নিষিদ্ধ হচ্ছে জঙ্গি সংগঠন ‘আনসারুল্লাহ বাংলা টিম’-স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী

Facebooktwittergoogle_plusredditpinterestlinkedinmail

Ansarullah Bangla Team  ‘পুলিশ সদর দপ্তর অনুসন্ধান করে প্রতিবেদন দিয়েছে। সে অনুযায়ী আমরা সংগঠনটিকে নিষিদ্ধ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছি।’ বললেন, স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল। বুধবার ডাকযোগে চিঠি পাঠিয়ে প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যসহ চার শিক্ষক,গণজাগরণ মঞ্চের মুখপাত্রসহ ১০ জনের নাম উল্লেখ করে তাঁদের প্রাণনাশের হুমকি দেওয়ার দু’দিনের মাথায় পর সংগঠনটিকে নিষিদ্ধ করার সিদ্ধান্ত চুড়ান্ত করে সরকার।

১২ মে মঙ্গলবার সকাল ৯টার দিকে সিলেটের সুবিদবাজার এলাকায় ব্লগার অনন্ত বিজয় দাশকে খুনের পর আনসার বাংলা ৮ নামে একটি টুইটার একাউন্ট থেকে বলা হয়েছে, আল কায়েদার ভারতীয় উপমহাদেশ শাখা এই হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে।এই হত্যাকাণ্ডে জড়িত কাউকে এখনো  চিহ্নিত কিংবা গ্রেপ্তার করতে পারেনি পুলিশ।  উল্লেখ্য , অনন্তকে হত্যাকাণ্ডের এক ঘণ্টার পরই সকাল ১০টা ২৬ মিনিটে আনসার বাংলা ৮ একটি টুইটে বলে, “আল্লাহু আকবার!!! বাংলাদেশে আরও একজনকে হত্যা করা হয়েছে। শিগগিরই আমাদের অপারেশন টিমের কাছ থেকে খবরটি নিশ্চিত করব আমরা।”এর এক ঘণ্টা পর আরেকটি টুইটে বলা হয়, “আলহামদুলিল্লাহ, আমাদের ভাইয়েরা ১০০% নিরাপদ।”এরপর পৌনে ১২টায় আরেকটি টুইটে বলা হয়, “আল কায়েদা ইন ইনডিয়ান সাবকন্টিনেন্ট সিলেটে অনন্ত বিজয় হত্যাকাণ্ডের দায়িত্ব স্বীকার করেছে।”পরের টুইটগুলোতে আনসার বাংলা ৮ এর নাম ব্যবহার না করে এই হত্যাকাণ্ডের দায়িত্ব স্বীকারকারী হিসেবে একিউআইএস এর নাম বলার জন্য সাংবাদিকদের উদ্দেশে বলা হয়।অভিজিৎ ও ওয়াশিকুর হত্যাকাণ্ড নিয়ে পুলিশি তদন্তের মধ্যে গত ৫ মে এই জঙ্গী দলের নামে তৈরি ফেসবুক পেইজে এক টুইটে পরবর্তী লক্ষ্যে হামলার হুমকি দেওয়া হয়েছিল। অনন্ত খুনের দায় আল কায়েদার স্বীকার করা প্রসঙ্গে সিলেটের পুলিশ কমিশনার কামরুল আহসান সাংবাদিকদের বলেছেন,“বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যমে বিষয়টি শুনেছি। ফলে এটাকে উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।”

বাংলাদেশে এর আগে ব্লগার হত্যাকাণ্ডের পেছনে আনসারুল্লাহ বাংলা টিমের সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ আসে। গোয়েন্দাদের অনুসন্ধানে প্রকাশ,আল কায়েদার সঙ্গে যোগাযোগ রেখে চলে আনসারুল্লাহ বাংলা টিম।গণজাগরণ মঞ্চের সংগঠক ব্লগার আহমেদ রাজীব হায়দার হত্যাকাণ্ডে অভিযুক্ত হয়ে বর্তমানে  বিচারের মুখোমুখি আনসারুল্লাহ বাংলা টিমের প্রধান এবং জামায়াত সংগঠক মুফতি জসীমউদ্দীন রাহমানী।গত ৩০ মার্চ তেজগাঁওয়ের বেগুনবাড়িতে ওয়াশিকুরকে হত্যাকারী দুই মাদ্রাসা ছাত্র গণপিটুনী খেয়ে গ্রেফতার হয়। ঘাতক জঙ্গীরা নিজেদের জামায়াত ক্যাডার জসীমউদ্দীন রাহমানীর অনুসারী হিসেবে স্বীকার করেছে ।

আনসার বাংলা ৮ এর টুইটার পেইজে অভিজিৎ, ওয়াশিকুর ও রাজীবের সঙ্গে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক এ কে এম শফিউল আলম লিলনকে ‘ধর্ম অবমাননাকারী’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।গত বছরের ১৫ নভেম্বর রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় সংলগ্ন এলাকায় বাড়ির কাছে কুপিয়ে হত্যা করা হয় লালনভক্ত লিলনকে। তখন আনসার আল ইসলাম ৭ নামে এই টুইটার পেইজ থেকে ওই হত্যাকাণ্ডের দায় স্বীকার করে বার্তা এসেছিল।

স্বঘোষিত ঘাতক এ জঙ্গী সংগঠনটিকে নিষিদ্ধ করার সিদ্ধান্তের বিষয়টি নিশ্চিত করে স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী আরো  বলেন, সংগঠনটির বিরুদ্ধে একটার পর একটা ঘটনায় জড়িত থাকার প্রমাণ মিলেছে। এ ছাড়া পুলিশের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী তারা লেখক, ব্লগার ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিদের হত্যা করছে, হুমকি দিচ্ছে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পাঠানো পুলিশের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আনসারুল্লাহ বাংলা টিম জেএমবি ও হরকাতুল জিহাদের চেয়েও বড় সন্ত্রাসবাদী সংগঠন হিসেবে বিশ্বব্যাপী পরিচিত। তারা আল-কায়েদার মতাদর্শ অনুসরণ করে। এখনো আনসারুল্লাহ বাংলা টীমের ওয়েবসাইটে উসকানিমূলক বক্তব্য দেয়া হচ্ছে।

আনসারুল্লাহ বাংলা টিম নামটি ইরাকি আল-কায়েদার আনসার উল ইসলাম-এর অনুকরণে নেওয়া। তবে বাংলাদেশি এই গোষ্ঠী আধ্যাত্মিক নেতা মানেন ইয়েমেনভিত্তিক আল-কায়েদার নেতা আনওয়ার আওলাকিকে। আল-কায়েদা ইন অ্যারাবিয়ান পেনিনসুলা (আরব উপদ্বীপ) নামে সক্রিয় এই গোষ্ঠীর প্রধান আওলাকি ২০১১ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর মার্কিন ড্রোন (চালকবিহীন বিমান) হামলায় ইয়েমেনে নিহত হন।দেশের প্রথম সারির  একাধিক সরকারি-বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীক কার্যক্রম পরিচালনা করে এই জঙ্গী গোষ্ঠী।

গেলো সপ্তাহে পুলিশ সদর দপ্তর থেকে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পাঠানো এক চিঠিতে সন্ত্রাসবিরোধী আইনের ১৮ ধারা অনুযায়ী আনসারুল্লাহ বাংলা টিমকে নিষিদ্ধ করার অনুরোধ জানানো হয়। এরপর মন্ত্রণালয় সংগঠনটিকে নিষিদ্ধ করার সিদ্ধান্ত নেয় ।

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় আনুষ্ঠানিকভাবে খুব শীগগীর ই এ বিষয়ে দাপ্তরিক ঘোষণা দেবে বলে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্রে প্রকাশ।

২০০৫ সালে হরকাতুল জিহাদ আল ইসলাম, জাগ্রত মুসলিম জনতা বাংলাদেশ (জেএমজেবি), জামাআতুল মুজাহিদীন বাংলাদেশ (জেএমবি), হরকাতুল জিহাদ আল ইসলামী বাংলাদেশ (হুজি বি) ও শাহাদাত আল হিকমাতকে নিষিদ্ধ করা হয়েছিল। এরপর ২০০৯ সালে হিযবুত তাহরীরকে নিষিদ্ধ করা হয়।

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পুলিশের পাঠানো চিঠিতে বলা হয়, আনসারুল্লাহ বাংলা টিম একটি সক্রিয় জঙ্গি সংগঠন। সংগঠনটি ২০১৩ সাল থেকে ব্যাপকভাবে বিস্তৃতি লাভ করতে থাকে। বাংলাদেশের যুবকদের উগ্রপন্থী আদর্শে উদ্বুদ্ধ করে জিহাদের মাধ্যমে এলাকার নিয়ন্ত্রণ নেওয়াই সংগঠনটির মূল লক্ষ্য। সংগঠনটি তাদের মতাদর্শ প্রচারের জন্য মসজিদকেও ব্যবহার করে থাকে। সংগঠনটির হামলার মূল লক্ষ্য হলো মুক্ত চিন্তার অনুসারী, ব্লগার ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব।আনসারুল্লাহ বাংলা টিমের বিরুদ্ধে গত কয়েক বছরে বিভিন্ন ঘটনায় জড়িত থাকার কথা উল্লেখ করে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০১৩ সালের ১২ আগস্ট বরগুনা জেলার একটি মসজিদে জঙ্গি হামলা ও নাশকতার পরিকল্পনা করার সময় সংগঠনটির নেতা মুফতি জসীম উদ্দিন রাহমানীসহ ৩০ জঙ্গিকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। ২০১৩ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি তারা ব্লগার আহমেদ রাজীব হায়দারকে হত্যা করে। এ হামলার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট পাঁচজনকে পুলিশ গ্রেপ্তার করে, যাঁরা পরে আদালতে স্বীকারোক্তি দেন। একই বছরের ১৪ জানুয়ারি ব্লগার আসিফ মহিউদ্দীনকে এবং ৭ মার্চ সানিউর রহমানকে হত্যার উদ্দেশ্যে হামলা চালানো হয়।

২০১৫ সালের ২৬ ফেব্রুয়ারি তাঁরা মুক্তমনা ব্লগের প্রতিষ্ঠাতা যুক্তরাষ্ট্রপ্রবাসী অভিজিৎ রায় ও তাঁর স্ত্রীর ওপর হামলা চালান। এতে অভিজিৎ রায় নিহত হন,তাঁর স্ত্রী গুরুতর জখম হন। গত ৩০ মার্চ ব্লগার ওয়াশিকুর রহমান বাবুকে একইভাবে কুপিয়ে হত্যা করা হয়।

জামায়াত নিষিদ্ধ করার আলোচনা শুরুর পর থেকে নতুন নতুন নামে জামায়াতের ক্যাডার রা তাদের জঙ্গী কার্যক্রম চালায়। ২০০৮ সালে রাজধানীর কামাল আতাতুর্ক অ্যাভিনিউয়ে নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটির সাবেক ক্যাম্পাসের কাছাকাছি বনানীর একটি মসজিদকে ঘিরে জামায়াতে ইসলামীর ছাত্র শাখা ছাত্র শিবিরের ক্যাডারের  আনসারুল্লাহ বাংরা টীমের জঙ্গী কার্যক্রম শুরু করে।এক সময়ে গরীব মেধাবীঅ ছাত্ররা জামায়াতের টার্গেট হলেও সাম্প্রতিক সময়ে আনসারুল্লাহ বাংলা টীম সহ জামায়াত এবং আল কায়দা অনুসারী জঙ্গী সংগঠকেরা  প্রধানত ইংরেজি মাধ্যম বা আধুনিক শিক্ষাব্যবস্থায় অধ্যয়নরত শিক্ষার্থীদের লক্ষ্য করে তাদের মতাদর্শ প্রচার ও উদ্বুদ্ধকরণ শুরু করে। একই সাথে  ফেসবুক, ব্লগসহ তথ্যপ্রযুক্তিকেন্দ্রিক কার্যক্রম শুরু করে তারা।

একটি সংগঠন নিষিদ্ধ হলে অন্য নামে আরেকটি সংগঠন প্রতিষ্ঠা করছে জঙ্গী রা । এক্ষেত্রে আরো সুপরিকল্পিত এবং সুসংবদ্ধ ভাবে এই জঙ্গীদের দমন করা জরুরী মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

thirteen − three =