এই দিনে বিদ্রোহী জওয়ানেরা তাণ্ডবে পিলখানায় নিহত হন ৫৭ সেনা কর্মকর্তাসহ ৭৪ জন

Facebooktwittergoogle_plusredditpinterestlinkedinmail

পিলখানার স্বজনহারাদের হৃদয়ের ক্ষত এখনো শুকায়নি। সাত বছর আগের (২০০৯) ঠিক এই দিনে (২৫ ফেব্রুয়ারি) বিদ্রোহী জওয়ানেরা তাণ্ডব চালান পিলখানায়। তাঁদের হামলায় প্রাণ হারান ৫৭ সেনা কর্মকর্তাসহ ৭৪ জন।10-03-09-Cornel Gulzer-1
ইতিহাসের কলংকজনক এই ঘটনার দু’টি মামলা পরিচালনা করার জন্যে কেন্দ্রীয় কারাগারের মাঠে বিশেষ আদালত গঠন করে ৭ বছর ধরে এ্বই বিদ্রোহের বিচার শেষ হয়েছে। এ ঘটনায় দায়ের করা হত্যা মামলার বিচার নিম্ন আদালতে শেষ হয়েছে। এখন উচ্চ আদালতে ডেথ রেফারেন্সের শুনানি চলছে। বিস্ফোরক আইনে দায়ের হওয়া মামলার বিচার চলছে নিম্ন আদালতে। তারপরও এ বিদ্রোহের নেপথ্য কারণ নিয়ে নানা প্রশ্ন ও সংশয় রয়েছে। মামলার রায়ে বিদ্রোহের কারণ সম্পর্কে জওয়ানদের ক্ষোভের কথা উল্লেখ রয়েছে। নিহতদের পরিবারগুলোর দাবি, নেপথ্য কারণ শুধু ক্ষোভ নয়, আরও কিছু থাকতে পারে। তারা মনে করছেন, মূল পরিকল্পনাকারী এখনো চিহ্নিত হয়নি।বিডিআর হত্যা মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা আবদুল কাহার আকন্দ সূর্যবার্তা২৪.কমকে বলেন, জওয়ানদের ক্ষোভ থেকেই বিদ্রোহ হয়েছে। এর বাইরে তার কোনো তথ্য প্রমাণ মেলেনি। আর তদন্তে যা পাওয়া গেছে, সেভাবে অভিযোগপত্র দেওয়া হয়েছে। বিচারও শেষ হয়েছে। এর বাইরে আর কিছু নেই।file (18)

বর্ডার গার্ডের (বিজিবি) মহাপরিচালক মেজর জেনারেল আজিজ আহমেদ সূর্যবার্তা২৪.কমকে বলেন, ‘আমি নিজে বিদ্রোহের বিচার-প্রক্রিয়ার সঙ্গে ছিলাম। যাঁরা বিদ্রোহের সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন, তাঁদের সবাইকে চিহ্নিত করে বিচার করা হয়েছে। তবে এটা নিয়ে মানুষের মনে ভিন্ন ধারণা রয়েছে। বিজিবিতে আসার আগে আমিও এসব শুনেছি। আসলে এ বিদ্রোহের পেছনে যা ছিল, সব পরিষ্কার হয়েছে।’
বিডিআর বিদ্রোহের পরে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় একটি তদন্ত কমিটি ও সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকে একটি তদন্ত আদালত গঠন করা হয়েছিল। এ দুটি কমিটি এ ঘটনার তদন্ত এবং ভবিষ্যতে যাতে এমন ঘটনা আর না ঘটতে পারে, সে ব্যাপারে বেশ কিছু সুপারিশ করে। কমিটি বিদ্রোহের নেপথ্যের কারণ চিহ্নিত করতে অধিকতর তদন্তের সুপারিশও করে। হত্যার ঘটনার তদন্তে পুলিশ বিদ্রোহের যে কারণ উল্লেখ করেছিল, তা নিয়ে নিহত ব্যক্তিদের পরিবারের সদস্যদের কেউ কেউ প্রশ্ন তোলেন।bdr_mutineers-300x258
২০০৯ সালের ২৫ ও ২৬ ফেব্রুয়ারি পিলখানায় বিডিআর বিদ্রোহের ঘটনা তদন্তে সাবেক সরকারি কর্মকর্তা আনিস উজ জামানকে প্রধান করে সরকার একটি কমিটি গঠন করে। ২০০৯ সালের ৩ মার্চ থেকে এ কমিটি কাজ শুরু করে। চার দফা সময় বাড়ানোর পর ওই বছরের ২১ মে কমিটি তাদের তদন্ত প্রতিবেদন
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সাহারা খাতুনের কাছে জমা দেয়। কমিটি স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদি ২৩ দফা সুপারিশ করেছে। স্বল্পমেয়াদি সুপারিশের মধ্যে ছিল, সেনা আইনে দ্রুত বিচার করা, বিডিআরের নিয়ন্ত্রণ পুনরুদ্ধার করা, নিহত পরিবারগুলোকে পুনর্বাসন করা, অশনাক্ত মৃতদেহ শনাক্ত করা, লুণ্ঠিত অস্ত্র উদ্ধার করা এবং হতাহত সামরিক ও বেসামরিক লোকদের ক্ষতিপূরণ দেওয়া।Bangladesh Rifles mutiny victim
আদালতের সুপারিশের মধ্যে উল্লেখযোগ্য সব বাহিনীতে বিদ্রোহের শাস্তি মৃত্যুদণ্ড করে আইন তৈরি করা। এর মধ্যে বিডিআরের জন্য নতুন একটি আইন হয়েছে। সেই আইনে বিদ্রোহের শাস্তি মৃত্যুদণ্ড করা হয়েছে। বিদ্রোহের ব্যাপারে আগাম তথ্য সংগ্রহে ব্যর্থতার পরিপ্রেক্ষিতে গোয়েন্দা সংস্থাগুলোকে আধুনিক, যুগোপযোগী ও সুনির্দিষ্ট দায়িত্ব প্রদান এবং পুনর্গঠনের জন্য সুপারিশ করেছিল। জানা গেছে, ওই ঘটনার পরে কিছু কর্মকর্তাকে বদলি করা হয়।
দীর্ঘমেয়াদি সুপারিশের মধ্যে আরো উল্লেখ্য, এ ধরনের জাতীয় সংকট মোকাবিলার জন্য সর্বোচ্চ পর্যায়ে একটি ‘জাতীয় সংকট মোকাবিলা কমিটি’ গঠন । এ ছাড়া বিডিআর বিদ্রোহের ষড়যন্ত্র যথাসময়ে উদ্ঘাটনে ব্যর্থতা এবং বিদ্রোহ দমনে সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত প্রদানে ব্যর্থ ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলা হয়। জাতীয়ভিত্তিক একটি কমিটি হলেও বিদ্রোহে আগাম তথ্য সংগ্রহে ব্যর্থতার ব্যাপারে কী ব্যবস্থা নেয়া হয়েছ-এ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন অনেকে। তিন বাহিনীর সমন্বয়ে দ্রুত মোতায়েনযোগ্য একটি বাহিনী গঠনের কাজও হয়নি বলে সূত্রে প্রকাশ।
এ ধরনের দুর্যোগ, সংকট বা বিপর্যয় মোকাবিলার ক্ষেত্রে জাতীয়ভিত্তিক একটি স্থায়ী ‘ব্যবস্থাপনা সেল’ গঠনের সুপারিশ করা হয়েছিল। এ ছাড়া তদন্ত আদালতের সুপারিশে গোয়েন্দা সংস্থাগুলোতে আধুনিক, যুগোপযোগী, সুনির্দিষ্ট দায়িত্ব প্রদান ও পুনর্গঠনের জন্য সুপারিশ করা হয়েছিল। সেনা তদন্ত আদালতের সুপারিশে আরও বলা হয়েছিল বিডিআরের মহাপরিচালকের নাম ব্যবহার করে সংশ্লিষ্ট সুবিধাভোগী ব্যক্তিদের চিহ্নিত করে তাঁদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে। কিন্তু তা হয়নি।
জানতে চাইলে বর্ডার গার্ডের (বিজিবি) মহাপরিচালক মেজর জেনারেল আজিজ আহমেদ বলেন, বিডিআর বিদ্রোহের পরে বাহিনীর ভেতরে-বাইরে অনেক কমিটি হয়েছিল। সেই সব কমিটির সুপারিশই আমলে নেওয়া হয়েছে। বাহিনী পুনর্গঠন করার সময় এসব বিষয়ের দিকে নজর দেওয়া হয়েছিল। তিনি বলেন, ‘সেই সুপারিশের ভিত্তিতে প্রতি তিন মাস পরপর সশস্ত্র বাহিনীর সঙ্গে আমাদের সমন্বয় সভা হচ্ছে। বর্ডার গার্ড সিকিউরিটি ইউনিটের (বিজিএসইউ) কার্যক্রমে গতিশীলতা আনা হয়েছে। এ ছাড়া গোয়েন্দা সংস্থা ডিজিএফআই (প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা মহাপরিদপ্তর) এবং এনএসআই (জাতীয় নিরাপত্তা গোয়েন্দা) এর সঙ্গে সব সময় সমন্বয় করা হচ্ছে।

আইন ও সালিশ কেন্দ্রের নির্বাহী পরিচালক সুলতানা কামাল বুধবার জাতীয় প্রেসক্লাবে এক অনুষ্ঠানে বলেন, ‘এত বড় একটা ঘটনা ঘটে গেল, সেটার একটা সুষ্ঠু বিচারের সূচনা পর্যন্ত আমরা করতে পারিনি। ” তিনি দাবি করেন, তদন্ত কমিটি হয়েছিল,একটা তদন্ত কমিটিরও কোনো তথ্য সুস্পষ্টভাবে কারও কাছে উপস্থাপন করা হয়নি। ” তিনি প্তারশ্রন তোলেন, “এর মানে কি আমরা তদন্ত করতে পারি না, না চাই না?”
বিডিআর বিদ্রোহের পরে ওই ঘটনা তদন্তে সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকে তৎকালীন কোয়ার্টার মাস্টার জেনারেল লে. জেনারেল মো. জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরীর নেতৃত্বে একটি তদন্ত আদালত গঠন করেছিল সেনাবাহিনী। ২০০৯ সালের ১১ মে এ আদালত তাঁদের প্রতিবেদন সেনাপ্রধান জেনারেল মইন উ আহমেদের কাছে হস্তান্তর করা করেন। ওই আদালতের প্রতিবেদনে বেশ কিছু সুপারিশ করা হয়েছিল। গতকাল জাতীয় প্রেসক্লাবে এক অনুষ্ঠানে নিহত কর্নেল কুদরত এলাহী রহমান শফিকের বাবা হাবিবুর রহমান বলেন, শহীদ পরিবারের সদস্যদের প্রশ্ন—‘কেন এই বর্বরোচিত হত্যাকাণ্ড হলো, কী তাঁদের অপরাধ? কারাই-বা এই নৃশংস কর্মকাণ্ডের পরিকল্পনাকারী। মানুষ তা জানতে চায়।’

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

2 × 2 =