জলবায়ু পরিবর্তন ঝুঁকি :গুণগত উদ্যোগ ও বরাদ্দ বাড়াতে হবে বাজেটে

Facebooktwittergoogle_plusredditpinterestlinkedinmail

জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি ও ক্ষতি মোকাবেলায় সরকারের বাজেটে বরাদ্দ পর্যাপ্ত নয়। আবার যে বরাদ্দ দেয়া হচ্ছে তার প্রভাব ও গুণগত বর্ণনা নেই বাজেট দলিলে। ফলে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবেলা কঠিন হচ্ছে বাংলাদেশের জন্য। এতে বেশি ক্ষতির মুখে পড়ছে প্রান্তিক জনগোষ্ঠী।

রবিবার সকালে ঢাকার জাতীয় প্রেসক্লাবে একশনএইড বাংলাদেশ এবং ইন্টারন্যাশনাল সেন্টার ফর ক্লাইমেট চেইঞ্জ এন্ড ডেভেলপমেন্ট ‘জলবায়ু বাজেট’নিয়ে এক সাংবাদিক সম্মেলনে এমন পর্যবেক্ষণ তুলে ধরে।

সাংবাদিক সম্মেলনের শুরুতেই ‘জাতীয় বাজেটে জলবায়ু অর্থায়নঃ আমরা কোন অবস্থানে আছি?’ শিরোনামে একটি বিশ্লেষণপত্র তুলে ধরেন একশনএইড বাংলাদেশের জলবায়ু সহনশীলতা ও ন্যায্যতা বিভাগের প্রধান তানজির হোসেন।

বিশ্লেষণপত্রে বলা হয়, বাংলাদেশ দেশীয় প্রবৃদ্ধির হার স্থিতাবস্থায় রয়েছে। কিন্তু জলবায়ু পরিবর্তনজনিত কারণে এই প্রবৃদ্ধির হার হ্রাস পেতে পারে এবং উন্নয়ন কর্মকান্ড বাধাগ্রস্ত হতে পারে। কারণ বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তনের প্রতিকূল প্রভাবে ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলির মাঝে প্রথমদিকে। গত বছর ভয়াবহ বন্যার কারণে দেশের অর্থনৈতিক এবং অবকাঠামোগত ক্ষতিসহ কৃষিক্ষেত্রে শস্য ও স্বাদুপানির মাছ উৎপাদনে মারাত্মক ক্ষতি হয়েছে। এ বছর আগাম মৌসুম ও প্রবল বর্ষার জন্য পর্যাপ্ত প্রস্তুতি না থাকার কারণে কৃষি উৎপাদনে আবারো ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।

সংবাদিক সম্মেলনের আয়োজক একশনএইড বাংলাদেশ-এর কান্ট্রি ডিরেক্টর ফারাহ্ কবির বলেন, “বাংলাদেশে জলবায়ুর দ্রুত পরিবর্তন হচ্ছে। এর প্রভাব প্রকট থেকে প্রকটতর হচ্ছে। সম্প্রতি সময়ে বন্যা, আগাম বৃষ্টি ও নানা প্রাকৃতিক পরিবর্তন তার প্রমাণ। ফলে বাংলাদেশের কৃষি, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে এর মারাত্মক প্রভাব পড়ছে। জলবায়ু ঝুঁকি ও ক্ষতি কমাতে তাই সরকারকে বাজেটে সুনির্দিষ্ট বরাদ্দ বাড়াতে হবে। শুধু ত্রাণ দিয়ে তো আর দায়িত্ব শেষ করা যাবে না। আগাম বর্ষা ও বন্যা কেন হচ্ছে সেই জায়গা কাজ করতে হবে।”

সাংবাদিক সম্মেলনে বাংলাদেশ সরকার জলবায়ু সংবেদনশীল বাজেট বিশ্লেষণের যে প্রথম প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে তাকে স্বাগত জানায় আয়োজকরা। এই প্রতিবেদনে সরকার ৬টি নির্ধারিত মন্ত্রণালয়ের একটি জলবায়ু প্রাসঙ্গিক রূপরেখা প্রণয়ন করেছে এবং দেখা গেছে ২০১৪-২০১৫ অর্থবছরের তুলনায় ২০১৭-১৮ উন্নয়ন বাজেটে ৪.৪ শতাংশ বরাদ্দ বৃদ্ধি পেয়েছে। সামগ্রিকভাবে ২০১৭-১৮ অর্থবছরে এই ৬টি মন্ত্রণালয়ের মোট ৭৬ হাজার কোটি টাকা বাজেটের মধ্যে সরাসরি জলবায়ু সংক্রান্ত বরাদ্দ ছিল ১৯.২০% (যা প্রায় ১৪.৫ হাজার কোটি টাকা)। তবে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবেলায় এই বরাদ্দ যথেষ্ট নয়।

আয়োজকরা বিশ্লেষণপত্রে বলেন, গবেষণা ও বিভিন্ন পূর্বাভাস অনুযায়ী আগামীতে ২ ডিগ্রি সেলসিয়াস-এর বেশি বৈশ্বিক তাপমাত্রা বৃদ্ধি পেতে পারে। বাংলাদেশে এর ফলে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে এবং হবে। এ কারণে সামগ্রিক ক্ষয়ক্ষতি সহনীয় পর্যায়ে রাখতে এ বিষয়ক জাতীয় কাঠামো ও প্রস্তুতি গঠন অপরিহার্য হয়ে পড়েছে। একইসাথে দুর্যোগ কবলিত জনগণের সুরক্ষা এবং জলবায়ু সহনশীলতা বৃদ্ধি করতে বাজেটে অর্থ বরাদ্দ করতে হবে।

ইন্টারন্যাশনাল সেন্টার ফর ক্লাইমেট চেইঞ্জ এন্ড ডেভেলপমেন্ট-এর পরিচালক ড. সালিমুল হক বলেন, “জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবেলায় আন্তর্জাতিক অর্থের উপর নির্ভর করলে চলবে না। আমাদের নিজেদের যে অর্থ এবং সম্পদ আছে সেগুলো জলবায়ু সহনশীল করতে হবে। আবার যে ব্যয় করা হচ্ছে তার কার্যকারিতা নিয়ে আমাদের জানা দরকার। শুধু ব্যয় করলে হবে না। ব্যয় করে যদি কাজে না লাগে তাহলে কোন লাভ হবে না। দেখতে হবে যে এই টাকা জনগণের কল্যাণে ব্যয় হচ্ছে কিনা। যারা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ তাদের কাজে লাগছে কিনা।”

তিনি আরো বলেন, “জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব মোকাবিলায় সরকারের সব মন্ত্রণালয়কে একসঙ্গে কাজ করতে হবে। আমরা শুধু উন্নয়ন চাই না, জলবায়ু সহনশীল উন্নয়ন চাই। এজন্য আমাদের একসঙ্গে কাজ করতে হবে। জোড় গিতে হবে গবেষণায়।”

সাংবাদিক সম্মেলনে জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবেলায় সরকারের বিভিন্ন উদ্যোগের কথা তুলে ধরেন আয়োজকরা।

সরকার জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবেলায় বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তন কৌশল ও কর্মপরিকল্পনা (বিসিসিএসএপি) গ্রহণ করেছে। সেই প্রেক্ষিতে বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তন ট্রাষ্ট (বিসিসিটি) তৈরি করা হয়েছে বলে সাংবাদিক সম্মেলনে বলা হয়। বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তন ট্রাষ্ট ফান্ড (বিসিসিটিএফ) শিরোনামে একটি তহবিল গঠন করা হয়েছে এবং ২০১২ সালে সরকার ‘রাষ্ট্রীয় খাতে জলবায়ু পরিবর্তনজনিত ব্যয় এবং প্রাতিষ্ঠানিক পর্যালোচনা’ (সিপিইআইআর) করেছে। তবে বাস্তবতা হলো বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে যে ঝুঁকিতে আছে সে অনুযায়ী আর্থিক ও গুণগত উদ্যোগ বাজেটে কম।

নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ বিজ্ঞান ও ব্যবস্থাপনা বিভাগের অধ্যাপক মিজান আর খান বলেন, “জলবায়ু বিষয়ক সরকারি প্রতিবেদনে ২০০৯ থেকে ২০১৩ পর্যন্ত শুধু বরাদ্দের কথা বলা হয়েছে। কিন্তু কিভাবে খরচ হয়েছে তা প্রতিবেদনের কোথাও উল্লেখ করা নেই। প্রতিবেদনে দেখা যায়, ৫০ থেকে ৫২ শতাংশ বাজেট দক্ষতা বৃদ্ধির জন্য খরচ করা হয়েছে। কিন্তু কি ধরনের দক্ষতা বৃদ্ধির জন্য খরচ করা হয়েছে তা কিন্তু পরিষ্কার নয়। আমাদের এই বিষয়গুলো সম্পর্কে সচেতন হতে হবে।”

তিনি আরো বলেন, “রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে কিভাবে অর্থায়ন বাড়ানো যায় সেটা ভেবে দেখার সময় এসেছে। তাই জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবেলায় আমাদের এই বাজেট বিকেন্দ্রীকরণ করতে হবে। শুধু ঢাকা ও মন্ত্রণালয়ে বসে বাজেট করলে হবে না। এই বাজেট যাতে বিকেন্দ্রীকরণ হয় সেটা দেখতে হবে। আর স্থানীয় সরকার যাতে নিজস্ব সম্পদ উৎপাদন করতে পারে সেটাও দেখতে হবে।

সংবাদ সম্মেলনে কিছু সুপারিশ তুলে ধরেন আয়োজকরা। যেখানে বলা হয়, জলবায়ু বাজেটের যথাযথ ব্যাখ্যা দেয়ার পাশাপাশি যে সকল মন্ত্রণালয় ও প্রকল্পসমূহ জলবায়ু অর্থায়নের তালিকায় রয়েছে, তার যথাযথ বিশ্লেষণ জরুরি। তা না হলে এই বরাদ্দ বা কাজের প্রভাব বোঝা যাবে না। ভবিষ্যৎ করনীয় নির্ধারন কঠিন হবে।

জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবেলায় মানবসম্পদ ও প্রযুক্তিগত উন্নয়ন খুবই জরুরি। এবং এই খাতে পর্যাপ্ত বিনিয়োগ করতে হবে। পাশাপাশি অর্জিত উন্নয়ন রক্ষা জন্য তথা দুর্যোগ ঝুঁকি হ্রাসে বিনিয়োগ বৃদ্ধি করা বর্তমানে সবচাইতে বেশি দরকার। একইসাথে সামাজিকভাবে গ্রহণযোগ্য এবং প্রযুক্তিগতভাবে বাস্তবসম্মত সমাধানের জন্য গবেষণা ও উন্নয়ন খাতে আরও বেশি বরাদ্দ রাখতে হবে। এ সকল গবেষণায় কেবলমাত্র প্রযুক্তি ও ব্যবস্থাপনাগত সমাধান নয় বরং মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি বিবেচনায় রাখতে হবে।

সুপারিশে আরো বলা হয়, দুর্যোগ ও জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবেলায় ত্রাণ বিতরণ, দুর্যোগে সাড়া প্রদান এবং উদ্ধার কার্যক্রমে বরাদ্দ বৃদ্ধির চেয়ে তৃণমূল পর্যায়ে প্রস্তুতিতে আরও বেশি দৃষ্টি দেয়া উচিত। সবকিছু বিবেচনায় নিয়ে ক্রমবর্ধমান জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবেলায় প্রতি অর্থবছরে জলবায়ু বাজেটে ৫ শতাংশ হারে বরাদ্দ বৃদ্ধির কথা বলেন আয়োজকরা।

আয়োজকরা বলেন, দারিদ্র্যপীড়িত ও জলবায়ু ঝুঁিকপ্রবণ জেলাগুলোকে অগ্রাধিকার দিয়ে জেলাভিত্তিক একটা তহবিল কাঠামো গঠন করা উচিৎ। এটি করা গেলে জলবায়ু পরিবর্তনজনিত প্রভাব মোকাবেলায় নারী, শিশু ও তরুণ-তরুণীদের দক্ষতা বৃদ্ধি করা যাবে। পাশাপাশি সেখানে গ্রামীণ ও উপশহর পর্যায়ে পরিবেশবান্ধব কর্মসংস্থানের বিষয়ে বাজেটে সুনির্দিষ্ট দিক-নির্দেশনা থাকা উচিত।

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

three × 2 =