জন্মাষ্টমী উপলক্ষে রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদ ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পৃথক বাণী

Facebooktwittergoogle_plusredditpinterestlinkedinmail

হিন্দু পঞ্জিকা মতে, সৌর ভাদ্র মাসের কৃষ্ণপক্ষের অষ্টমী তিথিতে যখন রোহিণী নক্ষত্রের প্রাধান্য হয়, তখন জন্মাষ্টমী পালিত হয়। হিন্দু পুরাণ মতে বিষ্ণুর অষ্টম অবতার কৃষ্ণ জন্মেছিলেন এই তিথিতে। কৃষ্ণভক্তদের কাছে জন্মাষ্টমীর বিশেষ মাহাত্ম আছে। প্রতি বছরই দেশের বিভিন্ন প্রান্ত ধুমধাম করে জন্মাষ্টমী উদযাপন হয়।এর অপর নাম কৃষ্ণাষ্টমী, গোকুলাষ্টমী, অষ্টমী রোহিণী, শ্রীকৃষ্ণজয়ন্তী ইত্যাদি।

কৃষ্ণের জন্ম হয়েছিল মথুরা নগরীতে অত্যাচারী রাজা কংসের কারাগারে। বসুদেব ও দেবকীর পুত্র তিনি। তার পিতামাতা উভয়েই যাদববংশীয়। দেবকীর দাদা কংস, তাদের পিতা উগ্রসেনকে বন্দি করে সিংহাসনে আরোহণ করেন। একটি দৈববাণীর মাধ্যমে কংস জানতে পারেন যে, দেবকীর অষ্টম গর্ভের সন্তানের হাতে মৃত্যু হবে তার। এই কথা শুনে দেবকী ও বসুদেবকে কারারুদ্ধ করেন তিনি এবং তাদের প্রথম ছয় পুত্রকে হত্যা করেন। দেবকী তার সপ্তম গর্ভ রোহিণীকে প্রদান করলে জন্ম হয় বলরামের। এরপরই জন্মগ্রহণ করেন কৃষ্ণ। কৃষ্ণের জীবন বিপন্ন জেনে জন্মরাত্রেই দৈবসহায়তায় কারাগার থেকে নিষ্ক্রান্ত হয়ে বসুদেব তাকে গোকুলে তার পালক মাতা-পিতা যশোদা ও নন্দের কাছে রেখে আসেন। কৃষ্ণ ছাড়া বসুদেবের আরো দুই সন্তানের প্রাণরক্ষা হয়েছিল। প্রথমজন বলরাম (যিনি বসুদেবের প্রথম স্ত্রী রোহিণীর গর্ভে জন্মগ্রহণ করেন) এবং সুভদ্রা (বসুদেব ও রোহিণীর কন্যা, যিনি বলরাম ও কৃষ্ণের অনেক পরে জন্মগ্রহণ করেন)।

সনাতন ধর্মালম্বীদের বিশ্বাস, পাশবিক শক্তি যখন ন্যায়নীতি, সত্য ও সুন্দরকে গ্রাস করতে উদ্যত হয়েছিল, তখন সেই শক্তিকে দমন করে মানবজাতির কল্যাণ এবং ন্যায়নীতি প্রতিষ্ঠার জন্য মহাবতার শ্রীকৃষ্ণের আবির্ভাব ঘটে। ধর্মগ্রন্থ গীতাও সেই সাক্ষ্য দেয়। শ্রীকৃষ্ণের আশীর্বাদ পেতে এদিন উপবাস রেখে পুজো-অর্চনা করেন অনেকেই।

রাজধানীসহ সারা দেশের বিভিন্ন মন্দিরে পূজা অর্চনা, তারকব্রহ্ম হরিনাম সংকীর্তন ও তারকব্রহ্ম নামযজ্ঞেরও আয়োজন করেছে হিন্দু সমপ্রদায়।

একসময় ঢাকা শহরে জন্মাষ্টমীর যে শোভাযাত্রা বের হতো তা সারা উপমহাদেশে ছিল খ্যাত।বর্তমানে এর ছোঁয়া থাকলেও আগের সেই জৌলুস আর নেই। ইতিহাস লেখক ভুবন মোহন বসাক এবং যদুনাথ বসাকের দুটি বইয়ের তথ্যানুসারে জন্মাষ্টমী উৎসবে শোভাযাত্রার শুরু হয়েছিল ষোড়শ শতকে।

ভুবন মোহনের লেখা বই অনুসারে ইসলাম খাঁর ঢাকা নগরের পত্তনের (১৬১০ সাল) আগে বংশালের কাছে বাস করতেন এক সাধু। ১৫৫৫ সালে (ভাদ্র ৯৬২ বাংলা) তিনি শ্রীশ্রী রাধাষ্টমী উপলক্ষে বালক ও ভক্তদের হলুদ পোশাক পরিয়ে একটি র‌্যালি বের করেছিলেন। এর প্রায় ১০-১২ বছর পর সেই সাধু ও বালকদের উৎসাহে রাধাষ্টমীর কীর্তনের পরিবর্তে শ্রীকৃষ্ণের জন্মোপলক্ষে জন্মাষ্টমীর অপেক্ষাকৃত জাঁকজমকপূর্ণ একটি শোভাযাত্রা বের করার প্রস্তাব অনুমোদিত হয়। সে উদ্যোগেই ১৫৬৫ সালে বের হয় প্রথম জন্মাষ্টমীর শোভাযাত্রা।

পরবর্তীকালে এ মিছিলের দায়ভার এসে বর্তায় ঢাকার নবাবপুরের ধনাঢ্য ব্যবসায়ী কৃষ্ণদাস বসাকের পরিবারের ওপর। কালক্রমে জন্মাষ্টমীর শোভাযাত্রা একটি সাংগঠনিক রূপ ধারণ করে এবং প্রতি বছর জন্মাষ্টমী উৎসবের নিয়মিত অঙ্গ হয়ে দাঁড়ায়। ১০৪৫ বঙ্গাব্দে কৃষ্ণদাসের মৃত্যুর পর থেকে শ্রীশ্রী লক্ষ্মীনারায়ণ চক্রই এ উৎসবের আয়োজন শুরু করেন এবং ধীরে ধীরে জন্মাষ্টমীর শোভাযাত্রাকে উন্নত করে তোলেন। এরপর থেকে নবাবপুরের ধনাঢ্য ব্যক্তিরাও জন্মাষ্টমী উপলক্ষে বের করতে শুরু করে নিজ নিজ শোভাযাত্রা। কালক্রমে যা পরিচিত হয় ওঠে ‘নবাবপুরের মিছিল’ নামে। অষ্টাদশ শতকের গোড়ার দিকে ইসলামপুরের পান্নিটোলার কিছু ব্যবসায়ী ধনাঢ্য হয়ে ওঠে এবং কৃষ্ণের অনুসরণে তারা বের করতে শুরু করেন জন্মাষ্টমীর র‌্যালি।

১৭২৫ সালে জেমস টেলর উল্লেখ করেন, ওই সময় জন্মাষ্টমী পালনের জন্য দুটি পক্ষের সৃষ্টি হয়। নবাবপুর পক্ষকে বলা হতো, লক্ষ্মীনারায়ণের দল আর ইসলামপুর পক্ষকে বলা হতো, মুরারি মোহনের দল। সপ্তদশ শতকে শোভাযাত্রার শুরু হলেও তা বিকশিত হয়েছিল মূলত উনিশ শতকের শেষার্ধে, যে ধারা বলবৎ ছিল বিশ শতকের প্রথমার্ধ পর্যন্ত। প্রথম দিকে র‌্যালিতে নন্দঘোষ, রানী যশোদা, শ্রীকৃষ্ণ ও বলরামকে আনা হতো। ক্রমেই এর সঙ্গে যুক্ত হতে থাকে আরো নানা ধরনের অনুষঙ্গ। তবে মূল কাঠামোটি ছিল প্রথমে নেচে-গেয়ে যাবে কিছু লোক, এরপর দেব-দেবীর মূর্তি, লাঠিসোঁটা, বর্শা, নিশান প্রভৃতি নিয়ে বিচিত্র পোশাক পরিহিত মানুষ, নানা রকমের দৃশ্য। শোভাযাত্রার প্রধান আকর্ষণগুলো ছিল সুসজ্জিত হাতি, ঘোড়া, রঙিন কাগজে মোড়ানো বাঁশের টাট্টি, প্রকাণ্ড প্রকাণ্ড মন্দির, মঠ, প্রাসাদ ও প্রাচীন কীর্তির প্রদর্শন, যা এখন পুরোটাই গল্পকথা।

জন্মাষ্টমী উপলক্ষে রাষ্ট্রপতি অ্যাডভোকেট আবদুল হামিদ ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পৃথক বাণী দিয়েছেন। আজ ঢাকেশ্বরী মন্দিরে দেশ ও জাতির মঙ্গল কামনায় গীতাযজ্ঞ,  রাতে কৃষ্ণপূজা এবং কাল আলোচনা সভা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান হবে।

বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এক বাণীতে হিন্দু ধর্মের সবাইকে আন্তরিক শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন জানিয়েছেন। তিনি বলেন, সকল ধর্মাবলম্বীদের ধর্মীয় উৎসবের মূলবাণী মানুষে মানুষে সম্প্রীতি, সৌহার্দ্য ও শুভেচ্ছাবোধ। ভগবান শ্রীকৃষ্ণও একই উদ্দেশ্যে পৃথিবীতে আবির্ভূত হয়ে জনসমাজে বিরাজমান অন্যায়কে পরাস্ত করে শান্তি ও কল্যাণ স্থাপন করেন। বাংলাদেশেও অশুভ শক্তিকে পরাভূত করে গণতন্ত্রের শুভশক্তির উত্থান ঘটাতে হবে।

সনাতন ধর্মাবলম্বী হিন্দু সম্প্রদায়ের প্রতি আন্তরিক প্রীতি, শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন জানিয়েছেন জাতীয় পার্টি চেয়ারম্যান জি এম কাদের। শুভেচ্ছা বাণীতে তিনি বলেন, বাংলাদেশের শান্তি প্রিয় মানুষ সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির ঐতিহ্য দৃঢ়ভাবে রক্ষা করবে। শ্রীকৃষ্ণের জন্মদিনের উৎসব ও আরাধনা নির্বিঘ্ন করতে জন্মাষ্টমীর দিনটিতে সরকারি ছুটি ঘোষণা করেন এরশাদ। এছাড়াও হিন্দু কল্যাণ ট্রাষ্ট প্রতিষ্ঠা করেছিলেন তিনি। আশা করছি, আগামী দিনে বাংলাদেশে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ও সৌহার্দ্য আরও সুদৃঢ় হবে।

আগের মতো না হলেও, ঢাকায় এখনো জন্মাষ্টমী উৎসব ও শোভাযাত্রা জাঁকজমকপূর্ণভাবে পালিত হয়। বিকাল তিনটায় শুরু হবে জন্মাষ্টমীর শোভাযাত্রা । শোভাযাত্রা ঢাকেশ্বরী জাতীয় মন্দির হয়ে পলাশী বাজার-জগন্নাথ হল-কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার-দোয়েল চত্বর-হাইকোট-জাতীয় প্রেসক্লাব-পল্টন-শহীদ নূর হোসেন স্কয়ার-গোলাপ শাহ মাজার-গুলিস্থান মোড়-নবাবপুর রোড-রায় সাহেব বাজার-বাহাদুর শাহ পার্কে গিয়ে শেষ হবে। র‌্যালির উদ্বোধন করবেন ঢাকা দক্ষিণের মেয়র সাঈদ খোকন। প্রধান অতিথি থাকবেন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের।

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

1 × five =