এবারে প্রথমবারে মত রাষ্ট্রীয়ভাবে উদযাপন করা হচ্ছে রবীন্দ্রজন্মবার্ষিকী

Facebooktwittergoogle_plusredditpinterestlinkedinmail

এবারে প্রথমবারে মত রাষ্ট্রীয়ভাবে উদযাপন করা হচ্ছে রবীন্দ্রজন্মবার্ষিকী, ঠিক যখন দেশে প্রবল প্রতাপ নিয়ে পথ হাটছে সাম্প্রদায়িক, ধর্মান্ধ হিংসার দর্শন দ্বারা পরিচালিত একটি দানবীয় অপশক্তি, আরেক দিকে আছে  ভাষা আন্দোলনের পধ ধরে যে অসাম্প্রদায়িক, মননশীল, উদার মানবিকতার বিকাশ ঘটেছে তার পক্ষের নীরব শক্তি ।

কেউ একজন বলেছিল, ‘রবীন্দ্রনাথ আর কি এমন কবি—’! রাস্তার পাশে পড়ে ছিল এক বাঁশ। সেটা তুলে বক্তার মাথায় এক বাড়ি বসিয়ে দিয়েছিলেন বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর যখন নোবেল পুরস্কার পান তখন কাজী নজরুল ইসলামের বয়স প্রায় ১৪ বছর। প্রথম জীবন থেকেই রবীন্দ্র-নিন্দা তার পক্ষে ছিল সহ্যের অতীত । নজরুলের রবীন্দ্র-ভজনাকে বিদ্রুপ করে খেলার মাঠে হাতে হাতে ফল পেয়েছিলেন তার বন্ধুরা। ক্রোধে  অগ্নিশর্মা হয়ে গোলপোস্ট উপড়ে তাদের ওপর চড়াও হয়েছিলেন কিশোর কবি। বন্ধু জগৎ রায়ের মাথা ফেটে রক্তারক্তি কাণ্ড ঘটলে বিষয়টি পুলিশ-আদালত পর্যন্ত গড়ায়। বিচারে আদেশ হয় তাকে জুভেনাইল কোর্টে পাঠানোর। শেষ পর্যন্ত অল্প বয়স বলে বিচারক নজরুলকে ক্ষমা করেন এবং কিছু সময় কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়ে রেখে কারাবাসের আদেশ প্রত্যাহার করেন।

উল্লেখ্য, রবীন্দ্র-জন্মশতবার্ষিকী পালন করার ঐকান্তিক ইচ্ছায় পাকিস্তানি শাসনের প্রতিকূল পরিবেশে কিছু বাঙালি একত্র হয়েছিলেন নিজেদের সংস্কৃতির প্রধান ব্যক্তিত্ব রবীন্দ্রনাথের জন্মশতবর্ষপূর্তির উৎসব করার জন্যে। জন্ম হয়েছিল ছায়ানটের।

১৯৬১ সালে রবীন্দ্র জন্মশত বার্ষিকী উদযাপনের ভেতর দিয়ে এ দেশের মানুষ সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে সাংস্কৃতিক প্রতিরোধ গড়ে তোলে। সেই শুরু আর থামেনি।

তৎকালীন পাকিস্তানের মুসলিম লীগের বাঙালি খুলনার আবদুস সবুর খান বিষোদগার করে বলেছিলেন  যে, ‘পয়লা বৈশাখ ও রবীন্দ্র জয়ন্তী উদযাপনের নামে পূর্ব পাকিস্তানে বিদেশি সাংস্কৃতির অনুপ্রবেশ ঘটছে। এভাবে চলতে থাকলে পাকিস্তানের ইসলামী জীবনাদর্শের পরিপন্থী কার্যকলাপ ক্রমাগত বাড়তে থাকবে। পাকিস্তানের অস্তিত্ব বিপন্ন হতে পারে’।

তখনকার তথ্যমন্ত্রী খাজা সাহাবুদ্দিন রেডিও টেলিভিশনে রবীন্দ্র সংগীত প্রচার নিষিদ্ধ করার পক্ষে বিবৃতি দেন।

রবীন্দ্রসঙ্গীত নিষিদ্ধ হচ্ছে জেনে রাজপথে মিছিল করে দেশের মানুষ।

৬৭ এর ফেব্রুয়ারি, কারাগার থেকে মুক্ত হয়ে রেসকোর্সের ময়দানের জমায়েতে বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, ”আমরা মির্জা গালিব, সক্রেটিস, শেকসপিয়ার, অ্যারিস্টটল, দান্তে, লেনিন, মাও সেতুং পড়ি জ্ঞান আহরণের জন্য, আর সরকার আমাদের পাঠে নিষিদ্ধ করে দিয়েছেন রবীন্দ্রনাথের লেখা, যিনি একজন বাঙালি কবি এবং বাংলা কবিতা লিখে বিশ্বকবি হয়েছেন। আমরা এ ব্যবস্থা মানি না, আমরা রবীন্দ্রনাথের বই পড়বই, আমরা রবীন্দ্রসঙ্গীত গাইবই এবং রবীন্দ্রসঙ্গীত এ দেশে গীত হবেই।’

বঙ্গবন্ধু তার ওই ভাষণে বেতার ও টেলিভিশনে রবীন্দ্রসঙ্গীতের ওপর থেকে সব ধরনের বিধিনিষেধ তুলে নিয়ে, দুটি প্রচার মাধ্যমেই পর্যাপ্ত পরিমাণ রবীন্দ্রসঙ্গীত প্রচারের দাবি জানান।

তার কিছুদিন আগেই বঙ্গবন্ধু আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা থেকে মুক্তি পেয়েছিলেন। এ সময় তার জনপ্রিয়তা ছিল গগনস্পর্শী।  বঙ্গবন্ধুর এই ভাষণ তখন ছিল অনেকটাই নির্দেশের মতো। বেতার ও টেলিভিশন কর্তৃপক্ষ বাধ্য হয়েছিলেন খানিকটা হলেও তার প্রস্তাব অনুসরণ করতে।

১৯৬৯-এর ১৬ ডিসেম্বর বাংলা একাডেমিতে রবীন্দ্রসঙ্গীত অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। জাহিদুর রাহিম ,কলীম শরাফী, সন্জীদা খাতুন, ফাহমিদা খাতুন, আফসারী খানম, বিলকিস নাসিরুদ্দীন, রাখী চক্রবর্তী, ইফফাত আরা দেওয়ান প্রমুখ নন্দিত শিল্পীরা সঙ্গীত পরিবেশন করেন। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব ওই অনুষ্ঠানে বেতার-টেলিভিশনে রবীন্দ্রসঙ্গীত প্রচারের সময়সীমা আর বাড়ানোর প্রস্তাব করে প্রধান অতিথির ভাষণ দেন। তিনি বক্তব্যে বলেন “Tagore had reflected the hopes and aspiration of the Bangalees through his works and without Tagore the bengali Language was incomplete.”

বাংলাদেশের অভ্যূদয় হয়েছে ধর্মীয় জাতীয়তাবোধকে বর্জন করে। বাংলাদেশে প্রকাশ্য রবীন্দ্রবিরোধিতা শুরু হয় ১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর। সেই সঙ্গে বিতর্কিত করা হয় বাঙালির জাতীয়তাবোধকে।

নতুন আঙ্গিকে সাজছে পতিসর।

বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের নিজস্ব জমিদারী নওগাঁর পতিসরে রাষ্ট্রীয়ভাবে উদযাপিত  রবীন্দ্র জন্মবার্ষিকীতে আগামীকাল প্রধান অতিথি হিসাবে যোগ দেবেন রাষ্ট্রপতি মোঃ আব্দুল হামিদ।

পতিসর রবীন্দ্র কাচারী বাড়িটি নওগাঁ জেলার আত্রাই উপজেলায় অবস্থিত বাংলাদেশের অন্যতম একটি সংরক্ষিত পুরাকীর্তি ও বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের স্মৃতি বিজড়িত স্থান। এটি উপজেলার পতিসর নামক গ্রামে নাগর নদীর তীরে অবস্থিত।

পতিসরের স্থাপনাগুলো দেখতে অনেকটাই শিলাইদহ ও শাহজাদপুরের একই পরিবার কর্তৃক স্থাপিত স্থাপনাসমূহের মতোই। এখানে একটি দোতলা কুঠিবাড়ি রয়েছে। এছাড়াও কুঠিবাড়ি ঘিরে বেশ কিছু ভবন রয়েছে যেগুলোর ধ্বংসাবশেষ দেখতে পাওয়া যায়। কাচারী বাড়ির পাশেই রয়েছে একটি পুকুর। পূর্বে পুকুরটি বেশ বড় থাকলেও কালক্রমে এটির মাটি ভরাট হয়ে গিয়েছে।

মূল ভবনের সামনেই রয়েছে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের একটি আবক্ষ মূর্তি। এছাড়াও ভবনে প্রবেশের জন্য রয়েছে নান্দনিক একটি প্রবেশপথ।

এই কাচারীতে অবস্থানকালে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বেশ কিছু কাব্য, গল্প ও প্রবন্ধ রচনা করেন।

“ আমাদের ছোট ছোট নদী/ চলে বাঁকে বাঁকে/ বৈশাখ মাসে তার হাটু জল থাকে” বিশ্বগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সেই বিখ্যাত “আমাদের ছোট নদী” যা কবি লিখেছিলেন জেলার আত্রাইয়ের পতিসরের কাছারি বাড়িতে অবস্থানের সময়। প্রায় এক বিঘা জমির উপর অবস্থিত কবির এই কাছারি বাড়ি। এখানে সংরক্ষণ করে রাখা হয়েছে কবির ব্যবহৃত বিভিন্ন আসবাবপত্র। যে বাড়ির পাশ দিয়েই বয়ে গেছে আঁকা-বাঁকা নাগর নদী।

বিশ্বকবি তার বিখ্যাত কবিতা “দুই বিঘা জমি” “সন্ধ্যা” সহ অসংখ্য বিখ্যাত সাহিত্য কর্ম রচনা করেছেন এই পতিসরের কাছারি বাড়িতে বসে।

এই স্থানটির চারপাশেই রবি ঠাকুরের পরিবার কর্তৃক স্থাপিত বেশ কিছু স্থাপনা রয়েছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল দাতব্য হাসপাতাল ও পুরাতন একটি কৃষি ব্যাংক যা ১৯০৫ সালে স্থাপিত হয়েছিল।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের পিতামহ ও জোড়াসাঁকোর ঠাকুর পরিবারের অন্যতম সদস্য দ্বারকানাথ ঠাকুর এ অঞ্চলের জমিদারি ১৮৩০ সালে কেনার পর বিশ্বকবি ১৮৯১ সালের ১৩ জানুয়ারি পতিসরে প্রথম আসেন এই কাছারি বাড়িতে জমিদারি দেখাশোনা ও খাজনা আদায় করতে।

সেই সময় এই পরগনা থেকে খাজনা আদায় হত প্রায় ৫০,৪২০টাকা। বিশ্বকবি নোবেল পুরস্কার পাওয়ার পর তার পুরস্কারের অর্থ থেকে তিনি এই পরগনার প্রজাদের মাঝে বিলিয়ে দেয়ার জন্য ৭৫ হাজার টাকা তৎকালিন সময়ে এখানে অবস্থিত কৃষি ব্যাংকের মারফত পাঠিয়েছিলেন।

এই প্রত্যন্ত গ্রাম এলাকার প্রজাদের মাঝে শিক্ষার আলো পৌছে দেয়ার লক্ষে কবি ১৯৩৭ খ্রিস্টাব্দে পতিসরে এসে তার ছেলে রথীন্দ্রনাথের নামে কালিগ্রাম রথীন্দ্রনাথ ইনষ্টিটিউশন স্থাপন করে এবং এই প্রতিষ্ঠানের নামে ২শত বিঘা জমি দান করেন।  এছাড়াও গড়ে তুলেছিলেন মৃৎশিল্প।

অর্ধশতাব্দীব্যাপী সময় ধরে জমিদার রবীন্দ্রনাথ পল্লী উন্নয়নের যে ধারা গড়ে তুলেছিলেন, গ্রামীণ ব্যাংক স্থাপন করে গ্রামের মানুষের ভাগ্যোন্নয়নের যে প্রয়াস চালিয়েছিলেন, বলা যায় শুধু বাংলাদেশই নয়, বিশ্বের যে অনেক দেশই সেই পথকে এখন অনুসরণ করে চলেছে।

নোবেল প্রাপ্তির পর সর্বশেষ  পতিসরে আসেন ১৯৩৭ সালে।

কবি পুত্র  রথীন্দ্রনাথ ঠাকুর ১৯৩৪ সালে এই এলাকার প্রজাদের জন্য সর্বপ্রথম আধুনিক সময়ের কলের লাঙ্গল এনেছিলেন। পরবর্তী সময়ে তৎকালিন সরকার ১৯৫২ সালে এক অডিন্যান্স বলে কালিগ্রাম পরগনার জমিদারি কেড়ে নিলে ঠাকুর পরিবারের এই জমিদারি হাতছাড়া হয়ে যায়, রথীন্দ্রনাথ ঠাকুর স্বস্ত্রীক পতিসর যাতায়াত বন্ধ করে দেন।

রবীন্দ্রবিরোধী পাকিস্তান সরকার ১৯৪৭ হতে ১৯৭০ সাল পর্যন্ত পতিসরে  কোন অনুষ্ঠান করতে দেয়নি ।

এদিকে সিরাজগঞ্জের শাহাজদপুরে কবির ১৫৬ তম জন্মবার্ষিকী পালনে নেয়া হয়েছে ৩দিনের বিশেষ প্রস্তুতি।

মননের চর্চা বর্তমানে ফরজ !

 

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

10 − two =