বরাক উপত্যকায় ভাষা দিবস: একুশে-উনিশে একাকার

Facebooktwittergoogle_plusredditpinterestlinkedinmail

উনিশে মে তারিখটির প্রতি ভারতের আসাম রাজ্যের বরাক উপত্যকার মানুষের আগ্রহ যত বাড়ছে, একুশে ফেব্রুয়ারির গুরুত্বও তত বৃদ্ধি পাচ্ছে। উনিশের শহরে আজ আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা পালনে বিভিন্ন সংস্থা, সংগঠন বিশেষ উদ্যোগ নেয়। একুশের সব অনুষ্ঠানেই উঠে আসে উনিশের কথা। এক দিকে মাতৃভাষার অধিকার রক্ষায় রক্ত দিয়ে বাংলাদেশর সৃষ্টি। অন্য দিকে বাংলা ভাষার সরকারি স্বীকৃতি আদায়ে বরাক উপত্যকায় এগারো তরুণ-তরুণীর প্রাণ বিসর্জন। এ দিন আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসে তাই উনিশে-একুশে একাকার হয়ে যায়।

এ উপলক্ষে বরাক উপত্যকা বঙ্গসাহিত্য ও সংস্কৃতি সম্মেলন ২১ ফেব্রুয়ারি অবিকল পুনর্মুদ্রণ ও পুনঃপ্রকাশ করে শতবর্ষ পূর্বে প্রকাশিত মাসিক সাহিত্য পত্রিকা ‘শ্রীভূমি’র প্রথম বর্ষ, প্রথম সংখ্যার । আনুষ্ঠানিকভাবে এর মোড়ক উন্মোচন করেন রবীন্দ্রানুরাগী মনুজেন্দ্র শ্যাম। বিভিন্ন ভাষাভাষীর ১১ জন সাহিত্যসেবীকে এ অনুষ্ঠানে সম্বর্ধনা জানানো হয়। এঁরা হলেন রাধাকান্ত চুতীয়া (অসমীয়া), মহীউদ্দিন (বাংলা), আনন্দমোহন মহন্ত (বাংলা), প্রভাসচন্দ্র নাথ (বাংলা), বরুণকুমার সিংহ (বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরি), মুকুলরঞ্জন বর্মন (ডিমাসা), সুরেশ দ্বিবেদী (হিন্দি), ভক্তসিং ঠাকুরি (নেপালি), কাজল দেমতা (চা জনগোষ্ঠী), ছবি গুপ্তা (বাংলা) ও চেংমাই রংমাই (নাগা)। শেষের দু’জন আসতে না পারলেও তাঁদের প্রতিনিধিরা স্মারক গ্রহণ করেন। অনুপস্থিত ছিলেন সোনা সিংহ (মণিপুরি) ও জন জেমিংলিয়েন মার (মার)। অনুষ্ঠানে বক্তৃতা দেন অমলেন্দু ভট্টাচার্য, আবিদ রাজা মজুমদার ও তৈমুর রাজা চৌধুরী।

অনুষ্ঠানে বিশেষ আকর্ষণ ছিল শহিদ স্মৃতি সঙ্গীত। ভাষা আন্দোলনের সময় পত্রপত্রিকা তেমন ছিল না। তখন লোককবিরা গ্রামেগঞ্জে গান গেয়েই আন্দোলনের বিভিন্ন ঘটনার খবর ছড়িয়ে দিতেন। আলাউদ্দিন খাঁ রচিত সে-সময়কার দুটি গান আজ গেয়ে শোনান সোনাইয়ের সাইদুল হক লস্কর। তাঁকে সহযোগিতা করেন কুতুবউদ্দিন লস্কর ও ফয়জুর হক বড়ভুঁইঞা। সংগৃহীত গান দুটি এ অনুষ্ঠানেই প্রথম জনসমক্ষে পরিবেশিত হল।

বঙ্গভবনে এ দিন বরাক বঙ্গের শিলচর আঞ্চলিক সমিতি শহিদ তর্পণের আয়োজন করে। সেখানে সংক্ষিপ্ত আলোচনায় অংশ নেন আঞ্চলিক সমিতির সভাপতি সঞ্জীব দেব লস্কর। ছিল শিশুদের চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতাও। উদ্বোধন করেন গুরুচরণ কলেজ পরিচালন সমিতির সভাপতি সৌরীন্দ্রকুমার ভট্টাচার্য।

শহরের গান্ধিবাগের সামনে কৃষ্ণচূড়া মঞ্চে নানা অনুষ্ঠানে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস পালন করে বরাক উপত্যকা মাতৃভাষা সুরক্ষা সমিতি। সঙ্গীত, আবৃত্তি, বক্তৃতায় মাতৃভাষার শহিদদের স্মরণ করা হয়। উন্মোচিত হয় মাতৃভাষা নামে সংগঠনের সাময়িকী।

জনশিক্ষণ সংস্থানের শিলচর কার্যালয়েও বিভিন্ন ভাষাভাষীর প্রতিনিধিরা একমঞ্চে বসে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস নিয়ে আলোচনা করেন। এ অনুষ্ঠানে বক্তারা ছিলেন: সীমা ঘোষ (বাংলা), সুনীতকুমার বর্মন (ডিমাসা), কমলকুমার সিংহ (মণিপুরি) ও  দিলীপ কুমার (হিন্দি)। আকাশবাণী শিলচর কেন্দ্রের বার্তা সম্পাদক সঞ্জীবকুমার শর্মা এ সভায় পৌরোহিত্য করেন। উপস্থিত ছিলেন জনশিক্ষণ সংস্থানের শিলচর নির্দেশক শৌভিক দাসচৌধুরী, সুনন্দা নন্দী পুরকায়স্থ, স্বর্ণালী ঘোষ, অসিত রায় ও লালনপ্রসাদ গোয়ালা।

সম্মিলিত সাংস্কৃতিক সংস্থা সন্ধ্যায় শহরের গান্ধিভবনে গানে-নৃত্যে ভাষাসংগ্রামীদের স্মরণ করে। সারা মণিপুর বাঙালি ছাত্র-যুব সংস্থার উদ্যোগেও জিরিবামে গতকাল আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস উদযাপিত হয়।

গুয়াহাটির প্রাগজ্যোতি আইটিএ কমপ্লেক্সে ব্যাতিক্রম মাসডো’র উদ্যোগে ১৯ থেকে ২১ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত পালিত হল দশম ভাষা সংস্কৃতি মিলন উৎসব। উৎসবের সূচনায় ছিল মাতৃভাষায় শিক্ষাসঙ্কট নিয়ে আলোচনা সভা। সেখানে আসাম ও বাংলাদেশের সাহিত্যিক-শিক্ষাবিদরা অংশ নেন। অনুষ্ঠিত হয় কবি সম্মেলনও। সদ্য পদ্মশ্রীপ্রাপ্ত সমাজসেবী অজয় দত্ত ও সাহিত্যিক নিরুপমা বরগোহাঞিকে এ অনুষ্ঠানে সংবর্ধনা জানানো হয়। বাউল গানে আসর মাতান গঙ্গাধর ও তুলিকা মণ্ডল। এ ছাড়া বিভিন্ন প্রতিযোগিতার আয়োজনও করা হয়।

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

three + 13 =