পাবনায় সাংবাদিক নদীকে সাবেক স্বামী চাপাতি দিয়ে কোপায়

Facebooktwittergoogle_plusredditpinterestlinkedinmail

মৃত্যুর আগে তার উপর  হামলাকারীদের নাম বলে গেছেন পাবনার সাংবাদিক সুবর্ণা নদী ওরফে শম্পা। তিনি জানান, সাবেক স্বামী রাজিবুল ইসলাম রাজিব ও তার সহযোগী মিলনসহ চার-পাঁচজন তাকে চাপাতি দিয়ে এলোপাতাড়ি কুপিয়েছে। তিনি তাদের চিনতে পেরেছেন। গুরুতর আহত অবস্থায় হাসপাতালে নেওয়ার আগে মা ও বোনের কাছে এসব নাম প্রকাশ করেন সুবর্ণা। তার মা মর্জিনা খাতুন গতকাল বুধবার জানাজার আগে র‌্যাব, পুলিশ ও সাংবাদিকদের কাছে এ তথ্য জানিয়েছেন।

তিনি আরও জানান, সুবর্ণার স্বীকারোক্তির ভিত্তিতে সাবেক স্বামী রাজিবুল ইসলাম রাজিব, শ্বশুর আবুল হোসেন এবং সহযোগী মিলনের নামসহ অজ্ঞাতপরিচয় ৭-৮ জনকে আসামি করে গতকাল সদর থানায় হত্যা মামলা করেছেন। মর্জিনা খাতুন জানান, স্বামীর সঙ্গে বিচ্ছেদের পর থেকে সুবর্ণা একমাত্র মেয়ে জান্নাতকে (৭) নিয়ে আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছিলেন। জীবনের নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কায় ছিলেন। বাসাও বদল করেছেন চারবার। একই কারণে গত বছর সংবাদ সম্মেলনও করেন। সুবর্ণা সে সময় বলেছিলেন, শ্বশুর আবুল হোসেন অনেক টাকার মালিক। তাই তিনি লোক দিয়ে যে কোনো সময় তাকে হত্যা বা গুম করতে পারেন। তা ছাড়া স্বামী এবং শ্বশুরের বিচারের দাবিতে প্রায়ই তিনি ফেসবুকে লিখতেন।

সুবর্ণার বোন চম্পা খাতুন সাংবাদিকদের জানান, পাবনার ব্যবসায়ী আবুল হোসেনের ছেলে রাজিবুলের সঙ্গে বর্ণার বিয়ে হয়। বিয়ের বছর খানেক যেতেই তাদের বিচ্ছেদ হয়ে যায়। এর পরপরই সুবর্ণা পাবনায় নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে মামলা করেন। মামলায় রাজিবুল, আবুল হোসেনসহ তিনজনকে আসামি করা হয়।

মঙ্গলবার ওই মামলার সাক্ষ্য দেওয়ার নির্ধারিত দিন ছিল। সকালে আদালতে সুবর্ণা সাক্ষ্যও দেন। তিনি বলেন, বোন সাংবাদিক হলেও সংবাদ প্রকাশের কারণে তাকে মরতে হয়নি। তাকে জীবন দিতে হয়েছে আবুলের ছেলেকে ভালোবেসে বিয়ে করে।

পাবনা প্রেস ক্লাবের সভাপতি অধ্যাপক শিবজিত নাগ বলেন, এটি একটি কাপুরুষোচিত হত্যাকাণ্ড। একজন নারীকে এভাবে কেউ হত্যা করতে পারে? পাবনা সংবাদপত্র পরিষদ সভাপতি বিটিভি প্রতিনিধি আবদুল মতীন খান বলেন, পাবনার সাংবাদিকতার ঐতিহ্য রয়েছে। এর পর একজন নারী সাংবাদিককে হত্যা কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না।

এর আগে পাবনার অনলাইন পোর্টাল দৈনিক জাগ্রত বাংলার সম্পাদক ও প্রকাশক এবং আনন্দ টিভির জেলা প্রতিনিধি সুবর্ণা হত্যার প্রতিবাদে এবং জড়িতদের গ্রেফতারের দাবিতে সমাবেশ ও মানববন্ধন করেন স্থানীয় সাংবাদিকরা। সমাবেশে বক্তারা ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে হত্যাকারীদের গ্রেফতার দাবি করেন। অন্যথায় বৃহত্তর কর্মসূচি ঘোষণা করা হবে বলে তারা জানান।

বুধবার দুপুরে পাবনা প্রেস ক্লাবের সামনে মানববন্ধন চলাকালে বক্তব্য দেন প্রেস ক্লাবের সাবেক সভাপতি মুক্তিযোদ্ধা রবিউল ইসলাম রবি, সাবেক সম্পাদক আব্দুল মতীন খান, সাবেক সম্পাদক এবিএম ফজলুর রহমান, প্রেস ক্লাবের সম্পাদক আঁখিনূর ইসলাম রেমন, আনন্দ টিভির বার্তা সম্পাদক আফজাল হোসেন, পাবনা টেলিভিশন ও অনলাইন সাংবাদিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক সৈকত আফরোজ আসাদ।

গতকাল বিকেলে পাবনা এডওয়ার্ড কলেজ মাঠে জানাজা শেষে সুবর্ণাকে পাবনার বালিয়াহাট কবরস্থানে দাফন করা হয়। এ ছাড়া সুবর্ণা হত্যার ঘটনায় মঙ্গলবার আটক শ্বশুর আবুল হোসেনকে সুবর্ণার মায়ের দায়ের করা হত্যা মামলায় গ্রেফতার দেখিয়েছে পুলিশ। পাবনার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার গৌতম কুমার বিশ্বাস ও সদর থানার ওসি ওবাইদুল হক এ মামলা ও আবুল হোসেনকে গ্রেফতারের তথ্য জানান।

এদিকে সাংবাদিক সুবর্ণাকে হত্যার ঘটনায় উদ্বেগ জানিয়েছেন জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান কাজী রিয়াজুল হক। তিনি হত্যাকারীদের চিহ্নিত করে আইনের আওতায় এনে শাস্তি নিশ্চিত করতে সংশ্নিষ্টদের প্রতি আহ্বান জানান। এ ব্যাপারে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীকে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দিতে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বরাবর চিঠিও দিয়েছে কমিশন।

মঙ্গলবার রাত সাড়ে ১০টার দিকে শহরের রাধানগর আদর্শ বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের সামনে সুবর্ণার ওপর সশস্ত্র হামলা চালানো হয়। এতে তার হাতে ও মাথায় গুরুতর জখম হয়। তার চিৎকারে স্থানীয় লোকজন এসে উদ্ধার করে পাবনা জেনারেল হাসপাতালে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন।

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

13 − ten =