পূর্নিমার পরের দিন বলিউডের আকাশ থেকে হারিয়ে গেলেন স্নিগ্ধ শশী

Facebooktwittergoogle_plusredditpinterestlinkedinmail

অভিনেতারা বিপদে পড়লে সাহায্য করতে সকলের আগে এগিয়ে আসতেন শশী। শাবানা আজমি একবার জানিয়েছিলেন সে কথা। কোনও সিনেমার জন্য বিদেশে গিয়েছিলেন অভিনেত্রী। সেখানে অর্থসংকটের মধ্যে পড়েন। শশী তাঁর পুরো খরচ বহন করেছিলেন।

অমিতাভ বচ্চন বছর খানেক আগে নিজের ব্লগে শশী কাপুরের সঙ্গে তাঁর কিছু স্মৃতি লিখেছিলেন। এই দুই তারকা একসঙ্গে ‘শান’, ‘রোটি, কাপড়া, মাকান’, ‘দিওয়ার’, ‘কাভি কাভি’, ‘সিলসিলা’, ‘ত্রিশূল’, ‘নমক হালাল’সহ বেশ কিছু আলোচিত ছবিতে কাজ করেছেন। সত্তরের শুরুর দিকে একবার অমিতাভের খুব টাকার প্রয়োজন হলো। তখনো তিনি ‘বিগ বি’ হয়ে ওঠেননি। শশী কাপুর অভিনীত এক ছবিতেই জুনিয়র আর্টিস্ট বা ‘এক্সট্রা’ হওয়ার প্রস্তাব এল তাঁর কাছে। অমিতাভ কাজ করতে রাজি হয়ে গেলেন। কারণ, তাঁর কাছে তখন চরিত্র নয়, টাকাটাই মুখ্য। যথারীতি অমিতাভ ছবির শুটিংয়ে গেলেন।

দৃশ্যটা ছিল এমন, শশী কাপুর মারা গেছেন। চিতায় তাঁর লাশ তোলা হয়েছে। সামনে অনেক মানুষ তাঁর সৎকারের জন্য দাঁড়িয়ে আছেন। এই ভিড়ের মধ্যেই দাঁড়িয়ে ছিলেন ‘বিগ বি’। এ জন্য তাঁকে অগ্রিম ৫০০ রুপি দেওয়া হয়েছিল। শট শেষ করার পর হঠাৎ শশীর নজরে পড়েন অমিতাভ। তিনি অমিতাভকে হাত ধরে ভিড়ের মধ্য থেকে টেনে বের করেন। বলেন, ‘এই রকম ছোটখাটো চরিত্রে আর কখনোই কাজ করবে না। আরও বড় কিছু করার ক্ষমতা তোমার আছে।’ এরপর পরিচালককে বলে শশী কাপুর অমিতাভের শুট করা সেসব দৃশ্য ছবি থেকে বাদ দেন।

মুম্বাইয়ে অভিনেতা হিসেবে যাত্রা শুরুর আগেই শশীর সঙ্গে অমিতাভের পরিচয় ছিল। এই পরিচয় শশীর শ্বশুর জেফরি কেন্ডালের সূত্রে। জেফরি ছিলেন একজন ইংরেজ অভিনেতা ও থিয়েটার ব্যবস্থাপক। তিনি তাঁর নাট্যদল নিয়ে ভারতেও আসতেন। সেভাবেই অভিনয়ে আগ্রহী অমিতাভের সঙ্গে তাঁর জানাশোনা। আর তাঁর বড় মেয়ের জামাতা শশীর সঙ্গে আলাপ।

অমিতাভের অভিনয়ের প্রতি আগ্রহ দেখে শশী কাপুর তাঁর সব পরিচালকের সঙ্গে অমিতাভকে পরিচয় করিয়ে দিতেন। ১৯৭৫ সালে ‘দিওয়ার’ ছবিতে অমিতাভ ও শশী দুই ভাইয়ের চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন। যশ চোপড়া পরিচালিত এই ছবির উদ্বোধনী প্রদর্শনীর দিন শশী ও অমিতাভ পাশাপাশি বসে ছিলেন। বাকিটা অমিতাভের লেখা থেকে তুলে দেওয়া হলো, ‘সিনেমা চলাকালে আমরা কেউ একটা শব্দও উচ্চারণ করিনি।

কিন্তু যখন ব্রিজের নিচে ‘‘মেরে পাস মা হ্যায়’’ সংলাপ দেওয়ার দৃশ্যটি পর্দায় ভেসে উঠল, আমি আমার হাতের ওপর আরেকটা হাতের স্পর্শ অনুভব করলাম। এটা ছিল শশীজির হাত। তিনি আমাকে মুখে কিছুই বলেননি। কিন্তু তিনি আমার হাত যেভাবে ধরেছিলেন, তা-ই সব বলে দিয়েছিল আমাকে। সেই স্পর্শে ছিল তাঁর স্নেহ, তাঁর স্বীকৃতি, তাঁর প্রশংসা। যে ভদ্রলোকের (শশী কাপুরের) ছবিতে এই ছেলে একদিন (অমিতাভ) ‘‘এক্সট্রা’’ হয়েছিল, আজ সে তাঁর পাশের আসনে বসে আছে। তখনকার এক সংগ্রামী অভিনেতার জন্য বিষয়টা ছিল স্বপ্নের মতো।’

বিশিষ্ট অভিনেতা রাজ কাপুরের ভাই এবং পৃথ্বীরাজ কাপুরের কনিষ্ঠ সন্তান শশী কাপুর ১৯৫০ সালে ‘সংগ্রাম’ এবং ১৯৫৩ সালে ‘দানা পানি’ ছবিতে শিশু চরিত্রে অভিনয় করেন তিনি। এরপর ১৯৬৩ সালে ‘ধর্মপুত্র’ সিনেমায় প্রথম মুখ্য চরিত্রে আভিনয় করেন শশী কাপুর।বলিউডে অভিনয় শুরু করেছিলেন ১৯৬১ সালে। প্রথম ছবি ধর্মপুত্র। তাঁর জনপ্রিয় ছবি গুলির মধ্যে অন্যতম দিওয়ার(১৯৭৫), সত্যম শিবম সুন্দরম(১৯৭৮),জুনুন(১৯৭৮), শান(১৯৮০), নমক হালাল(১৯৮২)।

বাংলায় যেমন ফেলুদা মানেই সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়। তেমনই হিন্দিতে ফেলুদা মানে সন্দীপ রায়ের কাছে ছিলেন শশী কাপুর। তাঁকে নিয়েই গড়েছিলেন ‘কিসসা কাঠমান্ডু কা’। ১৯৮৬ সালে ডিডি ন্যাশনালে প্রদর্শিত হয়েছিল এই টেলিভিশন সিরিজ। সত্যজিৎ রায় শশীর অন্যতম পছন্দের পরিচালক।

ছবি পরিচালনাও করেছেন শশী। বেশ কড়া ধাতের পরিচালক ছিলেন তিনি। এ কথা স্বীকার করেছে স্বয়ং অমিতাভ বচ্চন। অজুবা ছবির শুটিং চলাকালীন নাকি পরিচালক শশী সেটে ছড়ি নিয়ে ঘুরে বেড়াতেন। ভুল হলেই নিস্তার ছিল না। তবে সেটে কারও অসুবিধা হলে সবার আগে তা মেটাতে ছুটতেন তিনিই।

অপর্ণা সেনের সঙ্গে খুব বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক ছিল তাঁর। সিনেমার সূত্রেই দু’জনের আলাপ হয়। ‘৩৬ চৌরঙ্গি লেন’-এর জন্য যখন হন্যে হয়ে প্রযোজক খুঁজছেন অপর্ণা, তখন ত্রাতা হন শশীই। চিত্রনাট্য পড়েই ছবি প্রযোজনা করতে রাজি হয়ে যান তিনি। ছবিতে অভিনয় করেছেন তাঁর স্ত্রী জেনিফারও।

আসল নাম ছিল বলবীর রাজ কাপুর। বিয়ে করেছিলেন ব্রিটিশ অভিনেত্রী জেনিফার কেনডালকে। ১৯৫৬ সালে কলকাতায় নিজ নিজ থিয়েটারে প্রশিক্ষণ গ্রহণকালীন ইংরেজ অভিনেত্রী জেনিফার ক্যান্ডলের সাথে ভালোবাসার সম্পর্কে জড়িয়ে পড়েন। সহকারী মঞ্চ ব্যবস্থাপক ও অভিনেতা হিসেবে বাবার থিয়েটার গ্রুপ পৃথ্বী থিয়েটারে কাজ করতেন। জিওফ্রে ক্যান্ডলের শেক্সপিয়ারীয় গ্রুপ ঐ সময়ে কলকাতায় আসে ও তাঁর কন্যাই জেনিফার। বেশ কয়েকবার স্বাক্ষাৎকারের পর তাঁরা একে-অপরের দিকে আকৃষ্ট হয়ে পড়েন।

শুরুতে ক্যান্ডলের বাবা এতে বাঁধার কারণ হয়ে দাঁড়ান ও বৌদি গীতা বালির সমর্থনে জুলাই, ১৯৫৮ সালে তাঁদের সম্পর্কে পরিণয়ে গড়ায়।তাঁর সঙ্গেই ১৯৭৮-এ তৈরি করেছিলেন পৃথ্বী থিয়েটার। স্ত্রী আগেই মারা গিয়েছেন। এক কন্যা এবং দুই পুত্র রয়েছে শশী কাপুরের। পৃথ্বীরাজ কাপুরের সঙ্গে নাকি তাঁর সম্পর্ক খুব একটা সহজ ছিল না। তাই নিজের সন্তানদের সঙ্গে বন্ধুর মতো মেশার চেষ্টা করতেন। রবিবার কোনও কাজ করতেন না শশী। বাড়িতে সাড়ে সাতটায় ব্রেকফাস্ট ছিল মাস্ট। সকলকে সেই সময় হাজির থাকতে হত।

সর্বোচ্চ পদ্মভূষণ, দাদা সাহেব ফালকে সহ একাধিক সম্মানে সম্মানিত করা হয়েছে অভিনেতাকে। একাধিক সিনেমার পরিচালনাও করেছেন তিনি। হিন্দির পাশাপাশি ইংরেজি ছবিতেও কাজ করেছেন শশী কাপুর।

মুম্বইয়ের আন্ধেরিতে কোকিলাবেন আম্বানি হাসপাতালে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন বলিউডের এই বর্ষীয়ান অভিনেতা। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৭৯ বছর। কলকাতাতে জন্ম তাঁর।২০১৪ তে হার্ট বাইপাস সার্জারির পর থেকেই অসুস্থ ছিলেন তিনি।

তাঁর প্রয়াণে শোকস্তবদ্ধ চলচ্চিত্র জগৎ। অভিনেতার প্রয়াণে শোক প্রকাশ করেছেন রাষ্ট্রপতি রামনাথ কোবিন্দ। নিজের শোকবার্তায় তিনি লিখেছেন, ‘ভারতীয় সিনেমা ও থিয়েটার আন্দোলনের ক্ষেত্রে শশী কাপুরের উল্লেখযোগ্য ভূমিকা সারাদেশে সবসময় মনে রাখবে। তাঁর পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানাই।’

 

 

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

12 − 12 =