নির্বাহী সম্পাদকের সাপ্তাহিক কলাম

Facebooktwittergoogle_plusredditpinterestlinkedinmail

বদদ্ধং, সং বো মনাংসি, জানতাম এক হয়ে চলব, এক হয়ে বলব, সকলের মনকে এক বলে. জানব। ওয়ান ক্লিক অনলাইনের যুগে অতীতের যেকোনো সময় থেকে বর্তমানে বাংলাদেশ ও পার্শ্ববর্তী দেশগুলিতে ধর্মীয় উদ্দীপনা ও ধর্মীয় উন্মাদনা রাজনীতিতে, সমাজে, সংস্কৃতিতে ও গণমানসে এমন কি শিশু তরুণ সম্প্রদায়ের মধ্যেও পরম সোৎসাহে ব্যাপক আবাদ হচ্ছে । মুখে ও মননে ইদানিং বিশাল ফারাক, কি বিশ্বাসী কি অবিশ্বাসী উভয় সম্প্রদায়ের অধিকাংশের মধ্যে জ্ঞান আর যুক্তির চাইতে উগ্রতার চাষাবাদ অধিক ।

ধর্মীয় কুসংস্কার, অন্ধত্ব, সংকীর্ণতা, সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে সক্রিয় শক্তি সময়ের বিচারে বর্তমানে বিচ্ছিন্ন, স্থবির প্রায়, যদিও ইতিবাচকতার দূরবীন বলে লড়াকু মানুষ ছিল, আছে ।

আমাদের যার যার অবস্থান থেকে যা যা জানি তা জানাবো, যা যা জানিনা তা শুনবো, হোক সে বারবার, এই বোধ একটা দিয়াশলাই কাঠি রূপ, যে কোনো অন্ধকারে হয়তোবা এক চিলতে আলো জ্বালবে। আজ থাকছে সে সূত্রের এক আলোচিত আলোকিত মানুষের কথা ।

১৮৩১ র ২৬ মতান্তরে ২৩ শে ডিসেম্বর তার মৃত্যু হয়। গীর্জা ও খ্রিস্টধর্ম সম্পর্কে তাঁর অভিমতের কারণে কলকাতার সাউথ পার্ক স্ট্রিটের খ্রিস্টান গোরস্থানে তাঁকে সমাহিত করতে বাঁধা দেওয়া হয়। গোরস্থানের ঠিক বাইরে তাঁকে সমাহিত করা হয়।

জন্ম সূত্রে বাঙালি না হলেও বাঙালিদের সঙ্গে মনে প্রাণে জড়িয়ে ছিলেন তিনি। ডিরোজিও (১৮০৯-১৮৩১ খ্রি.) অ্যাংলো ইন্ডিয়ান হলেও ভারতবর্ষকে জন্মভূমির মতো ভালোবাসতেন । তাই তিনি ভারতমাতাকে বন্দনা করেই “To India—my native land” কবিতাটি লিখেছিলেন । ডিরোজিও -র অনুগামীরা ‘নব্যবঙ্গ’ বা Young Bngal নামে পরিচিত ছিলেন । একাধারে শিক্ষক, কবি, সাংবাদিক এই মানুষটি তাঁর উপলব্ধি আর কর্মোদ্যমে বদলাতে চেয়েছিলেন সমাজটাকে। তার পরিণামে জুটেছিল অপমান, তাচ্ছিল্ল্য আর দারিদ্রতা।

সেকেলে রক্ষণশীল বাঙালির কাছে তিনি ছিলেন ‘দ্রজু ফিরিঙ্গি’। তিনি উনিশ শতকের বাংলার নবজাগরণের এক অবিস্মরণীয় নাম হেনরি লুই ভিভিয়ান ডিরোজিও। বহু যুগের কুসংস্কার আর ধর্মান্ধতার বিরুদ্ধে বদ্ধ, জীর্ণ এই সমাজে তিনি ঝড় তুলেছিলেন।

হেনরির জন্ম ১৮০৯-এর ১৮ এপ্রিল কলকাতার মৌলালি অঞ্চলে এক ইউরেশীয় পরিবারে। তাঁর বাবার নাম ফ্রান্সিস, মা সোফিয়া। মাত্র ছ’বছর বয়সে মাতৃহারা হয়েছিলেন হেনরি। পরে তাঁর বাবা আনা মারিয়া নামে এক ইংরেজ মহিলাকে বিবাহ করেন। আনার নিজের সন্তানাদি না থাকায় সতীনের সন্তানদের নিজের ছেলে মেয়ের মতোই দেখতেন।

শোনা যায় হেনরি বেশ সচ্ছল পরিবারে জন্মেছিলেন। পোশাকে কিংবা সাজসজ্জায় তিনি সব সময়ে পরিপাটি থাকতেন। মাথার মাঝখানে সিঁথি, সচরাচর টুপি পরতেন না। এটাই তাঁর পরিচিত ছবি। শীতকালে ময়দানে ক্রিকেট খেলতেন বন্ধুদের সঙ্গে, আর ছিল ঘোড়ায় চড়ার শখ।

মাত্র ১৪ বছর বয়সে ডিরোজিও শিক্ষা জীবন শেষ করে উচ্চতর বিদ্যার্জনে না গিয়ে কর্মজীবনে প্রবেশ করেন। তবে শিক্ষকতা দিয়ে তার কর্মজীবন শুরু হয়নি। প্রথমে তার বাবা যে কোম্পানিতে কাজ করতেন সেখানে যোগ দেন। কিন্তু এ কাজ তার বেশি দিন ভালো লাগেনি। এর পর তিনি ভাগলপুরের নীল দফতরে যোগদান করেন।

এখানেই শুরু হয় তার কাব্য চর্চা। তার কবিতা রচনায় প্রধান উৎসাহদাতা ছিলেন ‘দ্য ইন্ডিয়া গ্যাজেটে’-এর সম্পাদক ডক্টর জন গ্রান্ট। ডিরোজিও ‘জুভেনিস’ ছদ্মনামে লিখতেন। ১৮২৮-য় প্রকাশিত হয় ‘দ্য ফকির অফ জঙ্ঘীরা, এ মেট্রিকাল টেল; অ্যান্ড আদার পোয়েমস’। এর পাশাপাশি চলতে লাগল তার নিজের পড়াশুনা। ক্রমেই তিনি নানা বিষয়ে পাণ্ডিত্য অর্জন করেছিলেন।

এর পরে ডিরোজিও ভাগলপুর থেকে কলকাতায় এসেছিলেন মূলত ডক্টর গ্রান্টের সহায়তায়। ১৮২৬ নাগাদ, তিনি কলকাতায় দুটি চাকরি পেয়েছিলেন। প্রথমটি ‘দ্য ইন্ডিয়া গ্যাজেটে’-এর সহ সম্পাদক হিসেবে, দ্বিতীয়টি হিন্দু কলেজে শিক্ষকতার। তার পাণ্ডিত্য ও মেধার জন্যই কলেজের খ্যাতি ও গৌরব বেড়েছিল।

ডিরোজিও মাত্র সতেরো বছর বয়সে শিক্ষকতা শুরু করেছিলেন। ছাত্রদের সঙ্গে তাঁর বয়সের ব্যবধান ছিল খুব কম। কেউ কেউ ছিলেন তাঁর সমবয়সী। তাঁর প্রত্যক্ষ ছাত্রদের মধ্যে ছিলেন দক্ষিণারঞ্জন মুখোপাধ্যায়, রামগোপাল ঘোষ, প্যারীচাঁদ মিত্র, রাধানাথ শিকদার, রামতনু লাহিড়ী, শিবচন্দ্র দেব, দিগম্বর মিত্র, গোবিন্দচন্দ্র বসাক। তেমনই হরচন্দ্র ঘোষ, কৃষ্ণমোহন বন্দ্যোপাধ্যায় ও রশিককৃষ্ণ মল্লিক ছিলেন তাঁর ভাবশিষ্য। তবে শিক্ষাদানকে ডিরোজিও কেবল মাত্র ক্লাসরুমের মধ্যে আবদ্ধ করে রাখেননি। ক্লাসের বাইরে তাঁর বাড়িতে কিংবা অন্যত্র তাঁরা মিলিত হতেন। তাই তিনি হয়ে উঠেছিলেন ছাত্রদের ‘friend philosopher and guide’।

সাংবাদিক রূপেও ডিরোজিয়োর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। ‘দি ইস্ট ইন্ডিয়ান’ নামে  ইংরেজি দৈনিক সংবাদপত্র সম্পাদনা করতে শুরু করেন। সে সময় তিনি তাঁর কিছু তরুণ হিন্দু শিষ্যকে সাংবাদিকতা পেশা গ্রহণে এবং এ গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম ব্যবহার করে তাঁদের প্রগতিবাদী ধারণাগুলি প্রচার করতে উৎসাহিত করেন।

এভাবে ১৮৩১সালের মে মাসে কৃষ্ণমোহন বন্দোপাধ্যায় ‘দি ইনকোয়ারার’ নামে একটি ইংরেজি সাপ্তাহিক পত্রিকা এবং পরের মাসে দক্ষিণারঞ্জণ মুখোপাধ্যায় ও রসিক কৃষ্ণমল্লিক ‘জ্ঞানাম্বেষণ’ নামে বাংলায় (পরে ইংরেজিতেও) একটি সংবাদপত্র প্রকাশ করতে শুরু করেন। দৃশ্যত ডিরোজিওর নির্দেশনায় এসব পত্রিকার মাধ্যমে তরুণ প্রগতিবাদীরা হিন্দু রক্ষণশীলতার বিরুদ্ধে তীব্র আক্রমণ চালান।

প্রমথনাথ বিশী তাঁর এক গ্রন্থে লিখেছেন, ‘তখন হিন্দু কলেজের আবহাওয়া কেমন ছিল? অনেকের ধারণা তখনকার আবহাওয়া খ্রিস্টধর্মের অনুকূল ছিল। অন্তত: তা নয়। হিন্দু কলেজের সবচেয়ে প্রভাবশালী অধ্যাপক ছিলেন ডিরোজিও। তিনি ছিলেন নাস্তিক। আর তখনকার দিনে ইংরেজী শিক্ষিত সমাজে হেয়াব সাহেবের অগাধ প্রতিপত্তি ছিল; তিনিও চাইতেন না যে, ছেলেরা খ্রীস্টান হয়। একবার কয়েকজন ছেলে কোন পাদ্রীর কাছে গিয়ে বাইবেল উপহার নিয়ে এসেছিল। হেয়ার তা জানতে পেরে তাদের বাইবেল কেড়ে নিয়ে বেতমেরে শাসন করে দেন। খ্রীস্টান করা যাদের উদ্দশ্য তারা নিশ্চয় এমন কাজ করতেন না।’

উনিশ শতকের প্রথম ফরাসী বিপ্লবের বাণী এ দেশে দোলা দেয়। আর সে নাস্তিক্যবাদী বিশ্বাসে গড়ে ওঠে এ্রদেশের যুবসমাজ যারা ইংরেজী শিক্ষায় শিক্ষিত। পুরাতনের প্রতি সন্দেহ, সংশয় ইত্যাদি তীব্র হয়ে দেখা দিয়েছে।

প্যারীচাঁদ মিত্র ওরফে টেকচাঁদ ঠাকুর তাঁর ‘ডেভিড সাহেবের জীবন চরিত’ প্রবন্ধে লিখেছেন, ‘হিন্দু কলেজে যত শিক্ষক ছিল তাহাদিগের মধ্যে ডিরোজিও কৌশলক্রমে উৎকৃষ্ট শিক্ষা দিতেন, এজন্য কতিপয় শিষ্য অবকাশ পাইলে তাঁহার নিকটে যাইত। তাঁহার শিক্ষার এই ফল দর্শিল যে, ছাত্ররা ধর্ম জ্ঞান বিষয়ে অনেক উন্নতি লাভ করিল কিন্তু হিন্দুধর্মের প্রতি তাহাদিগের বিদ্বেষ বৃদ্ধি পাইতে লাগিল। অখাদ্য ভোজন, অপেয় পান আর হিন্দু ধর্মের নিন্দা ও বিদ্রƒপ অনেক পরিবারে প্রকাশ পাইল। কলেজের কমিটি বৈঠক করিয়া ডিরোজিও সাবেবকে বিদায় করিলেন। কালেতে হেয়ার সাহেবের পরোপকারিতা ছাত্রদিগের হৃদয়ে কৃতজ্ঞতার বৃদ্ধি করিতে লাগিল।’

প্রাচীন চিন্তাধারার সঙ্গে নবীন চিন্তাধারার দ্বন্দ্ব উপস্থিত হলো। প্রাচীন সতীদাহ প্রথাকে কুসংস্কারাচ্ছন্ন বলে নবীনেরা মত প্রকাশ করল। ধর্মের যাবতীয় প্রথার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করল তরুণেরা। এক দল সতীদাহ প্রথার অমানুষিকতা অনুধাবন করেও যেমন তার পক্ষপাতিত্ব করতে থাকেন, অপর দল তেমনি সতীদাহ প্রথা তথা হিন্দুধর্মের সবরকমের প্রাচীনত্বকে রূঢ় ভাবে আক্রমণ করে। হিন্দু কলেজের শিক্ষিত যুবকেরা এমন সব কাজ করতে থাকে যা থেকে সমাজে একটা আলোড়ন উপস্থিত হয়।

রাজা রামমোহন রায় যে আন্দোলনের বীজমন্ত্র উচ্চারণ করেছিলেন হিন্দু কলেজে তা বিকাশ লাভ করে। ইয়ং বেঙ্গল ছাত্রগোষ্ঠীর উচ্ছৃঙ্খলতা এবং ধর্মবিরোধী মনোভাবের যথার্থ পরিবর্তন ঘটিয়েছিলেন রাজা রামমোহন রায়। তাঁর ব্যক্তিত্বগুণে এসব হিন্দু ছাত্রসমাজ খ্রীস্টান ধর্মমুখী না হয়ে নিজেদের ধর্মকে সংস্কার করার কাজে ব্রতী হয়েছিল। ব্রাহ্মধর্ম এসব ছাত্রদের পাশ্চাত্যাভিমুখী থেকে মুখ ফিরিয়ে প্রাচ্যমুখী করে দিয়েছিল। রামমোহন তার প্রতিভা বলে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। এসব ছাত্র দর্শন, সাহিত্য, শিল্প-সংস্কৃতিতে নিজেদের ব্যক্তিত্বের বিকাশ করেছিল।

ডিরোজিও’র শিষ্যরা সাময়িকভাবে সব সমাজের অন্ধতা, শূন্যতা ও ভন্ডামির জন্য সমাজকে সাময়িকভাবে উচ্চকিত করেছিলেন; কিন্তু তারচেয়েও বেশি তাঁরা জ্ঞান ও মুক্ত বুদ্ধির সাধনা করেছিলেন। পরবর্তীকালে এঁরা সকলেই নিজেদের ক্ষেত্রে ভাস্বর নক্ষত্রের দ্যুতি বিচ্ছুরণ করেছেন।

ডেভিড হিউম ও জেরেমি বেনথামের যুক্তিবাদী দর্শন ও টমাস পেইনের মতো প্রগতিবাদী চিন্তাবিদদের প্রভাবে তাঁরা সবকিছুই যুক্তির মাপকাঠিতে বিচার করতে শুরু করেন। ধর্মের প্রতি তাঁদের মনোভাব ছিল ভল্টেয়ারের মতো।

ডিরোজিওর বিরুদ্ধে গোঁড়া হিন্দু পরিবার থেকে আগত ছাত্রদের অধিকাংশের মধ্যে ধর্ম বিষয়ে প্রচলিত মতের বিরুদ্ধ বিশ্বাস সৃষ্টির অভিযোগ করা হয়।

ব্যাপারটা রাধাকান্ত দেব-এর (১৭৮৪-১৮৬৭) নেতৃত্বে রক্ষণশীল হিন্দুদের কর্তৃত্ত্বাধীন হিন্দু কলেজের ব্যবস্থাপনা পরিষদের নজরে আনা হয়। ১৮৩১ সালের এপ্রিল মাসে ডিরোজিওকে হিন্দু কলেজ থেকে বরখাস্ত করা হয়।

হিন্দু কলেজে অধ্যাপনার কাজে ইস্তফা দিলেও থেমে যায়নি তার জীবন সংগ্রাম। এ সবের মাঝেই চলতে লাগলো ‘ইস্ট ইন্ডিয়া’ পত্রিকা সম্পাদনার কাজ। থেমে যায়নি ধর্মান্ধতা, অন্ধবিশ্বাস আর ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে তাঁর লেখালেখি। কিন্তু পত্রিকার ব্যায়ভার বহন করা সহজ ব্যাপার ছিল না। এর জন্য হেনরি একে একে বিক্রি করে দিয়েছিলেন নিজের লাইব্রেরির সব বইপত্র এবং দামী আসবাবপত্র। শেষের দিনগুলিতে তাঁকে পড়তে হয়েছিল নিদারুণ অর্থাভাবে।

ডিরোজিও বলতেন, বুদ্ধিমান মানুষ তাঁর নিজের বুদ্ধি, যুক্তি, বিবেক ও বিচারশক্তি দিয়ে ন্যায় অন্যায়, কর্তব্য-অকর্তব্য বিচার করবে, শাস্ত্র-বচন, গুরু-বচন বা দৈব-বচন বলে কিছু অন্ধের মতো গ্রহণ বা পালন করবে না।

 

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

7 + 11 =