পাহাড়ি এলাকাতে হাহাকার,কমপক্ষে ১৪৭ জন নিহত

Facebooktwittergoogle_plusredditpinterestlinkedinmail

টানা বর্ষণে সোমবার থেকে পার্বত্য জেলা রাঙামাটি, বান্দরবান, চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারে পাহাড় বা ভূমি ধ্বসে এখন পর্যন্ত পাওয়া খবরে কমপক্ষে ১৪৭ জন নিহত হয়েছেন ৷ এর মধ্যে রাঙামাটিতে সেনা কর্মকর্তাসহ ৯৮ জন, বান্দরবানে ৯ জন এবং চট্টগ্রামে ৩০ জন মারা গেছেন ৷ সর্বশেষ বুধবার বেলা সাড়ে তিনটার দিকে রাঙ্গামাটিতে আরও তিন জনের লাশ উদ্ধার করা হয়।

মৃতের সংখ্যা আরও বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে ৷ মাটির নিচে অনেকে চাপা পড়ে থাকার সম্ভাবনা আছে ৷ উদ্ধারকর্মীরা এখনো ধসে যাওয়া পাহাড়ের সব ধ্বংসস্তুপে পৌঁছাতে পারেননি ৷
রাঙ্গামাটিতে নিহতদের বেশিরভাগই আদিবাসী ৷ ভারতের সীমান্তের কাছে একটি প্রত্যন্ত এলাকায় তাঁরা বাস করতেন ৷ ভূমিধসের ঘটনা যখন ঘটে তখন তাঁরা ঘুমিয়ে ছিলেন বলে জানিয়েছেন জেলার পুলিশ প্রধান সৈয়দ তারিকুল হাসান ৷

পাহাড় ধসে হতাহতের দিক থেকে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্থ জেলা রাঙামাটি। ঘূর্ণিঝড় মোরার পর থেকেই সেখানে বিদ্যুৎ সরবরাহ স্বাভাবিক ছিল না। পাহাড় ধসের আগের দিন রোববার থেকে রাঙামাটি শহর বিদ্যুৎ বিছিন্ন থাকায় আহতদের চিকিৎসাসেবা ব্যহত হচ্ছে।

শেষ খবর পর্যন্ত রাঙামাটিসহ কয়েকটি জেলায় পাহাড় ধসে ৪ সেনা সদস্য, ১৮ শিশু ও ২ নারীসহ মোট ১৩৮ জন প্রাণ হারিয়েছে। বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড-চট্টগ্রাম জোনের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মৃণাল কান্তি সেন বলেন, প্রাকৃতিক সমস্যার কারণে বৈদ্যুতিক লাইনগুলো টিকতে পারছে না। অধিকাংশ বৈদ্যুতিক খুঁটি জঙ্গল পরিবেষ্টিত ও পাহাড়ে। ফলে বিদ্যুৎ কর্মীদের কাজ করতে ব্যাপক বেগ পেতে হচ্ছে। তারপরও আমরা কাজ চালিয়ে যাচ্ছি।

রাঙামাটিতে বিদ্যুৎ পরিস্থিতি স্বাভাবিক হতে কতোদিন লাগতে পারে-এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, খাগড়াছড়ির একটি সাবস্টেশন থেকে রাঙামাটিতে বিদ্যুৎ সরবরাহ হয়। মেরামতের কাজ শেষ হলে দ্রুতই আমরা সেখানে বিদ্যুৎ পৌছে দিতে পারব। পিডিবি জানিয়েছে, খাগড়াছড়ির বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যবস্থা ১শ’ ৫ কিলোমিটার দূরের হাটহাজারী রিয়েল উপকেন্দ্র দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। সেখানে কোন যান্ত্রিক ও প্রাকৃতিক গোলযোগ দেখা দিলে ১১টি উপজেলায় বিদ্যুৎ সঞ্চালন ব্যবস্থা বন্ধ হয়ে যায়। জেলায় বিকল্প বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যবস্থা না থাকায় দীর্ঘ লাইনের শত শত খুঁটির মধ্যে কোনো একটির উপর প্রাকৃতিকভাবে গাছের ডাল ভেঙ্গে পড়লে কিংবা বজ্রপাতে কোন সমস্যা হলে বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ হয়ে যায়। এমন প্রাকৃতিক দুর্যোগের সময় ভবিষ্যতে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ ব্যবস্থা জোরদারের কথা বলেন বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের প্রধান প্রকৌশলী বিকাশ দেওয়ান।

বৃষ্টি বন্ধ হওয়ার পর চট্টগ্রামের সঙ্গে কক্সবাজার ও বান্দরবানের সড়ক যোগাযোগ স্বাভাবিক হয়েছে। বুধবার সকাল থেকে চট্টগ্রাম-কক্সবাজার ও চট্টগ্রাম-বান্দরবান মহাসড়কে যানবাহন চলাচল শুরু হয়েছে। তবে চট্টগ্রাম-রাঙামাটি সড়কে যানবাহন চলাচল এখনও পুরোপুরি স্বাভাবিক হয়নি। রাঙামাটি শহরের সাতছড়িতে সড়কের উপর মাটি পড়ে থাকায় যানবাহন ঘাগড়া পর্যন্ত গিয়ে ফিরে আসছে বলে জানিয়েছেন হাইওয়ে পুলিশের চট্টগ্রাম অঞ্চলের পুলিশ সুপার পরিতোষ ঘোষ।

পাহাড় ধসে আহতদের চিকিৎসায় পাহাড়ি এলাকায় স্বাস্থ্য বিভাগের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সব ধরনের ছুটি বাতিল করে প্রয়োজনীয় ওষুধ সামগ্রী সরবরাহ করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম।

দুর্গত এলাকায় ৪৮৩টি মেডিকেল টিম কাজ করছে বলেও জানান তিনি। পাহাড় ধসের পরিস্থিতি নিয়ে বুধবার সচিবালয়ে তাৎক্ষণিক সংবাদ সম্মেলনে স্বাস্থ্যমন্ত্রী এ তথ্য জানান। স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, পাহাড় ধসের ঘটনার সঙ্গে সঙ্গে ওই এলাকার হাসপাতালগুলোকে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। চিকিৎসা সামগ্রী সরবরাহ করা হয়েছে এবং প্রত্যেক আহতের জন্য হাসপাতালে চিকিৎসার সুব্যবস্থা রয়েছে।

ওই এলাকায় ৪৮৩টি মেডিকেল টিম কাজ করছে জানিয়ে মন্ত্রী বলেন, চট্টগ্রাম, রাঙ্গামাটি ও বান্দরবান এলাকার স্বাস্থ্য বিভাগের সব কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ছুটি বাতিল করা হয়েছে। চট্টগ্রাম বিভাগের পরিচালক (স্বাস্থ্য) এ এম মজিবুল হক ভিডিও কনফারেন্সে যুক্ত হয়ে জানান, চট্টগ্রামে ২৮৪, বান্দরবানে ৪১, রাঙ্গামাটিতে ৬০, কক্সবাজারে ৮৮ ও খাগড়াছড়িতে ১০টি মেডিকেল টিম কাজ করছে। এসময় নিহতের জন্য শোক এবং পরিবারের সদস্যদের প্রতি সমবেদনা জ্ঞাপন করেন মন্ত্রী।

উল্লেখ্য, চট্টগ্রামে এক দশক আগে ভূমিধসে একটি পুরো গ্রাম ঢেকে গিয়ে কমপক্ষে ১২৬ জনের মৃত্যু হয়েছিল ৷

মূলত, প্রবল বৃষ্টিপাতের ফলে পাহাড়ি এলাকার মাটির নরম ও নিচের অংশ স্থানচ্যূত হয়ে এই দুর্যোগ দেখা যায়। পাহাড় ধসের জন্য দায়ী পাহাড় কাটা, বনভূমি উজাড় করা ৷ প্রভাবশালীরা বছরের পর বছর এই অবৈধ কাজ করে শত শত মানুষের মুত্যু ডেকে আনছে ৷

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূগোল ও পরিবেশবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক শহিদুল ইসলাম সাংবাদিকদের বলেন, ‘‘আমরা দেখেছি, পাহাড় ধসের কারণ প্রাকৃতিকের চেয়ে মানুষেরই সৃষ্টি বেশি৷ পাহাড় কেটে ফেলা, গাছপালা কেটে ফেলা, পাহাড় লিজ দেয়া, পাহাড়ে সেটেলারদের বসতি, পাহাড়কে বাণিজ্যিক কাজে ব্যবাহার করা অন্যতম কারণ ৷”

‘‘আমরা পাহাড় ধস রোধে বেশ কিছু সুপারিশ করেছিলাম৷ এরমধ্যে প্রধান সুপারিশ ছিল পাহাড় লিজ দেয়া বন্ধ করা৷ পাহাড়ের বাণিজ্যিক ব্যবহার বন্ধ করা ৷ পাহাড় কেটে হাউজিং, শিল্পস্থাপন পাহাড়ের বড় ক্ষতি করে৷ পাহাড়ে ঘর বানিয়ে ভাড়া দেয়া আরেকটি ক্ষতি৷ আর আমরা অবৈধভাবে পাহাড় কাটা বন্ধেরও সুপারিশ করেছিলাম ৷”

‘‘পাহাড়ের বন উজার করা হয়েছে৷ গাছ না থাকলে পাহাড় টিকবে কী করে৷ তাই আমরা পাহাড়ে দ্রুত বনায়নের প্রস্তাব করেছিলাম ৷”

জানা যায়, ভূমিধস প্রতিরোধে একটি সফল সমন্বিত জীব প্রকৌশল ও পয়ঃনিয়ন্ত্রণ উদ্যোগ বান্দরবানে পরিচালিত হয়। বাংলাদেশের মৃত্তিকা সংরক্ষণ ও পানি ব্যবস্থাপনা কেন্দ্র (SCWMC) বান্দরবান পাহাড়ের উপর অবস্থিত। পাহাড়ের ঢাল বেশ খাড়া। এ রকম খাড়া পাহাড়ের ঢাল সুস্থিত করতে বিশেষ ব্যবস্থার প্রয়োজন।

১৯৯৫ সালের জুনমাসে এক ভারি বর্ষণের সময় ২০০ বর্গ মিটার এলাকাজুড়ে একটি খাড়া ঢালে বড় ধরনের ভূমিধস সংঘটিত হলে নিরাপত্তার কারণে একটি অফিস ভবনের পুরো কাঠামো ভেঙ্গে ফেলার প্রয়োজন দেখা দেয়। বিভিন্ন সরকারি সংস্থার স্থানীয় প্রকৌশলীরা ভবনটি রক্ষার্থে RCC-র তৈরি ধারক প্রাচীর নির্মাণের পরামর্শ দেন, যার আনুমানিক ব্যয় ৭০ লক্ষ টাকা (১২,৯৬,২৯ মার্কিন ডলার)। কিন্তু দপ্তর কর্তৃপক্ষ এই বড় অংকের ব্যয়ভার বহনে সক্ষম ছিল না।

তখন ঐ কেন্দ্রের বিজ্ঞানীরা এর সুরাহা করতে এগিয়ে আসেন এবং ধস আক্রান্ত অঞ্চলের ঢাল সুস্থিত করতে জীবপ্রকৌশলী পদ্ধতি প্রয়োগের পরামর্শ দেন। পদ্ধতিটি প্রয়োগে গৃহীত পদক্ষেপ অনুযায়ী বিজ্ঞানীরা প্রথমে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় বিভিন্ন প্রজাতির গাছের বীজ ছিটিয়ে দেন এবং জিও-জুট টেক্সটাইল দিয়ে এলাকাটি ঢেকে দেন। পরে বাঁশের বল্লী পুঁতে জিও-জুট টেক্সটাইলকে আরো সুদৃঢ় করা হয়। পরে ধস সংঘটিত এলাকায় পাহাড়ের মাথায় নালা কেটে পানির প্রবাহকে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকার বাইরে গতি পরিবর্তিত করে ঘুরিয়ে দেওয়া হয়।

পরের বছর অর্থাৎ ১৯৯৬ সালে জিও জুট টেক্সটাইল পচে গিয়ে উদ্ভিদের সারে পরিণত হয়। এতে উদ্ভিদের বৃদ্ধি ত্বরান্বিত হয়। ধস ক্ষতিগ্রস্থ এলাকায় বর্ধিত গাছপালাও একই সঙ্গে পাহাড়ের মাথায় পানির নিম্নমুখী প্রবাহের গতিপথ কার্যকরভাবে পরিবর্তনের মাধ্যমে অর্জিত সুস্থিতি ভূমিধস বরাবর টিকিয়ে রাখা সম্ভব হয়েছিল। ফলে কংক্রিটের ধারক প্রাচীর নির্মাণে যেখানে ৭০ লক্ষ টাকা ব্যয় হতো, সেখানে ঐ দপ্তর মাত্র ৪ হাজার টাকা ব্যয়ে জীব প্রযুক্তি পদ্ধতির মাধ্যমে সমস্যার সমাধানে সমর্থ হয়েছিল।

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

three × 5 =