গণমাধ্যমের ওপর কোনো ধরনের হস্তক্ষেপ করার অভিপ্রায় সরকারের নেই-তথ্যমন্ত্রী

Facebooktwittergoogle_plusredditpinterestlinkedinmail

২৫ ফেব্র“য়ারি, ২০১৬, সময়: বেলা ১২:০০ টা, স্থান: তথ্য অধিদফতর সম্মেলন কক্ষ, ঢাকা।
১। সম্প্রতি এমিনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল, আইএফজে, হিউম্যান রাইটস্ ওয়াচ এর প্রতিবেদনগুলোতে বাংলাদেশের গণমাধ্যমের স্বাধীনতা প্রসঙ্গে যে বক্তব্য দেয়া হয়েছে তার প্রতি আমাদের দৃষ্টি আকর্ষিত হয়েছে।কিছু বলার আগে এ সংস্থাগুলোর কর্মকান্ডের দিকে তাকাবার জন্য আপনাদের আহ্বান করছি। এমিনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল, আইএফজে, হিউম্যান রাইটস্ ওয়াচ আজ বাংলাদেশের গণমাধ্যম পরিস্থিতি নিয়ে যতটা উদ্বেগ প্রকাশ করছেন ১৯৭১ সালে যখন সমগ্র বাঙালি জাতির উপর ইতিহাসের বর্বরতম গণহত্যা-গণধর্ষণ-যুদ্ধাপরাধ সংগঠিত হয়েছিল, ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যা করা হয়েছিল, খুনী মোশতাক-জিয়ার সামরিক শাসনামলে যেভাবে গণতন্ত্রকে হত্যা ও গণমাধ্যমের স্বাধীনতাকে কবর দেয়া হয়েছিল, ২০০৪ সালে তৎকালীন বিরোধীদলীয় নেত্রী শেখ হাসিনাকে হত্যার জন্য জনসভা মঞ্চে গ্রেনেড হামলা চালানো হয়েছি, এক-এগারো পরবর্তীতে যেভাবে গণতন্ত্র ও গণমাধ্যমের স্বাধীনতা পদদলিত করা হয়েছিল তখন ঠিক ততটাই নিরব ছিল। শুধু তাই না, যখন ইতিহাসের বর্বরতম যুদ্ধাপরাধের বিচার হচ্ছে, তখন তারা যুদ্ধাপরাধীদের বাঁচাতে নানা রকম ফন্দিফিকির করছে।

২। ২০০৮ থেকে ২০১৪ পর্যন্ত প্রথম এবং ২০১৪ থেকে আজ পর্যন্ত দ্বিতীয় মহাজোট সরকার আমলে রাজনৈতিক কারণে রাষ্ট্র-সরকার-প্রশাসনের পক্ষ থেকে মুক্ত সংবাদপত্র, মুক্ত গণমাধ্যম, মুক্ত সাংবাদিকতা, মুক্ত মত প্রকাশের উপর কোন হস্তক্ষেপ, হয়রানী করা হয়নি। বরং এই আমলে সংবাদপত্র, গণমাধ্যম, সাংবাদিকগণ স্মরণকালের সবচাইতে বেশি স্বাধীনতা ভোগ করছে এবং সবচাইতে বেশি সম্প্রসারিত হয়েছে। গণমাধ্যম নিয়ন্ত্রণে সরকারের কোন নীতি বা পদক্ষেপ নেই। সরকারের নীতিই হচ্ছে গণমাধ্যমের স্বাধীনতাকে আরও সম্প্রসারিত ও বিকশিত করা। সেজন্য সরকার গণমাধ্যম ও সাংবাদিক বান্ধব নীতি প্রণয়ন ও বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়েছে। দেশে বর্তমানে ২ হাজার ৮ শত ৩৪টি পত্রিকা প্রকাশিত হচ্ছে, যার বেশির ভাগই সরকারের সমালোচনামুখর। সংসদীয় কমিটি টিআইবি’র নিবন্ধন বাতিলের সুপারিশ করেছে, যা তাদের এখতিয়ারভুক্ত। তবে সরকার এ ব্যাপারে কোনো পদক্ষেপ নেয়নি, তা আপনারা সবাই জানেন।

৩। সরকার সংবাদপত্র বা গণমাধ্যমকে নিয়ন্ত্রণে বিজ্ঞাপনকে হাতিয়ার হিসাবে ব্যবহার করে না, করছেও না। সে সুযোগও সরকারের নেই। সরকারি বিজ্ঞাপন সবাই পাচ্ছে। বেসরকারি বা ব্যক্তিগত মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান কোথায় কিভাবে বিজ্ঞাপন প্রদান করবে, তা তাদের নিজস্ব বিষয়। এ ব্যাপারে সরকারের হস্তক্ষেপের সুযোগ নেই। আমি আবারও বলছি, সরকারের সংবাদপত্র বা গণমাধ্যমের স্বাধীনতার উপর সামান্যতম নিয়ন্ত্রণ আরোপের কোনো নীতি বা অভিপ্রায় নেই। সরকার ডেইলী স্টার ও প্রথম আলোর সাথে সাথে বৈরিতা করছে- কেউ কেউ এমন বললেও সত্যি হলো এই যে, ঐ দুইটি সংবাদপত্রের বিভিন্ন অনুষ্ঠানে সরকারের গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রীরা নিয়মিত উপস্থিত হয়ে অংশগ্রহণ করে আসছেন আন্তরিকভাবে, কোনো বৈরিতা নেই।

৪। এমনেষ্টি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে ৪৯জন নাগরিক সমাজ সদস্যদের বিরুদ্ধে আদালত অবমাননার অভিযোগ করা হয়েছে। ইতিমধ্যেই অভিযুক্তরা তাদের দোষ স্বীকার করে নিয়েছে। উপরন্তু বিষয়টি নেহাতই আদালতের, সরকারের নয়।

৫। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেইসবুক খুবই স্বল্প সময়ের জন্য স্থগিত রাখা হয়েছিল জননিরাপত্তা স্বার্থে। কারণ আপনারা সকলেই জানেন আন্তর্জাতিক অপরাধে ট্রাইব্যুনালে দেলোয়ার হোসেন সাঈদীর রায় প্রকাশের পর ফেইসবুককে হাতিয়ার হিসাবে ব্যবহার করে যেভাবে চাঁদে সাঈদীকে দেখা গেছে’ বলে মিথ্যাচার ও অপপ্রচার চালিয়ে সারাদেশে নারকীয় তান্ডব-অন্তর্ঘাত-নাশকতা চালানো হয়েছিল তা আপনারা নিশ্চয়ই ভুলে যাননি। কোনো দায়িত্বশীল সরকারই জেনে-শুনে-বুঝে এ ধরনের নারকীয় তান্ডব-অন্তর্ঘাত-নাশকতা থেকে জনগণের জানমালের নিরাপত্তা বিধানের জন্য পদক্ষেপ নিলে তা গণমাধ্যমের টুটি চেপে ধরা হিসাবে চিহ্নিত করাও দুঃখজনক।

৬। চিহ্নিত ও আত্মস্বীকৃত জঙ্গিবাদী গোষ্ঠী কর্তৃক বেশ কয়েকজন ব্লগার গুপ্ত হত্যার দুঃখজনক ঘটনা ঘটেছে। সরকার ও আইন প্রয়োগকারী সংস্থা গুপ্ত হত্যাকারীদের চিহ্নিত করার কাজ চলছে। ইতিমধ্যেই কয়েকজন গ্রেপ্তার হয়েছে। ব্লগার রাজীব হত্যাকান্ডের বিচারও সম্পন্ন হয়েছে। এই জঙ্গিবাদী-উগ্রবাদী গোষ্ঠী শুধু মুক্তমনা ব্লগারই নয়, ইসলামের শান্তিবাদী-সুফীবাদী সাধক ও চিন্তাবাদীদেরও উপর গুপ্ত হামলা-হত্যা চালাচ্ছে। সরকার খুনী-জঙ্গিবাদী-মৌলবাদীদের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক পদক্ষেপ অব্যাহত রেখেছে।

৭। ডেইলী স্টার সম্পাদক জনাব মাহফুজ আনামের বিষয়ে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্য এক-এগারো সময়কালের ঘটনার বিবরণ মাত্র। এখানে কোনো অত্যুক্তি নেই, বিষোদগার নেই। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যে আমরা সেই সময়ে সেনা সমর্থিত সরকার কর্তৃক রাজনীতিক, ব্যবসায়ী, সরকারি কর্মচারী এমনকি গণমাধ্যমকর্মীদের ওপর যে নির্যাতন হয়রানী হয়েছিল, তারই পরিষ্কার চিত্রটি দেখতে পাই। এখানে কোনো হিংসা-প্রতিহিংসার বিষয় নেই।

৮। গণতন্ত্রে একটি সংবাদপত্র বা একজন সম্পাদক বা সাংবাদিক রাজনীতিকদের সমালোচনা করতে পারেন। একজন রাজনীতিক কি সংবাদপত্র বা কোনো সাংবাদিক বা সম্পাদকের যৌক্তিক সমালোচনা করার অধিকারও রাখেন না? কোনো রাজনীতিক সংবাদপত্র বা সাংবাদিক বা সম্পাদকের সমালোচনা করলেই এত শোরগোল তোলা হয় কেন? মাননীয় প্রধানমন্ত্রী এক- এগারো পরবর্তী সংবাদপত্র বা গণমাধ্যমের কয়েকজন সম্পাদক বা সাংবাদিক নিয়ে যে কথা বলেছেন, সেটাতো সত্য ঘটনাই বলেছেন। প্রধানমন্ত্রী কি সত্য কথাও বলার অধিকার রাখেন না ? গণমাধ্যম রাজনীতিবিদদের যুক্তিসংগত সমালোচনা করলে যেমন গণতন্ত্র ক্ষতিগ্রস্থ হয় না, ঠিক তেমনই রাজনীতিকরাও যুক্তিসংগতভাবে গণমাধ্যমের সমালোচনা করলে গণমাধ্যমের স্বাধীনতাও সংকুচিত হয় না। তবে গণমাধ্যম উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে রাজনীতিকদের চরিত্র হননে অপপ্রয়াস পেলে কিংবা রাজনীতিকরা যুিক্ত ছাড়া গণমাধ্যমের সমালোচনা করলে গণতন্ত্রের ক্ষতি হয়, গণতন্ত্র বিরোধী শক্তি এ থেকে উৎসাহ পায়।
৯। রাজনীতিকদের যেমন ন্যুনতম নৈতিক মান বজায় রাখা উচিৎ, ঠিক তেমনই একজন সম্পাদকের ন্যুনতম নৈতিক মান বজায় রাখা উচিৎ। একজন রাজনীতিক যদি নৈতিকতার বিবেচনায় সমালোচিত হতে পারেন, একজন সম্পাদকও নৈতিকতার বিবেচনায় সমালোচিত হতে পারেন।

কোনো সম্পাদকের পক্ষে-বিপক্ষে সমালোচনা গণমাধ্যমের ওপর হস্তক্ষেপ নয়। গণমাধ্যমের ওপর কোনো ধরনের হস্তক্ষেপ করার অভিপ্রায় সরকারের নেই।

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

12 − one =