ঢাবি উপাচার্যকে উদ্ধারে বিক্ষোভকারী শিক্ষার্থীদের ওপরে চড়াও ছাত্রলীগ

Facebooktwittergoogle_plusredditpinterestlinkedinmail

গত ১৫ জানুয়ারি রাজধানীর সরকারী সাত কলেজের অধিভুক্তি বাতিলের দাবিতে ‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাধারণ শিক্ষার্থী’ ব্যানারে আয়োজিত আন্দোলন কর্মসূচিতে ছাত্রীদের ওপর নিপীড়ন করে ছাত্রলীগ।এরপর ‘নিপীড়নবিরোধী শিক্ষার্থীবৃন্দের’ ব্যানারে শুরু হয় আন্দোলন। অধিভুক্তি বাতিল ছাড়াও নিপীড়ক ছাত্রলীগ নেতাকর্মীদের বহিষ্কার ও প্রক্টরের অপসারণসহ চার দফা দাবিতে গত সপ্তাহ থেকে এই আন্দোলন চালিয়ে আসছেন তারা।

বিকেলে উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. আখতারুজ্জামান একাডেমিক মিটিংয়ে যাওয়ার জন্য কক্ষ থেকে বের হলে আন্দোলনকারীরা তাকে ঘিরে ফেলে। এ সময় ভিসির পদত্যাগ চেয়ে বিভিন্ন স্লোগান দেয় আন্দোলনকারীরা। রুমের সামনে করিডোরে আধঘণ্টার বেশি উপাচার্যকে অবরুদ্ধ করে রাখে তারা। পরে ছাত্রলীগের সভাপতি সাইফুর রহমান সোহাগ, সাধারণ সম্পাদক এস এম জাকির হোসাইন ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সভাপতি আবিদ আল হাসানের নেতৃত্বে ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা এসে তাকে উদ্ধার করে তার কার্যালয়ের নিয়ে যান।

এ সময় ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় নেতারা বিশ্ববিদ্যালয়ের হল শাখার নেতাকর্মীদের ঘটনাস্থলে আসার নির্দেশ দিলে বিভিন্ন হল থেকে কয়েকশ’ নেতাকর্মী এসে পুরো প্রশাসনিক ভবন ঘিরে ফেলে। একপর্যায়ে আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা চালায় তারা।

মারধরের মুখে শিক্ষার্থীরা সিনেট ভবনসংলগ্ন গেট, প্রধান ফটকসহ বিভিন্ন গেট গিয়ে বের হওয়ার সময় ছাত্রলীগের কর্মীরা দফায় দফায় রড ও লাঠি দিয়ে পেটাতে থাকে। এ সময় ইট-পাটকেল, লাথি, কিল, ঘুষি মেরে আন্দোলনকারীদের ছত্রভঙ্গ করে দেওয়া হয়। প্রহারে অনেকে মাটিতে লুটিয়ে পড়েন। এ সময় সাংবাদিকসহ প্রায় ৪০ জন আহত হন।

তাদের মধ্যে আন্দোলনকারীদের মুখপাত্র মাসুদ আল মাহাদী, ছাত্র ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক লিটন নন্দী, ছাত্র ফেডারেশন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সভাপতি উম্মে হাবিবা বেনজির, ছাত্র ইউনিয়নের বিশ্ববিদ্যালয়ের সভাপতি তুহিন কান্তি দাস, সমাজতান্ত্রিক ছাত্রফ্রন্ট বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সাধারণ সম্পাদক রাজীব কান্তি, সদস্য সোহাইল আহমেদ শুভ, রবিউল ইসলাম মিম, সমাজতান্ত্রিক ছাত্রফ্রন্ট বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সভাপতি ইভা মজুমদার, প্রগতি বর্মণ তমাসহ আরও অন্তত ৪০ জন আহত হন।আহতদের ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।

আন্দোলনকারীদের ওপর হামলার ছবি তুলতে গিয়ে আহত হন ইংরেজি দৈনিক ইনডিপেনডেন্টের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধি আরশাদ, নিউ এজের বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধি অরণ্য আরিফ, ডেইলি অবজারভারের বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধি আবদুল করিম, বাংলা ট্রিবিউনের রুবেল, বিডিনিউজের তপন কান্তি রায়সহ আরও অনেকে। তারা ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের মারধরের শিকার হন। তাদের মধ্যে আরশাদ ও অরণ্য আরিফকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। তা ছাড়া কয়েকটি ইলেকট্রনিক মিডিয়ার সাংবাদিকদের ক্যামেরা কেড়ে নেওয়ারও চেষ্টা করা হয়।

শিক্ষার্থীদের ওপর ছাত্রলীগের হামলার ঘটনায় নিশ্চুপ ছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। প্রশাসনের নিশ্চুপতায় ছাত্রলীগের মারধরের ঘটনাকে বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য চরম লজ্জা ও অপমান হিসেবে দেখছে বিশ্ববিদ্যালয়ের সাধারণ শিক্ষার্থীরা। তারা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের নির্লিপ্ততা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন।

ঘটনার পর পরই ক্যাম্পাসের মধুর ক্যান্টিনে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে ছাত্রলীগ সভাপতি সাইফুর রহমান সোহাগ বলেন, আন্দোলনকারীরা আন্দোলনের নামে ক্যাম্পাসে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির চেষ্টা চালিয়েছে। তারা ভিসির ওপর হামলা করেছে। ভাংচুর চালিয়েছে। তিনি তাদের বিচার চেয়ে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বহিস্কারের দাবি জানান।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. আখতারুজ্জামানকে হেনস্তা ও কার্যালয়ে ভাঙচুরের ঘটনায় পাঁচ সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। তদন্ত কমিটিতে বিশ্ববিদ্যালয়ের কোষাধ্যক্ষ অধ্যাপক ড. মো. কামাল উদ্দীনকে আহ্বায়ক করা হয়েছে।

মঙ্গলবার রাত ১০টায় গণমাধ্যমে পাঠানো এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়। এতে বলা হয়, ‘তদন্ত কমিটিকে যত দ্রুত সম্ভব প্রতিবেদন প্রদানের জন্য অনুরোধ জানানো হয়েছে।’

এছাড়াও বিজ্ঞপ্তিতে এ ঘটনায় নিজেদের বক্তব্যও দিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। বলা হয়েছে, ‘বিগত কয়েকদিন ধরে চলে আসা বিক্ষোভ কর্মসূচির ধারাবাহিকতায় কতিপয় সহিংস শিক্ষার্থী ও বহিরাগত যুবক আজ (মঙ্গলবার) আনুমানিক বেলা ১২টায় উপাচার্য কার্যালয় ঘেরাও কর্মসূচির নামে বিভিন্ন ধরনের অস্ত্র ও হাতিয়ার যেমন হেক্সো ব্লেড, রড, লোহার পাইপ, ইট, পাথর ইত্যাদি ব্যবহার করে উপাচার্য অফিসের তিনটি গেটের তালা ও শিকল ভেঙে অবস্থান নেয় এবং দুটি মাইকে অশোভন ও কুরুচিপূর্ণ ভাষা প্রয়োগ করে উপস্থিত শিক্ষক, প্রক্টোরিয়াল বডির সদস্য এবং উপাচার্যকে উদ্দেশ্য করে অশালীন বক্তব্য প্রদান করতে থাকে।’

এতে আরও বলা হয, ‘সেই সাথে অফিস প্রাঙ্গণের বিভিন্ন স্থানে আপত্তিকর ও কুরুচিপূর্ণ দেয়ালচিত্র অংকন ও উক্তি লিখতে থাকে। এমতাবস্থায়, বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যমের প্রতিনিধিদের উপস্থিতিতে আন্দেলনকারীদের একটি প্রতিনিধি দলকে উপাচার্যের কাছে তাদের বক্তব্য উপস্থাপনের জন্য বারবার আহ্বান জানানো হয়। কিন্তু এই আহ্বানে তারা কোনো ধরনের কর্ণপাত ও গ্রাহ্য না করে তাদের অশালীন বক্তব্য চালিয়ে যায় এবং একাডেমিক ও প্রশাসনিক কর্মকাণ্ড পরিচালনায় বাধা প্রদান করতে থাকে।’

বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, ‘উপাচার্য পূর্বনির্ধারিত বোর্ড অব অ্যাডভান্সড স্টাডিজ সভায় সিনেট ভবনে যাওয়ার পথে আনুমানিক ৩টা ১০ মিনিটে উদ্ধত, উত্তেজিত এবং উচ্ছৃঙ্খল আন্দোলনকারীরা আক্রমণাত্মক ভঙ্গিতে তার পথ রোধ করে। এ অবস্থায় উপাচার্য ধৈর্য ধরে তাদের বক্তব্য শোনেন এবং তাদের অভিযোগ যা ইতোপূর্বে উত্থাপিত হয়েছে সেই সংক্রান্ত তদন্ত প্রক্রিয়া চলছে উল্লেখ করে বক্তব্য প্রদান করেন। তদন্ত সাপেক্ষে বিশ্ববিদ্যালয়ের যথাযথ নিয়ম অনুসরণ করে দোষী সে যে-ই হোক তাদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে বলে আশ্বাস প্রদান করেন। আন্দোলনকারীরা সেই বক্তব্য প্রত্যাখান করে অশালীন ও আক্রমণাত্মক বক্তব্য প্রদান করতে থাকে। এক পর্যায়ে উপাচার্যের প্রতি বলপ্রয়োগ ও আক্রমণ করলে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, কর্মকর্তা, কর্মচারী, প্রক্টোলিয়াল বডির সদস্য এবং শিক্ষার্থীরা মানববলয় তৈরি করে উপাচার্যকে তার কার্যালয়ে ফিরিয়ে আনেন। এ ধরনের সহিংস কার্যক্রম পূর্বপরিকল্পিত। আন্দোলনের নামে ধ্বংসাত্মক ও নাশকতামূলক ধারাবাহিক কার্যক্রমের আরও একটি বড় ধরনের অপপ্রয়াস।’

এমতাবস্থায়, সকল শিক্ষার্থী, শিক্ষক, কর্মকর্তা-কর্মচারী, অভিভাবক, সাংবাদিক এবং সকল বিবেকবান মানুষের সহযোগিতা কামনা করে বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখ করা হয়, ‘যারা আন্দোলনের নামে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা কার্যক্রমে বাধা প্রদান, সহিংসতা এবং সম্পদের বিনাস করে সন্ত্রাসী কার্যক্রম চালাচ্ছে তাদের কাছে দায়িত্বশীল আচরণ করার জন্য কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে আহ্বান জানানো হচ্ছে। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ দৃঢ়ভাবে বলতে চায় যে, যেকোনো নিপীড়নমূলক, সন্ত্রাসী ও নাশকতামূলক শৃঙ্খলা পরিপন্থী কর্মকাণ্ড যারাই ঘটাক না কেন তাদের বিরুদ্ধে তদন্ত সাপেক্ষে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।’

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

17 − 3 =