বঙ্গবন্ধু হত্যামামলার সাক্ষী ৯ সাব-সেক্টর কমান্ডার মেজর জিয়াউদ্দিন (বীর উত্তম’) চলে গেলেন

Facebooktwittergoogle_plusredditpinterestlinkedinmail

পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে ‘দালাইলামা’ হিসেবে খ্যাত মেজর জিয়াউদ্দিন একাত্তরে রাওয়ালপিন্ডি সেনা সদরে কর্মরত ছিলেন। তিনিও মেজর মঞ্জুর ও মেজর তাহেরের সাথে পাকিস্তান ত্যাগ করে মুক্তিযুদ্ধে সরাসরি অংশ নেন।

তাঁকে প্রথম ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের অধিনায়ক নিযুক্ত করা হয়। তাঁর সুযোগ্য নেতৃত্ব রৌমারীর কোদালকাঠি, সিলেটে ধলই আউটপোস্ট, জকিগঞ্জ, আটগ্রাম, গৌরীপুর, কানাইরঘাট, এমসি কলেজসহ বিস্তীর্ণ অঞ্চল শত্রুমুক্ত হয়। মুক্তিযুদ্ধে গৌরবময় অবদান রাখার জন্যে ‘বীর উত্তম’ খেতাবে ভ‚ষিত করা হয়।

তিনিও স্বাধীনতার অব্যবহিত পরে মত পার্থক্যের কারণে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী থেকে অবসর নেন, তিনি ছিলেন সেনাবাহিনীর কমিশনপ্রাপ্ত সেনা অফিসার, বীর উত্তম খেতাবপ্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধা এবং একজন লেখক ও সাংবাদিক।। ৭৫’এর ১৫ আগস্ট ঢাকায় ডিজিএফআই’তে কর্মরত ছিলেন। ৭ নভেম্বর কর্নেল তাহেরের বিপ্লবে অংশ নেন।

 

এরপর সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে কর্নেল তাহেরের সৈনিক সংস্থার পক্ষে অবস্থান নিয়ে তার অনুসারীদের নিয়ে সুন্দরবনে আশ্রয় নেন। ‘৭৬ সালের জানুয়ারিতে সুন্দরবনে সেনা অভিযানে মেজর জিয়াউদ্দিন গ্রেফতার হন। সামরিক আদালতে গ্রেফতারকৃতদের মধ্যে কর্নেল তাহেরকে ফাঁসি ও আ স ম আবদুর রব, মেজর জলিল সহ অন্যদের সঙ্গে মেজর জিয়াউদ্দিনও যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়।

এ নিয়ে তখন সারা দেশের মুক্তিযোদ্ধারা আন্দোলন শুরু করলে আ স ম আবদুর রব, মেজর জলিলসহ অন্যদের সঙ্গে মেজর জিয়াউদ্দিনও ১৯৮০ সালে রাষ্ট্রপতির সাধারণ ক্ষমায় মুক্তি লাভ করেন। ‘৮৩ সালে জেনারেল এরশাদের সময় মেজর জিয়াউদ্দিন দেশ ছেড়ে আশ্রয় নেন সিঙ্গাপুরে।

‘৮৪ সালের অক্টোবরে ছোট ভাই কামালউদ্দিন আহমেদ, ভাগ্নে শামীমসহ কয়েকজন মুক্তিযোদ্ধাকে নিয়ে চলে যান সুন্দরবনের দুবলার চরে। বনদস্যু বাহিনীগুলোর হাতে প্রতিনিয়ত নির্যাতিত সুন্দরবনের জেলেদের সংগঠিত করে শুরু করেন শুঁটকি মাছের ব্যবসা। ‘৮৮ সালের ফেব্রুয়ারিতে সুন্দরবনের মূর্তিমান আতঙ্ক ডাকাত দল কবিরাজ বাহিনীর সঙ্গে শ্যালারচরে সরাসরি বন্দুকযুদ্ধে জয়ী হন মেজর জিয়াউদ্দিন, নিহত হয় কবিরাজ বাহিনীর প্রধান। এরই মাঝে ‘৮৯ সালে পৌরবাসীর দাবির মুখে নির্বাচন করে তিনি পিরোজপুর পৌরসভার চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। গড়ে তুলেছেন সুন্দরবন বাঁচাও কর্মসূচি নামে একটি অরাজনৈতিক সংগঠন। এর চেয়ারম্যানও তিনি।

কর্মজীবনের শুরু থেকে আজ পর্যন্ত দুলবার চর ফিসারমেন গ্রুপের চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্বে আছেন। আর সংগত কারণে হাজার হাজার জেলের স্বার্থ রক্ষায় ডাকাতদের প্রতিরোধ করতে হয়েছে। কখনো জেলেদের নিয়ে, কখনো প্রশাসনকে সহায়তা দিয়ে ডাকাতদের নির্মুলের নায়কের ভূমিকা রেখেছেন। আর এ কারণেই অনেকশত্রু তার পিছু নিয়েছে। বিশেষ করে বন ও জল দস্যুদের দমনে তার ভূমিকা প্রশংসিত। আবার প্রশাসনের বনদস্যু নির্মুলে জনবল ও বুদ্ধি পরামর্শ দিয়ে সহায়তা করতেন ।

বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলার সাক্ষী এবং মুক্তিযুদ্ধে ৯ নম্বর সেক্টরের সুন্দরবন সাব-সেক্টর কমান্ডার মেজর (অব.) জিয়াউদ্দিন আহমেদ আর নেই । মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল ৬৭ বছর। মেজর জিয়াউদ্দিন আহমেদের জন্ম পিরোজপুর জেলার পারেরহাট গ্রামে।

শুক্রবার বাংলাদেশ সময় সকাল সাড়ে ১০টার দিকে সিঙ্গাপুর মাউন্ট এলিজাবেথ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।মেজর (অব.) জিয়াউদ্দিন আহমেদের বড় ছেলে জাকির উদ্দিন আহমেদ এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন। । , প্রায় দুই বছর ধরে  তিনি লিভার সিরোসিসে ভুগছিলেন। প্রায়ই তিনি অসুস্থ হয়ে পড়তেন।

সর্বশেষ গত ১ জুলাই অসুস্থ হওয়ার পর তাকে রাজধানীর স্কয়ার হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। পরদিন অবস্থার অবনতি হলে তাকে আইসিইউতে স্থানান্তর করা হয়। সেখান থেকে উন্নত চিকিৎসার জন্য এয়ার অ্যাম্বুলেন্সে করে সিঙ্গাপুরে নেওয়া হয়েছিল।

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

5 × 5 =