জননী সাহসিকা, জন্মদিনে সশ্রদ্ধ শ্রদ্ধাঞ্জলি

Facebooktwittergoogle_plusredditpinterestlinkedinmail

কবি সুফিয়া কামাল, ১৯৭৫ সালের ১৫ই আগষ্ট বঙ্গবন্ধুর নৃশংস হত্যাকাণ্ডের পর সম্পূর্ণ বৈরী পরিবেশে সব ভয়ভীতিকে উপেক্ষা করে এ হত্যাকান্ডের প্রতিবাদ করেছিলেন, উল্লেখ্য কি রাজনৈতিক কি বুদ্ধিবৃত্তিক অবস্থান থেকে এ প্রতিবাদে যখন সকলেই নীরব।

”আমি শেখ মুজিবুর রহমানকে তার কিশোর বয়স থেকেই চিনি। জানি। সোহরাওয়ার্দীর সাথে তাকে আমি প্রথম দেখি কলকাতায়। তখন সে ছিল ইসলামিয়া কলেজের ছাত্র। রাজনীতিতে হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর খ্যাতি যখন তুঙ্গে তখন থেকেই তাকে আমি একজন ছাত্রনেতা হিসেবে চিনি।

এই শেখ মুজিবুর রহমান নেতা হিসেবে সারা বিশ্বের মানুষের কাছে পরিচিত ছিলেন কিন্তু আমি তাকে আমার ছোট ভাইয়ের মতোই দেখতাম। শেখ মুজিব আমাকে ‘আপা’ বলে সম্বোধন করেছে। আমি আমার জীবনে অনেকবারই তার কাছাকাছি গেছি এবং তার মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়েছি।

এ ছাড়াও আমরা একই পাড়াতে থাকতাম বলে মুজিবের সঙ্গে আমার পরিচয় ছিল অনেকটা পারিবারিক সম্পর্কের মতো। বছরের বেশীরভাগ সময়ই মুজিব থাকত জেলে। যখনই শুনেছি যে তাকে পুলিশ ধরে নিয়ে গেছে তখনই তার বাড়িতে ছুটে গেছি। বাড়িতে গিয়ে দেখেছি মুজিবের স্ত্রী মুজিবের কাপড়-চোপড়-বিছানা-বালিশ গুছিয়ে জেলখানায় পাঠানোর ব্যবস্থা করছে। তখন আমাকে দেখে সে বলেছে, আপনার ভাই তো জেলে গেছে। এত ধৈর্যশীলা, এত শান্ত, এত নিষ্ঠাবতী মানুষ খুব কমই দেখা যায়।

একুশে ফেব্রুয়ারির সকালে শেখ মুজিবের সাথে পায়ে হেঁটে শহীদ মিনারে গিয়েছি ফুল দিতে। মুজিব আমাকে দেখে বলেছে, আহা ! আমার বোনটা আমার আপাটা এরকম করে হেঁটে যাবে। তারপর সে আমাকে বলত— আপা, আপনি হেঁটে যাবেন না। আপনি রিকশায় যান। আমরা হেঁটে যাই। আমি তখন উত্তরে বলেছি— না ভাই, আমি হেঁটে যেতে পারব। এভাবেই আমি মুজিবের সঙ্গে হেঁটে মিটিংয়ে যোগ দিয়েছি, আন্দোলনে যোগ দিয়েছি।

মুজিব সব সময়ই আমাকে বড় বোনের মতো দেখাশোনা করত। কখনো রাস্তায় দেখা হল সে গাড়ি থামিয়ে বলেছে— আপা শিগ্গির গাড়িতে আসেন। আমি বলেছি— না ভাই, এই টুকুন তো পথ, আমি হেঁটে যেতে পারব।
কিন্তু এর জবাবে মুজিব আবার বলেছে— না, আমি পৌঁছে দিয়ে আসি। কখনো ড্রাইভারকে বলেছে— আমার বোনকে তার বাড়িতে পৌঁছে দিয়ে আসো। আমি মুজিবের বাড়িতে গিয়েছি।

শত মিটিং মিছিল থাকলেও মুজিব এসে প্রশ্ন করত—
আপনি এসে আমাকে খবর দেন কেন? বলত— আপনি সরাসরি আমার কাছে চলে আসবেন। আপনি এসে কেন নীচে বসে থাকেন? আমার বাড়ি আপনার বাড়ি। আমি আপনাকে আমার বড় বোন বলে মনে করি।

মুজিব প্রতিদিন ভোরবেলা তার বাড়ি থেকে আমাদের বাড়ির সামনে দিয়ে রাস্তায় পায়ে হেঁটে চক্কর দিত। একদিন আমাকে দেখতে পেয়ে হাসতে হাসতে বলল— গতকাল আমাদের বাড়িতে পিঠা বানানো হলো। একবার আমার মনে হলো যে আপাকে ডাক দেব নাকি? কিন্তু খুব ভোর ছিল বলে আর আপনাকে ডাক দিলাম না। আমার প্রতি তার আন্তরিকতা ছিল এরকম।

স্বাধীনতার আগে আমার মেয়ের স্বামী আব্দুল কাহহার চৌধুরী চাঁটগা রেডিও’র অফিসার ছিল। একাত্তর সালে তিনি পাকিস্তানী বাহিনীর হাতে নিহত হন। মুজিব দেশে ফেরার পর ‍এ ঘটনা শুনল। আমার মেয়েকে ডাকল।

মুজিব আমাকে বলল— আমার মেয়ে বিধবা হলে যে রকম কষ্ট পেতাম আমি সে রকম কষ্ট পাচ্ছি। আপনার মেয়ে যা চায় আমি তাকে সব দেব। আমি তখন বললাম— মুজিব, এরকম হাজারো মানুষ মারা গেছে, হাজারো নারী বিধবা হয়েছে। আমার জামাইও মারা গেছে। তুমি শুধু তার জন্য একটু দোয়া করো।

মুজিব আবার বলল— আপা, আমি আপনার কাছে হাত জোড় করে বলছি, আপনি বলেন আমি কি সাহায্য করতে পারি? আমি বললাম— ভাই, রক্তের বিনিময়ে আমার মেয়েকে কিছু দিতে হবে না। দেশের হাজারও মেয়ের মতো আমার মেয়েও বিধবা হয়েছে। অনেক বিধবা তো আমার আশ্রয়েই রয়েছে। ওদের জন্য শুধু দোয়া করো।

তারপর যখন মুজিব রাষ্ট্রপ্রধান হলো তখন সে আমাকে বলেছে শুধু একবার এসে আপনি আমাকে দোয়া করে যান। মুজিব গাড়ি পাঠাল আমার কাছে। আমি গেলাম প্রেসিডেন্ট হাউজে। সেখানে এই-ই আমার প্রথম এবং শেষ যাওয়া। ত

থন বাকশাল গঠিত হয়েছে। মুজিব বলল- একজন মানুষ পাচ্ছি না যার উপর আমি বাকশালের ভার দেব। আপা আপনি যদি রাজী হন তাহলে আপনিই বাকশালের সভানেত্রী হয়ে থাকুন। আপনি যে রকম বলবেন সে রকমই হবে। আমি তখন বললাম— ভাই রাজনীতি বুঝি না, আমাকে মাফ করো। আমি তখন আর বাকশালে গেলাম না। কিন্তু যখনই কোনো মিটিং হয়েছে আমি মুজিবের সাথে গিয়েছি।

তারপর মুজিব আমাকে মহিলা আওয়ামী লীগের সভানেত্রী হওয়ার জন্যে অনুরোধ করেছে। সব সময় সে আমাকে সম্মানের পদ দিতে চেয়েছে। উত্তরে আমি বলেছি ভাই, আমি রাজনীতির মধ্যে যেতে পারব না। রাস্তায় নামতে পারব। কিন্তু রাজনীতির কোনো সংশ্রবে আমি থাকব না।

তখন মুজিব বলেছে— আপা, আপনাকে আমি মাথায় রাখব, না আপনার পায়ে হাত দিয়ে সালাম করব? আমি আপনার কাছে মিনতি করছি। জবাবে আমি বলেছি— ভাই আমিও মিনতি করছি।

ধানমণ্ডিতে মুজিবের আগে আসি আমরা। তাকে গ্রেফতারের সময় তার ছেলেমেয়েদের স্কুলে ভর্তি করানো নিয়ে সমস্যা হয়েছে। তার বউ একটা বাড়ি খুঁজে পাচ্ছে না কোথাও। এই দুর্দশার ভেতর দিয়েই মুজিব বাংলার নেতা হয়েছে। মুজিবের ত্যাগের কোনো সীমা নেই। তার নিষ্ঠার কোনো পরিসীমা নেই। দেশকে সে যে কতখানি ভালবাসত তা পরিমাপ করা যাবে না। মানুষের জন্য তার মমত্ববোধ তীব্র ছিল, একটা আত্মার টান ছিল তার। আজকের দিনে তার মতো একজন মানুষ আমি সারা বিশ্বের কোথাও দেখতে পাই না।

তার পলায়নী মনোবৃত্তি ছিল না কখনো। যেখানে সংকট, যেখানে সংগ্রাম, যেখানে সংঘাত দেখেছে ‍মুজিব এসে আগে দাঁড়িয়েছে। মরণকে সে কখনো ভয় করেনি। তার পেছনে জনগণ ‘মুজিব ভাই’ বলে লাফিয়ে পড়ে দেশ স্বাধীন করেছে। মুজিব বিশ্বাস করত যে, বাঙালীরা কখনো তাকে মারতে পারে না। সেই বাঙালীর হাতেই মুজিব নিহত হয়েছে। বাঙালী জাতির সেই গুনাহের, সেই পাপের কবে প্রায়শ্চিত্ত হবে আমি জানি না। মুজিবকে আমি সারা অন্তর দিয়ে এখনো উপলব্ধি করি”।

(১৬ আগস্ট ১৯৯৬ সালে বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে প্রয়াত কবি সুফিয়া কামালের ‘মুজিবকে আমি সারা অন্তর দিয়ে এখনো উপলব্ধি করি’ শিরোনামে একটি লেখা ‘বিচিত্রা’তে প্রকাশিত হয়েছিল।
)

 

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

ten + 13 =