ধর্ম বলতে মানুষ বুঝছে মানুষ শুধু-কুমারী রূপে পূজিত হলো বর্ষা খাতুন

Facebooktwittergoogle_plusredditpinterestlinkedinmail
কুমারী রূপে পূজিত হলো মুসলমান ঘরের কন্যা বর্ষা  খাতুন
কুমারী রূপে পূজিত হলো মুসলমান ঘরের কন্যা বর্ষা

জয় মানবতার জয়! বাংলা লালনের জন্মভূমি। লালন না ছিলেন মুসলিম, না হয়েছেন হিন্দু। লালনের যদি জাত না থাকে, তবে লালনের ‘মা’য়ের জাত কীভাবে হয়? তাইতো লালনের সুরে সুর মিলিয়ে লালনের বংশধরেরা গাইছে,’লালন বলে, জাত কারে কয়? এই ভ্রম তো গেল না’। পশ্চিমবঙ্গের কালনাতে মহাঅষ্টমীতেই তৈরি হলো নতুন ইতিহাস। সাধারণত কুমারী পুজাতে ব্রাহ্মণ পরিবারের কন্যাকেই বেছে নেওয়া চিরাচিরিত রীতি। চিরাচরিত সেই রীতি এবার ভাঙলো নতুন প্রজন্ম। একবিংশ শতাব্দীর সমাজে যেভাবে সমাজ ভাঙছে, সেখানে সমাজের চোখ রাঙানিকে উপেক্ষা করে পুরাতনের সঙ্গে নতুনকে মিলিয়ে সূচিত হতে চলেছে নবদিগন্ত।

 নাম বর্ষা খাতুন। মহাষ্টমীতে তিনিই দেবী দুর্গারূপী মহামায়া। পঞ্চম শ্রেণির বর্ষার এই দেবী রূপে পূজিত হওয়ার কথা শুনে স্তম্ভিত অনেকেই। কেউ কেউ ‘সব গেল, সব গেল’ বলে ধ্বনি তুললেও উন্নত ধ্যানধারণার মানুষের কাছে এই ঘটনা মানবতার জয়। মুসলিম কিংবা হিন্দু মায়ের গর্ভের কোনও জাত হয় না, তেমনি মা কখনও হিন্দু অথবা মুসলিমেও বিভাজিত নয়।  এ যেন কবীর সুমনের কাঙ্খিত,”আমি চাই হিন্দু নেতার সালমা খাতুন পুত্রবধু, আমি চাই ধর্ম বলতে মানুষ বুঝবে মানুষ শুধু…”।

কুমারী পূজা তন্যশাস্যমতে অনধিক ষোলো বছরের অরজঃস্বলা কুমারী মেযে়র পূজা। বিশেষত দুর্গাপূজার অঙ্গরৃপে এ পূজা অনুষ্ঠিত হয়। তবে কালীপূজা, জগদ্ধাত্রীপূজা ও অন্নপূর্ণাপূজা উপলক্ষে এবং কামাখ্যাদি শক্তিক্ষেত্রেও কুমারী পূজার প্রচলন আছে। শাস্যমতে কুমারী পূজার উদ্ভব হয় কোলাসুরকে বধ করার পর থেকে। কোলাসুর এক সময় স্বর্গ-মর্ত্য অধিকার করলে বিপন্ন দেবগণ মহাকালীর শরণাপন্ন হন। তাঁদের আবেদনে সাড়া দিযে় দেবী পুনর্জন্মে কুমারীরৃপে কোলাসুরকে বধ করেন। তারপর থেকেই মর্ত্যে কুমারী পূজার প্রচলন হয়। যোগিনীতন্য, কুলার্ণবতন্য, দেবীপুরাণ, স্তোত্র, কবচ, সহস্রনাম, তন্যসার, প্রাণতোষিণী, পুরোহিতদর্পণ প্রভৃতি গ্রন্থে কুমারী পূজার পদ্ধতি ও মাহাশ্ছ্য বিশদভাবে বর্ণিত হযে়ছে। কুমারী পূজায় কোন জাতি, ধর্ম বা বর্ণভেদ নেই। দেবীজ্ঞানে যে-কোন কুমারীই পূজনীয়, এমনকি বেশ্যাকুলজাত কুমারীও। তবে সাধারণত ব্রাহ্মণ কুমারী কন্যার পূজাই সমধিক প্রচলিত। এক থেকে ষোলো বছর বয়সী কুমারী মেযে়র পূজা করা চলে। বয়সের ক্রমানুসারে পূজাকালে এদের বিভিন্ন নামে অভিহিত করা হয়।

কুমারী রূপে এবারের মহাঅষ্টমীতে পুজিত হলেন মুসলিম ঘরের কন্যা বর্ষা।  দেবীর আগমন ঘটে গেছে। সপ্তমী, অষ্টমী, নবমী এরপরই আবার কৈলাসে ফিরবেন দেবী মহামায়া। পুরাণে বর্ণিত আছে রাবণ বধের আগে রাজা রাম দেবী দুর্গার বন্দনা করেছিলেন। ‘দশেরা’তেই রাম বধ করেছিলেন রাবণকে। মর্তের মানুষও সমস্ত দানবীয় শক্তির পরাজয় ঘটিয়ে নবদিগন্তের পথকে প্রশস্ত করবে বলেই দেবী বন্দনায় নিজেদের নিয়োজিত করেন। অনেক নিয়ম, আচার, অনুষ্ঠান, আড়ম্বরে পালিত হয় দুর্গা পুজো।

দেবী দুর্গার পূজা আর্চার মধ্যে কুমারী পুজো একটি বিশেষ অঙ্গ। অষ্টমীতে মা দুর্গাকে কুমারী রূপে পুজো করার রীতি আজকের নয়। বহু প্রাচীন এই প্রথা কালের নিয়মে আজও বহমান। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বদলেছে মানুষের ধ্যান ধারণা। কেবল বদলায়নি পরম্পরা। এবার সেই পরম্পরাই একই ভাবে পালিত হবে কিন্তু এই রীতিতে মিলে গেলো হিন্দু এবং মুসলিম। হ্যাঁ এটাই সত্যি। কুমারী রূপে দেবী হলেন মুসলিম ঘরের কন্যা ।

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

four × 3 =