”বিপ্লব স্পন্দিত বুকে মনে হয় আমি ই লেনিন”

Facebooktwittergoogle_plusredditpinterestlinkedinmail

২২ শে এপ্রিল, সারা বিশ্বের মেহনতীদের মহান নেতা ভ্লাদিমির ইলিচ লেনিনের জন্মদিন। ১৮৭০ সালের এই দিনে তিনি রাশিয়ার মহানদী ভলগার তীরে সিম্‌বির্স্ক শহরে জন্মগ্রহণ করেন। ভলগা তীরের সিমবির্স্ক, কাজান, সামারা শহরে কাটে তার বাল্য ও কৈশোর।

লেনিনের বাবা ইলইয়া (Ilya) ছিলেন একজন গরীব দর্জির ছেলে। কঠোর পরিশ্রমের মাধ্যমে তিনি একজন শিক্ষক হন। পরে ভলগা নদীর আশেপাশে বিশাল এলাকা জুড়ে ৪৫০টি সরকারি স্কুলের পরিচালকের দায়িত্ব পান। তৎকালীন রাশিয়ার শাসক জারের (Czar) প্রতি তিনি ভীষণভাবে অনুগত ছিলেন। একই সাথে ছিলেন রাশিয়ান অর্থোডক্স চার্চের একজন বিশ্বস্ত অনুসারী। একজন স্কুল কর্মকর্তা হিসেবে ইলইয়ার পেশাগত পদ তাঁকে জাতিগত উচ্চপদমর্যাদার শামিল করলেও আর্থিক দিক থেকে উলিয়ানোভ পরিবার ছিলো মধ্যবিত্ত পর্যায়ের।

লেনিনের মা মারিয়ার পূর্বপুরুষ এসেছিলো জার্মানি থেকে। তিনি ছিলেন একজন ডাক্তারের কন্যা। ইতিহাস, সাহিত্য ও সঙ্গীতে তাঁর ভীষণ আগ্রহ ছিলো। তাছাড়া চারটি ভাষায় কথা বলতে পারতেন তিনি। বিয়ের সময় মারিয়া উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া বেশ কিছু পরিমাণ সম্পদ নিয়ে এসেছিলেন। রাশিয়ার বড় বড় শহরগুলোর সাংস্কৃতিক ধারা থেকে নিজেকে বিচ্ছিন্ন বোধ করায় তাঁর সন্তানদের শিক্ষা-দীক্ষায় গভীর মনোযোগ ও শ্রম দিয়েছিলেন তিনি।

ছয় ভাইবোনের মধ্যে লেনিন ছিলেন তৃতীয়। পড়াশুনার দিকে প্রচুর ঝোক ছিল তার ।  তার পাঠ্য সম্ভারে  ছিল লেরমন্তভ, পুশকিন, তুর্গেনিভ, নেক্রাসভ, তলস্তয়, সালতিকভ, শ্যেদ্রিন প্রমুখ উল্লেখযোগ্য। তার অধিত সাহিত্যের মধ্যে একটা বড় অংশ জুরে ছিল বিপ্লবী গনতন্ত্রী লেখকরা। এরা ছিলেন_ ভ.গ. বেলিনস্কি, আ.ই. হেতসের্ন, চেনিশেভস্কি, দব্রলিউবভ ও পিসারেভের রচনা। এদের অনেকের লেখা তখন নিষিদ্ধ ছিল তবু ভ্লাদিমির তা বাদ দেননি। লেলিনকে খুবই আকৃষ্ট করত ন.গ. চেনিশের্ভস্কির “What’s the Duty” উপন্যাস।

বড় হওয়ার সাথে সাথে ভ্লাদিমির তাঁর পড়াশোনা নিয়ে ভীষণ ব্যস্ত হয়ে পড়েন। ল্যাটিন ও গ্রীকের দিকে বেশি মনোযোগ থাকলেও একই সাথে বিশ্ব-সাহিত্য, ইতিহাস আর অর্থনীতিও ব্যাপকভাবে পড়া হচ্ছিলো তাঁর। পাশাপাশি বক্তৃতা ও লেখালেখির দক্ষতা বাড়াতেও সচেষ্ট হয়ে ওঠেন ভ্লাদিমির।

ভ্লাদিমিরের হাই স্কুল গ্র্যাজুয়েশনের কিছুদিন আগে দুইটি ঘটনা উলিয়ানোভ পরিবারের সুখের জীবনকে বদলে দেয়। প্রথমটি ছিলো বাবা ইলইয়ার মৃত্যু। বাবার মৃত্যুর পর সদ্য কৈশোর পার হওয়া বড় ভাই আলেকজান্ডার পরিবারের দায়িত্ব কাঁধে তুলে নেয়। এরপর ১৮৮৭ সালে রাশিয়ার রাজধানী শহর সেইন্ট পিটার্সবার্গ থেকে আসা একটি খবর ভ্লাদিমিরের জীবনে বিশাল পরিবর্তন আনে। ইউনিভার্সিটি অফ সেইন্ট পিটার্সবার্গের ছাত্র থাকা অবস্থায় আলেকজান্ডার কয়েকজন তরুণ বিদ্রোহীর সাথে মিলে তখনকার জারকে হত্যা করার চেষ্টা চালিয়ে ব্যর্থ হয়। ফলে তাদের সবাইকে গ্রেপ্তার করা হয়।

সংবাদ পাওয়া মাত্রই মা মারিয়া ছেলেকে রক্ষা করার জন্য রাজধানীর উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করেন। জারের কাছে চিঠির পর চিঠি লিখে ক্ষমাপ্রার্থনা করেন তিনি। কিন্তু তাতে জারের মন গলে নি। আলেকজান্ডারকে ফাঁসিতে ঝোলানো হয়।

লেনিন কাজান বিশ্ববিদ্যালয়ে আইনশাস্ত্রের উপর লেখাপড়া করেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়ার সময়েই তিনি জার বিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সাথে জড়িয়ে পড়েন।

বাবা ও ভাইয়ের মৃত্যুতে ভেঙে পড়লেও ভ্লাদিমির তাঁর পড়াশুনা চালিয়ে যান। ষোল বছর বয়সে নিজের ক্লাসে প্রথম স্থান অধিকার করে হাই স্কুল থেকে পাশ করেন তিনি। অসাধারণ ফলাফলের জন্য পান স্বর্ণপদক।

প্রথম দিকে রাজনীতিতে ভ্লাদিমিরের তেমন কোন আগ্রহ ছিলো না। ক্লাসিকস (Classics – Study of ancient Greek and Latin literature, philosophy, and history) ও মানবিক বিষয়ের একজন কলেজ শিক্ষক হবার ইচ্ছা ছিলো তাঁর। কিন্তু প্রাণপ্রিয় বড় ভাইয়ের মৃত্যুতে দৃঢ় প্রতিজ্ঞ হয়ে ওঠেন লেনিন।

মানবিক বিষয়ে পড়া বাদ দিয়ে ভ্লাদিমির কাজান ইউনিভার্সিটির ল স্কুলে ভর্তি হন। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের একটি প্রতিবাদ সভায় উপস্থিতির কারণে মাত্র তিন মাসের মাথায় তাঁকে বহিষ্কার করা হয়। অবশ্য জারকে হত্যা করার জন্য লেনিনের বড় ভাইয়ের চেষ্টাও এর জন্য আংশিকভাবে দায়ী ছিলো। এই ছাত্র আন্দোলনে জড়িত হয়ে পড়ার কারণে জার সরকার তাকে সাইবেরিয়াতে নির্বাসনে পাঠায়।

বহু ঝামেলার পর ভ্লাদিমির ইউনিভার্সিটি অফ সেইন্ট পিটার্সবার্গের মাধ্যমে তাঁর ডিগ্রি অর্জনের সুযোগ পান। মাত্র এক বছরের মধ্যে তিনি চার বছরের ল প্রোগ্রামের বিষয়বস্তু আয়ত্ত্ব করেন ও পরীক্ষার প্রত্যেকটি ক্ষেত্রে খুব ভালো করেন। ফলে তাকে সম্মান সহ (With honors) ডিগ্রি দেয়া ছাড়া কাজান বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের অন্য কোন উপায় ছিলো না।

লেলিনের বধূ নাদেজদা কনস্তানতিনোভনা ক্রুপস্কায়া ছিলেন লেলিনের অন্তরঙ্গ বন্ধু ও বিশ্বস্ত সহায়ক।

জন্ম রাশিয়ায় হলেও সারা পৃথিবীর মানুষের কাছেই তার সমান মর্যাদা। মুক্তিকামী সব মানুষের প্রিয় এই নেতা ছিলেন অক্টোবর এবং মহান নভেম্বর বিপ্লবে বলশেভিকদের প্রধান নেতা। তিনি সোভিয়েত ইউনিয়নের প্রথম রাষ্ট্রপ্রধান এবং লেনিনবাদ তত্ত্বের প্রবক্তা।

সোভিয়েত ইউনিয়নই ছিল প্রথম দেশ যেখানে জনগনের স্বাস্থ্যের দায়ভার নিয়েছে রাষ্ট্র, সমস্ত নাগরিকদের জন্য ব্যবস্থা করেছে বিনামূল্য চিকিত্সা সেবা। সোভিয়েত ইউনিয়নের মেহনতীদের আছে কর্ম, অবৈতনিক শিক্ষা, চিকিত্সা, অবসর ও বার্ধক্য পেনশনের অধিকার। সোভিয়েত ইউনিয়নে নারীদের পরিপূর্ণ অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক সমতা নিশ্চিত হয়েছে। অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক জীবনের সর্বক্ষেত্রে মেয়েরা সমানে চলে পুরুষের সংগে, তারা আছে বীর কমিউনিজমের প্রথম সারিতে।

১৯১৭ সাল থেকে ১৯২৪ সালে তাঁর মৃত্যুর আগ পর্যন্ত লেনিন ছিলেন সোভিয়েত সরকারের অবিসংবাদিত প্রধান। কার্ল মার্ক্সের তত্ত্বকে আরো বড় পরিসরে নিয়ে যাওয়া ও রাজনৈতিক ব্যবস্থায় আনার মাধ্যমে জন্ম নিয়েছে “মার্ক্সিজম-লেনিনিজম” ব্যবস্থা। এটি একসময় বিশ্বের এক-তৃতীয়াংশ মানুষের জীবনযাত্রা নির্ধারণ করতো। লেনিনের শত্রুর সংখ্যাও কম ছিলো না। কিন্তু তাঁর শত্রুরাও নির্দ্বিধায় বলতে বাধ্য যে,  অন্য যেকোন নেতার চেয়ে লেনিনের কার্যকলাপ ও চিন্তা-ভাবনা বিংশ শতাব্দীর বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাকে নানাভাবে প্রভাবিত করেছে।

জ শ তিমির

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

sixteen + 16 =