দুই বাংলা হাত মেলালেই মঙ্গল বাংলা ছায়াছবির

Facebooktwittergoogle_plusredditpinterestlinkedinmail

একুশে ফেব্রুয়ারি ভাষা দিবসের পটভূমিতে পাঁচ দশক আগের স্মৃতি যেন আছড়ে পড়ছে। ঢাকার বলাকা বা মধুমিতা’র পর্দায় পরের যুগের রাজ্জাক-কবরীদের থেকে জনপ্রিয়তায় কম যেতেন না এপারের আগের যুগের নায়ক-নায়িকা উত্তম-সুচিত্রা, সৌমিত্র-মাধবীরা। ১৯৬৫-র ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধের পরে সেই সুতো ছিঁড়ে যায়।

বহু বছর বাদে আবার সৌমিত্রের অপেক্ষায় একুশ শতকের বাংলাদেশ। ঢাকার বসুন্ধরা সিনেপ্লেক্সে প্রিমিয়ার হয়ে গেছে। আগামী শুক্রবার এপার বাংলায় মুক্তি ওপার বাংলার ‘বেলাশেষে’র। একই দিনে ওপারে যাবে এপারের ‘ছুঁয়ে দিলে মন’। এ বছর টালিগঞ্জের আরো ৬টি ছবির ঢাকা আসার কথা। লাইনে রয়েছে ‘নাটকের মতো’, ‘বাস্তুশাপ’ ও ‘কাদম্বরী’। বাংলাদেশের কিছু জনপ্রিয় এবং ভিন্নস্বাদের ছবিও দেখার সুযোগ পাবে পশ্চিম বঙ্গ তথা বৃহত্তর ভারতের বাঙালিরা।

ঢাকার প্রবীণ প্রযোজক হবিবুর রহমান খানে স্মরণ করলেন ঋত্বিক ঘটকের অবিস্মরণীয় ছবি ‘তিতাস একটি নদীর নাম’ তৈরির দিনগুলোর কথা। এখন ‘পদ্মানদীর মাঝি’, ‘মনের মানুষ’-এর পরে তিনি ‘শঙ্খচিল’-এর অপেক্ষায়। গৌতম ঘোষের পরিচালনায় যৌথ প্রযোজনার ছবিটি মুক্তি পাবে আগামী পয়লা বৈশাখ। ঢাকায় সদ্য মুক্তিপ্রাপ্ত যৌথ প্রযোজনা ‘হিরো ৪২০’ পশ্চিমবঙ্গে হপ্তাখানেক আগেই মুক্তির আলো দেখেছে।

গত দু’তিন বছরে নয়-নয় করে গোটা দশেক বাংলা ছবি মুক্তি পেয়েছে দুই বাংলায়, যেগুলোর সবকটিই যৌথ প্রযোজনা। ‘আমি শুধু চেয়েছি তোমায়’-এর মতো সব ছবিই যে হিট হয়েছে, তা কিন্তু নয়। দুই দেশে একযোগে ছবি মুক্তি নিয়ে কিছু জটিলতা এখনও রয়ে গেছে। তবু গোটা ছয়েক যৌথ প্রযোজনার সঙ্গে জড়িত ধানুকা গোষ্ঠীর মতে, দুই বাংলায় ছবি হিট করানোর ফর্মুলা বার করতে পারলে ইন্ডাস্ট্রির পোয়াবারো।

মনমোহন সিংহ জমানার শেষ দিক থেকেই ‘সফ্‌ট পাওয়ার’ হিসেবে চলচ্চিত্রের প্রসারে উদ্যোগী হয়েছে দিল্লি। চলতি জমানাতেও মোদি-হাসিনার বৈঠকে ঢুকে পড়েছিল চলচ্চিত্র প্রসঙ্গ। ঢাকায় নিযুক্ত রাষ্ট্রদূত হর্ষবর্ধন সিংলার আশ্বাস, “দু দেশে সিনেমার জানলা খোলা রাখতে দিল্লির আন্তরিকতায় খাদ নেই।“

বাংলাদেশের তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রী হাসানুল হক ইনুও হাত বাড়িয়ে রেখেছেন। বছর তিনেক আগেই কলকাতায় ফিকি’র সম্মেলনে তিনি এ দেশের, বিশেষ করে টালিগঞ্জের ছবিকে স্বাগত জানিয়ে যান। পরবর্তীতে টালিগঞ্জ ও বলিউড এ ব্যাপারে তাঁর কাছেই দেনদরবার করে এসেছে।

টালিগঞ্জের মহাতারকা প্রসেনজিত বলেন, এটা তাঁর জীবনের স্বপ্ন। তথ্যমন্ত্রীরও মত, জট কাটলে কলকাতা ও ঢাকা— দুদিকের ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রিই উপকৃত হবে। বাজার বাড়ানোই একমাত্র পথ।

এ পারে ছবির বাজেট এক কোটি, সোয়া কোটি ছাড়ালেই দুশ্চিন্তায় রাতের ঘুম মাটি হয় প্রযোজকের। ফেলু-ব্যোমকেশ বাদ দিলে হিট ছবি হাতে গোনা। রাজ্যে মেরে-কেটে ২০-২৫টি মাল্টিপ্লেক্স (মহারাষ্ট্র বা অন্ধ্রপ্রদেশে সংখ্যাটা ১০০-র কাছাকাছি)। হলের সংখ্যা কমতে কমতে ৩৫০। অন্ধ্রে হলের সংখ্যা এর দশ গুণ। ফলে তেলুগু বা মারাঠি ছবি যেখানে ২৫ কোটির শিখর ছোঁয়ার কথা ভাবতে পারে, বাংলা ছবির ব্যবসা তিন-চার কোটি ছুঁলেই লটারি জেতার সামিল।

বাংলাদেসের দশা আরো করুণ। সারা দেশে মোট ১,২৮৫টা সিনেমা হল ছিল। কমতে কমতে তা এখন ৩০০-য় এসে ঠেকেছে। ছবির বাজেট ৮০ লক্ষ ছাড়ালেই প্রযোজক প্রমাদ গোনেন। সুপারস্টার শাকিব খানের ছবি ছাড়া বাংলাদেশে দুই-আড়াই কোটি টাকার বেশি ব্যবসা করতে পারাটা অভাবনীয় বললেই চলে।

যুগলবন্দির দখিনা বাতাসে কিছু প্রশ্নও অবশ্য খচখচ করছে। ‘‘পরস্পরের জন্য জানলা খুলে দেয়ার পথে কিছু বাধা রয়েছে,” বলছেন বাংলাদেশের চলচ্চিত্র প্রদর্শক সমিতির সিনিয়র ভাইস-প্রেসিডেন্ট সুদীপ্ত কুমার দাস। তাঁর মতে বাধাগুলো হল: যৌথ প্রযোজনার ক্ষেত্রে সমান সুযোগ পাওয়া নিয়ে ঢাকার ইন্ডাস্ট্রিতে শিল্পী-কলাকুশলীদের ক্ষোভ আছে; ঢাকায় ফিল্ম রিলিজে আমলাতান্ত্রিক গেরো প্রবল, সেন্সর বোর্ড ছাড়াও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের ছাড়পত্র লাগে; ফাইলবন্দি ছবির ভাগ্য টেবিলে পড়ে থাকে; বাংলাদেশের ছবি মুক্তির সময় কলকাতায় ততটা সহযোগিতা মেলে না বলেও অভিযোগ আছে।

ঢাকার এও আশংকা, ছবির মান ও প্রযুক্তিতে এগিয়ে থাকা টালিগঞ্জ বাংলাদেশে ঢুকলে গোটা ইন্ডাস্ট্রির দখল নেবে। ঢাকার ছবি ওপারে পাত্তা পাবে কি না, তা নিয়েও রয়েছে সংশয়। গত বছরের একটি যৌথ প্রযোজনা ‘ব্ল্যাক’ নিয়ে বিতণ্ডা কলকাতা হাইকোর্টে গড়িয়েছিল। ঢাকার প্রযোজক কামাল মহম্মদ কিবরিয়া লিপুর মতে, “একসঙ্গে দুই বাংলায় ছবি রিলিজ করা না-গেলে পাইরেসির দৌলতে ব্যবসা মার খাবে।“ বেশকিছু যৌথ উদ্যোগের রূপকার প্রযোজক নাসিরুদ্দিন দিলুর কথায়, “ঢাকার তারকারা তুলনায় তত পরিচিত নন কলকাতায়। এটাও একটু খামতি।“ কোনো কোনো প্রযোজক-পরিবেশক বাংলাদেশের ছবির প্রতি বিরূপ আচরণ করেন বলেও অভিযোগ।

গৌতম ঘোষের মতো অনেকে কিন্তু বরাবর বলে আসছেন, ঢাকার ছবিকে কলকাতায় গুরুত্ব দিলে আখেরে লাভ টালিগঞ্জেরও। ফিল্ম পরিবেশক অরিজিৎ দত্ত মনে করেন, বাংলাদেশের ছবির ভালো সম্ভাবনা আছে গ্রামবাংলায়। আবার দুই বাংলায় ছবি প্রচার-প্রসারে যুক্ত শুভজিৎ রায়ও আশাবাদী যে, ঠিকঠাক প্রচার হলে বাংলাদেশের অন্যধারার ছবি ওপারের শহুরে দর্শকদেরও অবশ্যই ভালো লাগবে।

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

20 − sixteen =