পাক প্রধানমন্ত্রীর অতিথি হয়েও হেনস্থা শর্মিলা ঠাকুরের

Facebooktwittergoogle_plusredditpinterestlinkedinmail

শর্মিলা ঠাকুর পাকিস্তানে এসেছিলেন সাহিত্য উৎসবে যোগ দিতে। উৎসবের উদবোধনও করেছেন তিনিই। অথচ আজ সোমবার ভারতে ফিরে যাওয়ার সময় নিয়মমাফিক ওয়াঘা সীমান্তে অভিবাসন দফতরে যেতেই, লাহোর সাহিত্য উৎসবের প্রধান অতিথি শর্মিলা ঠাকুরকে শুনতে হল— তিনি যে লাহোরে ছিলেন, তার পুলিশ রিপোর্ট কোথায়? আর ওই রিপোর্ট যখন নেই, দেশেও ফিরতে পারবেন না তিনি!

সাহিত্য উৎসবে আমন্ত্রিত হয়েও ভিসা না পাওয়া নিয়ে বিতর্ক ও তিক্ততার জেরে শেষ পর্যন্ত আসাই হয়নি বিখ্যাত বলিয়ড অভিনেতা  অনুপম খেরের। আর শর্মিলা এলেও তাঁর হয়রানিটা হল ফেরার পথে!

যদিও ওয়াঘা সীমান্তে পৌঁছনোর আগে পর্যন্ত ছবিটা ছিল একেবারেই অন্য রকম। সাহিত্য উৎসবে যোগ দিতেই শর্মিলার এই চার দিনের পাক সফর। এরই মধ্যে একটি সন্ধে কেটেছে নওয়াজ শরিফের রায়উইন্দের প্রাসাদোপম বাড়িতে। দাওয়াত দিয়েছিলেন পাক প্রধানমন্ত্রী। হবে না-ই বা কেন! এক সময়ে নওয়াজ মুগ্ধ হয়ে দেখতেন শর্মিলা ঠাকুরকে, ছবির পর্দায়। তখন থেকেই দারুণ ভক্ত তাঁর অভিনয়ের। সেই তরুণ নওয়াজের বয়স এখন ৬৭। আর তাঁর প্রিয় অভিনেত্রী ৭১-এ। এত বছর পরে শর্মিলাকে নিজের দেশে এত কাছে পেয়ে নিমন্ত্রণ জানানোর সাধটা চেপে রাখেননি। সেই সূত্রেই কাল সন্ধেয় শরিফের রায়উইন্দের বাড়িতে নৈশভোজে হাজির ছিলেন শর্মিলা।

দুজনের আলাপচারিতায় কখনও উঠে আসে ষাটের দশকের বলিউড, কখনও পতৌদি পরিবার। প্রবীণ অভিনেতা দিলীপকুমারের খোঁজ নিতেও ভোলেননি শরিফ। উঠে আসে ভারতের রাজনীতির প্রসঙ্গও। শরিফ জানান, তিনি চান দুদেশের সম্পর্কের উন্নতি হোক।

লাহোর সাহিত্য উৎসবে উদবোধনী বক্তব্য রাখছেন শর্মিলা ঠাকুর।
লাহোর সাহিত্য উৎসবে উদবোধনী বক্তব্য রাখছেন শর্মিলা ঠাকুর।

কিন্তু শরিফ চাইলেই যে এ দেশে সব কিছু তাঁর পছন্দ মোতাবেক হবে, এমন নিশ্চয়তা কোথায়! এ দেশের সেনাবাহিনী, আইএসআই থেকে শুরু করে মোল্লাতন্ত্রও যে যথেষ্টই, এমনকী অনেক ক্ষেত্রে বেশি প্রভাবশালী, সেটা বারবার প্রমাণিত হয়েছে বিভিন্ন প্রসঙ্গে। নওয়াজের জন্মদিনে আচমকাই উড়ে আসা ভারতীত প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি কীভাবে ‘বিনা ভিসা’য় পাকিস্তানে ঘুরে বেড়ালেন, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলতেও ছাড়েনি পাক সংবাদমাধ্যমের একাংশ। সামাজিক নেটওয়ার্কেও কূটকচালি কিছু কম হয়নি এ নিয়ে। শর্মিলার ক্ষেত্রে প্রশ্নটা তুলল পাকিস্তান ফেডারেল ইনভেস্টিগেশন এজেন্সি।

শরিফের বাড়িতে দাওয়াতের পরই পাঞ্জাব সরকার ‘অফিসিয়াল প্রোটোকল’ দিয়েছিল শর্মিলাকে। আজ কড়া নিরাপত্তা বেষ্টনী পরিবৃত অবস্থায় ওয়াঘা সীমান্ত পৌঁছতেই স্তম্ভিত হয়ে যান শর্মিলা। পাক গোয়েন্দা দফতরের অভিবাসন বিভাগের অফিসারেরা সরাসরি তাঁকে প্রশ্ন করেন, তিনি যে লাহোরে ছিলেন, সেই ‘পুলিশ-রিপোর্ট’ কোথায়? তাঁরা জানান, শর্মিলার পাক সফর সংক্রান্ত কাগজপত্রে ওই রিপোর্টটি নেই। বিস্মিত শর্মিলা প্রশ্ন করেন, “তা হলে কি আমি যেতে পারব না?”

তখন ওই অফিসারের সংক্ষিপ্ত জবাব ছিল, “না!”

পাক অভিবাসন দফতর সূত্রে জানা গিয়েছে, এর পর শর্মিলার সঙ্গে থাকা এক অফিসার যোগাযোগ করেন সংশ্লিষ্ট থানায়। দু ঘণ্টার চেষ্টায় ব্যবস্থা করা হয় রিপোর্টের। তা ফ্যাক্স করে পাঠানো হয় অভিবাসন দফতরে। কিন্তু ততক্ষণে বিব্রত অভিনেত্রী ফিরে গেছেন লাহোরের মল রোডের হোটেলে। এক পাক গোয়েন্দা কর্মকর্তা বলেন, “দফতরের অতিথিশালায় বসে অপেক্ষা করছিলেন শর্মিলা। কিন্তু ওই রিপোর্ট সংক্রান্ত সমস্যা মিটতে মিটতে পরিকল্পনা বদলে ফেলেন শর্মিলা। ঠিক করেন, আজ নয়, কাল দেশে ফিরবেন।” যদিও অন্য একটি সূত্রের দাবি, অমৃতসর-মুম্বই ফ্লাইট আর ধরতে পারবেন না বুঝেই হোটেলে ফিরে যান শর্মিলা ঠাকুর।

এই লাহোর সাহিত্য উৎসবে আমন্ত্রিতদের আরেকজন ছিলেন আরেক বলিউড অভিনেতা অনুপম খের। কিন্তু শেষমুহূর্তে তাঁকে জানানো হয়, ভিসার আবেদনই তিনি করেননি, আর তাই তিনি পাকিস্তানে যেতে পারবেন না। অনুপম তখন জানান, নিয়মমাফিক উৎসব কমিটিরই ভিসার আবেদন করার কথা ছিল। কমিটির তরফে তখন জানানো হয়, ভিসার আবেদন করতে নিষেধ করেছিল ভারতীয় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। পাক সরকারের পক্ষ থেকে আগেই তাদেরকে জানানো হয়েছিল, অনুপমের ভিসার আবেদন করা হলেও তা দেয়া হবে না। পাকিস্তান সরকার অবশ্য এ অভিযোগ মানতে চায়নি। পাকিস্তানের পক্ষ থেকে এ-ও বলা হয়, ভিসার ব্যবস্থা করে দেয়া হবে। কিন্তু অনুপমই শেষ পর্যন্ত এ দফায় পাকিস্তানে যেতে আর রাজি হননি।

অনুপমের আসা হয়নি। এসে কিন্তু সাহিত্যবাসরে উষ্ণ অভ্যর্থনাই পেয়েছেন শর্মিলা। উৎসবের সূচনাই হয় তাঁর বক্তৃতা দিয়ে। অনুষ্ঠানের ওই পর্বের নাম রাখা হয়েছিল ‘সফর’। সাহিত্য উৎসবে দেখানো হয় শর্মিলা অভিনীত ছবি সত্যজিৎ রায়ের ‘অপুর সংসার’ এবং ‘দেবী’র ভিডিও ক্লিপ। ‘অপুর সংসার’ থেকে যাত্রা শুরু করে ‘অ্যান ইভনিং ইন প্যারিস’-এর বিকিনি বিপ্লব— জীবনের নানা ওঠাপড়ার কথা উঠে আসে তাঁর অকপট আলাপচারিতায়। পরনে পেঁয়াজ-রঙা শাড়ি এই প্রাক্তন নায়িকা মঞ্চে উঠতেই হাততালিতে ফেটে পড়েন দর্শকরা। উঠে দাঁড়িয়ে অভিবাদন জানান সবাই। শর্মিলাও বলতে থাকেন, “সীমান্ত পেরোনো থেকে হোটেলে হিন্দি গান—সবই মনে করিয়ে দেয় ভারত-পাকিস্তানে কত মিল।” তখনও কিন্তু তিনি বোঝেননি, এ ‘সফর’-এর শেষটা ঠিক কেমন হবে!

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

3 × 1 =