চট্টগ্রামে ম্যাক্স হাসপাতালের চিকিৎসকদের অবহেলায় শিশু রাইফার মৃত্যু:তদন্ত টিম

Facebooktwittergoogle_plusredditpinterestlinkedinmail

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তদন্ত কমিটির পর এবার সিভিল সার্জনের নেতৃত্বে গঠিত তদন্ত টিমও শিশু রাইফার মৃত্যু বেসরকারি ম্যাক্স হাসপাতালের চিকিৎসকদের অবহেলায় হয়েছে বলে প্রমাণ পেয়েছে।

তদন্তে এ ঘটনায় হাসপাতালের শিশুরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. বিধান রায় চৌধুরীসহ অপর দুই চিকিৎসক ডা. দেবাশীষ সেনগুপ্ত ও ডা শ্রুভ্র দেবকে দায়ী করা হয়েছে। অভিযুক্ত চিকিৎসক ও ম্যাক্স হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে চার দফা সুপারিশ করা হয়েছে প্রতিবেদনে।
শুক্রবার দুপুরে চট্টগ্রাম প্রেসক্লাব মিলনায়তনে এক সংবাদ সম্মেলনে এই তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়। প্রতিবেদনটি স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের মহাপরিচালকের কার্যালয়ে পাঠানো হয়েছে বলে জানিয়েছেন চট্টগ্রামের সিভিল সার্জন ডা. মো. আজিজুর রহমান সিদ্দিকী।
তদন্ত কমিটির প্রধান সিভিল সার্জন ডা. মো. আজিজুর রহমান সিদ্দিকী সাংবাদিকদের বলেন, ‘তদন্ত কমিটির প্রতিবেদন স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের মহাপরিচালকের কাছে পাঠানো হয়েছে।’

প্রতিবেদনের একটি অনুলিপি চট্টগ্রাম বিএমএ সভাপতি, সিইউজের সভাপতি এবং চকবাজার থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে (ওসি) দেওয়া হয়েছে। প্রতিবেদনে দোষী ব্যক্তিদের বিষয়ে ব্যবস্থা নিতে সুপারিশ করা হয়েছে। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় থেকে যেহেতু একটি তদন্ত টিম গঠন করা হয়েছে সেহেতু তারাও এ বিষয়ে একটি প্রতিবেদন দেবে। আমাদের তদন্ত সাপেক্ষে প্রাপ্ত প্রতিবেদন তাই মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়েছি। এখন মন্ত্রণালয় থেকে যেভাবে নির্দেশনা দেবে আমরা সেভাবেই ব্যবস্থা গ্রহণ করবো।’

সিভিল সার্জনের নেতৃত্বাধীন তদন্ত কমিটির অপর দুই সদস্য হলেন চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালের শিশুস্বাস্থ্য বিভাগের প্রধান ডা. প্রণব কুমার চৌধুরী ও চট্টগ্রাম সাংবাদিক ইউনিয়নের যুগ্ম সম্পাদক সবুর শুভ।
গত ২৯ জুন চট্টগ্রামের বেসরকারি ম্যাক্স হাসপাতালে সমকালের সাংবাদিক রুবেল খানের আড়াই বছরের কন্যাশিশু রাফিদা খান রাইফার মৃত্যুর একদিন পর সিভিল সার্জনের নেতৃত্বে তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে। পাঁচদিন তদন্ত শেষে শুক্রবার আনুষ্ঠানিকভাবে তদন্ত প্রতিবেদন উপস্থাপন করা হয়। রাইফার বাবা-মা, ম্যাক্স হাসপাতালের চিকিৎসক-নার্স, হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের লিখিত ও মৌখিক জবাবসহ মোট ১২ জনের বক্তব্য নিয়ে এবং সংশ্লিষ্ট নথিপত্র পর্যালোচনা করে তদন্ত প্রতিবেদনটি তৈরি করা হয়েছে।

প্রতিবেদন যা উল্লেখ করা হয়েছে

তদন্ত প্রতিবেদনে সাত দফা পর্যবেক্ষণ দেওয়া হয়েছে, যার ষষ্ঠ দফায় বলা হয়েছে, ‘শিশু বিশেষজ্ঞ ডা. বিধান রায় চৌধুরী শিশুটিকে যথেষ্ট সময় ও মনোযোগ দিয়ে পরীক্ষা করে দেখেননি। ডা. দেবাশীষ সেনগুপ্ত ও ডা. শুভ্র দেব শিশুটির গুরুতর অসুস্থতার সময়ে আন্তরিকতার সাথে সেবা দেননি বলে শিশু রাইফার মা-বাবা যে অভিযোগ করেছিলেন তা এই তিন চিকিৎসকের বেলায় সত্য বলে প্রতীয়মান হয়েছে।’
চতুর্থ দফায় বলা হয়েছে, ‘রাইফা যখন তীব্র খিঁচুনিতে আক্রান্ত হয়, তখন সংশ্লিষ্ট চিকিৎসকের অভিজ্ঞতা এবং আন্তরিকতার অভাব ছিল। ওই সময়ে থাকা সংশ্লিষ্ট নার্সদের আন্তরিকতার অভাব না থাকলেও এরকম জটিল পরিস্থিতি মোকাবেলা করার মতো দক্ষতা বা জ্ঞান কোনোটাই তাদের ছিল না।’
তৃতীয় দফায় বলা হয়েছে, ‘শিশু রাইফাকে ভর্তির সময় থেকে পরবর্তী যে চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে তাতে রোগ নির্ণয়, চিকিৎসা ব্যবস্থাপত্র ও ওষুধের প্রয়োগ যথাযথ ছিল।’
পঞ্চম দফায় বলা হয়েছে, ‘রাইফাকে ম্যাক্স হাসপাতালের জরুরি বিভাগে ভর্তি করা থেকে শুরু করে শেষ চিকিৎসা পাওয়া পর্যন্ত প্রতিটা ক্ষেত্রে তার অভিভাবকের ভোগান্তি চরমে ছিল।’
সপ্তম দফায় বলা হয়েছে, ‘তদন্তে স্পষ্ট হয় যে, ম্যাক্স হাসপাতালে রোগী ভর্তি প্রক্রিয়ায় ভোগান্তি প্রকট। চিকিৎসক ও নার্সদের সেবা প্রদানের সমন্বয়হীনতা ও চিকিৎসাকালীন মনিটরিংয়ের অভাব দেখা যায়। অদক্ষ নার্স ও অনভিজ্ঞ চিকিৎসক নিয়োগের ফলে কাঙ্ক্ষিত চিকিৎসা ব্যবস্থাপনা অনেক দুর্বল। বিশেষত ও বিশেষজ্ঞ চিকিৎসা সেবায় বিশেষজ্ঞের সার্বক্ষণিক উপস্থিতির প্রবল সংকটও রয়েছে ম্যাক্সে।’
চার দফা সুপারিশ
প্রতিবেদনে চার দফা সুপারিশ করা হয়েছে। এতে চিকিৎসায় অবহেলার অভিযোগে তিন চিকিৎসকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া এবং ম্যাক্স হাসপাতালের সার্বিক ত্রুটিপূর্ণ চিকিৎসা ব্যবস্থাপনা সংশোধনের কথা বলা হয়েছে। প্রতিবেদনে ডিপ্লোমাধারী নার্সের মাধ্যমে চিকিৎসা সেবা নিশ্চিত করার সুপারিশ উঠে এসেছে। ম্যাক্স হাসপাতালে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের মাধ্যমে সার্বক্ষণিক দ্রুত সেবা নিশ্চিত করা এবং অভিভাবকদের রোগীর নিয়মিত আপডেট জানানোর কথাও বলা হয়েছে।
তদন্ত প্রতিবেদন উপস্থাপনের পর চট্টগ্রাম সাংবাদিক ইউনিয়নের (সিইউজ) সাধারণ সম্পাদক হাসান ফেরদৌস সাংবাদিকদের বলেন, ’তদন্ত প্রতিবেদনে ম্যাক্স হাসপাতাল ও তিন চিকিৎসকদের চরম অবহেলা এবং গাফিলতির প্রমাণ উঠে এসেছে। আমরা আশা করছি দ্রুত দায়ী চিকিৎসকদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। ম্যাক্স হাসপাতাল বন্ধ করা হবে। আমরা আবারও বলছি সমগ্র বিএমএ’র বিরুদ্ধে আমাদের কোনো আন্দোলন নয়। আমাদের আন্দোলন শুধুমাত্র দায়ী চিকিৎসক ও ম্যাক্স হাসপাতালের বিরুদ্ধে। আমাদের আন্দোলন সাংবাদিকদের সঙ্গে ঔদ্ধত্যপূর্ণ আচরণকারী বিএমএ নেতা ফয়সল ইকবাল চৌধুরী এবং উস্কানিদাতা বিএনপি-জামায়াতপন্থী আইনজীবী ডা. খুরশীদ জামিলদের বিরুদ্ধে। দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত চট্টগ্রামের সাংবাদিক-জনতা আন্দোলন চালিয়ে যাবে।’
গত ২৮ জুন জ্বর ও গলা ব্যথা নিয়ে চট্টগ্রামের বেসরকারি ম্যাক্স হাসপাতালে আড়াই বছরের শিশু রাইফাকে ভর্তি করানো হয়। কিন্তু সেখানকার চিকিৎসকদের চরম অবহেলা ও ভুল চিকিৎসার বলি হয়ে ভর্তির ৩০ ঘণ্টা পর মারা যায় রাইফা। এ ঘটনায় তীব্র ক্ষোভ ও প্রতিবাদ ছড়িয়ে পড়ে চট্টগ্রামসহ সারা দেশে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকেও ঝড় উঠে এই ঘটনায়। সবাই এ ঘটনার সুষ্ঠু বিচারের পাশাপাশি দোষী চিকিৎসকদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ এবং ম্যাক্স হাসপাতাল বন্ধের দাবি জানান। সেইসঙ্গে বিএমএ নেতা ফয়সল ইকবালের কঠোর শাস্তির দাবি জানান সবাই।

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

fourteen − 9 =