বর্বর পাকবাহিনীর “অপারেশন বিগ বার্ড“ ও ‘অপারেশন সার্চলাইট’ ১৯৭১-জাহান এস তিমির

Facebooktwittergoogle_plusredditpinterestlinkedinmail

হিটলারের নাজি  বাহিনী ৬ বছরে ৬০ লক্ষ মানুষকে হত্যা করে। আর ১৯৭১ সালের ২৫ – ২৬ মার্চে পাকিস্তান সেনাবাহিনী এদেশীয় দোসরদের সহযোগীতায় “অপারেশন সার্চ লাইট” চালিয়ে শুধু মাত্র ঢাকাতেই পঞ্চাশ হাজারের বেশী মানুষ হত্যা করেছিল ।২৫শে মার্চ কালরাত ১৯৭১, যে রাতে দু’টি পরিকল্পিত ছকে আধুনিক অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত পাকিস্তানী বাহিনীকে নামিয়ে দেয়া হয় ঢাকার রাজপথে। একটি মিশনের নাম ছিল “অপারেশন বিগ বার্ড“ -যার উদ্দেশ্য বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমানকে গ্রেফতার। আরেকটি মিশনের নাম ‘অপারেশন সার্চলাইট’- যার উদ্দেশ্য ক্যান্টনমেন্ট থেকে জিপ, ট্রাক, ট্যাঙ্ক ও আধুনিক সমরাস্ত্র বোঝাই পাকিস্তানি সৈন্যদের ঘুমন্ত নিরস্ত্র ঢাকা বাসীর ওপরে মরণ আঘাত হান ।তাদের ধারণা ছিল এর মাধ্যমে তারা রক্তে ভাসিয়ে দেবে স্বাধীনতাকামী নির্যাতিত মানুষের স্বাধীন ভূ-খণ্ডের ঐক্যবদ্ধ স্বপ্ন। ২৫ শে মার্চ দিয়েই শুরু দেশব্যাপী গণহত্যা !

পৃথিবীর ইতিহাসে মাত্র এক রাতে ও তারই ধারাবাহিকতায় মাত্র নয় মাসে এত নৃশংসভাবে এত দ্রুত এত ব্যাপক হারে ধর্ষণ – গণধর্ষণ ও নির্মমভাবে হত্যাযজ্ঞ আর দুটি আছে বলে আমাদের জানা নাই ।

তখন বসন্ত, চারদিকে রাজনৈতিক গুঞ্জন ছিল, কী হবে.. কী হবে?

একই দেশের মানুষ হয়ে ক্ষমতাসীন সরকারের পেটোয়া বাহিনী ২৫ শে মার্চের রাতে সারা শহর এমন হিমশীতল করে দেবে, কে জানতো ?

১৯৫৩ সালে দাঙ্গা লাগিয়ে প্রায় পাঁচ হাজার মানুষকে হত্যার দায়ে জামাত ই ইসলামের প্রতিষ্ঠাতা আবুল আ’লা মওদুদীর ফাঁসির আদেশ হয়েছিলো। পরবর্তীকালে তৎকালীন পাকিস্তানের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের কারণে মাত্র ২ বছর জেল খেটে মওদুদী জেল থেকে জামিনে বেরিয়ে আসে। এই দন্ড মওকুফ হয়েছিলো  মুলত যুক্তরাষ্ট্রের চাপে, তৎকালীন পাকিস্তানের সাথে আমেরিকান রাষ্ট্রদূতের ডি-ক্লাসিফাইড যোগাযোগ থেকে বিষয়টা পরবর্তীতে প্রকাশ হয়ে পড়ে।

জামাতই ইসলামের আরেক নাটের গুরু মউদুদী শিষ্য গোলাম আজম। যার ষড়যন্ত্রে  এদেশের কুসন্তান দের নিয়েই দালাল আর কুখ্যাত আলশামস রাজাকার আলবদর বাহিনী তৈরি করা হয় ।যারা পাকিস্তানী বাহিনীকে হত্যা, লুঠতরাজ, ধর্ষণে সহায়তা করেছিল।  সেই যুদ্ধাপরাধী দল জামাত ই ইসলামকে বঙ্গবন্ধু নিষিদ্ধ করলেও বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যার পর  ঘাতক গোলাম আযমকে নাগরিকত্ব দেয়া হয় এবং জামাতকে এদেশে রাজনীতি করার বৈধতা দেয়া হয়। সেই থেকে  জামাত এখনো স্বাধীন বাংলাদেশে রাজনীতি করে যাচ্ছে !

২৫ শে মার্চের রাতে পুড়িয়ে দেয়া হয় ইত্তেফাক ও দৈনিক সংবাদ অফিস, এই পরিস্থিতির মধ্যে কোন সংবাদপত্র বের হতে পারেনি। এমনকি সরকারী সংবাদপত্রও নয়। কিন্তু এই অ স্বাভাবিকতার ভেতরেও একটি দৈনিক পত্রিকা বের হয়েছিল । তার নাম দৈনিক সংগ্রাম।
 স্বাধীনতাবিরোধী জামায়াতে ইসলামীর মুখপত্র আখতার ফারুক সম্পাদিত  এই পত্রিকাতে ২৫ শে মার্চের নারকীয় হত্যাকান্ড, ধ্বংসযজ্ঞ, ধর্ষন ও লুঠপাটের  তথ্য গোপন করে , বিকৃত তথ্য ছাপানো হয় । ২৬ শে মার্চ  দৈনিক সংগ্রামে ছাপা হলো ‘ভারতীয় দালালদের কাছ থেকে পাকিস্তানী সেনাবাহিনী দেশ বাঁচালো !’

২৫ ও ২৬ মার্চের ঢাকায় পাক বাহিনীর ধ্বংসযজ্ঞের চাক্ষুষ বর্ণনা প্রথম বিশ্ববাসীর কাছে তুলে ধরেন লন্ডন থেকে প্রকাশিত ‘ডেইলি টেলিগ্রাফ’ এর সাংবাদিক সাইমন ড্রিং। ১৯৭১ সালের ৩০ শে মার্চ “ট্যাঙ্কস ক্রাশ রিভল্ট ইন পাকিস্তান” শিরোনামের একটি প্রতিবেদনের মাধ্যমে বাঙালিদের উপর পাকিস্তানিদের নির্যাতনের বিবরণ প্রকাশ করেন। এতে বলা হয়, “আল্লাহ্‌ ও অখণ্ড পাকিস্তান রক্ষার নামে ঢাকা আজ ধ্বংস ও ভীতির নগরী। পাকিস্তানি সৈন্যদের ঠাণ্ডা মাথায় টানা ২৪ ঘণ্টা গোলা বর্ষণের পর ঐ নগরীর কমপক্ষে দশ হাজার মানুষ নিহত হয়েছে। মাটির সঙ্গে মিশিয়ে দেয়া হয়েছে বিস্তীর্ণ এলাকা। সামান্যতম অজু হাতে মানুষকে গুলি করে মারা হচ্ছে। নির্বিচারে গুঁড়িয়ে দেয়া হচ্ছে বাড়িঘর। ঠিক কতো নিরীহ মানুষ এ পর্যন্ত জীবন দিয়েছে তার সঠিক হিসেব বের করা কঠিন। যা পরিমাপ করা যায় তা হল সামরিক অভিযানের ভয়া বহতা”।

বিশ্বের ৫৪টি দেশের ১৩৭টি পত্রপত্রিকায় একাত্তরের গণহত্যার বিষয়টি তুলে ধরা হয়। ১২ এপ্রিল ১৯৭১ এ টাইম ম্যাগাজিনের “পাকিস্তানঃ পশ্চিমের প্রতি রাউন্ড-১” শীর্ষক প্রতিবেদনে বলা হয়-“ সন্দেহ নেই যে এখানকার বর্তমান পরিস্থিতি সম্পর্কে গণহত্যা শব্দটিই প্রযোজ্য”! ‘নিউজ উইকে’ ২৮ জুন ১৯৭১ সংখ্যায় বলা হয়-“ পূর্ব পাকিস্তানের জনগণের উপর রক্তের বন্যা বইয়ে দিচ্ছে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী”।

বর্তমান প্রজন্মসহ বাংলাদেশের সকল প্রজন্মের মানুষের অনেক যুগের প্রাণের দাবির প্রেক্ষিতে সাংসদ শিরীন আখতারের আনীত ৭১ সালের ২৫শে মার্চ কাল রাত্রিতে বর্বর পাকিস্তানি সেনাবাহিনী কর্তৃক সংঘটিত গণহত্যাকে স্মরণ করে ২৫শে মার্চ গণহত্যা দিবস ঘোষণা এবং জাতিসংঘ সহ আন্তর্জাতিক ভাবে এ দিবসের স্বীকৃতি আদায়ে প্রয়োজনীয় কার্যক্রম গ্রহণ করার প্রস্তাব বাংলাদেশের জাতীয় সংসদে সর্বসম্মতিক্রমে গৃহীত হয়েছে।

সেই রাতের হত্যাযজ্ঞের প্রত্যক্ষ সাক্ষী ছিলেন হত্যাযজ্ঞ পরিষ্কারে নিয়োজিত ডোম আর সুইপাররা, যাদের মাধ্যমে জানা গেছে ঢাকায় সংগঠিত গণহত্যার ব্যাপকতা আর নির্মমতা। সুইপার ইনস্পেক্টর সাহেব আলী ছাড়াও আর যাদের নাম জানা গেছে, তারা হলেন মন্টু ডোম, পরদেশি সুইপার, লেমু ডোম, দুঘিলা ডোম, গোলাম চান ডোম ও মধু ডোম।
 ডোম সুইপারদের স্মৃতিচারণ উঠে আসে এভাবে, ‘ মনে হলো মানুষ না, হাজার হাজার মরা ব্যাঙের লাশ তুলেছি। বাংলা মদ গিলে কাজ করতে হতো । না হলে পারা যেতোনা কাজ করতে’।

জানা যায় সে রাতে রোকেয়া হলে আগুন ধরানো হয়েছিল এবং ছাত্রীরা হল থেকে দৌড়ে বের হবার সময় মেশিন গান দিয়ে গুলি করা হয়, রোকেয়া হলের অনেক মেয়েদের ধরে নিয়ে যাওয়া হয় ক্যান্টনমেন্টে । রাত সাড়ে চারটার দিকে পাকিস্তানী পশুরা পুলিশ কন্ট্রোল রুম দখল করে সেখানকার ওয়্যারলেসে বাইরে টহলে নিযুক্ত বাঙ্গালী পুলিশদের কর্কশ কণ্ঠে বলছিল “ বাঙ্গালী শালা লোগ আভী আ-কার দেখো, তোমারা কেতনা মা বহিন হামা রা পাস হ্যায়…।

২৫ শে মার্চ আক্রমণে সবচেয়ে বেশি মারা যান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে জগন্নাথ হলে থাকা শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জহুরুল হক হলের ২০০ জন ছাত্রকে পাকিস্তানী বাহিনী হত্যা করে। ডোমদের কাছে জানা যায়, ইকবাল হলে তারা কোনো লাশ পাননি, পাকিস্তানি সেনারা পূর্বেই ইকবাল হলের হিন্দু-মুসলমান ছাত্রদের লাশ পেট্রোল দিয়ে জ্বালিয়ে ভস্ম করে দেয়। বস্তি এলাকা থেকে জগন্নাথ হলে আশ্রয়ের জন্য ছুটে আসা দশ-বারো জন নর-নারীর ক্ষত-বিক্ষত লাশ পেয়েছিলেন তারা ।

এক রাতের মধ্যেই ঢাকা শহর হয়ে পড়ে মৃত্যুকুপ! ২৫ মার্চ ১৯৭১ রাতে মর্টার ও হেভি মেশিনগান, ট্যাংক বহরসহ সুসজ্জিত পাকিস্তানী বাহিনীর বিরুদ্ধে মরনপণ স্বাধীনতা সংগ্রামে প্রথম প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিলেন রাজারবাগ পুলিশ লাইনের সদস্যরা ।

 সুইপার রাবেয়া খাতুন রাজারবাগ পুলিশ লাইনের এস এফ ক্যান্টিনে ছিলেন।পুলিশদের প্রতিরোধ ব্যর্থ হবার পরে ধর্ষিত হন রাবেয়া খাতুন। সুইপার বলে প্রাণে বেঁচে যান কারণ রক্ত ও লাশ পরিস্কার করার জন্য তাকে দরকার ছিল সেনাবাহিনীর। এরপরের ঘটনার তিনি বিবরণ দিয়েছেন, “২৬ মার্চ ১৯৭১,বিভিন্ন স্কুল,কলেজ,বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মেয়েদের ধরে আনা হয়।আসা মাত্রই সৈনিকরা উল্লাসে ফেটে পড়ে (পাক বাহিনীকে এই জঘন্য অপরাধে সহায়তা করেছে রাজাকার ও দালালরা)। ব্যারাকে ঢুকে প্রতিটি যুবতী,মহিলা এবং বালিকাদের সম্পূর্ণ উলঙ্গ করে লাথি মেরে মাটিতে ফেলে ধর্ষণে লিপ্ত হতে থাকে। বুকের স্তন ও গালের মাংস কামড়াতে কামড়াতে রক্তাক্ত করে,মাংস তুলে নেয়। এভাবে চলতে থাকে প্রতিদিন।

যেসব মেয়েরা প্রাথমিকভাবে প্রতিবাদ করত তাদের স্তন ছিড়ে ফেলা হত,যোনি ও গুহ্য দ্বা্রের মধ্যে বন্দুকের নল,বেয়নেট ও ধারালো ছুরি ঢূকিয়ে হত্যা করা হত।বহু অল্প বয়স্ক বালিকা  ধর্ষণ ও নির্যাতনে প্রাণ হারায়।এরপরে লাশগুলো ছুরি দিয়ে কেটে বস্তায় ভরে বাইরে ফেলে দেয়া হত।

হেড কোয়ার্টারের দুই,তিন এবং চারতলায় এই্ মেয়েদের রাখা হত,মোটা রডের সাথে চুল বেঁধে।এইসব ঝুলন্ত মেয়েদের কোমরে ব্যাটন দিয়ে আঘাত করা হত প্রায় নিয়মিত,কারো কারো স্তন কেটে নেয়া হত,হাসতে হাসতে যোনিপথে ঢুকিয়ে দেওয়া হত লাঠি এবং রাইফেলের নল।

কোন কোন সৈনিক উঁচু চেয়ারে দাঁড়িয়ে উলঙ্গ মেয়েদের বুকে দাঁত লাগিয়ে মাংস ছিড়ে নিয়ে উল্লাসে ফেটে পড়ত,কোন মেয়ে প্রতিবাদ করতে গেলে তখনই হত্যা করা হত।কোন কোন মেয়ের সামনের দাঁত ছিল না,ঠোঁটের দু’দিকের মাংস কামড়ে ছিড়ে নেয়া হয়েছি ল,প্রতিটি মেয়ের হাতের আঙ্গুল ভেঙ্গে থেতলে গিয়েছিল লাঠি আর রডের পিটুনিতে।কোন অবস্থাতেই তাঁদের হাত ও পায়ের বাঁধন খুলে দেয়া হত না,অনেকেই মারা গেছে ঝুলন্ত অবস্থায়।” এতো শুধু একজনের দেখা অভিজ্ঞতা !

ঢাকা পৌরসভার সুইপার ইনস্পেক্টর সাহেব আলীর ওপর ঢাকার রাজপথ ও অলিগলি থেকে মৃতদেহ সরানোর প্রথম হুকুম আসে টিক্কা খানের কাছ থেকে। বর্ণনা দিয়ে সাহেব আলী বলেন, ‘এত লাশ এক সাথে এ জীবনে দেখিনি। পৌরসভার ডোমরা সেদিন রাস্তায় লাশের পাহাড় দেখে ভড়কে গিয়েছিল।

লাশ উঠাবার জন্য ট্রাক রমনা কালীবাড়ীর দরজায় দাঁড় করিয়ে রেখে, দু’জনকে ট্রাকে দাঁড় করিয়ে রেখে আমরা চারজন কালিবাড়ীর ভেতরে গিয়ে দেখি সবকিছু পুড়ে ভস্ম হয়ে আছে।কালিবাড়ীর এসকল লাশ আমরা ধলপুরের ময়লার ডিপোতে গর্তের মধ্যে ফেলেছি। লাশ তুলে তুলে মানুষের পচা চর্বির গন্ধে আমার পাকস্থলী বের হয়ে যেতে চাচ্ছিল”।

২৬ মার্চ বাবুবাজার ফাঁড়িতে গিয়ে তারা দেখেন ফাঁড়ির প্রবেশপথে, ভেতরে, চেয়ারে বসে, উপুড় হয়ে পড়ে আছে দশজন পুলিশ।বাবুবাজার ফাঁড়ির ভেতরে বাঙালি পুলিশ কেউ জিভ বের করে পড়ে আছে। কেউ হাত-পা টানা দিয়ে আছে। প্রতিটি লাশের শরীরে অসংখ্য গুলির চিহ্ন’।
শাঁখারী বাজারের প্রতিটি ঘরে নারী-পুরুষ, যুবক-যুবতী, বৃদ্ধ-বৃদ্ধা, বালক-বালিকা, কিশোর-শিশুর বীভৎস পচা লাশ, চারিদিকে ইমারত সমূহ ভেঙ্গে পড়ে আছে, মেয়েদের অধিকাংশ লাশ সম্পূর্ণ উলঙ্গ, তাদের বুক থেকে স্তন তুলে নেওয়া হয়েছে।’

মিটফোর্ড লাশ ঘরের সকল লাশ ট্রাকে উঠিয়ে ধলপুরের ময়লার ডিপোতে নিয়ে গিয়ে বিরাট গর্তের মধ্যে ঢেলে দেয়ার নির্দেশ ছিল । লাশের অধিকাংশই ছিল সরকারি কর্মচারী, আনসার, পুলিশ ও পাওয়ার ম্যানদের খাকি পোশাক পরা বিকৃত লাশ।’ তারা দেখেন বিরাট গর্তের মধ্যে সুইপার ও ডোমরা রাজধানী ঢাকার বিভিন্ন স্থান থেকে নিয়ে আসা লাশ ট্রাক থেকে গর্তের মধ্যে ফেলে দিচ্ছে।

মিলব্যারাক নদীর ঘাটে অসংখ্য মানুষের লাশ ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে, বহু লাশ রশি দিয়ে বাঁধা, প্রতিটি রশির বন্ধন খুলে তারা দেখেন প্রতি দলে দশ জন পনের জনের লাশ, সব যুবক ছেলে ও স্বাস্থ্যবান বালকদের লাশ । প্রতিটি লাশের চোখ বাঁধা, হাত বাঁধা, শক্ত করে পিছন দিক থেকে।

‘প্রতিটি লাশের মুখমণ্ডল কালো দেখলাম, এসিডে জ্বলে বিকৃত ও বিকট হয়ে আছে। লাশের সামনে গিয়ে ঔষধের অসহ্য গন্ধ পেয়েছিলেন তারা । লাশের কোন দল মেশিন গানের গুলিতে বুক ও পিঠ ঝাঁঝরা হয়ে আছে, অনেক লাশ বেয়নেটের আঘাতে বীভৎস, কারো মাথা চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে মগজ বের হয়ে আছে, কারো কাটা হৃদপিন্ড বের হয়ে আছে। নদীর পাড়ে যুবতীদের বীভৎস ক্ষতবিক্ষত, চোখ বাঁধা, হাত-পা শক্ত করে বাঁধা উলঙ্গ লাশ। সদরঘাট, শ্যামবাজার, ওয়াজ ঘাট, বাদামতলী এলাকায় নদীর পাড় ও পানি থেকে বৃদ্ধা, যুবা ও শিশুর লাশ তুলেছেন তারা ।

এরপর ৩০ শে মার্চ অবধি নির্দেশমতো তারা ট্রাক নিয়ে বুড়িগঙ্গা নদীতে ভাসমান হাত-পা, চোখ বাঁধা অসংখ্য যুবকের তিন ট্রাক লাশ তুলে স্বামীবাগ আউটফলে ফেলেছিলেন। ১ এপ্রিল তারা ড্রাম ফ্যাক্টরি, কচুক্ষেত, ইন্দিরা রোড, তেজগাঁও, শেরেবাংলা এলাকাস্থ ঢাকা বিমানবন্দরের অভ্যন্তর, ঢাকা স্টেডিয়ামের মসজিদের পূর্ব-দক্ষিণ দিক থেকে কয়েক শ’ ছাত্রের পচা লাশ তুলেছেন। জানা যায়, এটা ছিল ক্যান্টনমেন্টের কাছাকাছি এলাকা। তারা মিছিল করে এসে ঝাঁকে ঝাঁকে মারা পড়ে পাকিস্তানি হানাদারদের কামানের গোলায়।

রায়েরবাজার ইটখোলায় তারা কয়েক হাজার বাঙালি যুবক-যুবতী, শিশু-কিশোর এবং বৃদ্ধ-বৃদ্ধার লাশ তুলেছেন । অধিকাংশ লাশ ক্ষত-বিক্ষত। পাকিস্তানি সেনারা তাদের ট্রাকে করে ঢাকার বিভিন্ন এলাকা থেকে এনে এখানে জড়ো করে।

মিরপুর এক নম্বর সেকশনের রাস্তার পার্শ্বে ছড়ানো-ছিটানো ছিল শত শত বাঙালি যুবকের লাশ । পাকিস্তানি সেনাদের সহায়তায় বিহারীরা এদের এখানে এনে কচু কাটা করেছে। মোহাম্মদপুর ফিজিক্যাল কলেজের হল থেকে ছাত্রের ক্ষত-বিক্ষত লাশ তুলেছি। পিলখানা, রায়েরবাজার রাস্তা, গণকটুলি, কলাবাগান, ধানমন্ডি, কাঁঠালবাগান, এয়ারপোর্ট রোডের পার্শ্ববর্তী এলাকা, তেজগাঁও মাদ্রাসা থেকে অসংখ্য নারী-পুরুষের পচা, ফোলা লাশ তুলতে হয়েছিল তাদের । বলেছেন, ”অনেক লাশের ই হাত-পা পেয়েছি, মাথা পাইনি।’

সূত্র :ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে গণহত্যা : ১৯৭১, জগন্নাথ হল /রতনলাল চত্রবর্তী
দ্য রেইপ অফ বাংলাদেশ-অ্যান্থনি মাসকারেনহাস
দি ক্রুয়েল বার্থ অব বাংলাদেশ
‘বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ’- ৮ম খণ্ড
ইন্টারনেট ও পত্রিকা আর্কাইভ

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

5 − 3 =