একাত্তরে বাংলাদেশের বন্ধু অটলবিহারী বাজপেয়ীর শেষকৃত্য সম্পন্ন

Facebooktwittergoogle_plusredditpinterestlinkedinmail

ইয়াসের আরাফতকে বয়কট আর তাঁর সংগঠনকে সন্ত্রাসবাদী আখ্যা দিতে হবে। আমেরিকার চাপ ছিল এরকমই। প্রধানমন্ত্রী অটলবিহারী বাজপেয়ি জাতিসংঘকে রাষ্ট্রসঙ্ঘকে জানিয়ে দিয়েছিলেন, প্যালেস্তাইন ভারতের বহু পুরনো বন্ধু। সেই মিত্রতা থেকে সরে আসার প্রশ্নই নেই। আরাফত বন্ধু ছিলেন। আরাফত বন্ধুই থাকবেন।

অটলবিহারী বাজপেয়ি আগাগোড়া ইন্দিরা গান্ধীর কঠোর সমালোচক ছিলেন। কিন্তু বিদেশনীতির ক্ষেত্রে তিনি ইন্দিরা গান্ধীর নীতি থেকে বিচ্যুত হননি। সেটি হল বিশ্বের বৃহৎ শক্তির সামনে নত না হওয়া। অপেক্ষাকৃত দুর্বল রাষ্ট্রকে কাছে টেনে রাখা। বাজপেয়ির আমলেই পশ্চিমী শক্তির সামনে সার্ক রাষ্ট্রগুলি অনেক বেশি করে নিজেদের স্বার্থ আর অবস্থানের কথা উচ্চকণ্ঠে বলতে পেরেছিল।

তিনি সার্ক দেশগুলির রাষ্ট্রপ্রধানদের কাছে ছিলেন অভিভাবকসম। আজ পূর্ণ রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় সম্পন্ন হওয়া তাঁর অন্ত্যেষ্টি অনুষ্ঠানে শোকজ্ঞাপন করতে সোজা স্মৃতিস্থলে হাজির হওয়া অতিথিদের মধ্যে উজ্জ্বল উপস্থিতি ছিল ভারতের প্রতিবেশী সার্ক দেশগুলির। বাজপেয়ির শেষকৃত্যে হাজির থাকতে চলে এসেছিলেন বাংলাদেশ, শ্রীলঙ্কা, নেপাল, পাকিস্তান, আফগানিস্তান, ভুটানের মন্ত্রীরা।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ভারতের সাবেক প্রধানমন্ত্রী অটল বিহারী বাজপেয়ীর মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করে তাকে বাংলাদেশের একজন মহান বন্ধু হিসেবে উল্লেখ করেন। ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর কাছে পাঠানো এক শোক বার্তায় শেখ হাসিনা বলেন, ‘অটল বিহারী বাজপেয়ী আমাদের একজন মহান বন্ধু এবং বাংলাদেশে তিনি খুবই শ্রদ্ধা ভাজন ছিলেন।’ তিনি বলেন, ‘ভারতের সাবেক প্রধানমন্ত্রী অটল বিহারী বাজপেয়ীর মৃত্যুতে আমরা গভীরভাবে শোকাহত।’
প্রধানমন্ত্রী বলেন, সুশাসন এবং ভারতসহ এতদঞ্চলের সাধারণ মানুষের শান্তি ও সমৃদ্ধির ক্ষেত্রে অবদান রাখার জন্য অটল বিহারী বাজপেয়ী চিরকাল স্মরণীয় হয়ে থাকবেন।

শেখ হাসিনা বলেন, ১৯৭১ সালে স্বাধীনতা যুদ্ধে অমূল্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ বাংলাদেশ সরকার তাকে বাংলাদেশ মুক্তিযুদ্ধ সম্মাননা প্রদান করে। বাংলাদেশের সকলের জন্যও এটি একটি শোকের দিন।
তিনি বলেন, ‘আমরা তার বিদেহী আত্মার শান্তি কামনা করছি।’

২১টি গান স্যালুটের আবহে দত্তককন্যা নমিতা ভট্টাচার্য মুখাগ্নি করলেন পিতার। তার একটু আগেই সামরিক বিভাগের পক্ষ থেকে ভারতের ত্রিবর্ণরঞ্জিত পতাকা তুলে দেওয়া হয়েছিল দৌহিত্রী নীহারিকার হাতে। বেজে উঠেছিল বন্দেমাতরম।

১৯৪৫ সালে কানপুরের কলেজে আইন পড়তে ভর্তি হয়েছিলেন ২১ বছরের অটলবিহারী। সেই সময় তাঁর সহপাঠী ছিলেন এমন একজন ব্যক্তি যিনি ৩০ বছর শিক্ষকতা করার পরে আইন পড়তে গিয়েছিলেন। পঞ্চাশোর্ধ সেই ব্যক্তির নাম পণ্ডিত কৃষ্ণবিহারীলাল বাজপেয়ি। অটলবিহারীর বাবা। প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পরে কানপুর ডিএভি কলেজের ম্যাগাজিনে একথা লিখেছিলেন স্বয়ং অটলবিহারী।

তিনি লেখেন, আপনারা কি কেউ এমন কলেজের কথা শুনেছেন বা দেখেছেন, যেখানে বাবা ও ছেলে একই সঙ্গে একই ক্লাসে পড়াশোনা করেছে? কানপুর ডিএভি কলেজ হল এমন একটি কলেজ, যেখানে বাবা-ছেলে একসঙ্গে পড়াশোনা করেছে। বাবা-ছেলে যে একই ক্লাসে পড়তে গিয়ে বিড়ম্বনার মুখে পড়েননি এমন নয়। বাজপেয়ি লেখেন, যখন বাবা দেরিতে ক্লাসে আসতেন, অধ্যাপকরা হেসে আমাকে জিজ্ঞেস করতেন, তোমার বাবা কোথায় হারিয়ে গেলেন? আর আমি দেরি করলে, তাঁকে শুনতে হতো, ছেলে নিখোঁজ কেন? শেষে ঠিক হল, বাবা এই সেকশনেই থাকবেন আর আমি অন্য সেকশনে চলে যাব। গোয়ালিয়রের ভিক্টোরিয়া কলেজ থেকে বিএ পাশ করেন অটলবিহারী। বাবা সরকারি চাকরি থেকে অবসর নিয়েছিলেন।

দু’বোনের বিয়ের বয়স হয়ে গিয়েছিল। ফলে পোস্ট গ্র্যাজুয়েশন করতে পারবেন কি না, তা নিয়ে সংশয়ে ছিলেন অটলবিহারী। সেই সময় ছাত্র অটলের সাহায্যে এগিয়ে আসেন গোয়ালিয়রের মহারাজা শ্রীমন্ত জিভাজি রাও সিন্ধিয়া। তিনি অটলবিহারীকে ৭৫টাকা স্কলারশিপ দেন। অটলবিহারী লেখেন, ভাতার টাকা পেয়েই কানপুরের ডিএভি কলেজে ভর্তি হই। আমি কানপুরে মাস্টার্স করতে ও আইন পড়তে যাচ্ছি শুনে হঠাৎ করেই বাবা ঠিক করেন, তিনিও উচ্চশিক্ষায় ভর্তি হবেন। তাঁর সিদ্ধান্ত শুনে সকলেই অবাক হয়ে যাই। তখনই তাঁর বয়স ৫০-এর উপর। আমার পক্ককেশ বাবা হাতে লাঠি নিয়ে প্রিন্সিপাল কালকাপ্রসাদ ভাটনগরের অফিসে পৌঁছন।

অধ্যাপক ভাটনগর ভেবেছিলেন, ওই বয়স্ক ভদ্রলোক হয় অধ্যাপক পদের জন্য আবেদন করতে এসেছেন অথবা কাউকে ভর্তি করাতে এসেছেন। যখন তিনি বুঝলেন, উনি নিজেই ভর্তি হতে এসেছেন, তখন তিনি চেয়ার থেকে প্রায় লাফিয়ে ওঠেন এবং বলতে থাকেন আপনি অসাধারণ কাজ করেছেন। এই খবর সমগ্র কলেজেই চাউর হয়ে যায়। সবাই হস্টেলে ভিড় করে আমাদের দেখতে আসত। ওই কলেজেই স্বাধীনতার দিন তাঁর বাগ্মিতা দেখে মুগ্ধ হয়ে উপহার দিয়েছিলেন আগ্রা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস চ্যান্সেলর।

আজকের বাগ্মী অটলের যাত্রা শুরু তখনই। সামনের সারিতে বঁাদিক থেকে দ্বিতীয় কৃষ্ণবিহারীলাল বাজপেয়ি। পিছনের সারিতে ডানদিকে শেষে অটলবিহারী।

বিজেপি’র প্রবীণ রাজনীতিক অটল বিহারী বাজপেয়ী বৃহস্পতিবার নয়াদিল্লীর অল-ইন্ডিয়া ইনস্টিটিউট অব মেডিকেল সাইন্সে (এআইআইএমএস) মারা যান। তার বয়স হয়েছিল ৯৩ বছর। ভারতের দশম প্রধানমন্ত্রী বাজপেয়ী কিডনি জটিলতায় ভুগছিলেন এবং তিনি গত ১১ জুন এআইআইএমএস-এ ভর্তি হন।

রাষ্ট্রপতি রামনাথ কোবিন্দ বলেছেন, তাঁর নেতৃত্ব, দূরদৃষ্টি, পরিণতবোধ এবং বাগ্মিতা তাঁকে বিশিষ্ট করে তুলেছিল। প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং বলেছেন, অসাধারণ বক্তা, কবিও হিসাবেও দাগ কেটেছেন তিনি। আগামী সময়ে তাঁর অবদান স্মরণে রাখবে দেশ। শোক জানিয়েছেন কংগ্রেস সভাপতি রাহুল গান্ধীও। তিনি বলেছেন, বাজপেয়ীজী লক্ষ লক্ষ ভারতীয়ের শ্রদ্ধা অর্জন করেছেন। শোক জানান তৃণমূল নেত্রী এবং পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি। প্রাক্তন রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখার্জি শোকবার্তায় বলেছেন, বিরোধী নেতার ভূমিকায় সংসদে তিনি সরকারের যুক্তিসঙ্গত সমালোচনা করেছেন। প্রধানমন্ত্রী হিসাবে ঐকমত্য তৈরির চেষ্টা চালিয়েছেন।
সি পি আই (এম) পলিটব্যুরো অটলবিহারী বাজপেয়ীর প্রয়াণে গভীর শোক জানিয়েছে। পলিট ব্যুরো বলেছে যে সাংসদ, সরকারের মন্ত্রী এবং প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালনে বিশিষ্টতা অর্জন করেছিলেন তিনি। রাজনৈতিক নেতা হিসাবে সব অংশের সম্মান পেয়েছেন তিনি। সি পি আই (এম) সাধারণ সম্পাদক সীতারাম ইয়েচুরি টুইটে বলেছেন, রাজনৈতিক এবং মতাদর্শের ক্ষেত্রে তাঁর তীব্র বিরোধিতা করলেও তাঁর সৌজন্যবোধ এবং সব অংশের রাজনৈতিক নেতাদের সঙ্গে মতবিনিময়ের দক্ষতা তাঁকে পৃথক করেছে।

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

14 − 10 =