প্রয়াত ঋত্বিক পত্নী সুরমা ঘটক

Facebooktwittergoogle_plusredditpinterestlinkedinmail

পেশায় ছিলেন স্কুল শিক্ষিকা। শুধু ঋত্বিকের স্ত্রী হিসেবে নয়, নিজস্ব পরিচয়েও পরিচিত ছিলেন সুরমা।সুরমা ঘটকের বই এর মধ্যে ‘সুরমা নদীর দেশে’, ‘ঋত্বিক’, ‘শিলং জেলের ডায়েরি’, ‘ঋত্বিক পদ্মা থেকে তিতাস’ সাড়া জাগানো ।

কমিউনিস্ট পার্টির সদস্য ছিলেন। শিলং-এ জেলও খাটতে হয়েছে তাঁকে। ”গ্র্যাজুয়েট হবার পরে শিলং-এ তো আর এম. এ. পড়তে পারবো না। আর আমি তো হায়েস্ট কমিটির মেম্বার হয়েছি। আন্ডারগ্রাউন্ডে যেতেই হয়েছে। সেই অনেক দূরে খাসিয়া গ্রামে। তারপর তো ধরা পড়লাম। ধরা পড়ার পরে শিলং জেলে। এইখানে একটা কথা, সেটা হল যে আমরা দশ মাস ছিলাম ফিমেল ওয়ার্ডে। চোর, খুনি, পাগলি এবং পতিতাদের সঙ্গে। এদের মধ্যে চারজন ছিল ভায়োলেন্ট। তার মধ্যে একজন রিলিজ হয়ে চলে যায়। ভুটিয়ালি। আর একজন খুব অসুস্থ। খুশ্‌বু নাম। ও সব ছুঁড়ে ছুঁড়ে ফেলে দিত। খাবার জল, কাপড়চোপড় সব কিছু। ওর কথাও বাদ দিচ্ছি। আর একটি এসেছিল নিরুপমা, ও অঞ্জলিরই ক্লাসফ্রেন্ড ছিল। ওর সঙ্গে ওর দুটো ছেলে আছে। কিন্তু ও অসুস্থ হয়ে ভায়োলেন্ট হয়ে যায়। আর আরেকজন ছিল পার্বতীর মা। ও দেখতে খুব সুন্দর, ভদ্র, ভালো। ওর মেয়েরা দেখা করতে আসত। কিন্তু পরে এত ভায়োলেন্ট হয় এ দুজন যে সাংঘাতিক অবস্থা। সুতরাং আমরা যখন অনশন ধর্মঘট করতাম তখন আমাদের একটা ডিমান্ড থাকত যে এদের এখান থেকে তেজপুরে চালান কর। তেজপুরে চালান কর কেন? তখন শিলং ছিল সারা আসামের রাজধানী। এবং নিয়ম ছিল যারা অত্যন্ত ভায়োলেন্ট তাদের তেজপুরে চালান করা হবে। আর দুই নম্বর হল পতিতা মেয়েরা আসত। এরা আসত সিফিলিসের চিকিৎসার জন্য। ওদের অসুখের গুরুত্ব বুঝে, কনভিকশন দিয়ে তারপর ছেড়ে দিত”।

এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, যখনই আমার বিয়ে ঠিক হয়েছে তখনই আমি দেখলাম এতো আনকম্প্রোমাইজিং শিল্পী, কখনো কাজ থাকবে, কখনো কাজ থাকবে না। কখনো ছবি চলবে, কখনো ছবি চলবে না। সুতরাং আমি নিজের পায়ে দাঁড়াব। বাবা আমাকে একটা চাকরি ঠিক করে দিয়েছিলেন, সেক্রেটারিয়েটে। তখন বাবা বললেন যে তুমি এমন কিছু করতে পারবে না যাতে তোমার চাকরির ক্ষতি হয়। আমি বললাম যে না আমি সেরকম কিছু করব না। না তোমাকে লিখে দিতে হবে। আমি বললাম, লিখে আমি দেব না। সেজন্য আমার চাকরি হল না। তারপরে আমি তখন ঠিক করলাম যে আমি নিজের পায়ে দাঁড়াব। কিন্তু আমার এক বছরের ছোট-বড় দুই মেয়ে, মা-বোন নেই। ওদের দেখতে হবে। তারপর যাদবপুর ইউনিভার্সিটিতে ভর্তি হলাম। ফিফ্‌থ ইয়ার থেকে সিক্সথ ইয়ারে উঠলাম। ‘মেঘে ঢাকা তারা’র সময়। পরে ‘কোমলগান্ধার’ও চলল না। আমার একটা মেয়ের প্যারা-টাইফয়েড আর একটা মেয়ের জ্বর। রান্নার লোক ছুটিতে গেছে। ঘরের কাজ, মানে এত বিভ্রাট, চারটে পেপার দিয়েছি ফিফ্‌থ পেপারের দিন কী লিখব তাই ভাবছি।

তখন জানলাম যে বিষ্ণুদে’র স্ত্রী, প্রণতি দে, তিনি নাকি বলেছিলেন ভালো করে পরীক্ষা না দিলে ড্রপ করাই ভালো। আমি ভয়ে ভয়ে ড্রপ করে দিলাম। ফিফ্‌থ পেপারে ফেল করলাম, ৬১-সাল। ৬২-তে ‘সুবর্ণরেখা’ মর্টগেজ দিয়ে টাকা নিয়ে চলে গেছে। তাহলে আরো দুর্দশা। আর ৬৩-তে ছেলের জন্ম। উনি বলতেন ‘লক্ষ্মী আমার ছেলে হলে মাথা ঠিক হয়ে যাবে’। মাথা একদম ঠিক হল! ৬৪ থেকে চোলাই মদ খেয়ে বিছানা ভাসিয়ে শোওয়া। সুতরাং আমার দুই মেয়েকে স্কুলে পাঠানো, ছেলেকে সব করা, তারপর ওনাকে পরিষ্কার করা, বিছানা পরিষ্কার করা। এই আমার জীবন। ৬৫-তে পুনার চাকরি। পুনাতে ভাইস প্রিন্সিপাল। ওনাকে বাবার থেকে টাকা আনিয়ে পাঠিয়ে আমি শিলং চলে গেলাম। শিলং-এ গিয়ে আমি আর কিছু বলতে পারব না। মানে এত শরীর খারাপ, প্রথমে হয়েছিল শিরদাঁড়ায় ব্যথা। তারপর এত ওজন কমে গেল ডিওরাবলিন ইনজেকশন নিতে হতো। আর ওখানে গিয়ে শরীরটা কাঁপত, পারকিনশনস এর মতন। আমার জ্যাঠামশাই বললেন সব ডাক্তারকে আসতে বারণ কর, আমি দেখব। তারপর জ্যাঠামশাই আমাকে ভালো করে তুললেন।

অক্টোবরে এসে একটা স্ক্রিপ্ট লিখতে লিখতে অজ্ঞান হয়ে গেলেন। দুদিন দুরাত্রি হ্যালুসিনেশন, ডিলিরিয়াম এই সমস্ত। ৬৯-এ ডাক্তার বলায় ওনাকে মেন্টাল হসপিটালে ভর্তি করি।

মেন্টাল হসপিটালে একমাসের মধ্যেই সুস্থ হয়ে গেছিলেন। তারপর একটা নাটক লিখে, নাটকও করেছেন। তারপরে তিনটে ডকুমেন্টারি করেছেন। এর মধ্যে ছোড়দা এসে উপস্থিত, নরেশ ঘটক, উনি একটা ট্রেনিং-এ ছিলেন, জাহাজের চিফ অফিসার ছিলেন তো, ওই ট্রেনিংটা পাশ করলেই ক্যাপ্টেন হয়ে যাবেন। তো উনি ট্রেনিং ছেড়ে দিয়েছেন, চাকরিও ছেড়ে দিয়েছেন। আর দিনরাত্রি ড্রিংক করছেন। সঙ্গে আর দুটো চোলাইখোর, তিনজনে টং হয়ে বসে আছেন। আর ইনিও পরমানন্দে আবার আরম্ভ করেছেন। আর যখন সুস্থ অবস্থা, তখন দেবীর মতো মেয়ে (আমাকে) আর যখন ওই টং অবস্থা, তখন মাগী বেরিয়ে যা এটা আমার বাড়ি। তা আমি তখন দেখলাম যে, আমি যদি সব রেখে যাই তাহলে তো আমার সব যাবে। স্ক্রিপ্ট, রেকর্ড, বই সবকিছু অন্য জায়গায় সরিয়ে দিলাম। আমি বাড়িওলাকে একটা নোটিস দিলাম যে, বাড়ি আমরা ছেড়ে দিচ্ছি। নোটিস দিয়ে তিন ছেলেমেয়েকে নিয়ে আমি চলে গেলাম। বাবা নিজে বড়দা মনীশ ঘটক, আর সেজো ভাসুর এই দুজনকে লিখলেন যে লক্ষ্মী কাজে যোগদান করতে যাচ্ছে, তোমরা ঋত্বিককে দেখো। ব্যস এই ট্রিটমেন্টে কাজ হল। তারপর উঠে যা আরম্ভ করলেন, প্রথমে ‘দুর্বার গতি পদ্মা’। বিশ্বজিতের সঙ্গে যোগাযোগ হয়েছিল। ‘দুর্বার গতি পদ্মা’ মুক্তিযুদ্ধের ওপরে। তারপরে ‘যুক্তি তক্কো গপ্পো’, স্ক্রিপ্ট লিখে আমাকে এসে শোনালেন। শুনিয়ে বললেন যে আমি তোমাকে প্রোডিউসার করেছি, তবে তোমার একজন পার্টনার আছে। তা ছুটির সময় এসে আমি ওই পার্টনারের বাড়িতে উঠতাম। আর শ্যুটিং-এ চলে যেতাম। তার আগে ‘মেঘে ঢাকা তারা’ এবং ‘কোমল গান্ধার’-ও আমার নামে লিখে দিয়েছিলেন। এই তিনটে ছবির রাইট দিয়েছিলেন। আবার বাংলাদেশে যোগাযোগ হল। চলে গেলেন বাংলাদেশ। মানে একবার কলকাতায় ‘যুক্তি তক্কো গপ্পো’ আর বাংলাদেশে ‘তিতাস’।”

দীর্ঘদিন শিলংয়ে নিজের বাপের বাড়িতে কাটিয়েছেন সুরমাদেবী। তিন সন্তান ঋত্বিক ঘটক এবং সুরমা দেবীর ৷ তাঁরা হলেন ঋতবান, সংহিতা এবং শুচিশ্মিতা। শুচিশ্মিতার মৃত্যু হয়েছে ২০০৯ সালে। সংহিতা মারা যান বছর খানেক আগে। ছেলে ঋতবানও বহুদিন ধরে মানসিক রোগে আক্রান্ত।

কমলেশ্বর মুখোপাধ্যায়ের ছবি ‘মেঘে ঢাকা তারা’ সম্পর্কে সুরমার মন্তব্য ছিল,”ঋত্বিক ঘটক যে শেষ পর্যন্ত কাজ করেই শেষ করলেন জীবন, সেই অধ্যায়টা একদম বাদ”।

সুরমা ঘটক, মৃত্যুকালে বয়স হয়েছিল ৯২ বছর। শারীরিক অসুস্থতার কারণে ভর্তি ছিলেন বাঙ্গুর হাসপাতালে। সেখানেই গতকাল রাত সোয়া বারোটা নাগাদ শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি। সকাল ১০টায় তাঁর মরদেহ আনা হয়েছে বলে জানা যায় চেতলার সরকারি আবাসনে। ১১টায় শেষকৃত্য কেওড়াতলা শ্মশানে।

 

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

3 × one =