জবাই করে হত্যার তালিকা বেড়েই চলেছে: গোয়েন্দারা এখনো অন্ধকারে?

Facebooktwittergoogle_plusredditpinterestlinkedinmail

 

দেশের বিভিন্ন স্থানে জবাই করে হত্যার ঘটনায় জঙ্গীদের সম্পৃক্ততার কথা বারবার উঠে এলেও গোয়েন্দারা এখনো এর মূল অপরাধীদের আইনের আওতায় আনতে পারেন নি । গত সোমবার নিজ বাড়িতে নিহত বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (পিডিবি) সাবেক চেয়ারম্যান মুহাম্মদ খিজির খানের হত্যায় জড়িত কাউকে গ্রেফতার করতে পারেননি গোয়েন্দারা। পুলিশের গুলশান বিভাগের উপকমিশনার (ডিসি) এস এম মোস্তাক আহমেদ খান সাংবাদিকদের বলেন, পারিবারিক, সম্পত্তি নিয়ে ও ধর্মীয় মতাদর্শগত বিরোধ এই তিনটি সন্দেহকে সামনে রেখে তাঁরা খিজির খানের হত্যার তদন্ত করছেন।  খিজির খানের হত্যাকারীদের গ্রেপ্তার ও শাস্তির দাবি জানিয়েছে ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশন বাংলাদেশ, বঙ্গবন্ধু প্রকৌশল পরিষদ ও বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন।
খিজির খানের পুত্র আশরাফ আহমেদ বাদী হয়ে মঙ্গলবার  রাত ১২টার দিকে বাড্ডা থানায় মামলা করেন। এতে অজ্ঞাতনামা ছয়-সাতজনকে আসামি করা হয়। গত রাত পর্যন্ত এ ঘটনায় কাউকে গ্রেপ্তার করা হয়নি।
ঢাকা মেডিকেল কলেজ মর্গে ময়নাতদন্ত শেষে খিজির খানের লাশ গতকাল রাজধানীর আবদুল গণি রোডে বিদ্যুৎ ভবনের সামনে নেওয়া হয়। সেখানে বাদ জোহর তাঁর প্রথম জানাজা হয়। এরপর বাড্ডায় তাঁর বাসার কাছে বাদ আসর আরেক দফা জানাজা হয়। পরে লাশ দাফনের জন্য কুষ্টিয়ার দৌলতপুরের ফিলিপনগরে তাঁর গ্রামের বাড়িতে নেওয়া হয়।

গোয়েন্দারা তদন্তে নেমে  খিজির খানের হত্যার সাথে ২০১৪ সালের  ২৭ আগস্ট জনপ্রিয় টিভি উপস্থাপক মাওলানা নুরুল ইসলাম ফারুকীর হত্যা, ২০১৩ সালে  ইমাম মাহদীর প্রধান সেনাপতি দাবিদার লুৎফর রহমানসহ ছয় হত্যা  এবং গত  সেপ্টেম্বর মাসে চট্টগ্রামে ল্যাংটা ফকির রহমতউল্লাসহ দু’জন হত্যার যথেষ্ট  মিল রয়েছে বলে  মনে করছেন গোয়েন্দারা। এসব হত্যার দায়ে  সন্দেহ করা হচ্ছে ধর্মীয়  জঙ্গী সংগঠন গুলোকে।
গত সোমবার চট্টগ্রামে গ্রেপ্তার হওয়া জামাআতুল মুজাহিদিন বাংলাদেশের (জেএমবি) পাঁচ জঙ্গির একজন সুজন ওরফে বাবু প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে চট্টগ্রামে ল্যাংটা পীর হত্যায় জড়িত থাকার কথা স্বীকার করেছে বলে চট্টগ্রাম নগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) অতিরিক্ত উপকমিশনার বাবুল আক্তার সূর্যবার্তা টোয়েন্টিফোর ডটকমকে জানিয়েছেন। এর পর সোমবার রাতে ঢাকার মধ্য বাড্ডায় খিজির খানকে হত্যার ঘটনায়ও জঙ্গিগোষ্ঠীকে সন্দেহ করা হয়েছে।
গত ৪ সেপ্টেম্বর দুপুরে চট্টগ্রাম নগরের আকবর টিলা এলাকায় ‘ল্যাংটা ফকিরের মাজারে’ রহমতউল্লাহ ওরফে ল্যাংটা ফকির (৫৫) ও তাঁর খাদেম আবদুল কাদেরকে (৩০) দুর্বৃত্তরা জবাই করে হত্যা করে। এত দিন এই হত্যার কোনো সূত্র খুঁজে পায়নি পুলিশ।
চট্টগ্রাম নগর পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার (অপরাধ ও অভিযান) দেবদাস ভট্টাচার্য বলেন, আটক জেএমবি সদস্য সুজন ওরফে বাবু জিজ্ঞাসাবাদে ল্যাংটা ফকিরকে হত্যায় জড়িত থাকার কথা স্বীকার করেছে। নিজেকে এক ট্রাকচালকের ‘সহকারী’ দাবি করে সুজন বলেছে,‘ইসলামি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার’ লক্ষ্যে জেএমবিতে যোগ দিয়েছে সুজন। ‘শরিয়তবিরোধী কাজে লিপ্ত থাকায়’ তারা ল্যাংটা ফকির ও খাদেমকে খুন করেছে।তার  দাবি, ফারদিন নামে তাদের এক ‘বড় ভাই’ য়ের নির্দেশে ল্যাংটা ফকিরকে খুন করেছে তারা। পুলিশি হেফাজতে সুজন নিজেই সাংবাদিকদের কাছে হত্যার বর্ণনা দেয়। ঘুমন্ত ল্যাংটা ফকিরকে খুন কআর সময়ে তার চিৎকারে খাদেম জেগে উঠলে খাদেমকেও  কুপিয়ে হত্যা করে সুজন। সুজনের তথ্যের ভিত্তিতে পুলিশ মঙ্গলবার বিকেলে ঘটনাস্থলের পাশে একটি নর্দমা থেকে ল্যাংটা ফকিরকে হত্যায় ব্যবহৃত একটি দা এবং সুজনের ভাড়া বাসা থেকে রক্তমাখা টি-শার্ট উদ্ধার করেছে।
ল্যাংটা ফকির হত্যার মতো করেই ২০১৪ সালের  ২৭ আগস্ট রাতে ঢাকার পূর্ব রাজাবাজারের বাসায় ঢুকে বেসরকারি টিভি চ্যানেলের ধর্মীয় অনুষ্ঠানের উপস্থাপক নুরুল ইসলাম ফারুকীকে জবাই করে দুর্বৃত্তরা। এ ঘটনায় শেরেবাংলা নগর থানায়  মামলা দায়ের করা হয়।মামলাটি তদন্ত করছে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ। ফারুকীর পরিবারের সন্দেহ জঙ্গীরাই  ফারুকীকে হত্যা করেছে। মামলার তদন্ত-তদারক কর্মকর্তা ডিবির অতিরিক্ত উপকমিশনার আশিকুর রহমান বলেন, তদন্ত চলছে ,তবে তাঁদেরও সন্দেহ জঙ্গীরাই এ হত্যাকান্ড ঘটিয়েছে।
২০১৩ সালের ২১ ডিসেম্বর রাতে ঢাকার গোপীবাগের বাসায় দুর্বৃত্তরা ইমাম মাহদির প্রধান সেনাপতি দাবিদার লুৎফর রহমান ফারুক, তাঁর বড় ছেলে ও চার অনুসারীকে জবাই করে হত্যা করে। এ সময় তাঁর পরিবারের নারী সদস্যদের জিম্মি করে একটি কক্ষে আটকে রাখা হয়েছিল। একই ভাবে সোমবার রাতে খিজির খানের পরিবারকে জিম্মি করেছিল খুনিরা।
তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলেন, লুৎফর হত্যায়ও তাঁদের সন্দেহ উগ্রপন্থীদের দিকে। এ ঘটনায় ইতিপূর্বে জেএমবির চার সদস্যকে রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে। জেএমবির চার সদস্যকে ভিন্ন ঘটনায় গ্রেপ্তার করা হয়েছে।

বুধবার সকাল সাড়ে নয়টায় স্থানীয় ফিলিপনগর মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের মাঠে খিজির খানের জানাজার পর বাড়ির পাশে নুরি খানকাহ শরিফে তাঁর  বাবা রহমতুল্লাহর কবরের পাশে তাঁকে দাফন করা হবে বলে পারিবারিক সূত্র জানিয়েছে।
বাবার মৃত্যুর পর নিজে পীর হন খিজির খান। তাঁর মুরিদ মাহবুবুর রহমান ও স্থানীয় লোকজন বলেন, খিজির খানের বাবা রহমতুল্লাহ পেশায় সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক ছিলেন। ১৯৪২ সালে চট্টগ্রামের সৈয়দ হাবিবুল্লাহ পীরের মুরিদ হন তিনি। এরপর একই বছর ফিলিপনগর গ্রামে পদ্মা নদীর পারে নুরি খানকাহ শরিফ গড়ে তোলেন। ১৯৯০ সালের দিকে রহমতুল্লাহ মারা গেলে ছেলে খিজির খান পীর হিসেবে বাবার স্থলাভিষিক্ত হন। পরে খিজির খান ঢাকার বাড্ডায় নিজ বাড়ির দোতলায় খানকাহ শরিফ গড়ে তোলেন। দেশের বিভিন্ন স্থানে এ রকম আরও বেশ কয়েকটি খানকাহ শরিফ রয়েছে। তাঁর মুরিদের সংখ্যাও অনেক।

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

10 + 8 =