নরেন্দ্র মোদির ঢাকা সফর ৬ -৭ জুন:ঋণচুক্তি এবং ভিসা সহজ করার ঘোষণার সম্ভাবনা

Facebooktwittergoogle_plusredditpinterestlinkedinmail

04-Narendra-Modiভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি দুই দিনের সফরে ৬ জুন ঢাকায় আসছেন। এটি তাঁর প্রথম বাংলাদেশ সফর।
বাংলাদেশ ও ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় মঙ্গলবার আলাদা সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানায়,প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার আমন্ত্রণে নরেন্দ্র মোদি বাংলাদেশ সফর করবেন। এ সফরের মধ্য দিয়ে দুই দেশের চমৎকার সম্পর্ক আরও জোরদার হবে।এ সফরের সময় দুই প্রধানমন্ত্রী দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের সব কটি বিষয় নিয়ে আলোচনা করবেন।
২০১৩ সালের মে মাসে ভারতের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন মোদী। এর পর নরেন্দ্র মোদিকে বাংলাদেশ সফরের আমন্ত্রণ জানান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। মোদি তখনই বাংলাদেশে আসবার ইচ্ছা প্রকাশ করেছিলেন। কিন্তু সীমান্ত চুক্তি বাস্তবায়ন ও তিস্তা চুক্তি সইয়ের মতো অমীমাংসিত সমস্যার সুরাহা না করে তিনি ঢাকায় আসতে চাইছিলেন না। এ মাসের শুরুতে সীমান্ত চুক্তি বাস্তবায়নের জন্য ভারতের রাজ্যসভা ও লোকসভায় সংবিধান সংশোধনী বিল পাস হওয়ায় মোদির ঢাকা সফর নিশ্চিত হয়। এ সফরে তিস্তা চুক্তি সই না হলেও তিনি শিগগিরই চুক্তি সইয়ের ব্যাপারে বাংলাদেশকে আশ্বাস দিয়ে যাবেন।
এদিকে ভারতের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী রাজনাথ সিং গতকাল কলকাতায় এক সংবাদ সম্মেলনে বলেন, শিগগিরই ভারত ও বাংলাদেশ তিস্তার পানি বণ্টন চুক্তি সই করবে। রাজনাথ সিংকে উদ্ধৃত করে বার্তা সংস্থা পিটিআই এ খবর জানায়।
কূটনৈতিক সূত্রে জানা গেছে, নরেন্দ্র মোদির সফর ৬ ও ৭ জুন আয়োজনের জন্য ১৪ মে ভারতের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে বাংলাদেশকে অনুরোধ জানানো হয়। এ প্রস্তাবে সাড়া দিয়ে পরদিনই বাংলাদেশ এ সফর আয়োজনে সম্মতি জানায়।
নরেন্দ্র মোদির সফরের প্রস্তুতি হিসেবে গতকাল দুপুরে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করেন ঢাকায় ভারতীয় হাইকমিশনের কর্মকর্তারা। ওই আলোচনায় ভারতের প্রধানমন্ত্রীর খসড়া সময়সূচি নিয়ে দুই পক্ষ কথা বলে।
এদিকে মোদির সফরের সময় ভারতের সাবেক প্রধানমন্ত্রী অটল বিহারি বাজপেয়িকে মুক্তিযুদ্ধে বিশেষ অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে স্বাধীনতা সম্মাননা দেওয়া হবে। রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদের কাছ থেকে বাজপেয়ির পক্ষে সম্মাননা নেবেন নরেন্দ্র মোদি। সম্মাননা দেওয়ার বিষয়টি চূড়ান্ত করতে গতকাল মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী আ ক ম মোজ্জামেল হকের সভাপতিত্বে তাঁর দপ্তরে এক সভা অনুষ্ঠিত হয়।
কূটনৈতিক সূত্রে জানা গেছে, ভারতের প্রধানমন্ত্রীর এ সফরের মধ্যে দুই দেশের মধ্যে বেশ কয়েকটি চুক্তি ও সমঝোতা স্মারক সইয়ের প্রস্তুতি নিচ্ছে দুই দেশ। সহযোগিতাকে আরও নিবিড় করতে এবার প্রথমবারের মতো প্রকল্প বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত হবে।
খসড়া সফরসূচি: পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে শীর্ষ বৈঠক এবং রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎসহ নরেন্দ্র মোদির খসড়া সফরসূচি নিয়ে দুই পক্ষ আলোচনা শুরু করেছে। খসড়া সূচি অনুযায়ী, নরেন্দ্র মোদি ৬ জুন সকালে ভারতীয় বিমানবাহিনীর বিশেষ বিমানে ঢাকায় আসবেন। ওই দিনই তিনি মুক্তিযুদ্ধে শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে সাভারে জাতীয় স্মৃতিসৌধে যাবেন। এরপর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে ধানমন্ডিতে বঙ্গবন্ধু স্মৃতি জাদুঘর পরিদর্শন করবেন। বিকেলে তিনি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে তাঁর কার্যালয়ে শীর্ষ বৈঠক করবেন। সন্ধ্যায় হোটেল সোনারগাঁওয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দেওয়া নৈশভোজে যোগ দেবেন মোদি।
পরদিন ৭ জুন সকালে নরেন্দ্র মোদির ঢাকেশ্বরী মন্দির পরিদর্শনের কথা রয়েছে। এরপর তিনি বারিধারা কূটনৈতিক জোনের দূতাবাস সড়কে ভারতীয় হাইকমিশনের নতুন চ্যান্সেরি ভবনের উদ্বোধন করবেন। পরে তিনি বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক নিয়ে জনবক্তৃতা দেবেন।
সংসদে বিরোধীদলীয় নেতা রওশন এরশাদ ও বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া ভারতের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে হোটেল সোনারগাঁওয়ে সৌজন্য সাক্ষাৎ করবেন। রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদের সঙ্গে বঙ্গভবনে সৌজন্য সাক্ষাৎ করবেন নরেন্দ্র মোদি। ৭ জুন সন্ধ্যায় মোদি ঢাকা ছাড়বেন।
সফরের প্রস্তুতির সঙ্গে যুক্ত কর্মকর্তারা বলছেন, এখন পর্যন্ত নরেন্দ্র মোদির সফরে এসব কর্মসূচি রয়েছে। সফরের আগের দিন পর্যন্ত সফরসূচিতে পরিবর্তন আসতে পারে।
যা সই হবে: দুই দেশের মধ্যে স্বাক্ষরের জন্য উপকূলীয় জাহাজ চলাচল চুক্তি, দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য চুক্তি নবায়ন, অভ্যন্তরীণ নৌ প্রটোকল নবায়ন, সামুদ্রিক অর্থনীতি, জলবায়ু পরিবর্তন, দুর্যোগ মোকাবিলা, শিক্ষা, সংস্কৃতি, দুই দেশের মান নিয়ন্ত্রণ সংস্থার মধ্যে সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) চূড়ান্ত করার প্রস্তুতি চলছে। এর মধ্যে বাণিজ্য ও নৌ প্রটোকল চুক্তি এবার প্রতি পাঁচ বছর পর আপনা-আপনি নবায়নের বিধান রাখা হয়েছে। এখন নবায়নের ক্ষেত্রে সমস্যা তৈরি হওয়ায় দুই দেশ চুক্তিগুলো আপনা-আপনি নবায়নের নতুন ধারা যুক্ত করেছে। এ ছাড়া নতুন চুক্তি উপকূলীয় জাহাজ চলাচল ও নবায়িত নৌ প্রটোকলে সেবার মাশুল (সার্ভিস চার্জ) আদায়ের কথা বলা হচ্ছে। বাণিজ্য ও ট্রানজিট সেবা ব্যবহারের পরিপ্রেক্ষিতে সার্ভিস চার্জ যুক্ত করা হচ্ছে।
দুই নিকট প্রতিবেশীর সম্পর্ককে আরও জোরালো অর্থনৈতিক ভিত্তি দেওয়ার ওপর জোর দিতে চায় দুই দেশ। এরই অংশ হিসেবে নতুন একটি ঋণ চুক্তি সইয়ের কথা রয়েছে। ঋণ চুক্তির আওতায় যোগাযোগ অবকাঠামো ও সামাজিক উন্নয়ন খাতের প্রকল্প গ্রহণের ওপর জোর দেবে বাংলাদেশ। ঋণ চুক্তির পরিমাণ কত হবে, সেটি চূড়ান্ত না হলেও তা দেড় শ কোটি টাকার মতো হতে পারে বলে ধারণা দিয়েছেন অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের কর্মকর্তারা। এ সফরের সময় বাংলাদেশে বাণিজ্য ও বিনিয়োগ বাড়াতে ভারতকে একটি বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল নির্দিষ্ট করে দেওয়ার বিষয়ে আলোচনা হবে।
ভিসা সহজ করার ঘোষণা: আকাশপথে বাংলাদেশ থেকে ভারত যাওয়ার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের পর্যটকদের জন্য অন-অ্যারাইভাল ভিসা দেবে ভারত। তবে সড়ক ও রেলপথে এ সুবিধা থাকবে না।
প্রথম আলোর নয়াদিল্লি প্রতিনিধি জানান, সম্প্রতি দিল্লিতে বাংলাদেশ-ভারত মৈত্রি সংলাপের সময় ভারতের পররাষ্ট্রসচিব এস জয়শঙ্কর বাংলাদেশের জন্য ভিসা সহজ করার ঘোষণা আসছে বলে উল্লেখ করেন। ঢাকা সফরের সময় জনবক্তৃতায় নরেন্দ্র মোদি ভিসা সহজ করার কথা ঘোষণা করতে পারেন।
ভারতীয় ই-ট্যুরিস্ট ভিসার ওয়েবসাইট থেকে জানা যায়, ইলেকট্রনিক ভিসা পদ্ধতিতে অন-অ্যারাইভাল ভিসার আবেদনের সময় ক্রেডিট কার্ড কিংবা ডেবিট কার্ডের মাধ্যমে ৬০ মার্কিন ডলার ভিসা ফি দিতে হবে। আবেদনের চার দিন পর ভারতে প্রবেশ করা যাবে। যাত্রীকে ভিসার আবেদনের মুদ্রিত কপি বিমানবন্দরে দেখাতে হবে। নির্ধারিত বিমানবন্দরগুলো হচ্ছে কলকাতা, দিল্লি, মুম্বাই, হায়দরাবাদ, কোচিন, গোয়া, ব্যাঙ্গালুরু ও ত্রিবান্দ্রাম। ভারতে প্রবেশের পর থেকে ৩০ দিন পর্যন্ত ভিসার মেয়াদ থাকবে। বর্তমানে ৭৬টি দেশের নাগরিকদের জন্য ভারতে অন-অ্যারাইভাল ভিসা দেওয়া হয়। এ বছরের মধ্যে এ সংখ্যা ১৫০-এ উন্নীত হবে।

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

thirteen − 4 =