জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মুজাহিদের চূড়ান্ত রায় আজ

Facebooktwittergoogle_plusredditpinterestlinkedinmail

Mujahid-jamayat_55659bd82faf4

সুমি খান: একাত্তরে মানবতাবিরোধী অপরাধে মৃত্যুদণ্ডাদেশ পাওয়া জামায়াতে ইসলামী বাংলাদেশের সেক্রেটারি জেনারেল  আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদের আপিলের রায় ঘোষণা হবে মঙ্গলবার। একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে সাংবাদিক, শিক্ষকসহ বুদ্ধিজীবী হত্যা এবং সাম্প্রদায়িক হত্যা-নির্যাতনের দায়ে ২০১৩ সালের ১৭ জুলাই আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মুজাহিদকে মৃত্যুদণ্ড দেয়।অপহরণ, নিযার্তন ও হত্যাসহ মানবতাবিরোধী অপরাধের সাতটি অভিযোগের মধ্যে পাঁচটি ঘটনায় আলবদর বাহিনীর প্রধান মুজাহিদের সংশ্লিষ্টতা ট্রাইব্যুনালে প্রমাণিত হয়। বাংলাদেশে ২০০১ থেকে ২০০৫ সালে বিএনপি জামায়াত  চার দলীয় জোট সরকারের সমাজকল্যাণ মন্ত্রী মুজাহিদ একাত্তরে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানি বাহিনীকে সহযোগিতা করতে  পাকিস্তান সরকারের  তৈরি আলবদর বাহিনীর কমান্ডার ছিলেন এবং  কুখ্যাত বদর বাহিনীর ওপর আলী আহসান মুজাহিদের ‘কার্যকর নিয়ন্ত্রণ’ ছিল বলে  উল্লেখ করা হয় আন্তর্জাতিক অপরাধ  ট্রাইব্যুনালের রায়ে।২০১০ সালে যুদ্ধাপরাধের বহু প্রতীক্ষিত বিচার শুরুর পর এটি চতুর্থ মামলা, আপিল আদালতে যার রায় হতে যাচ্ছে।

বাংলাদেশের অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম  সূর্যবার্তা টোয়েন্টিফোর ডটকম কে বলেন, তিনি আশা করছেন, সর্বোচ্চ আদালতেও  আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের রায় বহাল থাকবে। এ ব্যাপারে এটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম  আরো বলেন, “ একাত্তরে আমাদের দেশের বুদ্ধিজীবি , সাংবাদিকদের যেভাবে হত্যা করা হয়েছে, তার দৃষ্টান্ত সারা বিশ্বে নেই। খুব কষ্ট হয় ভাবতে, ‘ আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারী, আমি কি ভুলিতে পারি?’-এমন অমর গানের সুরকার আলতাফ মাহমুদ সহ অনেক বুদ্ধিজীবি, সাংবাদিকদে পরিকল্পিত ভাবে হত্যা করা হয়েছে ।আমরা নানা রকম কাগজ-পুস্তক ও মৌখিক সাক্ষ্য দিয়ে প্রমাণ করার চেষ্টা করেছি, যাতে আমরা সার্থক হয়েছি।তিনি হতাশা এবং বেদনার সাথে বলেন, মুজাহিদের মতো বর্বর ঘাতক বা তার অনুসারীদের সম্পর্কে কী বলা যায়? এখন আল-কায়দা এবং তার অঙ্গ সংগঠন গুলো যা করছে ১৯৭১ সালে পাকিস্তান সরকারের নিয়োগকৃত ঘাতক বাহিনী আলবদর আল শামস এবং রাজাকার বাহিনীর ব্যানারে  মুজাহিদ এবং অন্যান্য জামায়াত নেতারা ঠিক তাই করেছে। বাংলাদেশের ধর্মনিরপেক্ষতা, গণতন্ত্রিক মূল্যবোধের প্রবক্তাদের নির্মমভাবে হত্যা করেছে। তিনি বলেন, নিজের দেশকে মেধাশূণ্য করার এমন বর্বর দৃষ্টান্ত পৃথিবীর ইতিহাসে নেই। আগামীকালের চূড়ান্ত রায়ে তার মৃত্যুদন্ডের আদেশ বহাল থাকবে বলে আশা করছি, এর মাধ্যমে শহীদ বুদ্ধিজীবিদের ঘাতকদের বিচারের ভার থেকে জাতি মুক্ত হবে; যে কোন  সভ্য জাতির জন্যে তা একান্ত আবশ্যক।

বাংলাদেশের প্রধান বিচারপতি এস কে সিনহার নেতৃত্বে চার সদস্যের আপিল বেঞ্চ মঙ্গলবার সকালে এই রায় ঘোষণা করবেন। দিনের কার্যতালিকার প্রথমেই এ মামলা রাখা হয়েছে।এই আপিল বেঞ্চের বাকি তিন সদস্য হলেন- বিচারপতি নাজমুন আরা সুলতানা, বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেন ও বিচারপতি হাসান ফয়েজ সিদ্দিকী।দুই পক্ষের শুনানি শেষে গত ২৭ মে আপিল আদালত রায়ের এই দিন ঠিক করে দেয়।

অন্যদিকে আসামিপক্ষের আইনজীবী শিশির মনিরের প্রত্যাশা, জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল মুজাহিদ এবার খালাস পাবেন।“এ মামলায় আমাদের পক্ষে যেসব যুক্তি ছিল, সেগুলো আমরা সাধ্যমতো আপিল বিভাগে তুলে ধরার চেষ্টা করেছি। আমাদের উপস্থাপিত যুক্তিগুলো বিবেচনায় নিয়ে আদালত তাকে সব অভিযোগ থেকে খালাস দেবেন বলে আমরা প্রত্যাশা করছি।”এর আগে যুদ্ধাপরাধের তিনটি মামলায় আপিল বিভাগের চূড়ান্ত রায় এসেছে; দণ্ড কার্যকর হয়েছে জামায়াতের দুই সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল কাদের মোল্লা ও মুহাম্মদ কামারুজ্জামানের।আপিল বিভাগের আরেক রায়ে জামায়াতের নায়েবে আমির দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর সাজা কমিয়ে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। তবে সেই রায়ের পূর্ণাঙ্গ অনুলিপি প্রকাশিত না হওয়ায় রিভিউ নিষ্পত্তি হয়নি।

 

শুনানি চলাকালীন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায়  মুক্তিযুদ্ধকালীন জামায়াত আমির গোলাম আযম ও বিএনপির সাবেক মন্ত্রী আবদুল আলীমের মৃত্যু হওয়ায় তাদের আপিলের নিষ্পত্তি হয়ে গেছে।

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের রায়

 

মুজাহিদের বিরুদ্ধে প্রসিকিউশনের আনা সাতটি অভিযোগের মধ্যে ১, ৩, ৫, ৬ ও ৭ নম্বর অভিযোগ ট্রাইব্যুনালে প্রমাণিত হয়। তবে ২ ও ৪ নম্বর অভিযোগে তার সংশ্লিষ্টতা প্রমাণিত হয়নি বলে রায়ে জানানো হয়।

প্রথম অভিযোগে সাংবাদিক সিরাজুদ্দীন হোসেনকে অপরণের পর হত্যা এবং ষষ্ঠ অভিযোগে বুদ্ধিজীবীসহ গণহত্যার ষড়যন্ত্র ও ইন্ধনের অভিযোগে ফাঁসির আদেশ দেয়া হয় এই জামায়াত নেতার।একই সাজা হয় সপ্তম অভিযোগে, ফরিদপুরের বকচর গ্রামে হিন্দু সম্প্রদায়ের ওপর বর্বর হামলা চালিয়ে হত্যা-নিযার্তনের ঘটনায়।এছাড়া পঞ্চম অভিযোগে সুরকার আলতাফ মাহমুদ, গেরিলা যাদ্ধা জহিরউদ্দিন জালাল ওরফে বিচ্ছু জালাল, শহীদজননী জাহানারা ইমামের ছেলে শাফি ইমাম রুমি, বদিউজ্জামান, আবদুল হালিম চৌধুরী জুয়েল ও মাগফার আহমেদ চৌধুরী আজাদসহ কয়েকজনকে ঢাকার নাখালপাড়ায় পুরনো এমপি হোস্টেলে আটকে রেখে নির্যাতন এবং জালাল ছাড়া বাকিদের হত্যার ঘটনায় সংশ্লিষ্টতার জন্য মুজাহিদকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয় ।তৃতীয় অভিযোগে ফরিদপুর শহরের খাবাসপুরের রণজিৎ নাথকে অপহরণ ও নির্যাতনের ঘটনায় পাঁচ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয় মুজাহিদকে।তবে দ্বিতীয় অভিযোগে ফরিদপুরের চরভদ্রাসনে হিন্দু গ্রামে গণহত্যা এবং চতুর্থ অভিযোগে আলফাডাঙ্গার আবু ইউসুফ ওরফে পাখিকে আটকে রেখে নির্যাতনের ঘটনার সত্যতা পাওয়া গেলেও তাতে মুজাহিদের সংশ্লিষ্টতা প্রসিকিউশন প্রমাণ করতে পারেনি বলে রায়ে উল্লেখ করা হয়। এ দুটি অভিযোগ থেকে তাকে খালাস দেয়া হয়।

মুজাহিদের বিরুদ্ধে যতো মামলা

ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত দেয়ার অভিযোগের একটি মামলায় ২০১০ সালের ২৯ জুন আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদকে গ্রেপ্তার করার পর ২ অগাস্ট তাকে মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে গ্রেপ্তার দেখানো হয়।মামলার শুনানি শেষে অভিযোগ গঠনের মধ্য দিয়ে ২০১২ সালের ২১ জুন ট্রাইব্যুনালে মুজাহিদের বিচার শুরু হয়।২০১৩ সালের ১৭ জুলাই ট্রাইব্যুনালে এই জামায়াত নেতার ফাঁসির রায় আসে। ওই রায়ের বিরুদ্ধে ২০১৩ সালের ১১ আগস্ট আপিল করেন মুজাহিদ। রাষ্ট্রপক্ষ আপিল না করলেও শুনানিতে অংশ নিয়ে দণ্ড বহাল রাখতে যুক্তিতর্ক উপস্থাপন করে। রাষ্ট্রপক্ষে যুক্তি উপস্থাপন শেষ করেন অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম। সঙ্গে ছিলেন সহকারী অ্যার্টনি জেনারেল মো. রশির আহমেদ।আদালতে আসামিপক্ষে শুনানি করে  বিএনপি নেতা আইনজীবী খন্দকার মাহবুব হোসেন ও এস এম শাজাহান। তাদের সঙ্গে ছিলেন  জামায়াতে ইসলামীর শিশির মনির।

 

‘বদর নেতা’ থেকে মন্ত্রী

আর্ন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউশনের তথ্য অনুযায়ী, ১৯৭১ সালে বাংলার মানুষের স্বাধীনতার সংগ্রাম যখন চূড়ান্ত পর্যায়ে, সেই বছর জানুয়ারিতে ইসলামী ছাত্রসংঘের ঢাকা জেলা শাখার সভাপতি হন মুজাহিদ। মুক্তিযুদ্ধ শুরুর পর জুলাই মাসে সংগঠনের পূর্ব পাকিস্তান শাখার সেক্রেটারির এবং এরপর প্রাদেশিক সভাপতির দায়িত্ব পান।জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মুজাহিদের জন্ম ১৯৪৮ সালের ২ জানুয়ারি, ফরিদপুর জেলার পশ্চিম খাবাসপুরে। ১৯৬৪ সালে মাধ্যমিক পাসের পর তিনি ফরিদপুর রাজেন্দ্র কলেজে ভর্তি হন এবং উচ্চমাধ্যমিকের ছাত্র থাকাকালেই জামায়াতের তখনকার ছাত্র সংগঠন ইসলামী ছাত্রসংঘে যোগ দেন। ১৯৬৮ সালে তাকে সংগঠনের জেলা শাখার সভাপতির দায়িত্ব দেয়া হয়।  মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতায় ইসলামী ছাত্রসংঘের সদস্যদের নিয়ে আলবদর বাহিনী গঠিত হলে ১৯৭১ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত তার নেতৃত্ব দেন ইসলামী ছাত্রসংঘের তখনকার সভাপতি ও জামায়াতের বর্তমান আমির মতিউর রহমান নিজামী। অক্টোবরে ওই বাহিনীর প্রধান হন মুজাহিদ। নিজামীর বিরুদ্ধেও যুদ্ধাপরাধের মামলা চলছে।

তার নেতৃত্বে আলবদর বাহিনী যুদ্ধের মধ্যে ফরিদপুর, ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে হত্যা, অপহরণ, লুটপাটের মতো ব্যাপক মানবতাবিরোধী কর্মকাণ্ড চালায়। এমনকি ১৬ ডিসেম্বর পাকিস্তানি বাহিনীর আত্মসমর্পণের প্রস্তুতির সময়ও বাহিনী নিয়ে আত্মসমর্পণ না করার সিদ্ধান্ত নেন মুজাহিদ।একাত্তরে তার হত্যাযজ্ঞের ঘনিষ্ঠ সহযোগী পলাতক আবুল কালাম আযাদ ওরফে বাচ্চু রাজাকারকেও যুদ্ধাপরাধের দায়ে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছে বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল।

স্বাধীনতার পর মুজাহিদ জামায়াতের রাজনীতিতে যুক্ত হন এবং ১৯৮২ সালে কেন্দ্রীয় পরিষদের সদস্য হন। ১৯৮৯ থেকে দুই বছর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেলের দায়িত্ব পালনের পর ২০০০ সালে জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল হন তিনি।কোনো নির্বাচনে জয়ী হতে না পারলেও বিগত চারদলীয় জোট সরকারের সময়ে সমাজকল্যাণ মন্ত্রীর দায়িত্ব পান মুজাহিদ। জামায়াতের মুখপত্র দৈনিক সংগ্রামের পরিচালনা পর্ষদেরও প্রধান তিনি।যুদ্ধাপরাধের মামলায় গ্রেপ্তার হওয়ার আগে ২০১০ সালের মার্চে জামায়াতে ইসলামীর এক সংবাদ সম্মেলনে মুজাহিদ বলেন, বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে জামায়াতে ইসলামী রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত হিসেবে পাকিস্তানের পক্ষে কাজ করেছে। কিন্তু মানবতাবিরোধী অপরাধ বা যুদ্ধাপরাধের মতো কোনো ধরনের অপরাধে জামায়াত নেতারা জড়িত ছিলেন না।

নির্মম ঘাতক মুজাহিদের ফাঁসির রায় বহাল রাখার দাবিতে বাংলাদেশের প্রতিটি মানুষ অধীর আকাঙ্খায় প্রতীক্ষা করছে। এই রায় কার্যকর করার মাধ্যমে জাতি দায়মুক্ত হবে এমন বিশ্বাস প্রতিটি বাঙ্গালীর হৃদয়ে। ###

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

five × 1 =