একুশের ৬৬ বছর :বাংলা হোক জীবিকার ভাষা-আহমদ রফিক

Facebooktwittergoogle_plusredditpinterestlinkedinmail

ভাষার মাস ফেব্রুয়ারি। আজ ভাষার মাসের প্রথম দিন। এই দিনটি এলেই আমরা ভাষা চেতনা, ভাষা সংগ্রাম এবং বাংলা ভাষার ব্যবহার নিয়ে সোচ্চার হয়ে উঠি। কিন্তু সারা বছর এই চেতনার কোনো খোঁজ আমাদের থাকে না। সংবিধানে প্রজাতন্ত্রের রাষ্ট্রভাষা বাংলা। তার মানে, জাতীয় জীবনের সর্বস্তরে বাংলার ব্যবহার করতে হবে। সেটা কি আমরা করছি? বিদ্যালয় থেকে শুরু করে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত সরকারি-বেসরকারি সব পর্যায় বিদেশি ভাষায় ছেয়ে গেছে। আমাদের চেতনায় থাকছে বাংলা, মুখেও বলছি বাংলা ভাষার কথা; কিন্তু বাস্তবে ব্যবহারের ক্ষেত্রে তার পুরোটাই উল্টো। এটা সম্পূর্ণ স্ববিরোধিতা। শুধু স্ববিরোধিতা নয়; সংবিধান-বিরোধিতাও বটে।

রাষ্ট্রের উদাসীনতা ও অবহেলার কারণেই সর্বস্তরে বাংলার ব্যবহার আজও নিশ্চিত করা যায়নি। সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা ও আদালতের নির্দেশসহ নানা উদ্যোগ গ্রহণের পরও বাংলা ব্যবহারের ক্ষেত্রে এমন অবনতি শুধু আমাদের সদিচ্ছার অভাবে।

‘আমরা বাঙালি, বাংলা আমার মাতৃভাষা, রাষ্ট্রভাষা আমাদের বাংলা’- বিষয় তিনটি নিয়ে আমাদের শিক্ষিত শ্রেণির তরুণদের মধ্যে গর্ব ও অহংকারের প্রকাশ যথেষ্ট। পাকিস্তানি আমলে অনেক লড়াই করে রাষ্ট্রভাষার অধিকার অর্জন; রীতিমতো যুদ্ধ করে অনেক মৃত্যু, অনেক ত্যাগের বিনিময়ে স্বাধীন ভাষিক রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠা- এ সবই এখন ইতিহাস।

আমাদের ভাষাপ্রেম, আমাদের রাজনৈতিক শ্রেণিস্বার্থ, আমাদের জাতীয়তাবাদী বোধ- বিষয়গুলো আমাদের একুশের চেতনার ধারাবাহিকতায় স্বাধীন বাংলাদেশে কী অবস্থায় আছে? আমাদের একুশের চেতনার মধ্যে ভাষাপ্রেম শতকরা কতটা, আমাদের রাজনৈতিক স্বাথ শতকরা কতটা ছিল, আমাদের জাতীয়তাবোধ শতকরা কতটা ছিল? এই জরিপটা আমরা করিনি, চেষ্টাও করিনি। আজকের এই অবস্থা যাচাই-বাছাই করার জন্য এ বিষয়টা জানা খুবই প্রয়োজন।

ভাষা আন্দোলনের এত বছর পর, বাংলা ভাষার ব্যবহার কি সব পর্যায়ে সঠিকভাবে হচ্ছে- এ প্রশ্ন ঘুরেফিরে আসছে। একজন সাধারণ মানুষ যখন উচ্চ আদালতে যান, তখন তিনি আইনজীবী এবং বিচারক; কারোরই ভাষা বুঝতে পারেন না। যেহেতু তা বাংলা ভাষা নয়, সেটা ঔপনিবেশিক রাজভাষা- ইংরেজি। ফলে রায় বুঝে নেওয়ার তার যে সামাজিক অধিকার, ওই অধিকার থেকে তিনি বঞ্চিত হন। বাংলাদেশ ভাষিক জাতিরাষ্ট্র বলে আমাদের যে গর্ব, তার পক্ষে এই ইংরেজি রাজভাষা এতদিন রক্ষা করা একটি অবিশ্বাস্য ঘটনা। অথচ সেই ঘটনাকে আমরা প্রশ্রয় দিয়ে চলেছি। আমাদের শাসনযন্ত্র যেমন একই কাজ করছে, তেমনি আমাদের শিক্ষা-সাহিত্য-সংস্কৃতি বিভাগের মানুষজনও এ ব্যবস্থা পরিবর্তনের নিমিত্তে সংগঠিতভাবে সংঘবদ্ধ হয়ে প্রতিবাদ করছেন না; প্রয়োজনে রাজপথে নামছেন না। ফলে এই ব্যবস্থাও অপরিবর্তিত থেকে যাচ্ছে।

কাজেই এটা সুস্পষ্টভাবে রাষ্ট্রভাষা-মাতৃভাষা বাংলার প্রতি অবিবেচনার কাজ। লক্ষ্য করার মতো আরেকটি বিষয় হলো, ইংরেজি মাধ্যমের স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে ব্যাপকভাবে। শুধু তা-ই নয়; ইংরেজি ভার্সন বলে একটি শিক্ষা মাধ্যমও চালু হয়েছে, যা বাংলাকে আরও পিছিয়ে দিয়েছে। বেতার-টিভিতে বাংলা-ইংরেজি মেশানো যে দোআঁশলা ভাষার ব্যবহার দেখি প্রতিনিয়ত, সেটাও বাংলা ভাষাকে অপমান করা ছাড়া আর কিছু নয়।

নির্ভুলভাবে বাংলা লেখা, বাংলা বলা; নির্ভুল বাক্যবন্ধ ব্যবহার- এসব ক্ষেত্রেও আমাদের শিক্ষিত সমাজে সচেতনতার অভাব কম নয়। রাস্তায় বেরুলেই সাইনবোর্ড-বিলবোর্ডে ভুল বাংলা বানান যথেষ্ট। তার চেয়ে বড় কথা, ষাটের দশকের বাঙালি চেতনা ভুলে গিয়ে দেখা যাচ্ছে আমাদের ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, আবাসনসহ সব বিষয়েরই নাম ইংরেজিতে, যা বিগত দুই দশকে অনেক হারে বেড়েছে। এখন বিয়ের কার্ড লেখা হয় ইংরেজিতে, আপ্যায়ন করা হয় ইংরেজিতে। অথচ এর বিপরীতটাই আমরা দেখেছি ষাটের দশকের শেষদিক থেকে সত্তরের দশকের বাঙালি জাগরণের কালে।

বাংলা ভাষাকে অবমাননা না করে বাংলা ভাষাকে ভালোবেসে নির্ভুলভাবে শেখার মানে এই নয়- আমরা ইংরেজি শিখব না। আমরা দুটো ভাষাই শিখব নির্ভুলভাবে, যথার্থভাবে; সেটা মাতৃভাষা বাংলাকে প্রথম পর্যায়ে, প্রথম জায়গাতে রেখে। দ্বিতীয় পর্বে, দ্বিতীয় পর্যায়ে ইংরেজি আসতে পারে, আপত্তি নেই। শুধু ইংরেজি নয়, আমরা ফ্রেঞ্চ-স্প্যানিশ ভাষাও শিখতে পারি। এমনকি একজন মানুষ দ্বিভাষিক-তৃভাষিকও হতে পারেন, সমস্যা নেই। কিন্তু সেটা কোনোভাবেই রাষ্ট্রভাষা-মাতৃভাষা বাংলাকে বাদ দিয়ে নয়।

সবচেয়ে জরুরি কথা- সংবিধান অনুযায়ী জাতীয় পর্যায়ে সর্বস্তরে উচ্চশিক্ষায়, উচ্চ আদালতে সর্বোপরি জীবিকার ভাষা হিসেবে বাংলা ভাষা ব্যবহার করতে হবে। ভাষার মাসে একজন ভাষাসংগ্রামী হিসেবে এটাই আমার দাবি।সমকাল

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

one × 4 =