পৃথিবীতে যেদিন আস্তিকতার জন্ম হয়েছিল, সেইদিনই নাস্তিকতারও জন্ম হয়েছিল -সুজন ভট্টাচার্য

Facebooktwittergoogle_plusredditpinterestlinkedinmail

সুজন ভট্টাচার্য

প্রায়শই ধার্মিক মানুষেরা তথাকথিত নাস্তিক বা যুক্তিবাদীদের প্রতি যতটা কঠোর বাক্যবাণ প্রয়োগ করেন, মৌলবাদীদের ক্ষেত্রে তাদের ততটা উদ্যম দেখা যায় না।

এর একটা বড় কারণ অবশ্যই মৌলবাদীদের প্রতি ভয়।

যুক্তিবাদীরা আর যাই হোক, বিতর্কের মাঝপথে গলা যে কাটতে আসে না, সেটা প্রমাণিত।

কিন্তু ধর্মান্ধরা বিতর্কের উত্তরে প্রথমে গালিগালাজ, শেষে চাপাতিতেই অভ্যস্ত।

এক্ষেত্রে ঈশ্বরের বদলে তারা আপনা হাত জগন্নাথ নীতিতেই বিশ্বাসী।

প্রতিটি ধর্মই নাকি সহিষ্ণুতা আর অপরের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হতে শেখায়, মানুষকে নাকি নৈতিকতা শেখায়।

অথচ ধর্মনিরপেক্ষভাবেই সমস্ত ধর্মের মৌলবাদীরাই কিন্তু ওইসব সহিষ্ণুতা বা শ্রদ্ধার ধার ধারে না।

আরো মজা হলো, মুখে অন্তত মৌলবাদী নন, অথচ ধর্মীয় বিষয়ে উৎসাহী এমন ধার্মিক মানুষদের নিয়ে। এমন একজন ধর্মপ্রাণ হিন্দুকে আই এস আই এস বা জামাতে ইসলামি নিয়ে প্রশ্ন করুন। তৎক্ষণাৎ উত্তর পাবেন, মুসলিমরাই ওরকম। এবারে তাকে হিন্দু মৌলবাদ নিয়ে প্রশ্ন করুন। প্রথমে উত্তর পাবেন, এটা ইসলামি মৌলবাদের প্রতিক্রিয়ায় ঘটছে। খানিকবাদে জবাব আসবে, হাতেগোনা কয়েকজন মৌলবাদীকে দিয়ে হিন্দুধর্মের উদারতাকে বোঝা যাবে না।

বেশ বেশ। এবারে একই প্রশ্ন করুন এমনই একজন ধর্মপ্রাণ মুসলিমকে। হিন্দু মৌলবাদ শুনেই তিনি ক্ষিপ্ত হয়ে বলবেন, ওরাই সমস্ত গণ্ডগোলের কারণ। এবারে তাকে ইরাক বা সিরিয়া নিয়ে প্রশ্ন করুন। তৎক্ষণাৎ তিনি থতমত খেয়ে বলবেন, ওদের মাথা খারাপ। ইসলাম এসব অনুমোদন করে না।

কী দাঁড়াল?

অন্য ধর্মের মৌলবাদের ক্ষেত্রে গোটা ধর্মীয় সম্প্রদায়টাই বদ। আর নিজ ধর্মের ক্ষেত্রে মৌলবাদ বিকৃতিমাত্র এবং বিচ্ছিন্ন ঘটনা। এই ব্যাখ্যাকে সুবিধাবাদ বললে কি খুব মিথ্যে বলা হবে? বিপরীতে যুক্তিবাদীমাত্রেই একটাই উত্তর দেবেন, সমস্ত ধর্মীয় মৌলবাদের চেহারাটা একই। গোবিন্দ পানেকর বা কালবর্গির হত্যার সাথে অভিজিৎ রায় বা ওয়াশিকুর রহমানের হত্যার কোন পার্থক্য নেই। তাহলে অন্তত এই প্রশ্নে যুক্তিবাদীরা তুলনায় সৎ। বিপরীতের রঙ বদলালেও তাদের উত্তর বদলায় না। কিন্তু সেই যুক্তিবাদীদের দলেও আজকে নানা কিসিমের পুরো-আধা-সিকি মৌলবাদীরা আস্তানা গেঁড়ে বসেছে। এবং তারা ভিতর থেকেই যুক্তিবাদকে ধ্বংস করার জন্য নানান কায়দায় উঠেপড়ে লেগেছে।

এই কায়দার দুটি মূল চলন আছে। একদিকে বলা হয়, ধর্মে বিশ্বাস মানুষের নৈতিক অবস্থানকে সুদৃঢ় রাখে। আবার অন্যদিকে যুক্তি দেওয়া হয়, যুক্তিবাদীদের ধর্মকে লাগাতার আক্রমণের জন্যই নাকি মৌলবাদ ঘাঁটি গেঁড়ে বসছে।

তার মানে, আজ বিশ্বজুড়ে মৌলবাদের রমরমার দায় হলো যুক্তিবাদীদের। বোঝো কাণ্ড। এদের মৌলবাদী বললে অতিরিক্ত “শ্রদ্ধা” দেখানো হবে; এদের বরং মউলবাদী বলা যেতে পারে। আম বা অন্য কোন গাছে ফলের যে মউল ফোটে, তাঁর মধ্যেই আগামীদিনের ফলের সম্ভাবনা লুকিইয়ে থাকে। এদের মধ্যেও আগামী দিনের মৌলবাদের বীজ ক্রমশ উপ্ত হচ্ছে; তাই এরা মউলবাদী।

প্রথমেই একটা কথা স্পষ্ট ভাষায় বুঝে নেওয়া ভালো যে পৃথিবীতে যেদিন আস্তিকতার জন্ম হয়েছিল, সেইদিনই নাস্তিকতারও জন্ম হয়েছিল।

বিভিন্ন প্রাকৃতিক শক্তিকে তুষ্ট রেখে সমাজের বিস্তৃতি ঘটানোর আকাঙ্খায় মানুষ তাদের মধ্যে দেবত্ব আরোপ করেছে, তাদের আরাধনা করেছে। বিশ্বের সর্বত্রই আদিম ধর্ম ছিল এমনই প্রাকৃতিক শক্তির উপাসনাকারী ধর্ম।

বিপরীতে আবার কেউ কেউ প্রাকৃতিক শক্তির দেবত্বের কাছে আবেদন-নিবেদনকে অর্থহীন মনে করে, বিষয়গতভাবে তাদের স্বরূপ বোঝার চেষ্টা করেছেন। সভ্যতার একদম প্রাথমিক লগ্নে এই আস্তিকতা আর নাস্তিকতার মধ্যে প্রবল প্রতিযোগিতার কোন কারণ ছিল না। কারণ তখনো সমাজে কোন পরস্বাপহারকের জন্ম হয়নি।

সমস্যার সূত্রপাত হলো রাজতন্ত্রের সূচনার সময় থেকেই। রাজা তার বাহুবলে অন্যদের উপর নিজের প্রভুত্ব কায়েম করেছেন। কিন্তু বাকিরা তাকে মেনে নেবে কেন? তাহলে কি প্রতিমুহূর্তে তাদের উপর ডান্ডাবাজি করেই নিজের রাজত্ব টিকিয়ে রাখতে হবে? তাহলে রাজা আয়েশ করবেন কখন?

রাজতন্ত্রের এই সমস্যার সমাধানে এগিয়ে এল ধর্ম; পুরনো প্রকৃতিবাদী ধর্মগুলো জন্ম দিল ঈশ্বরের, যিনি দেবতাদেরও নিয়ন্ত্রক। আর রাজা হলো পৃথিবীতে সেই ঈশ্বরের প্রতিনিধি।

অতএব রাজাকে মান্য করা মানে ঈশ্বরকে মেনে নেওয়া; রাজার বিরোধিতা মানেই ঈশ্বরের বিরুদ্ধাচরণ।

এবং সেই ব্যবস্থাকে আরো শক্তপোক্ত করার জন্য একগুচ্ছ নীতিমালা প্রণয়ন করা হলো মানুষের জন্য। এবং যাতে মানুষ সেগুলো মেনে চলে, তাদের সংযুক্ত করা হলো ঈশ্বরের নামের সাথে।

ধর্মের এই প্রয়োগ যে রাজতন্ত্রের পক্ষেই ছিল, সেটা বিশ্বের ইতিহাস পড়লেই বোঝা যায়। পৃথিবীর ইতিহাসে আজ পর্যন্ত এমন একটি রাজতন্ত্রের উদাহরণ পাওয়া যাবে না, যা নিরীশ্বরবাদী ছিল। স্বাভাবিক। যে ধর্ম সহনশীলতার পাঠ দিচ্ছে, লোভ না করার পাঠ দিচ্ছে, তাতে তো রাজারই উপকার হচ্ছে। একটি ধর্মও তো বলেনি, রাজতন্ত্রের অত্যাচারের বিরুদ্ধে বিদ্রোহও ন্যায়সঙ্গত। কাজেই রাজারা যে ধর্ম আর ধর্মগুরুদের মাথার মনি করে রাখবেন, তাতে আর আশ্চর্যের কি?

বিশ্বের ইতিহাসে যখনই নিপীড়িত মানুষ শাসকের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেছে, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান তাকে শয়তানের উপদ্রব বলেই ব্যাখ্যা করেছে। এমনকি বুদ্ধদেব, যীশু, মহম্মদ, নানক বা চৈতন্যদেবকেও প্রচলিত ধর্মের পাণ্ডাদের প্রবল বিরোধিতা ভোগ করতে হয়েছে। যীশু প্রাণ দিলেন ক্রুসে; মহম্মদ মদিনার নাগরিকদের আভ্যন্তরিন সমস্যা সমাধানের আহ্বানের অছিলায় বাস্তবত মক্কা থেকে পালিয়ে যেতে বাধ্য হলেন। চৈতন্যদেবকেও সম্ভবত হত্যাই করা হয়েছিল।

যে কোন ধর্মের উপযোগিতা সমাজের দু ধরণের মানুষের কাছে দু রকম।

যারা শাসক বা সুবিধাভোগী, তাদের কাছে ধর্মের বিধান হলো রাজত্ব টিকিয়ে রাখার তাত্ত্বিক মন্ত্র।

বিপরীতে যে অসংখ্য মানুষ প্রতিদিন বঞ্চিত হচ্ছেন, তাদের কাছে ধর্ম হয়ে উঠল বেঁচে থাকার মানসিক অবলম্বন।

যার খাদ্য নেই, বস্ত্র নেই, শিক্ষা নেই, চিকিৎসার সুযোগ নেই, ভবিষ্যতের কোন আশা নেই, সে বেঁচে থাকবে কী দিয়ে যদি তার কাছে মৃত্যুর পরে এক অখণ্ড সুখের স্বর্গরাজ্যের স্বপ্ন না থাকে? প্রতিদিন যে অত্যাচার বা যন্ত্রণা সে হজম করতে বাধ্য হয়, সেই গ্লানিকে হজম করার শক্তি সে অর্জন করে ধর্মীয় বিশ্বাস থেকেই। এই বিবেকহীন জগতে ধর্মই তার কাছে হয়ে ওঠে বিবেক; এই মায়াদয়াহীন জগতে ধর্মই তার কাছে বয়ে আনে সহ্য করার বাণী।

যতদিন না মানুষের দৈনন্দিন জীবনযন্ত্রণার সমস্যার সমাধান হচ্ছে, ততদিন তার কাছে ঈশ্বরের মৃত্যু নেই।

যেদিন মানুষ ঈশ্বরের তথাকথিত বিধানের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে নিজেদের জীবন নিজেদের মতো গোড়ে নিতে পারবে, সেদিনই হয়তো ধর্মের অস্তিত্ব প্রশ্নের মুখে পড়বে। তাহলে কি ততদিন নিরীশ্বরবাদের কথা বলা যাবে না? প্রশ্নটাকে অন্যভাবে দেখা যাক। যীশু ছিলেন জন্মগতভাবে ইহুদি এবং জুদা ধর্মের অনুসারী। কিন্তু জুদা ধর্মের রাব্বিদের ব্যক্তিগত লোভলালসা বা রোমান সাম্রাজ্যের আজ্ঞাবহ হয়ে সাধারণ মানুষের উপর অত্যাচার তিনি মেনে নিতে পারেননি। তাই ন্যাজারেথ থেকে তাঁর বেথেলহাইমে আসা। বেথেলহাইমে এসেই তিনি প্রধান মন্দির থেকে যাবতীয় মহাজনদের উৎখাত করলেন। রাব্বিরা তাঁর বিরুদ্ধে দরবার করল রোমান সম্রাটের কাছে।

এই পর্যন্ত ঘটনাক্রম আমাদের সবারই জানা।

এখন প্রশ্ন হলো, রাব্বিরা কিন্তু একটা প্রতিষ্ঠিত ধর্মেরই প্রতিনিধি বা পালক ছিলেন। সেই অর্থে যীশু প্রচলিত জুদা ধর্মকে আঘাত করেছিলেন। এতা কি যীশুর অন্যায় নয়? তাহলে তিনিও কি ধর্মকে আঘাত দেবার দায়ে অপরাধী নন? একইভাবে আরবের পৌত্তলিক ধর্মকে উচ্ছেদ করার দায়ে মহম্মদকেও কি অভিযুক্ত করা যায় না? অভিযুক্ত করা যায় না হিন্দু-মুসলিম দুই ধর্মকেই বাতিল করে দেওয়া গুরু নানককেও? কিংবা অন্ত্যজদের কণ্ঠে হরিনাম তুলে দেওয়া চৈতন্যদেবকে?

আমি ঠিক উল্টোটাই মনে করি।

যুগের প্রয়োজনে, নিপীড়িত মানুষের সমস্যার সমাধানেই এসেছিলেন বুদ্ধদেব, যীশু, মহম্মদ, নানক বা চৈতন্যদেব।

তাঁরা সেই সময়ের মাপে তাঁদের মতো করে একেকটা পথের কথা বলেছিলেন। সেই জন্যই ইতিহাসে তাঁদের ভূমিকা অবিস্মরণীয়।

তাহলে একই অপরাধে অভিযুক্ত যুক্তিবাদীদের কথা বলার অধিকার থাকবে না কেন?

এই কারণেই কি যে তাঁরা ধর্ম ও ঈশ্বরেরই বিরোধী?

অথচ আমাদের অভিজ্ঞতায় আমরা এটাই দেখি কোন একটি ধর্মের পাণ্ডারা অন্যান্য ধর্মগুলোর সম্পর্কে যে ভাষা প্রয়োগ করেন, তাকে আর যাই হোক ঠিক সভ্য বলা যায় না।

তাহলে কি ধর্মের কর্তাদেরই শুধু অধিকার আছে অন্য ধর্ম সম্পর্কে বিষোদ্গার করার? আজ যদি বলা হয়, সম্রাট আকবর যেমন হিন্দু-জৈন ও ইসলাম ধর্মের বিভিন্ন বাণীকে মিশিয়ে দীন-ইলাহি ধর্মমতের প্রচলন করেছিলেন, যুক্তিবাদীরাও ঠিক তেমনি বিভিন্ন ধর্মের পাণ্ডাদের অন্যান্য ধর্ম সম্পর্কে মতামতগুলোকে একত্রিত করছেন, তাহলে?

আমার যদি অধিকার থাকে অন্যদের গালিগালাজ দেবার, তাহলে বিনিময়ে আমাকেও দুচারটে মিষ্টি কথা শোনার মতো মানসিকতা রাখতে হবে।

দুর্ভাগ্যের বিষয়, সহিষ্ণুতার বাণীপ্রচারকদের সেটারই বড় অভাব।

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

9 + seven =