নভেরার ঠিকানা : প্যারিস -ইকতিয়ার চৌধুরী

Facebooktwittergoogle_plusredditpinterestlinkedinmail

11188242_10155494469940497_756095551439325561_n Novera Paris issue Paperএ লেখাটি ছাপা হয়েছিল ১৭ অক্টোবর ১৯৯৭, ২ কার্তিক ১৪০৪ তারিখে প্রকাশিত বিচিত্রা-র ২৬ বর্ষ ২২ সংখ্যার ‘লেখালেখি’ বিভাগে (পৃষ্ঠা ৪০-৪১)

এপ্রিলের শেষ শুক্রবারের বিকেল। প্যারিসের আবহাওয়া সেদিন চমৎকার। আসন্ন উইক এন্ডে দূরে যে কোন ফরেস্টে বারবিকিউয়ে যাবার পরিকল্পনা চলছিল আমাদের। দূতাবাসে একটি কল এলো। ফোনে। আমাকে বলা হলো,

: নভেরা আহমেদ কথা বলতে চান।

আমি একজন নভেরাকেই জানি তিনি হলেন ভাস্কর নভেরা আহমেদ। সাপ্তাহিক বিচিত্রা একদা যার সন্ধান করেছিল বিশ্বময় এবং ঔপন্যাসিক হাসনাত আবদুল হাইয়ের জীবনীভিত্তিক উপন্যাস ‘নভেরা’র শিল্পী নভেরা। বিচিত্রায় প্রকাশিত লেখাটি যখন কয়েক বছর আগে পড়ি তখন মনে হয়েছিল নব্বই থেকে বিরানব্বই সময়কালে অনেকটা সময় প্যারিসের সব নামকরা মিউজিয়াম আর গ্যালারীতে একজন দর্শক হয়ে কাটিয়েছি তখন প্যারিসবাসী নভেরার দেখা পেলে চমৎকার হতো। আমি ওঁকে হয়তো ওঁর ভাস্কর্যগুলোর হাল অবস্থা বলতে পারতাম। আর্ট ইনস্টিটিউট ছাড়াও এগুলোর দুটো অন্ততঃ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় লাইব্রেরী চত্বরে ভগ্নাবস্থায় আছে। যেখানে এক সময় আমরা বিস্তর আসর জমিয়েছি।
বললাম,

: কোন নভেরা?

: আর্টিস্ট।

আমি কেন জানি ধরেই নিলাম ইনিই হবেন সেই গল্পের মত সত্যি নভেরা যিনি পঞ্চাশের শেষে ও ষাটের শুরুতে ঘোর নারীবর্জিত সাংস্কৃতিক অঙ্গনে হাসনাত বয়সীদের অনেকের ভাবনায় হয়তো গভীরভাবে ছিলেন। যে জন্যে ওঁকে এত বছর পর হৃদয় খুঁড়ে বেদনা জাগানোর মত খুঁজে বের করার প্রয়োজন পড়ল। তবে ‘নভেরা’য় হাসনাত জানিয়েছেন তিনি মুক্ত মনের শিল্পী। কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের পরিকল্পনা ও নির্মাণে ওঁর অংশ ছিল। জেনেছি বাংলাদেশ সরকার এ জন্যে নভেরাকে রাষ্ট্রীয় পুরস্কারে (একুশে পদক) সম্মানিত করেছেন। নভেরাকে চেয়ে নিয়ে সম্ভাষণ জানালাম।

: স্লামালাইকুম।

কোন প্রতিউত্তর এলো না।

জিজ্ঞেস করলাম,

: ভাল আছেন?

শিল্পী ইংরেজিতে জানালেন তিনি বাংলা বলতে পারেন না। নভেরা তাঁর প্রয়োজনীয় কথা বলতে গিয়ে বেরুলো বাংলা লিখতেও পারেন না তিনি। ওঁর বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক পাসপোর্টের মেয়াদ ফুরিয়ে গেছে। নতুন একটি পাসপোর্ট চাই। দরখাস্তের নির্দিষ্ট ফরমটি পূরণে ও সেটি তাড়াতাড়ি পেতে তিনি আমার সাহায্য প্রত্যাশী। নভেরা সত্য বললেন কিনা জানি না। আমার শুধু মনে হলো হায় শিল্পী, হায় শহীদ মিনার, হায় রাষ্ট্রীয় পুরস্কার। তিনি বললেন,

: আমি খুব অসুস্থ। তিন চারদিন পর অপারেশন। তার আগেই কি পাসপোর্টটি পেতে পারি?

: কেন নয়? অবশ্যই পাবেন।

: কাল দূতাবাসে আসব। বলে নভেরা চলে গেলেন।

নভেরা আসেননি। পরের সপ্তাহে ফোনে বললেন, শরীর ভাল নেই, পরে আসবেন। ফোন নম্বর দিলেন। এলেন এর প্রায় দেড় মাস পর। ১০ জুন। ফোন করে। এতটাই অসুস্থ চারতলায় আমার রুম অবধি আসার জোর নেই। নিচে নেমে এলাম। হাসনাতের উপন্যাসের সুবাদে নভেরা নায়িকা। বইয়ের প্রচ্ছদে শিল্পী ওঁর চুল বোধ করি চুড়ো করে বেঁধেছেন। নিচে নামতে নামতে সে রকম একটি ছবি এলো কল্পনায়। ভুলে যাওয়াটা উচিত হয়নি শিল্পীর যথেষ্ট বয়স হয়েছে আর তিনি অসুস্থও।

বাস্তবের নভেরা আমার ভাবনার মত নন। বয়সের ভারে ন্যুব্জ। ক্রাচে ভর দিয়ে তিনি উঠে দাঁড়ালেন। বসতে বললেও শুনলেন না। কাজের কথা ওঁর হয়ে গিয়েছিল আমার সহকারীর সাথে। দাঁড়িয়েই তিন চার মিনিট কথা বললাম আমরা। আলাপে মনে হলো নভেরা খুব ভদ্র।

প্রবাসী বাঙালিদের থেকে তিনি নিজেকে লুকিয়ে রাখতে চান। আমি এও জানতাম ওঁর সম্পর্কে আগ্রহে বিরক্ত হন। দু’একটি ক্ষেত্রে রাগও করেছেন। গেল মার্চে হাসনাত প্যারিসে ছিলেন। ইউনেস্কো সদর দপ্তরে ইনডিপেন্ডেনস ডে রিসেপশনে লেখকের দেখা পেয়েছিলাম আমরা। ওঁর ইচ্ছে ছিল নভেরার মুখোমুখি হবার। ফ্রান্সে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত জনাব তোফায়েল ক. হায়দারের সহযোগিতাও ছিল এ জন্যে। কিন্তু নভেরার [দিক] থেকে সাড়া ছিল না। স্বভাবতই সৌজন্যমূলক কথাবার্তা ছাড়া অন্য কোন বিষয়ে যাইনি। আমি জানি না নভেরা ওঁকে নিয়ে বিচিত্রার বা হাসনাতের সাধুবাদ প্রাপ্য পরিশ্রমের ব্যাপারে অবগত কিনা। যা ওঁকে আমাদের সাথে পরিচিত করেছে। হাজার হাজার শুভানুধ্যায়ী পেয়েছেন তিনি। রাষ্ট্রীয় পুরস্কার প্রাপ্তি তাঁর গোচরে এসেছে কিনা তাও আমার অজানা। সবিনয়ে জানাই এসব প্রকাশে আমার অনীহা ছিল। শিল্পী বাংলা জানেন না কিংবা না জানার ভান করছেন এই ক্ষোভে।

নভেরার বয়স এখন ষাটের মতো। প্রায় বছর চারেক আগে বিয়ে করেছেন স্থানীয় একজন এ্যানটিক ডিলারকে। স্বামী গ্রেগোয়া দ্য ব্রুনসের দোকান প্যারিস আট-এর পিয়ের ল্য গ্রঁ সড়কে। ওটিই নভেরার ঠিকানা। পাশেই একটি চার্চ। যতদূর জানা গেছে তিনি এখন আর ছবি আঁকেন না। খৃষ্ট ধর্মীয় নিদর্শন যেমন যীশুর মূর্তি, ক্রুশ ইত্যাদি বিক্রি করেন। ধর্মান্তরিত হয়েছেন কিনা তথ্য নেই। ওঁর আঁকা পেইন্টিং আছে দূতাবাসে মাননীয় রাষ্ট্রদূতের কামরায়। মুক্তিযুদ্ধ যাদুঘরের পক্ষ থেকে তাঁদের সংগ্রহে চিত্রকর্মটি পেতে আগ্রহ প্রকাশ করা হয়েছে।

নভেরা ভাল আছেন। শিল্পীর অগণিত ভক্তদের ওঁর সম্পর্কে জানানোর আগে তাঁকে আরেকবার স্বচক্ষে দেখা দরকার মনে হওয়ায় গেল ১৯ সেপ্টেম্বর হাজির হলাম নভেরার ডেরায়। রাত্রি তখন আসন্ন। দোকানে আলো জ্বলছিল। সেই আলোয় উদ্ভাসিত হয়ে আছেন তিনি কালো রংয়ের শাড়িতে। আরো দু’জন লোক ছিল। একজনকে মনে হলো খদ্দের। নভেরার মুখের প্রশান্তি বলছে সুস্থ হয়ে উঠেছেন তিনি। ওঁকে লাগছিল একটি সুখী কবুতরের মত। না, তাঁকে আমি বিরক্ত করিনি। দোকানের সামনে গাড়ির স্টিয়ারিংয়ে হাত রেখে সেকেন্ড বিশ শুধু এই দৃশ্যমালা দেখে মিশে গেলাম বুলভাঁ কুরসেলের গাড়ির অরণ্যে। দেশবিচ্ছিন্ন নভেরা যদি এভাবেই নিজের মধ্যে সুখ রচনা করে থাকেন তবে ওঁর স্বস্তি নষ্ট করা কেন।

তবে আমার দৃঢ় বিশ্বাস আমাদের নভেরা একদিন আমাদের মাঝে ফিরবেন। জীবিত বা মৃত তা একমাত্র প্রভুই জ্ঞাত। দীর্ঘদিন আছেন তিনি ফরাসী মুলুকে। এদেশের একটি পাসপোর্ট নিতে পারতেন তিনি। কিন্তু আজো সযত্নে বহন করে চলেছেন জন্মভূমির ছাড়পত্র। ওঁর শেষ ইচ্ছে বোধহয় জননীর কোলে ফেরা।

‘নভেরা’য় বলা হয়েছে ‘বিগার দেন লাইফ’। স্বদেশ এ সন্তানকে ফেরত তো চাইবেই তা সন্তান হয়তো জানেও না।

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

5 − 2 =