কিছু না জেনেই শর্মিলার সঙ্গে নেচেছিলাম: অমিতাভ বচ্চন

Facebooktwittergoogle_plusredditpinterestlinkedinmail

কলকাতার সঙ্গে অমিতাভ বচ্চনের যেন নাড়ির টান। বাঙালি অভিনেত্রী জয়া ভাদুড়ি (বচ্চন)-কে বিয়ে করার সুবাদে এ শহরের মানুষ তাঁকে ‘জামাইবাবু’ বলতেই বেশি পছন্দ করে। ‘আনন্দ’ ফিল্মের এই ‘বাবুমশায়’ ইদানীং প্রায়ই কলকাতায় আসেন— কখনও কোনো ফিল্মের শুটিংয়ে, কখনও চলচ্চিত্র উৎসবে, কখনো অন্য কোনো উপলক্ষে। গতকাল বুধবার সন্ধ্যেয় কলকাতার এক পাঁচতারা হোটেলে ‘অমিতাক্ষর’ অনুষ্ঠানে অমিতাভ ফের উচ্ছ্বসিত হলেন এ মহানগরীতে তাঁর যৌবনের দিনগুলোর স্মৃতিচারণায়। ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়ালের সামনে ছবি তোলা থেকে ময়দানের ফুটবল, উৎপল দত্তের নাটক— সবই একে একে তাঁর এই স্মৃতিচারণায় উঠে এল।

দা ৪২ ফাউন্ডেশন এবং অল বেঙ্গল অমিতাভ বচ্চন ফ্যানস অ্যাসোসিয়েশন আয়োজিত এ-অনুষ্ঠানে অমিতাভের সঙ্গে আলাপচারিতায় মেতেছিলেন শর্মিলা ঠাকুর, অপর্ণা সেন, সন্দীপ রায় এবং সুজিত সরকারও।

অমিতাভ জানালেন, এলাহাবাদ থেকে সামান্য কিছু টাকা হাতে নিয়ে এসে পড়েছিলেন কলকাতায় এসে পড়ে চাকরি শুরু করেছিলেন ৪৭০ টাকা বেতনে। তখন থাকতেন টালিগঞ্জে তাঁর বাবার এক বন্ধুর বাড়িতে, এবং রোজ ট্রামে করে এসপ্ল্যানেডে অফিসে যেতেন। পোশাক বলতে একমাত্র সম্বল ছিল একজোড়া জ্যাকেট-ট্রাউজার আর একটিমাত্র টাই। বর্ষাকালে পানি জমতো ধর্মতলায়, আর তখন প্যান্ট গুটিয়ে নিয়ে হাঁটতে হতো। সেইসঙ্গে দুশ্চিন্তা থাকতো, প্যাণ্টটা যেন আবার খুব বেশি কুঁচকে না যায়, কারণ তা হলে পরদিন সেটা আর পরা যাবে না! পরে অফিসের কাছাকাছি থাকার উদ্দেশ্যে রাসেল স্ট্রিটের এক গেস্ট হাউসে উঠে আসেন। দুপুরের খাবার অফিসেই মিলত বিনা পয়সায়, আর রাতে বেশির ভাগ কাটতো ফুচকা খেয়ে।

সওদাগরি আপিসের কাজে তখন তরুণ অমিতাভকে ঘুরতে হয়েছে আসানসোল, ধানবাদ প্রভৃতি কয়লাখনি এলাকায়। সেই সময় খনিশ্রমিকদের কষ্টকর জীবন তাঁর মনটাকে খুব ভারি করে তুলেছিল। মনের এ অবস্থা নিয়েই তিনি দেখেন খনশ্রমিকদের নিয়ে উৎপল দত্তের বিখ্যাত নাটক ‘অঙ্গার’। অনন্যপূর্ব সে-অভিজ্ঞতা এখনও তাঁর মনে সজীব বলে জানান আজকের এই মহাতারকা। তাপস সেনের অবিস্মরণীয় আলোকসম্পাতে মঞ্চের ওপর খনি শ্রমিকদের আর্তনাদ আজও যেন তাঁর কানে বাজে। এসব অভিজ্ঞতাই পরে তাঁর কাজে লাগে ‘কালাপাথর’ ছবিটি করার সময়। নাটক পড়ার অভ্যাসেও শান পড়ে এই কলকাতাতেই। হাতের কাছেই ছিল ব্রিটিশ কাউন্সিলের লাইব্রেরি। আর বন্ধুদের সঙ্গে আনন্দ করতে হলে গন্তব্য ছিল পার্ক স্ট্রিটের সাবেক ব্লু-ফক্স। সেখানে এক বার আচমকাই শর্মিলা ঠাকুরের সঙ্গে নাচার সুযোগ হয়েছিল। যুবক অমিতাভ তখনও বুঝতেও পারেননি যে, উনি শর্মিলা। পরে বন্ধুরা বলার পরে মাথায় হাত! তখন তো জানা ছিল না আগামী দিনে ‘চুপকে চুপকে’, ‘ফরার’, ‘দেশপ্রেমী’ বা ‘বিরুধ’-এর মতো ছবিতে অভিনয় করতে হবে এই শর্মিলার সঙ্গেই!

জীবনের প্রথম পোর্টফোলিও তৈরির জন্য ছবি তুলে দিয়েছিলেন ভাই অজিতাভ। ছবি তোলা হয় ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়ালের সামনে একটা গাছের নীচে। মেমোরিয়ালের ভিতরে তখন ঢোকা হয়নি। অমিতাভ জানালেন, কয়েক দিন আগে ডোনা গঙ্গোপাধ্যায়ের নাচের অনুষ্ঠান দেখতে গিয়ে প্রথম বার ভিতরে ঢুকলেন। হেসে ফেলে বললেন, সে দিনও মনে মনে খুঁজছিলেন ওই গাছটা। বিজ্ঞাপনে ভয়েসওভার করার কাজ জুটল কিছু দিন পরে। কাপড় কাচা সাবানের বিজ্ঞাপন করে পাওয়া গেল পঞ্চাশ টাকা। সেই টেপ সম্বল করেই চলে গিয়েছিলেন মৃণাল সেনের কাছে। মুম্বইয়ের ফিল্মিস্তান স্টুডিওয় ওই টেপ শুনেই মৃণাল তাঁকে ‘ভুবন সোম’-এ ভয়েসওভারের কাজ দেন।

খেদ থেকে গিয়েছে, ‘শতরঞ্জ কি খিলাড়ি’-র ভয়েসওভার ছাড়া সত্যজিৎ রায়ের সঙ্গে কাজ করা হয়নি। যদিও সত্যজিতের সঙ্গে আড্ডা দেওয়ার সুযোগ হয়েছে বহু। সেই ঘর এবং আড্ডার বর্ণনা দিতে গিয়ে আবার হেসে ফেললেন অমিতাভ। হেসে ফেললেন সন্দীপ রায়ও। অমিতাভ বলছিলেন, সত্যজিতের ঘরটা ছিল পৃথিবীর যে কোনও গৃহিণীর কাছে দুঃস্বপ্ন। কাগজ আর বইপত্রের ভিড়ে সবার খেই হারিয়ে যেত। ‘‘অথচ হাত বাড়িয়ে ঠিক জায়গা থেকে ঠিক বইটা দিব্যি খুঁজে বের করে ফেলতেন মানিকদা!’’ অমিতাভ বলে চলেন, ‘‘আজও যখন জয়া (বচ্চন) আমার অগোছালো অফিসঘর নিয়ে খোঁচায়, আমি বলি মানিকদার কথা ভাবো!’’

এ ভাবেই প্রসঙ্গ থেকে প্রসঙ্গান্তরে যেতে যেতে অমিতাভ ছুঁয়ে ছুঁয়ে দেখছিলেন তাঁর স্মৃতির কলকাতাকে। অনুষ্ঠানের একেবারে শেষ লগ্নে দর্শকাসন থেকে উঠে দাঁড়ালেন এক বৃদ্ধা। তাঁকে দেখে চমকে উঠলেন তিনি। মঞ্চ থেকে নেমে জড়িয়ে ধরলেন তাঁকে। দর্শকদের সঙ্গে পরিচয় করালেন, ওই বৃদ্ধা শ্রীমতি প্রাণপ্রসাদ।

১৯৬৮ সালে জীবনের প্রথম চাকরিটি শুরু করেছিলেন অমিতাভ। তখন শ্রী প্রাণপ্রসাদ ছিলেন ওই কোম্পানির ডিরেক্টর।

আবেগের মুহূর্ত বটে! মধ্য সত্তর ছুঁই ছুঁই তরুণ এ বার ধরা গলায় বলতে শুরু করলেন, ‘‘কভি কভি মেরে দিল মে খেয়াল আতা হ্যায়…।’’ কলকাতা উঠে দাঁড়িয়ে কুর্নিশ জানাল তার নিকট-আত্মীয়কে।

সূত্র: আনন্দবাজার

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

5 + 8 =