বাংলাদেশিরা ভরসা মমতার – অমিত বসু

Facebooktwittergoogle_plusredditpinterestlinkedinmail

একটা ভোটও অনেক। হারলে লোকসান। যেখান থেকে যতটা পাওয়া যায় কুড়িয়ে বাড়িয়ে আঁচল ভরা। ঘরে যা আছে থাক। বাইরে থেকে আরো পাওয়া যায় যাক। রাখঢাক না করেই তাই ফিল্ডে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। পশ্চিমবঙ্গে মুখ্যমন্ত্রিত্বের মেয়াদ ফুরোচ্ছে। জিতে সে পদ ধরে রাখতে মরিয়া মমতা।
কাজটা সহজ নয়। বিরোধীরা বাগড়া দিচ্ছে। ভোটের দিন যত এগোচ্ছে তারা মমতার বিরুদ্ধে আক্রমণ শাণাচ্ছে। মমতাকে জর্জরিত করছে একের পর এক ইস্যুতে। সমালোচনার ধারাটা এমন, পাঁচ বছরে মমতা যেন কিছুই করেননি। উৎসব আর মচ্ছবে দিন কাটিয়েছেন। সাড়ম্বরে উন্নয়নের প্যাকেজ ঘোষণা করেছেন। রাজ্যের কোথাও কোথাও শিলান্যাস করে নতুন প্রকল্প উদ্বোধনের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। কাজের কাজ কিছুই হয়নি। সবই ফাঁকা। শূন্যে আঁকা ছবি মাত্র।
মমতার বিরুদ্ধে সব থেকে বড় অভিযোগ, আইনশৃঙ্খলার দফারফা করেছে তাঁর দল তৃণমূল। তৃণমূলের গুণ্ডারা দাপিয়ে বেড়াচ্ছে। খুন-জখম চলছে নির্বিচারে। পুলিশ নিষ্ক্রিয়। মমতা সমালোচনার জবাব দিতে চান ভোটে। বিপুল ভোটে জিতে দেখিয়ে দেবেন কে ঠিক—মমতা, না বিরোধীরা।

তাঁর দাবি, ২৯৪টি আসনের ২২০টি তিনি পাবেন। হেরে ভূত হবে প্রতিপক্ষ। তাদের মুখ লুকানোর জায়গা থাকবে না। তখন বুঝবে কত ধানে কত চাল। অকারণে কুৎসা করার ফল হাতেনাতে পাবে। মমতা যা বলছেন, নিজে কি তাই বিশ্বাস করেন। ভোটে সত্যিই কি বিরোধীরা খড়কুটোর মতো ভেসে যাবে। মমতা হাসতে হাসতে দ্বিতীয়বার মুখ্যমন্ত্রীর কুর্শিতে বসবেন। না, ব্যাপারটা অত সহজ নয়। মমতার জয়ের রাস্তায় অনেক কাঁটা। হাঁটতে গিয়ে ক্ষতবিক্ষত হতে শুরু করেছেন। ক্ষতে মলম লাগানোর কেউ নেই। তৃণমূল একটা দল হলেও কার্যত তিনিই দল, তিনিই তৃণমূল। মাথা খাটিয়ে তাঁকেই ভোটের হিসাব কষতে হচ্ছে। ভুল হলে সংশোধনের দায়িত্বও তাঁর। এ পর্যন্ত হিসাবে যা দাঁড়াচ্ছে, দক্ষিণবঙ্গ মোটামুটি তৃণমূলের নাগালে আছে। সমস্যা উত্তরবঙ্গ নিয়ে। সেখানে কিছুতেই দাগ কাটা যাচ্ছে না। হাজার প্রলোভনেও ভোটারদের মন গলছে না। মমতা যত বলছেন কংগ্রেস সিপিএমের চেয়ে তৃণমূল বেশি দেবে, তারা বিশ্বাসই করতে চাইছে না। আড়ালে হাসছে। মমতার কথা যেন বিশ্বাস্য নয়। মমতা উত্তরবঙ্গ কবজা করতে নতুন ফন্দি এঁটেছেন।

উত্তরবঙ্গের ছয়টি জেলা—উত্তর দিনাজপুর, দক্ষিণ দিনাজপুর, কোচবিহার, জলপাইগুড়ি, মালদা, মুর্শিদাবাদে বাস করে প্রচুর বাংলাদেশি। তাদের ভোটাধিকার নেই। তারা যদি ভোট দিতে পারে, সেই ভোটে তৃণমূলের ভোটব্যাংক বাড়ানো যেতে পারে। আচমকা তাদের নাগরিকত্বের দাবিতে সোচ্চার মমতা। তিনি বলেছেন, বাংলাদেশ থেকে আসা যে মানুষগুলো এ রাজ্যে পাঁচ বছরের বেশি সময় ধরে বাস করছে, যাদের রেশন কার্ড, ভোটার কার্ড আছে, আমি মনে করি তারা ভারতের নাগরিকত্ব পেতেই পারেন। মমতার কথায় অসংগতি লক্ষ করার মতো। যার ভোটার কার্ড আছে সে তো নাগরিকই। তাকে নতুন করে নাগরিকত্ব দেওয়ার কী আছে। নাগরিক ছাড়া কেউ কি ভোট দিতে পারে! আসল বিষয়টি হচ্ছে, বাংলাদেশিদের রেশন কার্ড আছে, ভোটার কার্ড নেই। দীর্ঘদিন ধরে ভোটার কার্ডের দাবি জানিয়ে তারা নিরাশ। ১৯৮৫ সালের আগ পর্যন্ত নাগরিকত্ব দিতে পারতেন জেলা শাসকরা।

সন্ত্রাসবাদের অজুহাতে কেন্দ্রীয় সরকার সেই অধিকার কেড়ে নেয়। মমতা, জেলা শাসকদের সেই অধিকার ফিরিয়ে দেওয়ার পক্ষে সওয়াল করেছেন। পশ্চিমবঙ্গ কংগ্রেসের সভাপতি অধীর চৌধুরী জানিয়েছেন, এটা নিছক রাজনীতি। জেলা শাসকদের বড় অংশ এখন তৃণমূলের জেলা সভাপতি হয়ে বসেছেন। বাংলাদেশিদের ভোট পেতেই মমতার এই তদবির। প্রদেশ কংগ্রেস নেতা আবদুল মান্নান বলেছেন, ১৯৮৫ সালে সংসদ সদস্য হিসেবে মমতা তখনকার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বুটা সিংকে আরজি জানিয়েছিলেন, নাগরিকত্ব-সংক্রান্ত এই দায়িত্ব রাজ্যের হাতে রাখা উচিত নয়। তখন পশ্চিমবঙ্গে বাম সরকার ছিল বলেই কি তিনি এই অবস্থান নিয়েছিলেন। মান্নানের কথায় ফ্যাসাদে মমতা। সত্যিই তো একসময় যিনি জেলা শাসকদের নাগরিকত্ব দানের অধিকার কাড়তে চেয়েছেন, এখন তিনি সেটা ফেরত দেওয়ার দাবিতে সরব। উদ্দেশ্যটা পরিষ্কার। ভোট বাড়ানো। মমতার এই দাবি তোলার বহু আগেই প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি বাংলাদেশি শরণার্থীদের ভারতীয় নাগরিকত্ব দানের আইন সংশোধনের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। তিনি জানিয়েছেন, আশ্রিত বাংলাদেশিদের নাগরিকত্ব দিতে তাঁর সরকার বদ্ধপরিকর। এ ব্যাপারে কাজও শুরু হয়েছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী রাজনাথ সিং প্রক্রিয়া শুরু করেছেন, তবু অসুবিধা আছে। লোকসভায় বিজেপির নেতৃত্বে এনডিএ সরকারের বিপুল গরিষ্ঠতা থাকলেও রাজ্যসভায় নেই।

ভারতের সংসদ দুই কক্ষের। লোকসভা আর রাজ্যসভা। লোকসভার প্রতিনিধিরা সরাসরি মানুষের ভোটে নির্বাচিত হন। রাজসভায় তা নয়। সেখানকার সদস্যরা আসেন ২৯টি রাজ্যের বিধানসভার ভোটে। বিধায়করা ভোট দিয়ে প্রার্থী নির্বাচন করেন। সব রাজ্যে তো আর বিজেপি সরকার নেই। রাজ্যসভায় তাই বিজেপি সদস্য কম। সেই বাধা কাটিয়ে নাগরিকত্বের সংশোধনী বিল পাস করাতে বিরোধীদের সঙ্গে কথা বলছে বিজেপি। আপাতত তৃণমূলের তাতে সায় আছে সেটা পরিষ্কার। ১৯৮৫ সালে জেলা শাসকদের নাগরিকত্ব দানের অধিকার কেড়ে নিয়েছিলেন রাজীব গান্ধী। বিষয়টি তিনি কেন্দ্রীয় সরকারের প্রক্রিয়ায় নিয়ে আসেন। ২০০৩ সালে নাগরিকত্ব আইন সংশোধনের সময়ও মমতা চুপ করেছিলেন। তিনি কংগ্রেস আর বিজেপি দুই সরকারের মন্ত্রী ছিলেন। চাইলে বাংলাদেশি শরণার্থীদের জন্য অনেক কিছু করতে পারতেন। এবার ভোটের মুখে বিষয়টি নিয়ে সরব হলেন। উদ্দেশ্য, বাংলাদেশি শরণার্থীদের মুসলমান ভোট যাতে তৃণমূলের ঝুলিতে জমে। মমতার প্রতি বাকি সংখ্যালঘুরাও সহমর্মী হয়ে ওঠে। মমতা চাইলেও তা দু-চার দিনে হওয়ার নয়। মাঠে ধান পাকতে অনেক দেরি। এখনই ভাত রান্নার কথা ভেবে কী লাভ। লেখক : কলকাতার সাংবাদিক

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

eight − one =