কমরেড মনি সিং, বিপ্লবের ভাস্কর্য

Facebooktwittergoogle_plusredditpinterestlinkedinmail
পল্লীকবি জসীমউদ্দীন রাশিয়া ভ্রমন করে এসে লেখেন “যে দেশে মানুষ বড়” বইটি, উৎসর্গ করে উৎসর্গ পৃষ্টায় লিখেনঃ “মনি সিং –
তুচ্ছ করেছ রাজ প্রাসাদের মনি মানিকের শোভা,
তুচ্ছ করেছ বন্ধু স্বজন পরিজন মনোলোভা।
তুচ্ছ করেছ রাজ-ভয় আর শাসন ত্রাসন জ্বালা,
কন্ঠে পরেছ শত শোষিতের জীর্ন হাড়ের মালা।
চির অমানিশা নিকষ নিশির মহাকন্ঠক পথ,
চারি দিকে তব ভয়াল বিশাল বাধা ঘেরা পর্বত।
তুচ্ছ করিয়া চলেছো একাকী যেবা শক্তির বলে,
তাহারি স্মরনে এই উপহার সপিলাম করতলে।

ভুল হতে পারে,তবে মনে হয়, বঙ্গবন্ধুকে বুঝতে যেমন তার ”অসমাপ্ত আত্ম জীবনী” অনেকখানি সাহায্য করে তেমনি কমরেড মনি সিং এর ‘‘জীবন-সংগ্রাম’ও’, নতুন প্রজন্মের জন্যে যারা প্রথমে রাজনীতিবিদ বা বিপ্লবী নয় – প্রথমে মানুষ হতে চায় ।

স্বাধীনতার পর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমান কমরেড মণি সিংহ’ কে তার বাড়ি-ভিটা ফিরিয়ে দিতে চেয়ে ছিলেন। এর উত্তরে কমরেড মণি সিংহ বলেছিলেন, “টংক আন্দোলন ও বাংলাদেশের মুক্তি আন্দোলনে লক্ষ লক্ষ মানুষ তার প্রাণ বিসর্জন দিয়েছে এবং তাদের বাড়ি ঘর উচ্ছেদ হয়েছে। যতদিন পর্যন্ত এই দেশের প্রতিটি মানুষের অন্ন-বস্ত্র-বাসস্থান-শিক্ষা-চিকিৎসা ও কর্মসংস্থান না হচ্ছে ততদিন পর্যন্ত আমার বাড়ি-ভিটা ফিরিয়ে নেয়ার প্রশ্ন উঠতে পারে না। যে দিন সবার ব্যবস্থা হবে সেদিন আমারও ব্যবস্থা হবে।”

তার জন্ম দিন। নেত্রকোনার পূর্বধলা শহরের দশভুজা বাড়িতে রয়েছে রাজা গোপিনাথ সিংহের বাড়ি। তিনি এই বাড়িতে দশভুজার একটি মূর্তি স্থাপন করে প্রতিদিন তাতে পূজা দিতেন। তাই স্থানীয়রা এই বাড়ির নাম দেয় দশভুজা বাড়ি। রাজা গোপিনাথ সিংহের পঞ্চম পুরুষ কালী কুমার সিংহের তৃতীয় পুত্র মনিন্দ চন্দ্র সিংহ ভারত উপমহাদেশের সাম্যবাদী কমিউনিস্ট নেতা কমরেড মনি সিং নামে পরিচিত। মণি সিংহের বয়স যখন আড়াই বছর তখন তাঁর বাবা মারা যান। মা ছিলেন তৎকালীন ময়মনসিংহ জেলার নেত্রকোণা মহাকুমার সুসং-দুর্গাপুরের জমিদার বংশের মেয়ে। মণি সিংহের বয়স যখন ৭ বছর সেই সময় থেকে তাঁরা সুসং-দুর্গাপুরে বসবাস শুরু করেন। এখানেই মণি সিংহ প্রাথমিক পড়াশুনা শুরু ও শেষ করেন।

চে বলেছেন “আমরা অসম্ভবের স্বপ্ন দেখি, সে জন্যই আমরা বাস্তববাদী” – কিন্তু তত্কালীন বিপ্লবীরা শুধু অসম্ভবের স্বপ্ন দেখতেন না, মাটির সাথে তাদের যোগাযোগ ততোধিক ছিল বলেই স্বপ্নকে বাস্তবে নিয়ে আসার সামর্থ্য তারা অর্জন করেছিলেন। ১৯১৪ সালে মাত্র ১৩ বছর বয়সে ব্রিটিশকে উচ্ছেদের জন্য সশস্ত্র বিপ্লববাদী দল অনুশীলনের সাথে যুক্ত হন। তারপর কমিউনিস্ট নেতা মণি সিং নেতৃত্ব দেন টংক আন্দোলন, পরবর্তীতে তেভাগা আন্দোলনের।

পঞ্চাশের দশক থেকে শুরু করে ষাটের দশকের শেষ পর্যন্ত টানা ২০ বছর তাঁকে বাধ্য হয়ে আত্মগোপনে থাকতে হয়। এ সময় আইয়ুব সরকার তাঁকে ধরিয়ে দেওয়ার জন্য ১০ হাজার টাকা পুরস্কার ঘোষণা করে, ৬৯ সালে জাতীয় অনেক নেতৃবৃন্দের সাথে কমরেড মণি সিংহকেও গ্রেফতার করা হয়, ঐতিহাসিক গণঅভ্যুত্থানের পর সকলের সাথে তিনিও মুক্তি পান।

মুক্তিযুদ্ধের শুরুতে তিনি জেলে বন্দী ছিলেন।পাকসেনাদের ভয়াবহ গণহত্যার পর ছাত্র জনতা ৭১ সালের এপ্রিল মাসে রাজশাহী কারাগার ভেঙ্গে তাঁকে মুক্ত করে। জেল থেকে বেরিয়ে তিনি ভারতের উদ্দেশ্যে রওনা হন। মনে রাখা প্রয়োজন বৃহৎ শক্তি চীন তিন তিন বার জাতিসংঘে যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব এনেছে এবং তিনবারই সোভিয়েত ইউনিয়নের ভেটোর কারণে সেটি সফল হয়নি, নাহলে ইতিহাস অন্যরকম হতে পারতো।

ভুলে গেলে চলবেনা আমেরিকার মতো বৃহৎ শক্তি পাকিস্তানের পক্ষে লড়েছে সামরিক কূটনৈতিক উভয় ভাবে। আমেরিকানদের পাঠানো সপ্তম নৌবহর যখন বঙ্গোপসাগর অভিমুখে তখন সোভিয়েত ইউনিয়ন সাবমেরিন পাঠিয়ে সেটিকে ঠেকি য়েছে। এই যে আন্তর্জাতিক চক্রান্ত এবং ঠেকিয়ে দেয়ার কূটনৈতিক সফলতা সেটা সফল হয়েছে তাজউদ্দীন, আবদুস সামাদ আজাদ, মনিসিং এর যৌথ প্রচেষ্টায়।তাছাড়া পৃথিবীর অন্যদেশে মুক্তিযুদ্ধকে কূটনৈতিক ভাবে তুলে ধরতে যে টিম ইউরোপ সহ বিভিন্ন দেশ সফর করে সেটিতে ছিলেন আব্দুস সামাদ আজাদ, ন্যাপের দেওয়ান মাহবুব আলী এবং কমিউনিস্ট পার্টির ডা সারোয়ার আলী।যারা আন্তর্জাতিক সমর্থন আদায়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন।

মুক্তিযুদ্ধকে সবচে’ বেশি সমর্থন দেয়া ভারতের দরকার ছিলো আন্তর্জাতিক সমর্থনের। ফলে অন্য বৃহৎশক্তি সোভিয়েত ইউনিয়নের অনুকূল অবস্থান জরুরী ছিলো। সেই বিবেচনায় সোভিয়েতের সাথে মৈত্রী চুক্তি করে ভারত আন্তর্জাতিক ভাবে নিজেদের সুরক্ষিত করার কৌশল নেয়। এটি করতে গিয়ে মস্কো-পন্থীদের মূল ফ্রন্টে নিয়ে আসা দরকার ছিলো। সেই লক্ষ্যে গঠিত হয় মুজিব নগর সর কারের উপদেষ্টা পরিষদ। যেখানে অন্তর্ভুক্ত হন কমরেড মনি সিংহ, কমরেড মোজাফফর আহমেদ। গঠিত হয় ন্যাপ সিপিবি ছাত্র ইউনিয়ন যৌথ গেরিলা বাহিনী, যারা সরাসরি বীরত্বপূর্ণ অবদান রেখে ছেন সম্মুখ যুদ্ধে।

তাজউদ্দিন আহমেদ সহ মুজিব নগর সরকারের চার নেতার এক্ষেত্রে ছিল অক্লান্ত অবদান, আর মীর জাফর খ্যাত খন্দকার মোশতাক আহমেদ ও তার গং দের ছিল এই মৈত্রীর বিপক্ষে সক্রিয় পদচারণা যা বলিষ্ঠ নেতৃত্বের দুরদর্শিতার ফলে সফলতার মুখ তখেন দেখে নাই। যুদ্ধ চলাকালে মুজিব নগর সরকারের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য হিসেবে ভারতের বিভিন্ন স্থানে শরণার্থী শিবিরের জন্য সহায্য-সহযোগিতা আদায়ে মণি সিংহের ব্যাপক অবদান রয়েছে।

কমরেড মণি সিংহ দেশের ভেতরে শত্রুদের মোকাবেলাও করেন বিচক্ষণতার সঙ্গে। যুদ্ধের বিপক্ষে চীনপন্থীদের অপপ্রচারকেও তিনি দক্ষ হাতে সামাল দেন। কমরেড আহসানউল্লাহ চৌধুরীর ভাষ্য থেকে জানা যায়:’বিভিন্ন মহলের প্রতি তিনি [মণি সিংহ] মুক্তিযুদ্ধের সমর্থন দেয়ার আহ্বান জানান। ওই সময় কমরেড মণি সিংহের ভূমিকা ছিল অত্যন্ত বলিষ্ঠ। এ-যুদ্ধ জনগণের যুদ্ধ নয় বলে যে বিভ্রান্তি ছড়ানো হচ্ছিল এবং চীনাপন্থিরা দুই কুকুরের লড়াই বলে যে প্রচারণা চালাচ্ছিল তাকে ভুল ও বিভ্রন্তিকর প্রতিপন্ন করার লক্ষ্যে পার্টি সর্বতোভাবে মাঠে ময় দানে সক্রিয় ছিল। এ-যুদ্ধকে জনগণের লড়াই হিসেবে তুলে ধরে আন্তর্জাতিক ভাবে এর পক্ষে সমর্থন আদায়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন কমরেড মণি সিংহ।’

বঙ্গবন্ধুর সাথে কমরেড মনি সিং মুক্তিযুদ্ধ পূর্ব ও পরবর্তিতে ঘনিষ্ট সম্পর্ক ছিল । বঙ্গবন্ধুর বাকশাল করার পিছনেও মস্কোপন্থি ন্যাপ আর কমিউ নিস্ট পার্টির গুরুত্বপূর্ণ অবদান ছিল, বিশেষ করে মনি সিং এর,বিশ্বস্ত লোকশ্রুতি আছে ।

১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধু হত্যার পর কমিউনিস্ট পার্টি আবারও বেআইনী ঘোষিত হয়। ঐ সময় আজীবন সংগ্রামী নেতা আবার রাজনৈতিকভাবে নির্যাতনের শিকার হন ও কারাবরণ করেন। জিয়াউর রহমান যখন ক্ষমতায় ছিলেন তখন ১৯৭৭ সালের মাঝামাঝি সময় একদিন কমরেড মণি সিংহকে গ্রেপ্তার করে বিনা বিচারে ছয় মাস অন্তরীণ রাখা হয়। সেই সময়ে তাঁর বয়স হয়েছিল ৭৭ বছর। একজীবনে দেশের জন্যে মানুষের জন্যে এত কাজ করে যাওয়া মানুষটাকে পরবর্তী প্রজন্মের সাথে পরিচিত করার ক্ষেত্রে জাতীয় পর্যায়ে উদ্যোগ নেয়া উচিত যা হবে দেশপ্রেম ও মুক্তিযুধ্দের চেতনাতে বেড়ে উঠবার প্রেরণা স্বরূপ, কারণ মনি সিংরা আমাদের জাতির গর্ব, সম্পদ,ইতিহাসের ভিত ।

 (সৌজন্য : সাম্প্রদায়িকতা বিরোধী বাংলাদেশ)

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

8 + 17 =