বাহুবলে ৪ শিশু হত্যায় অংশ নেয় ৬ জন

Facebooktwittergoogle_plusredditpinterestlinkedinmail

হবিগঞ্জের বাহুবল উপজেলার সুন্দ্রাটিকি গ্রামে বসানো অস্থায়ী ক্যাম্পের চিকিৎ​সকেরা নিহত মনিরের মা সোলেমা খাতুনের স্বাস্থ্য পরীক্ষা করছেন। গতকাল বিকেল চারটার দিকে তোলা ছবি l আনিস মাহমুদ

হবিগঞ্জের বাহুবল উপজেলার সুন্দ্রাটিকি গ্রামে ৪ শিশু হত্যায় সরাসরি অংশ নিয়েছে ৬ জন। তাদেরকে হত্যা করা হয়েছে তাদের পরিবারের ওপর ক্ষোভ ও পঞ্চায়েতের দ্বন্দ্বের কারণে।  শিশু চারটিকে প্রথমে অচেতন করা হয়, এবং পরে শ্বাসরোধ করে হত্যা করা হয়।

নৃশংস এই হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার দায়ে গ্রেপ্তারকৃত রুবেল মিয়ার (১৮) স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি থেকে এসব তথ্য জানা গেছে। গতকাল শুক্রবার সন্ধ্যায় সে হবিগঞ্জের বিচারিক হাকিম আদালতের বিচারক কৌশিক আহমদ খোন্দকারের কাছে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেয়। বিকেল সাড়ে ৫টা থেকে সন্ধ্যা সাড়ে ৭টা পর্যন্ত এ জবানবন্দি নেয়া হয়।

রুবেলের জবানবন্দিতে বলা হয়, এ হত্যাকাণ্ডে মুখ্য ভূমিকায় ছিল গ্রামের অটোরিকশাচালক বাচ্চু মিয়া। শিশুদের পরিবারের বয়োজ্যেষ্ঠদের ওপর তার ক্ষোভ ছিল। পুলিশ বলেছে,

বাচ্চু মিয়াকে পুলিশ এখনো গ্রেপ্তার করতে পারেনি বলে জানিয়েছে। তবে তার পরিবারের দাবিমতে, গত বুধবার র‌্যাব তাকে বাড়ি থেকে উঠিয়ে নিয়ে গেছে। র‌্যাব কিন্তু এ ব্যাপারে কিছু বলতে রাজি হয়নি।

হত্যাকাণ্ডটির সঙ্গে জড়িত সন্দেহে পুলিশ এ পর্যন্ত ৫ জনকে গ্রেপ্তার করেছে। এরা হল আবদুল আলী, তার দুই ছেলে জুয়েল (২০) ও রুবেল (১৮), এবং একই গ্রামের অন্য দুই বাসিন্দা আরজু ও বশির। আবদুল আলী দুভাগে বিভক্ত গ্রাম পঞ্চায়েতের একভাগের নেতা।

রুবেলের জবানবন্দি দেয়ার পর রাত সাড়ে আটটায় হবিগঞ্জের পুলিশ সুপার জয়দেব কুমার ভদ্র তাঁর কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলন করেন। তিনি বলেন, রুবেলের জবানবন্দিই এ মামলার চূড়ান্ত কিছু নয়। সে অনেককিছু আড়াল করতে পারে এবং নিজের পরিবারের সদস্যদের রক্ষার চেষ্টাও তার থাকতে পারে। তবে এই জবানবন্দি থেকে পুলিশ হত্যার বিষয়ে প্রাথমিক ধারণা পেয়েছে। আগামী ১৫ দিনের মধ্যে মামলার অভিযোগপত্র দেওয়া সম্ভব হবে বলেও জানান তিনি।

রুবেলের জবানবন্দির তথ্য উদ্ধৃত করে পুলিশ সুপার বলেন, হত্যাকাণ্ডটি ছিল পরিকল্পিত। হত্যাকাণ্ডে ছয় ব্যক্তি সরাসরি অংশ নেয়। আরো কয়েকজন তাদেরকে সাহায্য করে।

এসপি বলেন, ১২ ফেব্রুয়ারি বিকেলে ৪ শিশু ভাদেশ্বর গ্রামে খেলা দেখতে যাওয়ার বিষয়টি গ্রেপ্তারকৃত আরজু ও অটোরিকশাচালক বাচ্চু দেখতে পান। এরপরই বাচ্চু তার অটোরিকশা নিয়ে ভাদেশ্বর-সুন্দ্রাটিকি সড়কের মাঝামাঝি এক জায়গায় অপেক্ষায় থাকে। সন্ধ্যার আগে শিশু তাজেল, মনির, জাকারিয়া ও ইসমাইল হেঁটে বাড়ির দিকে রওনা হয়। তারা অটোরিকশাটির কাছে এলে বাচ্চু তাদেরকে বাড়িতে নামিয়ে দেয়ার প্রস্তাব দেয়। পূর্বপরিচিত হওয়ায় শিশুরা তার অটোরিকশায় ওঠে। অটোরিকশার ভেতরেই শিশুদের চেতনানাশক ওষুধ দিয়ে অচেতন করা হয়। পরে তাদের নিয়ে যাওয়া হয় বাচ্চুর অটোরিকশার গ্যারেজে। গ্যারেজটি বাচ্চুর বাড়ির ভেতরে। সেখানে রুবেল, বাচ্চু, আরজুসহ ৬ জন মিলে ৪ শিশুকে একে একে শ্বাসরোধে হত্যা করে। পরে আরো কয়েকজনের সহযোগিতায় লাশগুলো সে-রাতেই গ্রামের বালুচড়ায় মাটিচাপা দেয়া হয়।

রুবেল তার জবানবন্দিতে জানিয়েছে, বাচ্চু ও আরজু বিভিন্ন সময় নিহত শিশুদের পরিবারের সদস্যদের দ্বারা অপমানিত হয়েছে। বাচ্চুর অনেক ক্ষোভ ছিল। এ ছাড়া গ্রামে পঞ্চায়েত নিয়ে দ্বন্দ্ব আছে। একটি পক্ষের নেতৃত্ব দিচ্ছেন আবদুল খালেক মাস্টার (৭৫)। তিনি গ্রামের সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের অবসরপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক। নিহত শিশুদের পরিবারগুলো ছিল আবদুল খালেক মাস্টারের সমর্থক। অপর পক্ষের নেতা হলেন আবদুল আলী (৬০)। তিনি স্থানীয় ফয়জাবাদ চা-বাগানে পাহারাদারের চাকরি করতেন। সম্প্রতি একটি কুলগাছ কাটাকে কেন্দ্র করে দুপক্ষের বিরোধ উস্কে ওঠে। প্রতিপক্ষকে দুর্বল করতেই শিশুগুলোকে হত্যার পরিকল্পনা করা হয়।

পুলিশ সুপার বলেন, অটোরিকশা গ্যারেজ থেকে রক্তমাখা একটি পাঞ্জাবি, একটি শাবল, বস্তাসহ হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত কিছু আলামত উদ্ধার করা হয়েছে। গ্রেপ্তারকৃত আবদুল আলী ও জুয়েল ১০ দিনের রিমান্ডে আছে। গতকাল আরজু ও বশিরকে ১০ দিনের রিমান্ড চেয়ে আদালতে হাজির করে পুলিশ। আদালত পরে এ বিষয়ে আদেশ দেবে বলে জানা গেছে।

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

11 + 19 =