প্যারিসে কাল শুরু হচ্ছে জলবায়ু শীর্ষ সম্মেলন:ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোকে রক্ষায় সার্বজনীন চুক্তি স্বাক্ষর

Facebooktwittergoogle_plusredditpinterestlinkedinmail

cf_lf_entrance_cop21_533x200_2‘সন্ত্রাসীদের বর্জনের’ পদক্ষেপ হিসেবে আগামীকাল সোমবার ফ্রান্সের রাজধানী প্যারিসে শুরু হচ্ছে জলবায়ু শীর্ষ সম্মেলন। এবারের সম্মেলনের মূল লক্ষ্য ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোকে রক্ষার জন্য সকল দেশকে নিয়ে একটি সার্বজনীন চুক্তি স্বাক্ষর। যাতে বিশ্ব শতভাগ নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে রূপান্তরে প্রয়াসী হয়। এ লক্ষ্যেই প্যারিসে সববেত হচ্ছেন বিশ্বের অন্তত ১৪৭টি দেশের রাষ্ট্র ও সরকার প্রধান।বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার এ সম্মেলনে যোগদানের কথা থাকলেও শেষ মুহূর্তে তিনি তার সফর বাতিল করেছেন। ফলে তার পরিবর্তে এবারের সম্মেলনে বাংলাদেশের নেতৃত্ব দেবেন বন ও পরিবেশমন্ত্রী আনোয়ার হোসেন মঞ্জু।

প্যারিস লে বোরগেতে অনুষ্ঠেয় সম্মেলনে সবমিলিয়ে ৪০ হাজার থেকে ৪৫ হাজার মানুষ অংশ নেবে বলে আশা করা হচ্ছে।সন্ত্রাসী হামলায় প্যারিসে ১৩০ জন নিহত হওয়ার পরও এই সম্মেলন আয়োজনকে ‘সন্ত্রাসীদের বর্জনের’ পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে। বিশ্বব্যাপী সন্ত্রাসীদের বর্জনের লক্ষ্যে জলবায়ু শীর্ষ সম্মেলনে আমন্ত্রিত বিভিন্ন দেশের সরকার ও রাষ্ট্র প্রধানরা যোগ দিচ্ছেন। যেখানে সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধে জাতিসংঘের এই জলবায়ু সম্মেলন নতুন মাত্রা দেবে বলে আশা করা হচ্ছে। রাষ্ট্রনেতারা পরস্পর সাক্ষাতের মাধ্যমে জলবায়ু পরিবর্তন রোধের পাশাপাশি সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধের কৌশল নির্ধারণে ভূমিকা রাখবেন বলেই মনে করা হচ্ছে।

প্যারিস সম্মেলন উপলক্ষে  পরিচালিত এক জরিপে প্রকাশ, বিশ্বখ্যাত ৩৬০টি কোম্পানির সিইও, যুক্তরাষ্ট্রের ক্লিন পাওয়ার কর্তৃপক্ষ, ৬টি বিশ্বখ্যাত ব্যাংক, বেভারেজ কোম্পানির সিইও এবং ৪শ’ জন গ্লোবাল বিনিয়োগকারী মনে করেন, কেবল বর্তমান অবস্থা থেকে জলবায়ুবান্ধব শিল্পে রূপান্তরে কমপক্ষে ২৪ ট্রিলিয়ন ডলার নতুন বিনিয়োগের প্রয়োজন পড়বে শিল্পোন্নত দেশগুলোর।

জলবায়ু বিশ্লেষকরা বলছেন, সম্মেলনে অংশগ্রহণকারী নেতারা গ্রীনহাউস গ্যাসের পরিমাণ হ্রাস এবং বিশ্বের তাপমাত্রা কমিয়ে আনার বিষয়ে আলোচনা করবেন। বিশেষ করে বিশ্ব নেতাদের শংকার কারণ হচ্ছে, বৈশ্বিক উষ্ণতার রেকর্ড সৃষ্টির বিষয়টি। বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থা (ডাব্লিউএমও) জানাচ্ছে, বৈশ্বিক গড় তাপমাত্রার বিবেচনায় ২০১৫ সাল গড়তে যাচ্ছে উষ্ণতম বছরের রেকর্ড। অক্টোবর পর্যন্ত সংস্থাটির রেকর্ড করা তথ্যে দেখা যাচ্ছে, চলতি বছরের তাপমাত্রা আগের যে কোন ১২ মাস সময়কালের চেয়ে ‘অনেক বেশি’। ২০১১-১৫ পর্যন্ত এই পাঁচ বছরের গড় তাপমাত্রা আগের যে কোন পাঁচ বছরের তাপমাত্রা থেকে সবচেয়ে উষ্ণ। প্রবল এল-নিনোর প্রভাব ও মানবসৃষ্ট কারণকে যৌথভাবে তারা বৈশ্বিক তাপমাত্রা বাড়ার কারণ হিসেবে বলছেন।
ডাব্লিউএমও বলছে, ২০১৫ সালে পৃথিবীপৃষ্ঠের গড় তাপমাত্রা দশমিক ৭৩ ডিগ্রী সেলসিয়াস, যা ১৯৬১-১৯৯০ সালের গড় তাপমাত্রার থেকে উপরে। বিজ্ঞানীরা বলছেন, ১৮৮০-৮৯ সময়কালের বৈশ্বিক গড় তাপমাত্রা থেকে চলতি বছরের তাপমাত্রা ১ ডিগ্রী সেলসিয়াস উপরে। ১৯৬১-৯০ সালের গড় তাপমাত্রা থেকে ২০১১-১৫ সালের গড় তাপমাত্রা দশমিক ৫৭ ডিগ্রী সেলসিয়াসের উপরে রয়েছে। সংস্থাটি শঙ্কা প্রকাশ করে বলছে, বায়ুম-লে গ্রীনহাউস গ্যাসের স্তর নতুন উচ্চতায় উঠেছে। উত্তর গোলার্ধে ২০১৫ সালের বসন্তের তিন মাসে কার্বন-ডাই অক্সাইডের ঘনীভবন প্রতি মিলিয়নে ৪০০-এর সীমা প্রথম ছাড়িয়েছে।

প্যারিস জলবায়ু চুক্তির প্রেক্ষাপট তুলে ধরে জলবায়ু বিশ্লেষক ড. মনজুরুল হান্নান খান বলেন, এই চুক্তিটি হওয়ার কথা ছিল কোপেনহেগেনে। কিন্তু কোপেনহেগেন ব্যর্থ হলো। সেখানে একটি আইনগত চুক্তির পরিবর্তে একটি এ্যাকর্ড হলো। যা কোন আইনগত বিষয় নয়। আমাদের আশা ছিল, কোপেনহেগেনে জলবায়ু চুক্তি হলে ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলো জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব থেকে রক্ষা পাবে। এই পৃথিবীও উষ্ণায়নের গতিও শ্লথ হবে। কিন্তু কোপেনহেগেন ব্যর্থ হওয়ার পর ক্ষতিগ্রস্ত রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে হতাশা নেমে আসে। তবে ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলো হাল ছাড়েনি। ফলে পরের বছর মেক্সিকোর কানকুনে জলবায়ু আলোচনার অচলাবস্থা প্রাণ পায়।  গ্রীনহাউস গ্যাস কমাতে একটি সার্বজনীন আইনগত চুক্তির উপর জোর দেয়া হয়। যেখানে সকল দেশকে আসতে হবে। কানকুন সিদ্ধান্তের প্রেক্ষিতেই ডারবানে জলবায়ু আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি আসে।এতে ডারবান এ্যাকশন প্ল্যান ঘোষিত হয়।
এই এ্যাকশন প্ল্যানে পাঁচটি বিষয়কে গুরুত্ব দেয়া হয়, শেয়ার্ড ভিশন, মিটিগেশন, এডাপটেশন, ফিনান্স, টেকনোলজি ও ক্যাপাসিটি বিল্ডিং। সেই সঙ্গে বালির অর্জনকে সমাপ্তি ঘোষণা করে তার অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে কানকুন এ্যাকশন প্ল্যান নিয়ে কাজ শুরু করা হয়। যার নাম দেয়া হয় এ্যাডহক ওয়ার্কিং গ্রুপ অন ডারবান প্ল্যাটফর্ম ফর এনহেন্সড এ্যাকশন (এডিপি)। এই কমিটি আলোচনা করে বিশ্বের সকল দেশকে নিয়ে একটি সার্বজনীন জলবায়ু চুক্তি স্বাক্ষরের দলিল (টেক্সট) তৈরি করে। যা আসন্ন প্যারিস জলবায়ু সম্মেলন অনুমোদন করবে।
বিশ্লেষকরা মনে করছেন, প্যারিসে আলোচনা করে একটি আইনগত চুক্তি স্বাক্ষর দুরূহ হবে। ফলে প্যারিসে একটি চুক্তি হবে। তবে তা আইনগত চুক্তি বা প্রটোকল নাও হতে পারে। তবে এই চুক্তিই পরবর্তীতে একটি আইনী চুক্তির কাঠামো তৈরির ভিত্তি হিসাবে কাজ করবে।
এ প্রসঙ্গে ড. হান্নান খান বলেন, এবারের সম্মেলনের মূল বিষয় হবে তাপমাত্রা বৃদ্ধি। কিভাবে বৈশ্বিক তাপমাত্রা বৃদ্ধি ১.৫ ডিগ্রী বা দুই ডিগ্রীর নিচে নামিয়ে আনা যায়। এটা অর্জনের জন্য লীমায় সিদ্ধান্ত হয়, প্রত্যেক দেশ নিজস্ব উদ্যোগে কি পরিমাণ কার্বন কমাবে (আইএনডিসি) তার এ্যাকশন প্ল্যান প্রদান করবে। প্রায় সব দেশই এই এ্যাকশন প্ল্যান জমা দিয়েছে। কিন্তু শঙ্কার বিষয় হচ্ছে, সব দেশ মিলে যে পরিমাণ কার্বন কমানোর ঘোষণা দিয়েছে তা অর্জন করা হলেও বৈশ্বিক উষ্ণতা ২.৭ ডিগ্রী থেকে ৩ ডিগ্রী সেলসিয়াস বৃদ্ধি পাবে। ফলে এবারের জলবায়ু সম্মেলন ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর বাঁচার বড় ইস্যু হয়ে দাঁড়াবে। ইস্যু হবে কিভাবে বৈশ্বিক তাপমাত্রা ১.৫ ডিগ্রী বা দুই ডিগ্রীর নিচে নামিয়ে আনা যায়।
অর্থায়ন ইস্যুটিও জলবায়ু সম্মেলনে উত্তাপ ছড়াবে বলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন। কারণ জলবায়ু পরিবর্তন রোধ করার জন্য প্রয়োজন অর্থের। কিন্তু উন্নত দেশগুলো তাদের প্রতিশ্রুত অর্থ দিচ্ছে না। জলবায়ু পরিবর্তন রোধে অর্থায়নের জন্য দোহা জলবায়ু সম্মেলনে ‘গ্রীন ক্লাইমেট ফান্ড’ গঠন করা হয়। উন্নত দেশগুলো বলেছে, তারা ২০২০ সালের পর প্রতিবছর ১০০ বিলিয়ন ডলার করে অর্থ প্রদান করবে। যা দিয়ে জলবায়ুর বিরূপ প্রভাব মোকাবেলা করা হবে।

২০২০ সালের আগে উন্নত দেশগুলো গ্রীন ক্লাইমেট ফান্ডে মাত্র ১০.৪ বিলিয়ন ডলার প্রদানের ঘোষণা করেছে। এই অর্থ তারা তিন বছরে দেবে বলেছে। কিন্তু এখন পর্যন্ত অর্থ ছাড় করেনি। ফলে এ পর্যন্ত অর্থায়ন ইস্যুতে অগ্রগতি খুবই সামান্য।
কোপেনহেগেন জলবায়ু সম্মেলনে সিদ্ধান্ত হয়েছিল, উন্নত দেশ যে অর্থ দেবে তা হবে সরকারী অর্থ এবং ইতোপূর্বে প্রদত্ত অর্থের অতিরিক্ত। কিন্তু উন্নত দেশগুলো এখন গ্রীন ক্লাইমেট ফান্ডের অর্থের উৎস হিসাবে সরকারের পরিবর্তে বেসরকারী খাতের প্রতি জোর দিচ্ছে। বেসরকারী খাত প্রসঙ্গে ড. মনজুরুল হান্নান খান বলেন, অর্থায়নের ক্ষেত্রে বেসরকারী খাতের নজর থাকবে কার্বন প্রশমন বা মিটিগেশনের প্রতি। জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে খাপখাইয়ে নেয়ার (এ্যাডাটটেশন) ক্ষেত্রে তাদের কোন স্বার্থ নেই। অথচ আমাদের দরকার এ্যাডাপটেশন বা অভিযোজনের জন্য অর্থ। ফলে জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব মোকাবেলায় আমাদের (বাংলাদেশ) অর্থ পাওয়া নিয়ে শঙ্কা দেখা দিয়েছে। অভিযোজনের জন্য অর্থায়ন নিশ্চিত করা এবারের সম্মেলনে ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে।
প্রযুক্তি হস্তান্তর ও সক্ষমতা অর্জন বিষয়ে তিনি বলেন, ‘ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর অভিযোজনের জন্য প্রযুক্তি প্রয়োজন। এটা না হলে বাংলাদেশের মতো দেশগুলোর জীববৈচিত্র্য রক্ষা করা যাবে না। এই প্রযুক্তি পাওয়ার ব্যাপারে সম্মেলনে বাংলাদেশের মতো ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোকে জোর প্রচেষ্টা চালাতে হবে।’
ড. খান আরো বলেন, প্রযুক্তি হস্তান্তরের বিষয়ে টেক (টিইসি) ও সেন্টার হয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠান যাতে ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোকে প্রযুক্তি সহায়তা দেয় সেটা নিশ্চিত করতে হবে। আমাদের বাঁধ উচু করতে হবে, বাস্তুচ্যুতদের রক্ষা করতে হবে। এজন্য অর্থ ও প্রযুক্তি প্রয়োজন। তিনি বলেন, উন্নত দেশগুলো আমাদের সক্ষমতা অর্জনে তৈরি হওয়ার জন্য প্রযুক্তি দিতে চায়। কিন্তু সক্ষম হওয়ার জন্য প্রযুক্তি দিচ্ছে না। আমরা যাতে মূল সক্ষমতা অর্জনের জন্য অর্থ পাই তার জন্য সোচ্চার হতে হবে।
সোমবার সকাল ১০টায় ফরাসী প্রেসিডেন্টের আমন্ত্রিত ১৪৭ রাষ্ট্র প্রধান ও রাষ্ট্রীয় প্রতিনিধিদের অংশগ্রহণে ‘লিডারস ইভেন্টের’ মাধ্যমে এবারের গুরুত্বপূর্ণ সম্মেলনের আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু হবে। যা ১১ ডিসেম্বরের আনুষ্ঠানিক ঘোষণার মাধ্য দিয়ে শেষ হবে। লিডারস ইভেন্ট পরিচালনা করবেন ফরাসী পররাষ্ট্রমন্ত্রী লরা ফেবিয়াস। এতে সভাপতিত্ব করবেন ফরাসী প্রেসিডেন্ট ওলাঁদ। তিনি রাষ্ট্র প্রধানদের উদ্দেশে পৃথিবীকে বাসযোগ্য করা এবং জলবায়ু সঙ্কট মোকাবেলায় ঝুঁকিপূর্ণ রাষ্ট্রগুলোর পাশে দাঁড়াতে বিশ্বনেতাদের প্রতি যতœশীল ও দায়িত্ববান হওয়ার আহ্বান জানাবেন।
আয়োজক কমিটি জানাচ্ছে, এবারের সম্মেলনে ১৯৭টি দেশের সংবাদকর্মী, এনজিও কর্মী এবং নেগোশিয়েটর, জলবায়ু বিশেষজ্ঞ, বিজ্ঞানী, উদ্ভাবক, উদ্যোক্তা, নারী নেত্রী, মানবাধিকার কর্মী, চিকিৎসা বিজ্ঞানী, সরকারী কর্মকর্তা, ব্যাংকার ও জাতিসংঘের বিভিন্ন সংস্থার কর্মকর্তা অংশ নেবেন।

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

6 + 8 =