ফসল তোলার স্বপ্নে এখন দলা দলা হাহাকার, মৌ মৌ বদলে ভ্যাঁপসা পঁচা গন্ধ

Facebooktwittergoogle_plusredditpinterestlinkedinmail

তিন দশকেরও বেশি সময় সুরমা, কালনী, মহাসিংহ-সহ এই অঞ্চলের নদীগুলোতে করা হয়নি কোনো খনন কাজ। পলি জমে নাব্যতা কমে যাওয়ায় ভারত থেকে আসা পাহাড়ি ঢলের পানি বহন করার মতো ক্ষমতা নেই নদীগুলোর বুকে।

শুধু সুনামগঞ্জেই এবার প্রায় ষাট কোটি টাকা ব্যয়ে প্রধান ৪২টি হাওরের ফসল রক্ষা বাঁধ নির্মাণ আর সংস্কারের কাজ শেষ হওয়ার কথা ছিল ফেব্রুয়ারির মধ্যে আর কিছু অংশ মার্চের শেষে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে শেষ হয় কাজের মাত্র চল্লিশ থেকে পঞ্চাশ ভাগ। লুটপাটে ব্যস্ত থাকার কারণে মধ্য ডিসেম্বরের মধ্যে কাজ শুরুর কথা থাকলেও তা শুরু হয় ফেব্রুয়ারি-মার্চ থেকে। প্রথম থেকেই কৃষকসহ এলাকার সব মানুষের আশঙ্কা ছিল এবারের অকাল বন্যায় তাদের সব শেষ হতে চলেছে। হলোও তাই। এমনটা যে হবে সে তো হিসেবের কথা। নভেম্বর থেকে বোরো ধানের আবাদ শুরু হয়ে সে ফসল ঘরে ওঠে মধ্য এপ্রিলে। সব যখন শেষ হয়ে গেল, ঢাক ঢোল পিটিয়ে তখন পানি উন্নয়ন বোর্ড আর ঠিকাদারদের বিরুদ্ধে দুদকের কর্তাব্যক্তিরা চষে বেড়াচ্ছেন দুর্নীতির তদন্তে।

সুনামগঞ্জের কৃষক এবং অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক আবু সুফিয়ান, যিনি সম্প্রতি স্থানীয়দের নিয়ে ‘হাওর বাঁচাও আন্দোলন’ নামে একটি সংগঠন গড়ে তুলেছেন, তিনি জানান সময় মতো বাঁধ নির্মাণ না করার কারণে এই পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে।

তিনি বলেন, “কোনো কোনো বাঁধে কাজই হয়নি। আবার কোনো কোনো বাঁধে কাজ শুরু হয় যখন বৃষ্টি শুরু হয়েছে তখন। একারণে পানি আসা মাত্রই সেই ঢল হাওরের ভেতর ঢুকে পড়েছে।”তিনি জানান, ফেব্রুয়ারি মাসের মধ্যে বাঁধের কাজ শেষ করার কথা ছিলো। সময় মতো বাঁধ নির্মাণের কাজ হলে এতো বড়ো বিপর্যয় ঘটতো না।

আবু সুফিয়ান বলেছেন, এবিষয়ে তারা স্থানীয় পানি উন্নয়ন বোর্ডের কর্মকর্তাদের সাথে বহুবার কথা বলেছেন। সংবাদপত্রগুলোতেও প্রচুর লেখালেখি হয়েছে যে এখন মাটি ফেলা হচ্ছে না। কিন্তু আগাম যদি বন্যা হয়ে যায় তাহলে হাওরগুলো পানির নিচে পুরোপুরি তলিয়ে যেতে পারে। তিনি অভিযোগ করেছেন, এবিষয়ে পানি উন্নয়ন বোর্ড গুরুত্ব দেয়নি।

তিনি বলেন, অন্যান্য বছরেও এসময় বৃষ্টি হয়, পাহাড় থেকে ঢল আসে কিন্তু বাঁধের কারণে বৃষ্টির পানিটাই শুধু হাওরের ভেতরে থেকে সামান্য ক্ষতি হয়। “কিন্তু সময়মতো বাঁধ নির্মিত হলে এতো বড়ো সর্বনাশ হতো না বলে আমার বিশ্বাস”।

দুর্গত মানুষগুলোকে নিয়ে পরস্পর বিরোধী রাজনীতি শুরু করেছে প্রধান দুই শাসকদল আওয়ামী লীগ-বিএনপি। সবসময় ঢালাওভাবে সরকারকে দোষ দেওয়াটা অবশ্য মূর্খতার পরিচয়। ফসল রক্ষা বাঁধের জন্য সব সরকারই কম-বেশি বরাদ্দ রেখে আসছে প্রতিবছর। বরং উত্তরোত্তর বাড়ছে বরাদ্দের পরিমাণ। কিন্তু কাজের নামে সামান্য কিছু করে সেই টাকা লুটেপুটে খায় সরকারি কর্তাব্যক্তি আর স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা। বছর বছর বরাদ্দ থাকলেও নেই সমন্বিত পরিকল্পনা।

শত শত মানুষের দিনরাতের চেষ্টা ব্যর্থ করে দিয়ে ঢলের পানিতে তলিয়ে গেলো সুনামগঞ্জের জামালগঞ্জ উপজেলার পাকনার হাওরের বোরো ধান। সোমবার ভোর ৫ টা ২২ মিনিটে হাওরের উড়ারকান্দি এলাকার বাঁধটি ভেঙে যায়। এরপর হাওরে প্রবল বেগে ঢলের পানি ঢুকে পড়ে। এর মধ্য দিয়ে বড় হাওরের সবকটিরই ধান ভেসে যায় ।

২০০১ সালের পর থেকে এ পর্যন্ত আট আটবারের মতো ঘরে ফসল তুলতে পারলেন না কৃষক। তবে এবারের ক্ষতি অবর্ণনীয়। যে কথা স্বয়ং রাষ্ট্রপতিও বলেছেন। সর্বস্ব খুইয়ে হাওরাঞ্চলে এখন মঙ্গার আশঙ্কা। সুনামগঞ্জের ২ লাখ ২৪ হাজার হেক্টর জমিতে আবাদকৃত বোরোর ৮২ শতাংশ ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার কথা প্রশাসন বললেও কৃষকেরা বলছেন ৯০ শতাংশের কথা। ফসলহানি না ঘটলে এবার উৎপাদিত ধান থেকে প্রায় ৯ লাখ মেট্রিক টন চাল পাওয়া হতো। মুষ্টিমেয় কিছু দুর্নীতিবাজের পাপ গ্রাস করেছে লাখ লাখ মানুষের ভবিষ্যতকে। এক ফসলী ছোট-বড় দেড়শোরও বেশি হাওর তলিয়ে যাওয়ার পর এখন মোড়ক লাগতে শুরু করেছে মাছসহ জলজ প্রাণীতে। গবাদি পশুর বেঁচে থাকার জন্যও নেই কোনো খাবারের ব্যবস্থা।

এদিকে, সম্প্রতি বন্যায় হাওর-জলাশয়ে ধান পঁচে এমোনিয়া গ্যাসে মাছের মহামারী শুরু হওয়ায় প্রশাসন মাইকিং করে ওইসব পঁচা মাছ না খাওয়ার জন্য নির্দেশনা দেয়ার পর এসব জলাশয়ে সবধরনের মাছধরা নিষিদ্ধ করেছে জেলা প্রশাসন। বৃহস্পতিবার রাতে জেলা প্রশাসক শেখ রফিকুল ইসলাম এই নির্দেশনা জারি করেছেন।

প্রশাসন জানায়, গত কয়েক দিন ধরে হাওর-জলাশয়ে মাছ মরে ভেসে উঠছে। এতে হাওরবাসী আতঙ্কিত হয়ে পড়েছে। মত্স্য বিভাগ বিভিন্ন উপজেলায় মাইকিং করে মরা মাছ খাওয়া থেকে জনগণকে বিরত থাকার আহ্বান জানিয়ে আসছে। অবস্থা অপরিবর্তিত থাকায় বৃহস্পতিবার রাতে জেলা প্রশাসক শেখ রফিকুল ইসলাম আগামী এক সপ্তাহের জন্য সুনামগঞ্জের হাওর জলাশয় (যেখানে সাধারণত মাছ ধরা হয়) এমন স্থানে সবধরনের মাছধরা নিষিদ্ধ করা হয়েছে।

জেলা মত্স্য অফিসার রঞ্জন কুমার দাস বলেন, আমরা মাইকিং করে হাওড়ে ভেসে ওঠা পঁচা মাছ না খাওয়ার জন্য সতর্কতা জারি করেছি। পাশাপাশি আমরা যেখানে সাধারণত সবসময় মাছ ধরা হয় সেসব স্থানে মাছ না ধরার জন্য নির্দেশনা দিয়েছি।
সুনামগঞ্জের হাওর ছাড়াও মৌলভীবাজারের হাকালুকি হাওড়ে মাছ মরে ভেসে উঠেছে। সেখানেও মাছ ধরা নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। ভারি বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলে দেশের হাওর এলাকায় অকাল বন্যায় বোরো ধান তলিয়ে গেছে। দীর্ঘদিন পানির নিচে থাকায় গাছ পঁচে গেছে।

ভিটেমাটি ছাড়তে শুরু করেছেন অনেকে, বাকিরা পানির দিকে তাকিয়ে ভাবছেন বা ভাবতেই পারছেন না গরম ভার, শুকনা মরিচ আর নুন দিয়ে কবে জুটবে দৈনিক খাবার ।

হাওড়ে ক্ষতিগ্রস্ত ৩লক্ষ ৩০হাজার কৃষক পরিবারকে প্রতি মাসে ৩০কেজি চাল ৫০০টাকা করে দিবে বলে ঘোষণা দিয়েছে বাংলাদেশ সরকার।

 

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

2 × 5 =