এক নিভৃতচারী মুক্তিযোদ্ধার অপ্রকাশিত গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাস -আল আমিন বাবু

Facebooktwittergoogle_plusredditpinterestlinkedinmail

বরিশালের মেহেন্দিগঞ্জের এক দামাল ছেলে। ইশকুল ছেড়ে কলেজের গন্ডিতে পা রাখতে না রাখতেই ছাত্রলীগের হাত ধরে ১৯৬৯ এর গণঅভ্যুথ্থান ,১৯৭০ পেরিয়ে একদম ১৯৭১ এর মুক্তিযুদ্ধের সামনে এসে দাঁড়ালেন। বয়সের দিক থেকে সহযোদ্ধাদের চাইতে কনিষ্ঠ হলেও কমান্ডার এর দায়িত্ব পেলেন। নিজের বুদ্ধিমত্তা, সাহস আর বঙ্গবন্ধুর সেই দুর্বার আহবান “তোমাদের যা কিছু আছে তাই নিয়ে শত্রুর মোকাবেলা করতে হবে ।” সেই  শক্তিতে বলিয়ান হয়ে ঝাঁপিয়ে পড়লেন মহান মুক্তিযুদ্ধে ।

এর পর একে একে অনেক সফল অপারেশন । মেহেন্দিগঞ্জ থানা থেকে অস্ত্র লুট ,মিলিটারির গানবোটে আক্রমন করতে করতে এক সময় নিজেই আহত হলেন মাথায় গুলি লেগে । প্রায় এক রাত এক দিন আহত অবস্থায় পড়ে থাকলেন ভাঙ্গা পুরোনো একটি কবরের ভেতর । কিন্তু সৃষ্টিকর্তা যাঁকে বাঁচাবেন, তাকে মারে কে? অবশেষে সহযোদ্ধারা তাঁর নিস্তেজ দেহ খুঁজে পেলেন । সকলের সহায়তায় তিনি বেঁচে গেলেন ।এর পর দেশ স্বাধীন হলো । সদ্য স্বাধীন দেশে জনকের নির্দেশিত পথে দেশ গড়তে অনেক কাজ তখন তাঁর সামনে।  এ্ই অসীম সাহসী বীরযোদ্ধার সেই কাজগুলোই আজ  সূর্যবার্তার পাঠকদের সামনে তুলে ধরবো।

মেধাবী ছাত্র ও আহত মুক্তিযোদ্ধা হিসাবে উচ্চতর শিক্ষা ও আরো উন্নত চিকিৎসার জন্য বঙ্গবন্ধুর আশীর্বাদ নিয়ে এই বীর যোদ্ধা সোভিয়েত ইউনিয়নের ‘প্যাট্রিস লুমুম্বা’  বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে গেলেন। সেই সময়ে  বঙ্গবন্ধু ১৯৭৪ সালে মস্কো গেলেন তাঁর পরম বন্ধু লিওনিদ ব্রেজনেভের আমন্ত্রণে । বঙ্গবন্ধুর থাকার ব্যবস্থা হলো “লেনিনেস্কিগড়ি রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবনে’ , যা  মস্কোর সবচাইতে সন্মানিত অতিথিশালা,যেখানে আমেরিকার প্রেসিডেন্ট নিক্সনকে রাখা হয়েছিল ।আমাদের জাতির পিতা তাঁর সন্তানকে ভুলেন নি।তিনি তখনকার রাষ্ট্রদূত শামসুর রহমানের মাধ্যমে সেই  বীর যোদ্ধা ছাত্রটিকে ডেকে নিয়ে তার পড়াশুনার খবর নিলেন, কুশলাদী জানলেন ।তাকে পরিচয় করিয়ে দিলেন তখনকার সোভিয়েত ইউনিয়নের দক্ষিন-পূর্ব এশিয়ার দায়িত্বে থাকা মিষ্টার কে.কে.বৈধাকভ ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী আন্দ্রেই গ্রোমিকোর সাথে ।

এর পর কৃষ্ণসাগর থেকে পদ্মা ,মেঘনা ,যমুনাতে অনেক জল গড়িয়ে গেল ।১৯৭৫ এর ১৫ই আগস্ট পাকিস্তানের বিশ্বস্ত ক্রীড়নক  জেনারেল জিয়াউর রহমান,এরশাদ দের হাত ধরে আমরা আবার মউদুদীর বিকৃত ইসলামের উদ্ভট উটের পিঠে উঠে পাকিস্তানের  পথে রওনা হলাম ।নির্লজ্জ ,অভিশপ্ত জাতি হিসাবে একে একে হাজার হাজার বীর দেশপ্রেমিক  মুক্তিযোদ্ধাদের হত্যা করলাম। জাতির জনককে সপরিবারে  এবং তাঁর পরীক্ষিত বীর সৈনিকদের  জেলখানার অন্ধকার প্রকোষ্ঠে কাপুরুষের মতো হত্যা করলো পাকিস্তানের প্রেতাত্মা জিয়ার সৈনিকেরা।

বিএনপি’র  খোলসে  পরাজিত পাকিস্তানী শক্তি জামাতের অনুপ্রবেশ ঘটলো স্বাধীন দেশে।দেইল্লা রাজাকার বকধার্মিক রূপ নিলো “মৌলানা সায়িদী সাহেব ” নামে । দেইল্লা, ঘাতক পাকি গোলাম রাজাকার গোলাম আজম  আর মৈত্তা রাজাকাররা ‘অধ্যাপক গো-আজম’,  “মৌলানা মতিউর রহমান নিজামী ” ব’নে আমাদের রক্তস্নাত  লাল-সবুজের পতাকা উড়িয়ে রায়ের বাজারের বধ্যভূমিতে গিয়ে জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তানদের সাথে নির্মম রসিকতা করে  এলো।আরো কত হঠকারীতা আর ধৃষ্টতার চুড়ান্ত প্রকাশ দেখলো বিশ্ববাসী ।

১০ই নভেম্বর ১৯৮২, রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট লিওনিদ ব্রেজনেভ ইহজগত ত্যাগ করলেন ।ক্রেমলিনের রেড স্কয়ারে তাঁর অন্তেষ্টিক্রিয়া অনুষ্ঠিত হবে ।সারা দুনিয়া থেকে প্রায় সকল রাষ্ট্রপ্রধানেরা সহ পৃথিবীর যত জ্ঞানী-গুণী , বিশিষ্ট নেতা,নেত্রীরা উপস্থিত ছিলেন সেই অনুষ্ঠানে । বাংলাদেশে তখন পাকিস্তানের মিলিটারী শাসনের ক্রীড়নক জিয়াউর রহমানের উত্তরসূরী এরশাদের স্বৈরাচারী  মিলিটারী শাসন চলছে -‘গণতন্ত্র রক্ষা’র নামে । আমাদের মুক্তিযুদ্ধের সময়ের সেই পরম বন্ধুর অন্তেষ্টিক্রিয়ায় স্বৈরাচার এরশাদ কেন গেলনা, তা আইএসআই ও এরশাদ ই ভালো বলতে পারবেন। বাংলাদেশের রাষ্ট্রপ্রধানের পক্ষ থেকে সেই অন্তেষ্টিক্রিয়ায় উপস্থিত হলেন রিয়ার এডমিরাল এম.এইচ ,খান।  এ ঘটনা মেনে নিতে পারলেন না বাংলাদেশের মুক্তিযোদ্ধারা।

এবার ১৯৭১ এর মতোই এগিয়ে এলো বঙ্গবন্ধুর আশীর্বাদ নিয়ে রাশিয়ায় পড়তে এবং চিকিৎসা করতে আসা ছোটখাটো গড়নের ছাত্রলীগের সেই ছাত্রটি। প্রতিবাদ করে বলে উঠলো,”না ,এ হতে পারেনা , ব্রেজনেভ ছিলেন বঙ্গবন্ধুর পরমবন্ধু ,আমাদের মুক্তিযুদ্ধের বড়ো মিত্র ।তিনি শুধু মুক্তিযুদ্ধে সাহায্য করেই ক্ষান্ত হননি। ব্রেঝনেভ বঙ্গবন্ধুর অনুরোধে বাংলাদেশ থেকে ছাত্রদের এনে বিনা পয়সায় তো বটেই উপরন্ত স্কলারশীপ দিয়ে পড়ার সুযোগ করে দিলেন, যাতে আমরা একটি আদর্শ দেশ গড়ে তুলতে পারি ।সেই আমাদের কি এখানে বসে ব্রেঝনেভের স্মৃতির প্রতি সম্মান জানিয়ে কিছুই করার নেই ? ”  তাঁরা উদ্যোগ নিলেন বঙ্গবন্ধু কন্যাকে আমন্ত্রন জানানোর। ক’জন সহপাঠী সাথে  নিয়ে কাজে নেমে পড়লেন সেই দামাল ছাত্র মুক্তিযোদ্ধা । যোগাযোগ করলেন মস্কোর কমিউনিষ্ট পার্টির উচ্চপর্যায়ের লোকেদের সাথে এবং তৎকালীন পররাষ্ট্রমন্ত্রী আন্দ্রেই গ্রোমিকর সাথে ।

ঢাকা থেকে তাঁকে সাহায্য করতে এগিয়ে এলেন তখনকার বাংলাদেশ কমুনিস্ট পার্টির বরিশালের বেলা নবী, ও  তাঁর স্বামী মোহাম্মদ নবী । তাঁদের চেষ্টা বিফল হলোনা। শেষ পর্যন্ত  বিজয় ছিনিয়ে আনলেন । মস্কো তাঁদের অনুরোেধের পক্ষে জোরালো যুক্তি খুঁজে পেলো । তারা রাজি হলো।ব্রেঝনেভের অন্তেস্টিক্রিয়া অনুষ্ঠানে যোগ দেবার জন্য বিশ্বের একজন বিশিষ্ট নাগরিক হিসাবে বঙ্গবন্ধুকন্যাকে নিমন্ত্রণপত্র পাঠানো হলো লন্ডনে। এরপর সেই দামাল মুক্তিযোদ্ধা  মস্কোর প্রোটোকলের বাইরে গিয়ে নিজেই যোগাযোগ করলেন বঙ্গবন্ধুকন্যার সাথে । আমাদের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী যখন উদ্বাস্তুর মতো মানবেতর জীবনযাপন করছিলেন এদেশ থেকে সেদেশে, ঠিক সেই সময় এই বীর মুক্তিযোদ্ধার সেদিনের লড়াইটি ছিল  মাইলফলকের মতো । লন্ডন থেকে সুলতান শরিফকে(যিনি বর্তমানে যুক্তরাজ্য আওয়ামীলীগের প্রেসিডেন্ট ) সাথে নিয়ে আমাদের আজকের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বিশ্বের সম্মানিত বিশিষ্ট ব্যক্তির প্রোটোকল নিয়ে মস্কো এসে পৌঁছুলেন । সেই অনুষ্ঠানে ঘটে গেল এক তাৎর্যপূর্ণ ঘটনা ।

সবার মতো রিয়ার এডমিরাল এম,এইচ ,খান ব্রেঝনেভের শবদেহে শুধু ফুল দিয়ে শ্রদ্ধাজ্ঞাপন করলেও সোভিয়েত পররাষ্ট্র মন্ত্রী আন্দ্রেই গ্রোমিকো নিজে শেখ হাসিনাকে বিশ্বনেতাদের কাছে বিশেষ বিশেষণে উপস্থাপন করলেন। বিশ্ব নেতৃত্বের মাঝে শেখ হাসিনাকে আন্দ্রেই গ্রোমিকো পরিচয় করিয়ে দিলেন বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের মহানায়ক বাঙালির জাতির পিতা বিশ্বের অদ্বিতীয় মহান নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমান এর সন্তান হিসাবে ।এর পরের দৃশ্য শুধুই অনুভব করা যায়। কারণ, তখন অনেক বিশ্বনেতার চোখের কোণায় চিক চিক করা কিছু জল গড়িয়ে পড়ল । সবার চোখের দৃষ্টির সামনেই হিমালয়ের মত মানুষটির স্মৃতি ভেসে উঠলো।পৃথিবীর সব বিশিষ্টজনেদের সারিতে “বঙ্গবন্ধুর রক্ত এসে তাঁর আসনটি  নিলেন।সবার দৃষ্টি তখন বঙ্গবন্ধুর সন্তানের দিকে ।কেউ কেউ তাঁকে দেখলেন গভীর শ্রদ্ধা ,সহানুভুতি আর ভালবাসার দৃষ্টি দিয়ে ;কেউ দেখলেন অপরাধবোধ আর অনুশোচনার দৃষ্টি দিয়ে,কারো আবার বুক কেঁপে উঠলো অজানা আতঙ্কে।

“কিন্তু যা ঘটবার তা ঘটে গেলো।আমরা সারাবিশ্বের নেতৃত্বকে একই স্থানে বসিয়ে আমাদের ম্যাসেজ পাঠিয়ে দিলাম ” বলছিলেন সেই ছাত্র যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধাটি । না, বঙ্গবন্ধু মরেনা, বেঁচে আছে তাঁরই রক্ত, বাঙালির ঋণ শুধবার জন্য ।এই সংবাদে হয়তো তখনকার পাকিস্তানের আই এস আই ও তাদের ক্রীড়নক বাংলাদেশের কিছু জেনারেলের হাত থেকে ‘ব্লাডি সিভিলিয়নে’র রক্তে রাঙ্গা শরাবের পাত্রটি পড়ে গেল ।কারো কারো বুটের নিচের মাটি একটু কেঁপে উঠলো ।আমরা বঙ্গবন্ধুরকন্যার হাত ধরে আবার ধীরে ধীরে ঘুরে দাঁড়াতে শুরু করলাম ।সেদিনটি সত্যিই আমাদের আরো এক বিজয়ের দিন ছিল।

পাঠক ,এতক্ষণ যে মুক্তিযোদ্ধা ছাত্রটির সম্পর্কে আলোচনা করলাম ।তিনি সাবেক ছাত্রলীগ কর্মী, যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা ।বর্তমানে নিউইয়র্ক প্রবাসী । ভীষণ ধীর,স্থির,মার্জিত ও নিভৃতচারী এক অসাধারণ মেধাবী ব্যক্তিত্ব। পেশায় ডাক্তার ।বর্তমানে কান্সারের প্রতিশোধক উদ্ভাবনের জন্যে গভীর গবেষণায় নিবেদিত। তিনি ফেলোশিপ করেছেন আমেরিকার National Institute of Health (NIH) থেকে ।

এতোক্ষণ যাঁর কথা বললাম, তিনি ডক্টর আব্দুল বাতেন, আমাদের বাতেন ভাই ।নিউ ইয়র্কে একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির উত্তর আমেরিকার সমন্বয়্কারীর দায়িত্ব পালন করার সময় যাঁকে পেয়েছি সব চাইতে কাছে;যিনি প্রতিটি পদক্ষেপে হিমালয়ের মতো আগলে রেখেছিলেন আমাদের বীর মুক্তিযোদ্ধার সঠিক অবস্থান নিয়ে।

তিনি সর্বদা গর্বের সাথে বয়ে বেড়ান বঙ্গবন্ধুর এক অমর স্মৃতি। তাঁর নিজের ভাষায়,”বঙ্গবন্ধু সোভিয়েত ইউনিয়নের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সাথে মিটিং করতে যখন হলে ঢুকছেন ,তখন তাঁর বাম হাতটি আমার কাঁধে আর ডান হাত দিয়ে করমর্দন করছেন সব ডেলিগেট দের সাথে।সবাই উৎসুক দৃষ্টি নিয়ে আমার দিকে তাকিয়ে, এই ছেলেটি কি ? ” বলেই ঝর ঝর করে  দু’চোখের জলে ভাসলেন বাতেন ভাই। বললেন, ” বাবু, এই ছিল আমাদের জাতির পিতা ।আমরা সবাই ছিলাম তাঁর সন্তান ।” আমরা তাঁরই কথায় যেমন হাতে অস্ত্র তুলে নিয়েছিলাম , আবার তারই কথায় অস্ত্র জমা দিয়ে  ফিরে গিয়েছিলাম শিক্ষাঙ্গনে ।এই ছবিটি ১৯৭২ সালের ৩১শে জানুয়ারী বরিশালের অশ্বিনী কুমার টাউন হলের ।সেদিন অস্ত্র জমা দেবার পর মানুষ আমাদের ফুলের মালা দিয়ে বরণ করে নিয়েছিলেন ।কিন্তু আজ কিছু মুক্তিযোদ্ধাদের পদস্খলন দেখলে ভেবে অবাক হই, এমন পরিবর্তন  কিভাবে সম্ভব ? তারপর ও  আশায় বুক বাঁধি । কারণ, এখনো বেঁচে আছেন বঙ্গবন্ধুর যোগ্য সন্তান শেখ হাসিনা , যিনি আমাদের নিয়ে যাবেন বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের দেশ ,”সোনার বাংলায় ।” ছলছল চোখে বাতেন ভাই শেষ কথাটি যা বললেন, তা ছিল এমন , বাবু আমি নিজেই নিজেতে গর্বিত, আত্মতৃপ্ত হই ব্রেজনেভ এর সেই অন্তেষ্টিক্রিয়ার দিনটির স্মৃতি রোমন্থন করে । সেদিন মস্কোতে বঙ্গবন্ধু আমার কাঁধে এক হাত রেখে অন্য হাতে সব বড় বড় মানুষের সাথে করমর্দন করে যে সম্মান আমাকে দিয়েছিলেন , আমি সেই পিতার সম্মানের ঋণ কিছুটা হলেও মনে হয় শোধ করতে পেরেছি ওই দিন ।”

জয় বাংলা ,জয় বঙ্গবন্ধু ,জয় শেখ হাসিনা !!
আল আমিন বাবু
লস এঞ্জেলেস !!
৩১ জানুয়ারী  ২০১৬

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

one × 5 =