জামাতের ভোট রাজনীতির বলি -আর কতো নিরীহ প্রাণ? বিচার দাবি করছি-এখলাসুর রহমান

Facebooktwittergoogle_plusredditpinterestlinkedinmail

চট্টগ্রামের সাতকানিয়ায় ইফতার পণ্য নিতে গিয়ে পদদলিত হয়ে মারা গেছে ১০ নারী ও ১টি শিশু। এ ঘটনায় আরও ৫০ জন আহত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে।কবির স্টিল রি রোলিং মিলস বা কেএসআরএম এর ইফতার পণ্য নিতে এসে এ ঘটনা ঘটে। ২০১৮ সালের ১৪ মে এ ঘটনা ঘটে। একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে আগে এ ঘটনা ঘটল। অনুরূপ একটি ঘটনা ঘটেছিল ২০০৮ সালে। সে সময়টাও ছিল নির্বাচনের বছর। তখন পদদলিত হয়ে ৭ জন হতদরিদ্র মানুষ প্রাণ হারিয়েছিল।এবার আরও ৪ জন বাড়লো। মোট হলো ১৮ জন। কবির স্টিল রি রোলিং মিলস বা কেএসআরএম এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক শাহজাহান কবির তার বাড়ির পার্শ্ববর্তী একটি মাদ্রাসা মাঠে ইফতার পণ্য বিতরণকালে পদদলিত হয়ে এবার এই ১১ জন মানুষের প্রাণহানি ঘটে। পুলিশ বলছে বিতরণকারীদের ব্যবস্থাপনায় দুর্বলতা ছিল। দোষীদের বিরুদ্ধে আইনী ব্যবস্থা নেয়া হবে।

২০০৮ সালে ৭ জন মানুষের মৃত্যুর ব্যাপারে কী আইনী ব্যবস্থা নেয়া হয়েছিল। সেদিনের এই মৃত্যুর বিষয়ে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হলে এবারের এই অপমৃত্যুর ঘটনা ঘটতো? পদদলনে মৃত্যুর ঘটনা ঘটার পরেও তারা বিতরণ অব্যাহত রাখে। কে এই শাহজাহান কবির? কী তার পরিচয় ও কী তার উদ্দেশ্য?

শাহজাহান কবির যে সংসদীয় এলাকার বাসিন্দা সে আসনের এমপি ছিলেন জামায়াতে ইসলামীর ভারপ্রাপ্ত আমীর আ.ন.ম শামসুল ইসলাম। দুজনের মধ্যে ঘনিষ্ট সম্পর্ক বিদ্যমান। ২০০৮ সালে শাহজাহান কবির ইফতার পণ্য বিতরণ করে ভোটারদের মাঝে নিজের প্রভাব সৃষ্টি করে নির্বাচনে জামাত নেতা আ.ন.ম শামসুল ইসলামকে জিতিয়েছিলেন। তিনি সুকৌশলে নিজেকে দানশীল ব্যক্তি হিসাবে প্রতিষ্ঠিত করে ভোটারদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে থাকেন।

নির্বাচনের সময় কোন প্রার্থীর পক্ষে ভোট আহবান খুবই প্রভাব ফেলে। এই প্রভাবেই ২০০৮ সালে জামাত নেতাকে বিজয়ী করেন। আসন্ন একাদশ সংসদ নির্বাচনেও শাহজাহান কবিরের এটি একটি পরিকল্পিত প্রক্রিয়াই নয় কি?এব্যাপারে জামায়াতে ইসলামীর চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা আমীর মোহাম্মদ ইসমাঈলের একটি উক্তি এখানে উল্লেখ করা যায়। তিনি বলেন, শাহজাহান কবির একজন দানশীল ব্যক্তি। তার সঙ্গে সবার সম্পর্ক আছে। আমাদেরও আছে।

জামাতের নেতার কথা সত্য হলে এটা পরিস্কার যে সবার সাথে সম্পর্ক থাকলেও সবার জন্য তিনি ভোট চান না। ভোট চান জামাতের জন্য। এবারও জামাত নেতাকে জেতাতেই হয়তো তিনি নিজের দানশীলতার জাল ফেলেছিলেন।
দানশীলের দানের কোন নির্দিষ্ট সময় থাকেনা। তিনি দান করেন দানের প্রয়োজনেই। শাহজাহান কবিরের দানের ইচ্ছা জেগে ওঠে জাতীয় নির্বাচনের আগে। ২০০৫-৬-৭ সালে  কি রোজা ছিলোনা?এবার ২০১৮ তে এসে আবার দানের ইচ্ছা জেগে উঠল!কেন ২০১৫/১৬/১৭তে রোজা ছিলো না?নির্বাচনের আগে আগেই কেন তার দানের ইচ্ছা জেগে ওঠে?এর পেছনে কি আমাদের হাভাতে চরিত্রটাকে বিশ্ব দরবারে তুলে ধরে বাংলাদেশ মধ্যম আয়ের দেশ এই আইডিয়াকে ব্যঙ্গ করা নয়?

কেএসআরএমের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মেহেরুল করিম বলেন, আমরা যত যা-ই বলি, দেশে কিন্তু ক্রমশ দরিদ্র মানুষের সংখ্যা বাড়ছে। ফলে আমরা ইফতার সামগ্রী দিতে হিমশিম খাই। তিনি এব্যাপারে আইনশৃংখলা বাহিনীকেও দায়ী করেন। তারা মহিলা পুলিশ দাবি করেছিলেন। থানা পুলিশকে চিঠিও দিয়েছিলেন। আয়োজকরা এ ও বলেছে যে, হতাহতের ঘটনা ঘটতে পারে, তা তারা আগেই আঁচ করতে পেরেছিল। তাই ইফতার পণ্য বিতরণের আগে কেএসআরএমের পক্ষ থেকে তিনটি এম্বুলেন্স প্রস্তুত রাখা হয়েছিল। এর নেতৃত্বে ছিলেন কেএসআরএমের প্রধান চিকিৎসক ডা. মিসবাহ উদ্দীন আহমেদ। কিন্তু সকালে ইফতার পণ্য বিতরণ শুরুর পর সেই চিকিৎসক দলকে সেখানে খুঁজে পাওয়া যায়নি। তারা হতাহতের সাহায্যার্থেও কিছুই করেননি। কেন করেননি?কে এই মেসবাহ উদ্দীন আহমেদ। তার সঙ্গে আর কারা কারা ছিলেন?কী উদ্দেশ্য ছিল তাদের?

এসব খুঁজে বের করতে হবে।চট্টগ্রামের সাতকানিয়ার হাঙ্গরমুখ গ্রামে চলছে স্বজন হারাদের আহাজারি। এটাকে স্রেফ দুর্ঘটনা বলে হেলাফেলা করা উচিত নয়। যেখান থেকে মধ্যম আয়ের দেশ বলে অনেক এনজিওরা গুটিয়ে যাচ্ছে।সেখানে ইফতার পণ্য জোগার করতে যেয়ে পদদলিত হয়ে প্রাণহানি!এতে কি মধ্যম আয়ের দেশের গর্বও পদদলিত হলো না?এতে কি বাংলাদেশ বিশ্ব দরবারে বুভুক্ষু ও হাভাতে জাতি হয়ে উঠলো না?পদ্মাসেতু, বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট, ফ্লাইওভার, মেট্রোরেল, ঘরে ঘরে বিদ্যুৎ, হাতে হাতে মোবাইল, ফেসবুক, টুইটার তথা ইন্টারনেট প্রযুক্তির অবাধ তথ্য প্রবাহ প্রভৃতি কি উন্নয়নের ধাপ নয়? আজ থেকে বিশ বছর আগে কি এগুলো কারও ভাবনায় ছিল?
দেশ ও জাতির আত্মসম্মান নষ্টের সুচতুর পরিকল্পনা নিয়েই হয়তো ইফতার পণ্য নিতে আসা বুভুক্ষু নরনারী ও শিশুদের পদদলিত হয়ে অপমৃত্যুর দৃশ্যের দৃশ্যায়নের সৃষ্টি। নইলে আয়োজকরা আগে হতেই এই হতাহতের ঘটনার খবর কিভাবে জানতো? কেন তারা আগাম অ্যাম্বুলেন্সও রেডি রেখেছিল? ঘটনাটি যে অপ্রত্যাশিত কিংবা অনাকাঙ্ক্ষিত বা আকস্মিক কিছু যে নয় তা নিশ্চিত। সবকিছু জেনেও আয়োজকরা কেন এই অপমৃত্যু প্রতিরোধে সর্বশক্তি নিয়োগ করলো না? এখন তারা পুলিশকে দায়ী করছে। পুলিশতো জানতো না এমন ঘটনা ঘটবে। তারা যেহেতু জানতো পুলিশকে তা জানাতে কেন তৎপর হলোনা তখন? ২০০৮ সালে ইফতার পণ্য বিতরণকালে পদদলিত হয় ৭ জনের মৃত্যু হলে বিতরণ বন্ধ করে দেয়া হয়।কিন্তু ২০১৮ সালে পদদলনে ১১ জনের মৃত্যু ঘটলেও আয়োজকরা বিতরণ বন্ধ করেনি। বন্ধ হলো চট্টগ্রাম জেলা পুলিশ সুপারের নির্দেশে। চট্টগ্রাম জেলা পুলিশ সুপার বলেন, পদদলনের পরও বিতরণ অব্যাহত রাখলে আরও প্রাণহানির ঘটনা ঘটতে পারতো। এ আশঙ্কা থেকে আমরা তাৎক্ষণিকভাবে তা বন্ধের নির্দেশ দিই। এক্ষেত্রে তা বন্ধের নির্দেশ না দিলে কি মৃতের সংখ্যা আরও বাড়তো না? আয়োজকরা কি তা-ই চেয়েছিল?
কেএসআরএম ঢাকঢোল পিটিয়ে মানুষকে ইফতার পণ্য নিতে ছুটে আসতে বাধ্য করে। লোকজন জড়ো হলে আয়োজকরা ইফতার সামগ্রী বিতরণকে অহেতুক বিলম্বিত করতে থাকে। ফলে অপেক্ষমান মানুষদের ঘটে ধৈর্যচ্যুতি। আগের রাত থেকে অপেক্ষমান মানুষদের অনেকেই ছিলেন অভূক্ত? এতবড় একটা আয়োজন নিয়ে কেন খামখেয়ালি করল কেএসআরএম? মানুষকে ডেকে নিয়ে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেয়া কি কোন মানবিক কাজ হলো? কেএসআরএম কেবল ১৮ জন মানুষ হত্যা করেনি। সে হত্যা করেছে আমাদের জাতিগত আত্মমর্যাদা। এর বিচার হওয়া উচিত। সে আমাদের বিশ্ব দরবারে হাভাতে জাতি হিসেবে তুলে ধরেছে। হয়তো এর পেছনে রয়েছে সুচতুর কূটচাল ও পরিকল্পনা। আমরা হা-ভাতে নই, তাই এই হা-ভাতে পরিচয়দানকারীর দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চাই।

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

12 + 16 =