নড়াইলের কন্যা ভারতের ফার্স্ট লেডি শুভ্রা মুখার্জি আর নেই: ৫৫ বছরের শ্রদ্ধা ভালোবাসার দাম্পত্যের অবসান

Facebooktwittergoogle_plusredditpinterestlinkedinmail
৫৫ বছরের দাম্পত্য জীবন কেবলি ভালোবাসা আর শ্রদ্ধার; একদিন ও ঝগড়া হয়নি
৫৫ বছরের দাম্পত্য জীবন কেবলি ভালোবাসা আর শ্রদ্ধার; একদিন ও ঝগড়া হয়নি

রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখোপাধ্যায়ের স্ত্রী শুভ্রা মুখোপাধ্যায় আর নেই।  মঙ্গলবার সকাল ১০টা ৫১ মিনিটে দিল্লির সেনা হাসপাতালে মৃত্যু হয় তাঁর। রাষ্ট্রপতি ভবন সূত্রে তাঁর মৃত্যুর খবর জানানো হয়েছে।শ্বাসকষ্টজনিত অসুখে ভুগছিলেন শুভ্রাদেবী। হৃদরোগের সমস্যাও ছিল তাঁর। গত সপ্তাহে তাঁকে দিল্লির সেনা হাসপাতালে তাঁকে ভর্তি করানো হয়।  শুভ্রার প্রয়াণে গভীর শোক প্রকাশ করেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং রাষ্ট্রপতি  আবদুল হামিদ । এক শোক বাণীতে রাষ্ট্রপতি এবং প্রধানমন্ত্রী  শুভ্রা মুখোপাধ্যায়ের আত্মার শান্তি কামনা এবং শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি গভীর সমবেদনা প্রকাশ করেছেন।

প্রতিদিন সকালে আহ্নিক সেরে স্ত্রী শুভ্রার কপালে ফুল ছুঁয়েই দিন শুরু করতেন প্রণব মুখার্জি। ৫৫ বছরের একনিষ্ঠ সঙ্গী শুভ্রা আজ  সকালে চিরদিনের মতো ছেড়ে গেলেন সকলকে। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৭৪ বছর।

বেশ কিছুদিন ধরেই শ্বাসপ্রশ্বাসজনিত সমস্যায় ভুগছিলেন শুভ্রা মুখোপাধ্যায়। গত শনিবার শুভ্রার শারিরিক অবস্থার খোঁজ নিতে প্রণব মুখোপাধ্যায়কে ফোন করেছিলেন আবদুল হামিদ। বাংলাদেশের নড়াইলের ভদ্রবিলা গ্রামে শুভ্রা মুখোপাধ্যায়ের জন্ম। তার বাবা অমরেন্দ্র ঘোষ। তার ভাই-বোনের মধ্যে শুধু কানাইলাল ঘোষ (৬৮) বর্তমানে ভদ্রবিলায় বসবাস করেন।গুণী রবীন্দ্রসঙ্গীতশিল্পী , চিত্রশিল্পী এবং লেখক শুভ্রা মুখার্জি  দু’টি বই লিখেছিলেন ।‘চোখের আলোয়’ এবং ‘চেনা অচেনায় চিন’।রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের একনিষ্ঠ ভক্ত ছিলেন শুভ্রাদেবী। রবীন্দ্র সঙ্গীত ও কবিতা আবৃত্তি করতেন তিনি।

১৯৪০-এর ১৭ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশের যশোরে জন্ম শুভ্রাদেবীর। ১৯৫৭-র ১৩ জুলাই প্রণববাবুর সঙ্গে বিবাহ হয় তাঁর।  তাঁদের দুই ছেলে ও এক মেয়ে— অভিজিত্ মুখোপাধ্যায়,ইন্দ্রজিত্ মুখোপাধ্যায় ও শর্মিষ্ঠা মুখোপাধ্যায়।  ভারতের রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখার্জির দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনের ছায়াসঙ্গী শুভ্রা ।  নেপথ্যে থেকেও স্বামীর জীবনের প্রতিটি মাইলফলকে রয়েছে যাঁর অবদান। দীর্ঘ ৫৮ বছরের জীবনসঙ্গী শুভ্রার প্রয়াণে শোকস্তব্ধ প্রণব মূখার্জী ।

 

শুভ্রা অনুপ্রাণিত ছিলেন দেং জিয়াওপিংয়ের দ্বারা। মাঝেমধ্যেই দেংয়ের উদ্ধৃতি শোনা যেত তার মুখে।  শান্তিনিকেতন থেকে স্নাতকোত্তর পাশ করেছিলেন তিনি। মাত্র ৬ বছর বয়স থেকেই সঙ্গীতচর্চা করতেন। শিখেছিলেন কণিকা বন্দ্যোপাধ্যায়, গোরাচাঁদ সর্বাধিকারীর কাছে। কখনও বাণিজ্যিক অনুষ্ঠানে গান করেননি তিনি। গান ছিল তার আধ্যাত্মিক যোগ স্থাপনের মাধ্যম। পড়া, গান ও বাগানের পরিচর্যা করেই কেটে যেত তার সময়। স্বামী রাষ্ট্রপতি হওয়ার পর তারই ছেড়ে যাওয়া আসনে বীরভূমের নলহাটি থেকে সাংসদ নির্বাচিত হন ছেলে অভিজিত্।  একমাত্র মেয়ে শর্মিষ্ঠা কত্থক নৃত্যশিল্পী।

শুধু স্বামী সন্তান সংসারের সাফল্যে গর্বিত হয়েই আটকে থাকেননি তিনি। সাংস্কৃতিক জগতে তৈরি করেছিলেন নিজের পরিচিতি। রাষ্ট্রপতি ভবনেও নিয়মিত বসত গানের আসর। সংসার থেকে স্বামীর ব্যস্ততা, সবকিছুই সামলাতেন পাকা হাতে। ফার্স্ট লেডি হিসেবে  সাক্ষাত্কার দিতে গিয়ে জানিয়েছিলেন তাদের সুখী দাম্পত্যের কথা।

৫৫ বছরের বিবাহিত জীবনে একবারও ঝগড়া না হওয়ার কথা গর্বের সঙ্গে জানিয়েছিলেন তিনি। রাষ্ট্রপতি ভবনে নিজের পুজোর ঘর সুন্দর করে সাজিয়েছিলেন তিনি। অতি প্রিয় তানপুরা ও হারমোনিয়াম নিয়ে এসেছিলেন সঙ্গে করে।
সঙ্গীতে পারদর্শী ছিলেন তিনি। ইউরোপ, এশিয়া ও আফ্রিকার বহু জায়গায় পারফর্ম করেছেন।

ভারতের প্রথম বাঙালি রাষ্ট্রপতির স্ত্রী শুভ্রা মুখোপাধ্যায়ের আদি নিবাস ছিল বাংলাদেশের নড়াইল। শুভ্রা মুখোপাধ্যায় বিয়ের আগে ছিলেন শুভ্রা ঘোষ। তিনি ভদ্রবিলা গ্রামের স্বর্গীয় অমরেন্দ্র ঘোষের মেয়ে। ১৯৪৩ সালে নড়াইল সদরের চাঁচড়া গ্রামের নানার বাড়িতে জন্মগ্রহণ করেন শুভ্রা ঘোষ। পাঁচ বছর বয়স পর্যন্ত কাটান নিজ গ্রাম ভদ্রবিলায়। এরপর তিনি আবার নানা বাড়ি বসবাস শুরু করেন এবং স্থানীয় চাঁচড়া প্রাথমিক বিদ্যালয়ে প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণি পর্যন্ত লেখাপড়া করেন।  পরে পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে ভারত চলে যান। বিয়ে হয় ১৯৫৭ সালের ১৩ জুলাই। ওই সময় তিনি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তেন। প্রণব ও শুভ্রা মুখোপাধ্যায়ের তিন সন্তান। দুই ছেলে অভিজিৎ ও সুরজিৎ এবং এক মেয়ে শর্মিষ্ঠা। রাষ্ট্রপতি হওয়ার পর সস্ত্রীক প্রণব মুখোপাধ্যায় একবার বাংলাদেশ সফরে ঘুরে গিয়েছিলেন তাঁর আদি শ্বশুরবাড়িতে এবং ঘণ্টা দুই ওই পরিবারের স্বজনদের সঙ্গে সময় কাটান ভারতের রাষ্ট্রপতি। ২০১২ সালে প্রণব মুখোপাধ্যায় রাষ্ট্রপতি হওয়ার পর তাঁর ঠিকানা হয়ে যায় রাইসিনা হিলস।

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

nine − eight =