদ্দীন আহমদ একটি স্বাধীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠায় কোটি কোটি বাঙালির স্বাধীনতার স্বপ্নপূরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। বঙ্গবন্ধুর অপর ঘনিষ্ঠ সহযোগী এএইচএম কামরুজ্জামান এবং ক্যাপ্টেন এম মনসুর আলী আধুনিক অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত পাকিস্তানি বাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ পরিচালনার ক্ষেত্রে নীতি ও কৌশল নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।

আওয়ামী লীগের দুই দিনের কর্মসূচি

জাতীয় জীবনের অন্ধকারাচ্ছন্ন এ দিনটি স্মরণ করতে দুই দিনের কর্মসূচি হাতে নিয়েছে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ। এ উপলক্ষে দিবসের প্রথম প্রহর মঙ্গলবার সকাল ৬টায় বঙ্গবন্ধু ভবন ও দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়সহ দেশের সর্বত্র শাখা কার্যালয়ে জাতীয় ও দলীয় পতাকা অর্ধনমিতকরণ, কালোব্যাজ ধারণ ও কালো পতাকা উত্তোলন করা হবে। সকাল ৭টায় বঙ্গবন্ধু ভবনে জমায়েত এবং জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের প্রতিকৃতিতে পুষ্পার্ঘ্য অর্পণ। এ ছাড়া সকাল ৭টা ৪৫ মিনিটে বনানী কবরস্থানে ১৫ আগস্টের শহীদ ও জাতীয় নেতাদের কবরে পুষ্পার্ঘ্য অর্পণ, ফাতেহা পাঠ, মিলাদ মাহফিল ও মোনাজাত অনুষ্ঠিত হবে। একইভাবে রাজশাহীতে জাতীয় নেতা শহীদ কামরুজ্জামানের কবরে পুষ্পার্ঘ্য অর্পণ, ফাতেহা পাঠ, মিলাদ মাহফিল ও মোনাজাত হবে। এছাড়া দিবসটি উপলক্ষে সোমবার দুপুর আড়াইটায় রাজধানীর সোহরাওয়ার্দী জনসভার আয়োজন করে ক্ষমতাসীন দলটি। আওয়ামী লীগ সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এতে সভাপতিত্ব করেন। আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও জনপ্রশাসনমন্ত্রী সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম এক বিবৃতিতে জেল হত্যা দিবসটি যথাযোগ্য মর্যাদা ও ভাবগম্ভীর পরিবেশে পালনের জন্য আওয়ামী লীগের সব শাখা এবং সহযোগী ও ভ্রাতৃপ্রতিম সংগঠনের সব নেতাকর্মীর প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন।

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

eleven + five =