নাসিরুদ্দিন ইউসুফ বাচ্চু আর খান আতা, কিছু প্রশ্ন কিছু কথা

Facebooktwittergoogle_plusredditpinterestlinkedinmail

সামাজিক মাধ্যমে বিতর্কের ঝড়, পুরনো ইস্যু নিয়ে । এবার লাইমলাইটে একাত্তরের তরুণ মুক্তিযোদ্ধা, বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক অঙ্গন যোদ্ধা ও নেতৃত্ব প্রদানকারী নাট্যশিল্পী নাসিরুদ্দিন ইউসুফ বাচচু (দুর্জনেরা নাকি পশ্চাতে তাকে ‘সাংস্কৃতিক মাফিয়া’ বলেও সম্বোধন করে)।

নাসিরুদ্দিন ইউসুফ বাচচু ফেসবুক তার নিজ দেয়ালে লিখেছেন, ”বিশিষ্ট চলচ্চিত্র নির্মাতা ও সংগীত পরিচালক খান আতাউর রহমান ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে অংশ গ্রহনে অপারগ ছিলেন। যে ৫৫ জন বুদ্ধিজীবী ও শিল্পী ১৯৭১ -এর ১৭মে মুক্তিযুদ্ধকে “আওয়ামী লীগের চরম পন্থীদের কাজ” বলে নিন্দাসূচক বিবৃতি দিয়েছিলেন দু:খ জনক ভাবে খান আতাউর রহমান তার ৯ নম্বর স্বাক্ষরদাতা ছিলেন। ১৭মে ১৯৭১ দৈনিক পাকিস্তান পত্রিকা দ্রষ্টব্য”।

তিনি লিখেছেন ” ১৯৭২ সালে বাংলাদেশ সরকার ড.নীলিমা ইব্রাহীম কে প্রধান করে ৬ সদস্যের কমিটি গঠন করেছিলেন রেডিও টেলিভিশনে পাকিস্তানীদের প্রচার কার্যে সহযোগিতাকারীদের সনাক্ত করার জন্য। ১৯৭২ -এর ১৩মে নীলিমা ইব্রাহীম কমিটি যে তালিকা সরকারকে পেশ করেন সে তালিকায় ৩৫ নম্বর নামটি খান আতাউর রহমানের ।”

তিনি লিখেছেন, ”* একথা অনস্বীকার্য যে খান আতাউর রহমান একজন গুণী শিল্পী। তার সৃষ্টিশীলতা নিয়ে কোন প্রশ্ন নাই। মুক্তিযুদ্ধপূর্ব কালে তাঁর চলচ্চিত্র সমূহ আমাদের ঋদ্ধও উজ্জীবিত করেছে । যেমন “সোয়ে নাদীয়া জাগো পানি” “নবাব সিরাজদৌলা” সহ অনেক চলচ্চিত্র। কিন্তু মুক্তিযুদ্ধের সময় তাঁর ভূমিকা প্রশ্নবিদ্ধ। তিনি পাকিস্তানের সমর্থক ছিলেন এবং তা তাঁর রাজনৈতিক সিদ্ধান্তে ।”

তারপর তিনি যোগ করেছেন, ”অনেকের মনে প্রশ্ন উদ্রেক হয়েছে যে ৭১ সালে ১৬ ডিসেম্বর অব্যহতিতে কেন আমি বা আমরা তাঁকে রক্ষা করেছিলাম। কারণ খান আতাউর রহমান কোন প্রকার মানবতা বিরোধী কর্মে লিপ্ত ছিলেন না;  যদিও পাকিস্তানীদের সমর্থনে রেডিও টেলিভিশনে অনুষ্ঠান করেছেন।আর খান আতাউর রহমান একজন শিল্পী এবং ৯মাসে তাঁর কর্ম সম্পর্কে আমরা অবহিত ছিলাম না। তাছাড়া আমরা এও ভেবেছি ইচ্ছায় হোক অনিচ্ছায় হোক অনেকে পাকিস্তানীদের পক্ষাবলম্বন করেছে। আমরা তা বিচারের এখতিয়ার রাখি না”।

”তাছাড়া মুক্তিযোদ্ধাদের এ কথা বাধ্যতামূলক ভাবে মানতে বলা হয়েছিল যে কোন অবস্থাতেই যুদ্ধোত্তর সময়ে কাউকে ক্ষতি বা আঘাত করা যাবেনা । বিচারিক প্রক্রিয়ায় দোষী সাব্যস্তদের বিচার করাহবে রাষ্ট্রীয়ভাবে। মুক্তিযোদ্ধারা সেই আদেশ পুরোপুরি ভাবে মেনেছিলো বিধায় যুদ্ধোত্তর কালে প্রাণহানির ঘটনা উল্লেখযোগ্য ভাবে কম হয়েছিল। * আমার মূল বক্তব্যে নয় এক প্রশ্নের উত্তরে ইতিহাসের দায় থেকে আমি খান আতাউর রহমান সম্পর্কে উক্তিটি করেছিলাম। সবশেষে আবারো বলছি খান আতাউর রহমান একজন সৃষ্টিশীল মানুষ , কিন্তু ১৯৭১ সালে তিনি দেশ ও মানুষের পাশে দাঁড়াতে ব্যর্থ হয়েছিলেন। ব্যক্তিগত ভাবে আমার তার বিরুদ্ধে কোন অভিযোগ নাই । শিল্পী হিসাবে তাঁর প্রশংসা করি, কিন্তু মুক্তিযুদ্ধকালে তার ভূমিকার সমালোচনা তো করতেই পারি”।

এছাড়া চোখে পড়লো নায়ক ফারুকের প্রতিবাদলিপি, ”খান আতা সাহেব কলকাতা যেতে পারেননি। এক কোটি মানুষ গিয়ে সেখানে আশ্রয় নিয়েছেন। তারা তো মুক্তিযোদ্ধা নয়। তার মানে তারা কি রাজাকার? যুদ্ধের সময় তাকে রাখা হয়েছিলো গান পয়েন্টে। সেই অবস্থায় তাকে দিয়ে টিভিতে প্রোগ্রাম করানো হয়েছে। শুধু তাকে নয়, আরো অনেককেই এভাবে রাখা হয়েছিলো। আমরা তো তাদের নিয়ে সমালোচনা করি না। আমরা তাদের উদারতার কথা বলি। যাদের বুদ্ধিজীবী বলা হয়েছে, তাদের অধিকাংশ দেশেই কর্মরত ছিলো। যুদ্ধের পরে তাদের হত্যা করা হয়েছিলো। কিন্তু খান আতা বাসায় থাকতেন না বলে বেঁচে গিয়েছেন।

‘তুই আগে মানুষ হ’-এই কথাটি খুবই আপত্তিকর। একজন ভদ্র মানুষ যদি তিনি (নাসিরউদ্দীন ইউসুফ বাচ্চু) হয়ে থাকেন, তার মুখ থেকে এ ধরনের বাক্য বের হওয়ার কথা নয়। বাচ্চু সাহেব আপনি ভুলে যাবেন না, এমন একজন মানুষকে নিয়ে আপনি মন্তব্য করেছেন, এতে আমাদের অঙ্গনের সব মানুষকে দুঃখ দেয়া হয়েছে।’’ ( http://www.risingbd.com/entertainment-news/243060)

এবং সামাজিক মাধ্যমে পক্ষে বিপক্ষে পোস্টের পর পোস্ট । সেই স্রোতের টানে একাত্তরের ঘাতক ও দালালেরা কে কোথায়. (সম্পাদনায়-. শাহরিয়ার কবির. আহমদ শরীফ. কাজী নূর-উজ-জামান মুক্তিযুদ্ধ চেতনা বিকাশ কেন্দ্র) বইতে পড়েছিলাম প্রকাশিত হবার পর পর ই , তারপর আজ আবার সেটা নিয়ে বসলাম। নীলিমা ইব্রাহীম কমিটির তালিকা পাঠকদের সামনে  তুলে ধরছি । বিবৃতিদাতাদের তালিকার  আগে তাদের  বিবৃতিটি তুলে ধরছি পাঠকদের জন্যে  :


এবারে দেখা যাক কারা সেখানে স্বাক্ষর দিয়েছিলেন ? তাঁরা কি সকলেই দেশ ও মানুষের পাশে দাঁড়াতে ব্যর্থ হয়েছিলেন ? মুক্তিযুদ্ধের সময় বা মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে এদের সকলের ভূমিকা ই কি প্রশ্নবিদ্ধ ? নাসিরুদ্দিন ইউসুফের এহেন  ঢালাও উপসংহার পরবর্তী প্রজন্মের জন্যে কতখানি দায়িত্বশীল ?

এই বিবৃতির প্রেক্ষিতে কয়েকজন মুখ খুলেছিলেন, কয়েকজন কিছু বলেননি; আর চিহ্নিত দালালরা ভ্রূক্ষেপহীন ছিল ।

 

বেতার টেলিভিশন শিল্পী কলাকুশলীদের ওপরেও নীলিমা ইব্রাহিম কমিটি রিপোর্ট ও তালিকা প্রদান করে, যেখানে একটি তালিকার শিল্পীদের কয়েক মাস পরে আবার পেশাতে ফিরতে পারার মত সংযুক্ত থাকে ।

 

”আমি হাউমাউ করে কাঁদছিলাম, আর বলছিলাম আমাকে মেরো না, আমি সুইপার, আমাকে মেরে ফেললে তোমাদের পায়খানা ও নর্দমা পরিষ্কার করার কেউ থাকবে না, তোমাদের পায়ে পড়ি তোমরা আমাকে মেরো …না..” রাজারবাগ পুলিশ লাইনের সেই মহিলার উক্তির সাথে আমরা সংশ্লিষ্টরা কমবেশি পরিচিত !

একাত্তরের সেই নয় মাস ভারতে যারা পেরেছে আশ্রয়ের জন্যে ছুটে গেছে, সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ এদেশের মাটিতে ছিল । বাংলাদেশের বেশিরভাগ মানুষ মুক্তিযুদ্ধ করেছিল, কেউ মুক্তিযোদ্ধা হয়ে, কেউবা পাশে থেকে, কেউবা চেতনা অন্তরে লালন করে প্রাণ হাতে করে অফিস কাচারী কুলি মজুরি করে, হাটে মাঠে থেকে, কেউ রেঁধে বেড়ে, কেউ ঘরে জায়গা দিয়ে, কেউবা মসজিদ – মন্দির – গির্জাতে আশ্রয় দিয়ে, নাহলে দেশ স্বাধীন হতে পারতোনা।

দেশের দুর্ভাগ্য স্বাধীনতার পর বহু কাল একই দেশের মাটিতে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের আর বিপক্ষের শক্তি অবস্থান করে যাচ্ছে । আজ কুখ্যাত যুদ্ধাপরাধী ও মানবতাবিরোধী নেতৃবর্গের সংখ্যাগরিষ্ঠরাই ফাঁসিতে ঝুলেছে, কেউ যাবজ্জীবন গরাদের ভেতরে । অনেক মূল্য দিয়ে তারুণ্য, জনগণ ও বাংলাদেশের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বাংলাদেশের ত্যাগকে মহিমান্বিত করেছেন।

মুক্তিযোদ্ধাদের সম্মান ভাতা বেড়েছে, আবার তাদের কেউ কেউ বিনা চিকিৎসায়, বিনা ভাতায় মারা যাচ্ছেন, বীরাঙ্গনা দের  অনেকে ‘মুক্তিযোদ্ধা’ খেতাব পেয়েছেন, অনেকে দুর্নীতির চাকায় জিম্মি হয়ে এখনো ‘মুক্তিযোদ্ধা খেতাবের’ স্বপ্ন দেখছেন -মরার আগে আর তাদের  আর কিছু চাওয়ার নাই !

যুদ্ধাপরাধী রাজনৈতিক দল নিবন্ধন হারিয়েছে কিন্তু নিষিদ্ধ নয় এখনো । কুখ্যাত যুদ্ধাপরাধী ও মানবতাবিরোধী নেতৃবর্গের পরিবার রাজনীতিতে সক্রিয়। জঙ্গিবাদ, ধর্মান্ধতা, ধর্মীয় উন্মাদনা, সাম্প্রদায়িকতা বাড়ছে ! মানুষ স্বাধীনভাবে নিজের মত নিয়ে বাঁচতে ভয় পায় ; ‘৭২ র সংবিধানের ধর্মনিরপেক্ষতা এখন রূপকথা !

নাসিরুদ্দিন ইউসুফদের মতো ব্যক্তিত্বের কাছে মানুষ প্রমানসাপেক্ষ যুক্তিনির্ভর কথা আশা করে । কারণ তারা সমাজের বিবেক, তাদের সামান্য হেলাফেলা প্রজন্মকে দিকভ্রান্ত করে ফেলতে পারে-  দ্বিখণ্ডিত করে দিতে পারে !

আমরা বিশ্বাস করতে চাই একজন রাজাকার যেমন সকল সময়ে রাজাকার,  তেমনি একজন মুক্তিযোদ্ধা সকল সময়ে মুক্তিযোদ্ধা হয়েই সজাগ থাকুন । তা নাহলে সময় পেলেই জাতির পতাকা খামচে ধরবে পুরানো শকুন !

জ .শ.তিমির

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

5 × 3 =