বাইশে শ্রাবন চলে এলো’

Facebooktwittergoogle_plusredditpinterestlinkedinmail

”আইডিয়া যত বড়োই হউক, তাহাকে উপলব্ধি করিতে হইলে একটা নির্দিষ্ট সীমাবদ্ধ জায়গায় প্রথম হস্তক্ষেপ করিতে হইবে। তাহা ক্ষুদ্র হউক, দীন হউক, তাহাকে লঙ্ঘন করিলে চলিবে না। দূরকে নিকট করিবার একমাত্র উপায় নিকট হইতে সেই দূরে যাওয়া”। কবিগুরুর মহাপ্রস্থানের পর আরও কতকাল কাটল, কিছু কি বদলালো, কোনো ছবি ? দৃশ্যপট ?

স্বদেশী যুগে রাজনৈতিক আন্দোলনে যোগ দিয়েও কেন সরে এলেন তার কৈফিয়ত কবি এভাবেই দিয়েছিলেন।অধ্যাপক প্রশান্তচন্দ্র মহলানবিশকে কবি বলেছিলেন, “যখন দেখলুম সত্যি কাজের চেয়েও নামের নেশা বেশী, কি কাজ হ’ল তার চেয়েও কে করেছে সেইটাই বড়ো কথা, তখন বুঝলুম আমার ওর মধ্যে থেকে সময় নষ্ট করলে চলবে না, তাই সরে দাঁড়ালুম। এই দলাদলির বিষই আমাদের মেরেছে। অনেক লোককে আমি দেখেছি যাদের মনোভাব হচ্ছে তার দ্বারা কিংবা তার দলের দ্বারা যদি স্বদেশ উদ্ধার না হয় তাহলে অন্য কারও দ্বারায়ও হয়ে দরকার নেই। দেশের লোকের ভালো হোক এটার চেয়েও বড়ো কথা আমার দ্বারা বা আমার দলের দ্বারা সেই ভালো হল কি না। এরকম জায়গায় কখনও আমি থাকতে পারি ?”

কিশোর বয়সে বন্ধুপ্রতিম বৌদি কাদম্বরী দেবীর অকালমৃত্যু ও আরও পরে সন্তান সন্ততি,স্ত্রীর মৃত্যু এবং একে একে প্রিয়জনদের মৃত্যুর নীরব সাক্ষী ও মৃত্যুশোক—রবীন্দ্রনাথ একপর্যায়ে অকপটে লেখেন, ‘‘জগৎকে সম্পূর্ণ করিয়া এবং সুন্দর করিয়া দেখিবার জন্য যে দূরত্ব প্রয়োজন, মৃত্যু দূরত্ব ঘটাইয়া দিয়াছিল। আমি নির্লিপ্ত হইয়া দাঁড়াইয়া মরণের বৃহৎ পটভূমিকার উপর সংসারের ছবিটি দেখিলাম এবং জানিলাম, তাহা বড়ো মনোহর।’’

১৯৩৭ সালে চোখ জুড়ানো সোনালী রঙের দেহধারী মানুষটির দেহে প্রথম রোগ-লক্ষণ দেখা দেয়। বিশ্রামের প্রয়োজন হল। কিন্তু সেদিকে তাঁর মন নেই। উপরন্তু দর্শনার্থীর বিপুল সংখ্যাকে নিয়ন্ত্রণ করার প্রয়োজনও তাঁকে বোঝানো দায়। ‘শরীরের দোহাই পাড়লে’ যা বলতেন তা শিক্ষণীয় তো বটেই একই সঙ্গে অবিশ্বাস্যরকমের অভিনব — “যারা মানী লোক তাদের ফিরিয়ে দিতে আমার দ্বিধা হয় না, কিন্তু যারা অতি অভাজন, যাদের সকলেই অনায়াসে অবজ্ঞা করতে পারে, তাদেরকে দেখা হবে না বলতে আমি পারিনে। আমি জানি এতে আমার সময় নষ্ট হয়, বিশ্রামের ব্যাঘাত ঘটে, কিন্তু উপায় কি বলো?”

পুত্র শমীন্দ্র অকালে চলে গেলে বলে উঠতে পেরেছিলেন সহজ সত্য প্রকাশের ভঙ্গিতে — “শমী যে রাত্রে গেল তার পরের রাত্রে রেলে আসতে আসতে দেখলুম জ্যোৎস্নায় আকাশ ভেসে যাচ্চে, কোথাও কিছু-কম পড়েছে তার লক্ষণ নেই। মন বললে কম পড়েনি — সমস্তের মধ্যে সবই রয়ে গেছে, আমিও তারি মধ্যে। সমস্তর জন্য আমার কাজও বাকি রইল। যতদিন আছি সেই কাজের ধারা চলতে থাকবে। সাহস যেন থাকে, অবসাদ যেন না আসে, কোনোখানে কোনো সূত্র যেন ছিন্ন না হয়ে যায় ….।”

মাত্র একচল্লিশ বছর বয়সে কবির স্ত্রী বিয়োগ হয়। শেষ বেলার বিদায় মুহূর্তের কথা মনে করেই পরবর্তীতে কবি লেখেন,

‘‘দুজনের কথা দোঁহে
শেষ করি লব
সে রাত্রে ঘটেনি
হেন অবকাশ তব’’

১৯৪১ সাল তাঁর চলে যাওয়ার সন। খুবই অসুস্থ তিনি তখন। তাঁর পুরনো সেবক বনমালী দেশ থেকে ফিরে স্নান সেরে পরিচ্ছন্ন বেশে তাঁর সামনে যাবেন বলে দেরি হল তাঁর সঙ্গে দেখা করতে। কবি ব্যস্ত হয়ে পড়লেন — কেন বনমালী আসছে না? তাঁর সেই অতি চাঞ্চল্যভরা ব্যস্ততার হেতু অতঃপর তিনি প্রকাশ করলেন — “বনমালী কেন আমার কাছে আসছে না? তার জমি নিলাম হয়ে যাচ্ছিলো, তার কী ব্যবস্থা হল জানতে চাই।”

একদিন নির্মলকুমারী মহলানবিশ কবির শয্যার পাশে বিমর্ষমুখে  এসে জানালেন — আজ তিনি ট্রেনের তলায় চাপা পড়তে পড়তে বেঁচে ফিরেছেন,  উদ্বিগ্ন মন নিয়ে কবির কাছে আসার পথে। কবি তাঁর বিষন্নতা-বিপন্নতা কাটাবার জন্য বললেন, “বলো কি? তার চেয়ে না এসে আমার জন্যে কিছু টাকা দিলে পারতে। সে গল্প জানো না বুঝি? একজন আর একজনকে বলছে এ-তো প্রাণ নয় যে দিয়ে ফেললেই হ’ল, এ হচ্ছে টাকা ! দেওয়া অত সহজ নয়।” লেখিকার মনের সব কষ্ট ধুয়ে-মুছে গেল বাঁধন-হারা হাসিতে সে রসিকতা শোনার পর।

নির্মলকুমারী  তাঁদের পুরনো ভৃত্য রামচরিতকে কবির পরিচর্যার কাজে নিযুক্ত করলেন কবির প্রিয় সেবক বনমালী বয়সের ভারে অশক্ত হয়ে পড়েছে বলে। লেখিকা জানিয়েছেন, ‘খুব কাজের’ ভৃত্য রামচরিতের ‘দোষের মধ্যে একটু গম্ভীর মুখ এবং একজোড়া প্রকাণ্ড গোঁফ, তাতে আরো যেন মুখটা অন্ধকার দেখাতো।’

কবি কিন্তু বললেন, “ঐ গুণের চাকরকে তুমি ফিরিয়ে নাও। … কোনো ঠাট্টা-তামাশা ওর সঙ্গে করতে পারিনে, ঠাট্টা করলে ও হাসতে জানে না, শুধু কাজ নিয়ে আমি কি করবো? আমার ‘লীলমণি’ (বনমালী) আর কিছু পারুক না পারুক পেট ভরে হাসতে জানে, ঠাট্টায় যোগ দেয় — তাই ওর সঙ্গে কথা বলে আমি আনন্দ পাই।”

জীবনের শেষ নববর্ষের সময় রবীন্দ্রনাথ ছিলেন তাঁর সাধের শান্তিনিকেতনে। সে দিন তাঁর কলমে রচিত হয়েছিল ‘সভ্যতার সংকট’ নামের অমূল্য লেখাটি। তারও ক’দিন পর ১৯৪১ সালেরই ১৩ মে লিখে রাখলেন, রোগশয্যায় শুয়ে—‘‘আমারই জন্মদিন মাঝে আমি হারা’’

নৈবেদ্য কাব্যগ্রন্থে ‘মৃত্যু’ কবিতায় রবীন্দ্রনাথ লিখছেন—

‘‘মৃত্যু অজ্ঞাত মোর
আজি তার তরে
ক্ষণে ক্ষণে শিহরিয়া কাঁপিতেছি ডরে
এত ভালোবাসি
বলে হয়েছে প্রত্যয়
মৃত্যুরে আমি ভালো
বাসিব নিশ্চয়’’

মৃত্যুর মাত্র সাত দিন আগে পর্যন্তও কবি সৃষ্টিশীল ছিলেন। জোড়াসাঁকো রোগশয্যায় শুয়ে রানী চন্দকে লিখে নিতে বলেছিলেন। কবি বলে গেছেন, ক্রমশ ক্লান্ত হয়ে পড়ছিলেন কবিতাটি বলতে বলতে। দিনটা ছিল কবির শেষ বিদায়ের দিন কয়েক আগে চোদ্দো শ্রাবণ। রানী চন্দ সে দিন সূত্রধরের মতো লিখে নেন—

‘‘তোমার সৃষ্টির পথ
রেখেছ আকীর্ণ করি
বিচিত্র ছলনাজালে,
হে ছলনাময়ী—’’

রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক সব্যসাচী বসুরায়চৌধুরীর ভাষাতে, “আমাদের কাছে প্রস্টেট ক্যান্সার ফাউন্ডেশনের চিকিৎসকরা সম্প্রতি প্রমাণ পেশ করেছেন যে রবীন্দ্রনাথ জীবনের শেষ দিকে আক্রান্ত হয়েছিলেন প্রস্টেট ক্যান্সারে। এই গুরুত্বপূর্ণ তথ্যটা সাধারণ মানুষের কাছে জানানো জরুরী ছিল। তবে এ নিয়ে বিতর্ক বা গবেষণা চলতেই পারে।”

“শান্তিনিকেতন থেকে সে বছরের ১৯শে সেপ্টেম্বর পূত্রবধূ প্রতিমা দেবীর কাছে গিয়েছিলেন দার্জিলিং পাহাড়ের কালিম্পং-এ। সেখানেই ২৬ তারিখ রাতে গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েন কবি। দার্জিলিংয়ের সিভিল সার্জন বলেছিলেন তখনই অপারেশন না করলে কবিকে বাঁচানো যাবে না। প্রতিমা দেবী এবং মৈত্রেয়ী দেবী তখনই অপারেশন না করানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন,” ।

১৯১৬ সাল থেকে রবীন্দ্রনাথের চিকিৎসা করছিলেন যে কিংবদন্তী ডাক্তার নীলরতন সরকার, তিনি কখনই কবির অপারেশন করানোর পক্ষে ছিলেন না। কবি নিজেও চাননি অস্ত্রোপচার করাতে। ডা. সরকার যখন স্ত্রী বিয়োগের পরে গিরিডিতে চলে গেছেন, সেই সময়ে আরেক বিখ্যাত চিকিৎসক বিধান চন্দ্র রায় শান্তিনিকেতনে গিয়ে অপারেশন করিয়ে নেওয়ার কথা জানিয়ে দেন।

কবিকে বলা হয়েছিল ছোট্ট একটা অপারেশন; এটা করিয়ে নিলেই তাঁর আচ্ছন্নভাবটা ঠিক হয়ে যাবে, পরের দশ বছর আবার আগের মতোই লিখতে পারবেন।

দুর্নীতি-দুষ্কৃতি-নির্ভর রুচি বৈকল্যের তাপদাহে শুকনো খড়খড়ে সাংস্কৃতিক স্বদেশের দিকে তাকিয়ে আজো বারবার পড়ি বারবার ভাবি – “আমি কবি, আমার সবচেয়ে বড়ো কাজ দেশের লোকের দৃষ্টি যাতে ভালোমন্দর তফাতটা পরিষ্কার দেখতে পায় সেই সাধনায় আত্মনিয়োগ করা, চরিত্রের মর্যাদা যেখানে খর্ব হয় সেখানে দেখিয়ে দিতে পারা আসল গৌরবটা কি। সবচেয়ে বড়ো কাজ সত্যের আহ্বানে সাড়া দিতে পারার মতো চেতনা জাগানো।”

নীলরতন সরকারকে একবার জানানোও হয়নি এত বড় একটা সিদ্ধান্ত. পেনিসিলিনবিহীন যুগে ওই অপারেশনের ফল যে খারাপ হওয়ারই সম্ভাবনা বেশী ছিল, সেটা একবারও বলা হয়নি কবি বা তাঁর পরিবারকে। ওইভাবে অপারেশন করানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া এবং ভাল করে না বুঝিয়ে সম্মতি আদায় করাটা মেডিক্যাল এথিক্স বিরোধী !

জোড়াসাঁকোর মহর্ষি ভবনের দোতলায় পাথরের ঘর বলে পরিচিত রবীন্দ্রনাথের প্রয়াণ কক্ষ। যাঁরা জোড়াসাঁকোয় গেছেন, তাঁদের কাছে এটা পরিচিত। পাথরের ঘরের পূর্ব দিকের বারান্দায় তাঁর অস্ত্রোপচারের জন্য একটা অপারেশন থিয়েটারও বানানো হয়েছিল।

“অপারেশনের পরে ধীরে ধীরে তিনি আরও অসুস্থ হয়ে পড়ছেন, জ্ঞান নেই তাঁর। সকলেই যখন বুঝতে পারছে কী ঘটতে চলেছে, তখনই গিরিডি থেকে খবর দিয়ে আনানো হয় কবির সুহৃদ ও বিশিষ্ট চিকিৎসক নীলরতন সরকারকে। তিনি এসে নাড়ি দেখলেন, পরম মমতায় কপালে হাত বুলিয়ে দিলেন, তারপরে উঠে দাঁড়ালেন। হেঁটে বেরিয়ে যাওয়ার সময়ে ডা. সরকারের দু’চোখে ছিল জল,” !

অগস্টের প্রথম দিন দুপুরবেলা থেকেই রবীন্দ্রনাথের হিক্কা শুরু হয়। কবি কাতর স্বরে তখন উপস্থিত সবাইকে বলেছিলেন, ‘‘একটা কিছু করো, দেখতে পাচ্ছো না কী রকম কষ্ট পাচ্ছি পরের দিন হিক্কা থামানোর জন্য ময়ূরের পালক পড়িয়ে খাওয়ানো হলেও তাতে কিছুমাত্র লাঘব হল না। অগস্টের ৩ তারিখ থেকে কিডনিও নিঃসাড় হয়ে পড়ল। ৬ অগস্ট রাখি পূর্ণিমার দিন কবিকে পূবদিকে মাথা করে শোয়ানো হল। পরদিন ২২শে শ্রাবণ, ৭ অগস্ট—রবীন্দ্রনাথের কানের কাছে মন্ত্র জপ করা হচ্ছে—ব্রাহ্ম মন্ত্র

‘‘শান্তম, শিবম, অদ্বৈতম….’’
‘‘তমসো মা জ্যোতির্গময়…..’’

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তখন মৃত্যু পথযাত্রী। ”পৃথিবীতে যেখানে এসে তুমি থামবে সেইখান হতেই তোমার ধ্বংস আরম্ভ হবে। কারণ, তুমিই কেবল একলা থামবে, আর-কেউ থামবে না। জগৎপ্রবাহের সঙ্গে সমগতিতে যদি না চলতে পার তো প্রবাহের সমস্ত সচল বেগ তোমার উপর এসে আঘাত করবে, একেবারে বিদীর্ণ বিপর্যস্ত হবে, কিম্বা অল্পে অল্পে ক্ষয়প্রাপ্ত হয়ে কালস্রোতের তলদেশে অন্তর্হিত হয়ে যাবে। হয় অবিশ্রাম চলো এবং জীবনচর্চা করো, নয় বিশ্রাম করো এবং বিলুপ্ত হও– পৃথিবীর এইরকম নিয়ম”।

শিল্পী নন্দলাল বসু, ইতিহাসবিদ তপন রায়চৌধুরী সহ একাধিক বিশ্রুত ব্যক্তি বয়ানে জানা যায়, কবি নিজে এবং তাঁর উত্তরাধিকারীরা একান্তভাবেই নিজেদের রীতি অনুযায়ী ব্রহ্মোপাসনা ইত্যাদি সহকারে শান্ত সম্ভ্রান্ত শেষকৃত্য চেয়ে এসেছিলেন বরাবর। কিন্তু সে ইচ্ছার মর্যাদা রাখা হয়নি, উগ্র ‘বলোহরি হরিবোল’ চিত্‍কারের মধ্যেই আগুন দেওয়া হয় শবদেহে।

হিন্দু-ব্রাহ্মের পুরোনো রেষারেষি এইভাবে শ্মশানেও উত্‍কট চেহারায় ফুটে উঠেছিল, বলেন অনেকে। কবির শেষ সত্‍কারটুকুও তাঁর একমাত্র পুত্রের হাতে হয়ে উঠতে পারেনি। ছেলের হাতের আগুন পাননি রবীন্দ্রনাথ ! ভিড়ের চাপে রথীন্দ্রনাথ ঠাকুর শ্মশানে পৌঁছতেই পারেননি, কেউ কেউ জল্পনা করেন তাঁকে ইচ্ছা করেই আটকে দেওয়া হয় মাঝরাস্তায়। শেষকৃত্য সম্পন্ন করেন রবীন্দ্রনাথের ভ্রাতুষ্পৌত্র সুবীরেন্দ্রনাথ। শ্মশানে হিন্দু জনতার প্রাধান্য ছিল, সেই জনতা একরকম জোর করে সুবীর ঠাকুরকে বাধ্য করে আদি ব্রাহ্ম-মতের বদলে হিন্দু-মতে মন্ত্রপাঠ মুখাগ্নি ও সত্‍কার করতে। এই সব নিয়ে পালটা পালটি বক্তব্য চলে বহু।

যেমন ‘শনিবারের চিঠি’র সম্পাদক কবি সজনীকান্ত দাশ বলেছিলেন , ‘নিঃসংশয়ে বলা যায় সমগ্র বাংলাদেশ সেদিন রবীন্দ্রনাথের শবদেহ বহন করিয়াছিল- ঠাকুরবাড়ি, শান্তিনিকেতন, বিশ্বভারতী বা ব্রাহ্মসমাজের কোনও বিশেষ দাবি টেকে নাই, টিকিতে পারে না. . ইহা আনন্দের কথা, ইহাতে কাহারও অভিমান হওয়া উচিত নয়।’

আগে থেকেই অত্যন্ত অসুস্থ ও মুহ্যমান ছিলেন রথী, তিনি যে শেষকৃত্য করবেন না, এমনকী শ্মশানেও যাবেন না, তাঁর বদলে নাতি সুবীরেন্দ্রর প্রস্তুতি- এই সমস্তই পূর্বাহ্নে স্থির করা ছিল। বাড়ির বয়োজ্যেষ্ঠ হিসেবে স্বয়ং অবনীন্দ্রনাথ এই অগ্রিম বিধান দিয়েছিলেন। পরে নিতান্ত অস্থির হয়ে রথীন্দ্রনাথ শ্মশানের দিকে রওনা হয়েছিলেন, ভিড়ের চাপে মাঝপথে আটকে পড়েছিলেন এও ঠিক- কিন্তু তাঁর ফিরে আসার কারণ সেটা নয়। অসুস্থতা বেড়ে যাওয়ার দরুণই তিনি ফিরে আসেন, এতে অন্যের কোনও দোষ ছিল না।

হিন্দু-মতে সত্‍কার, হরিধ্বনি ইত্যাদি প্রসঙ্গ উড়িয়ে সজনীকান্ত জোর দিয়ে বলছেন, আদি ব্রাহ্ম মতের সত্‍কাররীতি ‘হিন্দুমতের প্রায় অনুরূপ’। হ্যাঁ- মুখাগ্নি, চিতায় জল ঢালা, গঙ্গায় অস্থি-ভাসানো সবই হয়েছিল- ‘ইহাতে কি প্রমাণিত হয়, অধিকারীদের অনিচ্ছাক্রমে হিন্দুমতে তাঁহাকে দাহ করা হইয়াছে? উপাসনাদি মন্ত্রপাঠ সকলেই দেখিয়াছেন, শ্মশানে হরির নামেও আপত্তি হইবার কথা নয়।’

শেষে জানাচ্ছেন সজনীকান্ত, যে-গান তাঁর দেহাবসানে গাওয়ার জন্য কবি চিহ্নিত করে গিয়েছিলেন, সেই গান গাওয়াও হয়েছিল, সেই বাইশে শ্রাবণেই- বোলপুরের আশ্রমে। আবার, শ্রাবণ-সংক্রান্তিতে, কবির শ্রাদ্ধবাসরেও স্বজন-অনুরাগীরা গেয়েছিলেন –  “সমুখে শান্তিপারাবার।”

জাহান শ তিমির

(কৃতজ্ঞতা – রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের”জীবনস্মৃতি”পুত্রবধূ প্রতিমা দেবীর স্মৃতিকথা, রাণী চন্দের ‘গুরুদেব, নির্মল কুমারী মহলানবীশ ২২ শে শ্রাবন, শেষকৃত্য বিতর্ক , অধ্যক্ষ ও সাহিত্যিক রামকুমার মুখোপাধ্যায় – রবীন্দ্রনাথ , গবেষক শ্যামল চক্রবর্তী)

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

twenty + seventeen =