জঙ্গি ঘাঁটির খোঁজ, উদ্ধার বিস্ফোরক রাসায়নিক পদার্থের ১৭টি ড্রাম

Facebooktwittergoogle_plusredditpinterestlinkedinmail

কুমিল্লার পর এবার ঝিনাইদহ। খোঁজ মিলল আরও এক জঙ্গি ঘাঁটির।  সেই ঘাঁটি গুঁড়িয়ে দিতে শনিবার সকাল থেকে পুলিশের কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি) ইউনিটের সদস্যরা শুরু করে অপারেশন ‘সাউথ প’ (দক্ষিণের থাবা)।

ঝিনাইদহের সদর উপজেলার পোড়াহাটি গ্রামের ঠনঠনেপাড়ায় জঙ্গি ঘাঁটি থেকে বেলা পৌনে ১১টা নাগাদ বিস্ফোরক তৈরির তরল পদার্থ ভরতি ১৪টি ড্রাম উদ্ধার করা হয়। পরে ১২টা নাগাদ একই ধরনের আরও তিনটি ড্রাম পাওয়া যায়। সেই বাড়ি থেকে ১৫টি জেহাদি বইও উদ্ধার করা হয়েছে। পুলিশের খুলনা রেঞ্জের ডিআইজি দিদার আহমেদ জানিয়েছেন, ৩০ লিটারের এই সব কন্টেনারের লেবেলে ‘হাইড্রোজেন পারঅক্সাইড’ লেখা রয়েছে।

বেলা ১২টা থেকে সাড়ে ১২টার মধ্যে ওই বাড়ির ভিতর থেকে বিকট তিনটি শব্দ পাওয়া যায়। ডিআইজি দিদার আহমেদ জানান, বোমা নিস্ক্রিয় করার সময় এই আওয়াজ হয়েছে। ঠনঠনেপাড়ায় ওই বাড়ির আশপাশের ৫০০ গজের মধ্যে ১৪৪ ধারা জারি করা হয়েছে। অভিযান শেষ না হওয়া পর্যন্ত এই নির্দেশ জারি থাকবে বলে জানিয়েছেন ঝিনাইদহের জেলা প্রশাসক মেহবুব আহমেদ তালকুদার। কাউকে ধরা না গেলেও বাড়িতে প্রচুর রাসায়নিক পদার্থ পাওয়া গিয়েছে। মিলেছে কয়েকটা সুইসাইডাল ভেস্টও। বাড়িটিকে নব্য জেএমবির সদস্যরা বোমা তৈরির কারখানা হিসাবে ব্যবহার করত, তা নিয়ে পুলিশ নিশ্চিত।

ঝিনাইদহের পুলিশ সুপার মিজানুর রহমান জানান, দুই ঘরের টিনের এই বাড়ির মালিক আবদুল্লাহ পাঁচ বছর আগে হিন্দু ধর্ম ছেড়ে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করে। গোপন খবরের ভিত্তিতে বাড়িটি ঘেরাও করা হয়। শুক্রবার বিকাল ৬টার দিকেই ঝিনাইদহ সদর উপজেলার পোড়াহাটি গ্রামের আবদুল্লাহর বাড়িকে ‘জঙ্গি আস্তানা’ সন্দেহে ঘিরে ফেলে পুলিশ। বাড়ির মালিক আবদুল্লাহ নিজেও জেএমবির সদস্য। পুলিশের কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি) ইউনিটের ৩০ জন এবং খুলনা রেঞ্জের পুলিশ, পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই), র্যা বসহ নিরাপত্তা বাহিনীর প্রায় ৪০০ সদস্য গোটা বাড়িটিকে ঘিরে রেখেছে।

এদিকে, ‘নব্য জেএমবি’র প্রধান শায়খ আবু ইব্রাহিম আল হানিফ আসলে কে,  আবু ইব্রাহিম জীবিত, নাকি মারা গেছে, সেই সংশয়ের সুরাহা এখনও হয়নি। র্যা ব বলছে, সাভারে তাদের অভিযানে নিহত সারোয়ার জাহানের সাংগঠনিক নাম আবু ইব্রাহিম আল হানিফ। সেই নব্য জেএমবির প্রধান। আর পুলিশের কাউন্টার টেররিজম ইউনিট বলছে, তদন্তে তারা জেনেছে, নিহত সারোয়ার জাহানের সাংগঠনিক নাম শায়খ অসিম আজওয়াদ বিন আবদুল্লাহ। তার আরও এক ছদ্মনাম মানিক। কাউন্টার টেররিজম ইউনিটের কর্তাদের ধারণা, আবু ইব্রাহিম আল হানিফ নামধারী ব্যক্তি এখনও বেঁচে।

সারোয়ারের বাড়ি থেকে জঙ্গিদের বেশ কিছু সাংগঠনিক চিঠি ও কাগজপত্র উদ্ধার করা হয়। এগুলির মধ্যে ছিল নব্য জেএমবি গঠনের একটি ঘোষণাপত্র, যাতে আবু ইব্রাহিম আল হানিফ ও আবু দোজানা নামে দু’জনের সই রয়েছে। আবু দোজানা যে নারায়ণগঞ্জ অভিযানে নিহত তামিম চৌধুরি, তা নিয়ে র্যা ব ও পুলিশের কারও সন্দেহ নেই।

আইএসের আরও এক অনলাইন ম্যাগাজিন রুমাইয়ার এক নিবন্ধেও এর সত্যতা মিলেছে। কিন্তু সারোয়ার জাহান আর আবু ইব্রাহিম আল হানিফ একই ব্যক্তি কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। আবার র্যা ব যে জঙ্গি দলকে বলছে ‘জেএমবির সারোয়ার-তামিম গ্রুপ’, সেই একই দলকে পুলিশের কাউন্টার টেররিজম ইউনিট বলছে ‘নব্য জেএমবি’। অন্যদিকে এই দলটি নিজেদের আইএস দাবি করে গুলশানে হোলি আর্টিজানসহ বিভিন্ন হামলার ঘটনার দায় স্বীকার করেছে। শায়খ আবু ইব্রাহিম আল হানিফ নামটিও এসেছে আইএসের অনলাইন ম্যাগাজিন দাবিক-এ প্রকাশিত এক নিবন্ধে। যাতে বলা হয়েছে, আবু ইব্রাহিম আল হানিফ আইএসের বাংলার খিলাফতের সৈনিকদের প্রধান। ‘নব্য জেএমবি’ বা ‘সারোয়ার-তামিম’ গ্রুপ—যা-ই বলা হোক না কেন, এ জঙ্গি সংগঠনের নেতৃত্ব এখন কার হাতে, সে বিষয়ে কাউন্টার টেররিজম ইউনিট ও র্যা বের কর্তাদের কেউই নিশ্চিত নন।

কাউন্টার টেররিজমের কর্তাদের দাবি, হোলি আর্টিজানে হামলা ঘটনার তদন্ত করতে গিয়ে ওই ঘটনার সঙ্গে যুক্ত হিসাবে অসিম আজওয়াদ বিন আবদুল্লাহ ওরফে মানিক নামে একজনের কথা জানতে পারেন তাঁরা। পরে তাঁরা নিশ্চিত হয়েছেন, নিহত সারোয়ার জাহানই অসিম আজওয়াদ। এখনও পর্যন্ত আবু ইব্রাহিম আল হানিফ নিহত হওয়ার বিষয়ে আইএসের তরফ থেকে কোনও দাবি করা হয়নি। নব্য জেএমবির প্রধান আবু ইব্রাহিম আল হানিফের নাম প্রথম শোনা যায় গত বছর এপ্রিলে। আইএসের অনলাইন সাময়িকী দাবিক-এ তার সাক্ষাৎকার ছাপা হয়েছিল। তবে সেখানে তার আসল পরিচয় প্রকাশ করা হয়নি। ফলে চট্টগ্রাম, সিলেট, মৌলভীবাজার, কুমিল্লা ও ময়মনসিংহে অন্তত সাতটি বাড়িতে জঙ্গিবিরোধী অভিযানের পর বারবার একটাই প্রশ্ন ঘুরে ফিরে আসছে, নব্য জেএমবির প্রধান আবু ইব্রাহিম আসলে কে?

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

one × five =