ইতিহাসের মাইলফলক বীরকন্যা প্রীতিলতার আত্মদানের চুরাশি বছর:জ শ তিমির

Facebooktwittergoogle_plusredditpinterestlinkedinmail

লক্ষীমন্ত হবে নিজের মেয়ে, বোন, বোনঝি, মা, পুত্রবধু – কিন্তু, প্রতিবাদী ? না -প্রতিবাদী মেয়েদের গল্প শুনতেই আমাদের সমাজ বেশি ভালবাসে, নিজের ঘরে তাদের উপস্থিতি দেখলে মানুষ প্রমাদ গোনে ! তারপর ও এই সমাজ ব্যবস্থা প্রসব করে যাচ্ছে যুগে যুগে প্রতিবাদ,যারা ইতিহাসের মাইলফলক হয়ে থাকেন – আছেন !
বিশ শতকের শুরু থেকে তিরিশের দশক ছিল ‍বৃটিশ শাসকদের বিরুদ্ধে আন্দোলন সংগ্রামের অগ্নিযুগ।অনুশীলন, স্বদেশী, খেলাফত, অসহযোগ, কমিউনিস্ট আন্দেোলন, সংগ্রাম, বিপ্লব, প্রবল আকার ধারণ করে।কংগ্রেস, মুসলিম লীগ, প্রজা সমিতি প্রভৃতি নিয়মতান্ত্রিক রাজনৈতিক দলগুলোও শক্তিশালী হওয়ায় সাধারণ মানুষ সচেতন হয়ে ওঠে। এ সময়ে বিপ্লবী ক্ষুদিরাম বসু ফাঁসিকাষ্ঠে আত্মদান করেন, প্রফুল্ল চাকীর আত্মহত্যাও নিকটবর্তী সময়ে, ঘটে খ্যাতনামা বিপ্লবী বিনয়, বাদল, দীনেশদের রাইটাস বিল্ডিং এ অলিন্দ যুদ্ধ ও আত্মাহুতি, ১৯৩০ সালে সূর্যসেনের নেতৃত্বে ঘটে ঐতিহাসিক চট্রগ্রামে অস্ত্রগার লুণ্ঠন ।
পূর্ণেন্দু দস্তিদার টেবিলের পাশে বসে রানীর ইতিহাসের বইটি উল্টাচ্ছিলেন। হঠাৎ বইয়ের পৃষ্ঠার মধ্য থেকে একটি ছবি পড়ে গেল। রানী ছবিটি উঠিয়ে দাদাকে দেখিয়ে বলে, “নিশ্চয়ই তুমি এই ছবিটি চেনো? ‘ঝাঁসির রানী লক্ষ্মীবাই’। এই বই অনেক আগেই পড়ে শেষ করেছি।সিদ্ধান্ত নিয়েছি ঝাঁসির রানী, রানী ভবানীর মতো আমি দেশের জন্য কাজ করবো, লড়বো। প্রয়োজনে এদের মতো জীবন উৎসর্গ করবো। তোমাদের সাথে যুক্ত হব।তাছাড়া তোমরা আমায় ‘রানী’ বলে ডাক।নাটোরের রানী আর ঝাঁসির রানী যা পেরেছিল, চাটগাঁর রানী নিশ্চয়ই তা পারবে, দাদা?”

১৯৩২, ১৭ সেপ্টেম্বর দক্ষিণ কাট্টলী গ্রামে এক গোপন বৈঠকের উদ্দেশ্যে প্রীতিলতা ও কল্পনা দত্ত রওনা হন, কিন্তু পথে পাহাড়তলীতে কল্পনা দত্ত ধরা পড়েন। মাষ্টারদা সূর্য সেন পাহাড়তলী ইউরোপিয়ান ক্লাব আক্রমণের নেতৃত্ব প্রীতিলতাকে নিতে বলেন।

২৩ সেপ্টেম্বর/১৯৩২ ইউরোপিয়ান ক্লাব :

পরনে ছিল মালকোঁচা দেওয়া ধুতি আর পাঞ্জাবী, চুল ঢাকার জন্য মাথায় সাদা পাগড়ি এবং পায়ে রাবার সোলের জুতা।সাথে ছিলেন – কালীকিংকর দে, বীরেশ্বর রায়, প্রফুল্ল দাস, শান্তি চক্রবর্তী (এদের পরনে ছিল- ধুতি আর শার্ট), মহেন্দ্র চৌধুরী, সুশীল দে এবং পান্না সেন (এদের পরনে ছিল- লুঙ্গি আর শার্ট)।রাত আনুমানিক ১০টা ৪৫ এর দিকে ক্লাব আক্রমণ শুরু হয়।

সেদিন ছিল শনিবার, তিন ভাগে বিভক্ত হয়ে আগ্নেয়াস্ত্র হাতে বিপ্লবীরা ক্লাব আক্রমণ শুরু করেন।প্রীতিলতা হুইসেল বাজিয়ে আক্রমণ শুরুর নির্দেশ দেবার পরেই ঘন ঘন গুলি আর বোমার আঘাতে পুরো ইউরোপিয়ান ক্লাব কেঁপে উঠেছিলো।কয়েক জন ইংরেজ অফিসারের কাছে রিভলবার থাকায় তারা পাল্টা আক্রমণ করে।প্রীতিলতার দেহের বাম পাশে গুলি লাগে।

আক্রমণ শেষে পূর্ব সিদ্বান্ত অনুযায়ী প্রীতিলতা পটাসিয়াম সায়ানাইড খান।কারণ ধরা পড়লে বিপ্লবীদের অনেক গোপন তথ্য ব্রিটিশদের নৃসংশ অত্যাচারের ফলে ফাঁস হয়ে যেতে পারে। ক্লাবের পাশে পড়ে থাকা লাশটিকে পুলিশ প্রথমে পুরুষ ভেবে ভুল করে।

কিন্তু মাথার পাগড়ি খুলে লম্বা চু্লের মেয়েটিকে দেখে শুধু পুলিশ নয়, গোটা ব্রিটিশ সরকার নড়েচড়ে ওঠে।আলোড়িত আর আন্দোলিত হয় গোটা ভারতবর্ষ আর বাঙালি, দেশভাগের আগের সেই ভারত বর্ষ স্বাধীনতা লাভের সোপানে আরেক পা অগ্রসর হয়, ২১ বছরের সাধারণ মধ্যবিত্ত পরিবারের বাঙালি মেয়ে ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনে জীবন উত্সর্গ করে রচনা করে গেলেন ইতিহাস ! প্রমান করে দিলেন নারী আর পুরুষের মধ্যে ব্যবধান শুধু প্রকৃতি গত, সাহসিকতায় তারা এক কাতারে।তবে প্রীতিলতার ভিটে বলতে এখন আছে ছবির ওই ঝোপঝাড়টুকুই !

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

sixteen − two =