বোশেখে বৈঠকি

Facebooktwittergoogle_plusredditpinterestlinkedinmail

‘অনেকদিন পর দেখা হল, কেমন আছ উত্তম?’

জলদগম্ভীর স্বরটা যেন গোটা ঘরে স্টিরিওফোনিক সাউন্ডের মতো ঘুরে এল। প্রশ্নের উত্তরে যিনি এগিয়ে এলেন, মুখে তাঁর ভুবনমোহিনী হাসি। যে হাসির রহস্য আজও অধরা বাঙালির তাবড় গোয়েন্দাদের কাছে। তো ‘ফেলুদা’র স্রষ্টার প্রশ্নের উত্তরে বাঙালির প্রথম ‘ব্যোমকেশ’ হেসে বললেন, ‘আছি তো বেশ। চারিদিক বেশ আছে তো ?’

উল্টোদিকের চেয়ারে স্বভাবসিদ্ধ ভঙ্গিতে বসে আছেন আর একজন। হাতদুটো মাথার উপর তোলা। যুবকের ঔদ্ধত্যে বুকের কাছে জামার বোতামটি খোলা। চোখে চশমা। পকেটে রাখা প্রথম আলো আনা অদ্বিতীয় কলম। একমনে কিছু একটা ভাবছিলেন। কথোপকথনের শব্দ শুনে এতক্ষণে নড়েচড়ে বসলেন। তারপর মুখে একটু হাসি টেনে বললেন, ‘একটা কথা মনে হচ্ছে জানেন। শক্তি থাকলে আজ অবনী কেটে নিশ্চয়ই লিখত, বাঙালি বাংলায় আছ ?’

‘আরে সুনীল যে’, আবার ভেসে এল সেই জলদগম্ভীর কণ্ঠস্বর।

এক অলৌকিক বৈশাখে বৈঠকি মেজাজে সত্যিজৎ রায়, উত্তমকুমার আর সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়। এও আবার হয় নাকি! হচ্ছে তো। ওই তো সুনীল বলছেন, ‘পয়লা বোশেখ এলেই জানেন, আমার আপনার ‘জলসাঘর’ মনে পড়ে।’

যাঁর উদ্দেশে এ কথা বলে তিনি তখন পাইপে আগুন দিচ্ছিলেন। ঠোঁটের কোণে সেটি চেপে ধরে তিনি বললেন, ‘বাঙালি কি আজ পুণ্যাহ কথাটার মানে জানে? বিশ্বম্ভর রায়কে চেনে-টেনে নাকি ?’

এবার খলখল করে হেসে উঠলেন বাঙালির সেরা ম্যাটিনি আইডল। বললেন, ‘শুনুন, হোয়্যাটসঅ্যাপে এখন কীরকম মেসেজ আসে জানেন! হ্যাপি দোলযাত্রা, হ্যাপি বসন্তপঞ্চমী। আমি সিওর, আজ ফোন অন করলেই অনেকে হ্যাপি বাংলা নববর্ষ জানাবে।’

হোয়্যাটসঅ্যাপ! তুমি আবার ওসবেও আছ নাকি? আমি তো শুনেছিলাম, তুমি নায়ক, ব়্যাদার মহানায়ক। তুমি সচেতনভাবে একটা দূরত্ব মেনে চলো।

-দূরত্ব বাড়তে বাড়তে এখন দূরত্বটাই গা-সওয়া হয়ে গিয়েছে জানেন। খবর পাই, বাঙালি আজকাল আর আড্ডা দেয় না। কথাবার্তা বলাও কমে গিয়েছে। এখন পাশাপাসি বসে সব হোয়্যাটসঅ্যাপ চালাচালি করে। আর ফেসবুকে একে অন্যকে নিয়ে ট্রোল করে।

বাহ, তুমি তো বেশ কনটেমপোরারি আছ। ভেরি গুড। টু বি ভেরি ফ্র্যাঙ্ক, তোমার এই টেনাসিটি, শেখার আগ্রহই তোমাকে মহানায়ক করেছে। ‘নায়ক’-এর সময় কতটা ভেঙেছিলে নিজেকে। আমি তো পরে বলেছি, ভুল কিছু থাকলে আমার আছে, উত্তম পারফেক্ট। তা বাঙালি আজ বইটই পড়ে না?

এবার চশমাটা ধবধবে ফরাসের উপর নামিয়ে রেখে উত্তর দিলেন সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়। ‘পড়ে না বললে ভুল হবে। পড়ে, তবে ওই পিডিএফ। নতুন বইয়ের পাতায় যে প্রথম প্রেমিকার গন্ধ থাকে, তাতে নাকি বাঙালির আজ অরুচি।’

-এ কথা তুমি বলছ? তোমার বইয়ের তো বেজায় কাটতি শুনি। এখনও তো তোমার কাহিনি নিয়ে অনেকে ছবি করছে বলে খবর আসে।

– পরের জেনারেশনের কথা ভাবছি। বাঙালিরা যে হারে ফেসুবক লেখক হয়ে উঠেছে তাতে অশনি সংকেত দেখছি। শুনি, নিজেরাই নিজেদের লেখা পড়ে। নিজেরাই কমেন্টে পিঠ চাপড়ায়। আর দরকার পড়লে একে অন্যকে রিপোর্ট করে দেখে নেয়। আবার ভাবাবেগও প্রবল। এই তো শুনলাম বাংলা বানানটাও যে নাকি লিখতে পারে না, সেও নাকি এফআইআর…থাক

-থাকাই ভাল। তাহলে বাঙালির ভবিষ্যৎ নিয়ে কী ভাবছ?

-দূর ভবিষ্যৎ, উত্তমের পর অমন ধুতিই আর কাউকে পরতে দেখলাম না। তা অন্য পোশাক পরলে আমার ক্ষোভ নেই। কিন্তু এখন তো দেখি, ফেসবুকে ধুতি পরার দশটি উপায় দেখে লোকে বাঙালি সাজছে।

-তা ছবিটবির কী খবর?

– হচ্ছে, দুরকম। মৌলিক আর লিক। মানে শেষেরটা অন্য ভাষার ছবির কার্বন কপি। তবে প্রমোশনটা জোরদার হওয়া চাই।  তা লিকের পাল্লা নাকি এত ভারি যে ক্রমশ কৃষ্টি লিকলিকে হয়ে উঠছে।

তিনজনেই যখন হা হা করে হাসছেন, তখন উল্টোদিক থেকে কে যেন কী একটা বলতে চাইলেন। শব্দ শুনে তিনজনেই হাসি থামিয়ে ঘুরে তাকালেন। একজনকে দেখে এগিয়ে এলেন সুনীল।

-আরে সৌরভ যে, এসো এসো, জার্সি-টার্সি ওড়াচ্ছ তো ?

-আমি তো অবসর নিয়ে নিয়েছি। এখন আর ওসব…

তিন কিংবদন্তির সামনে দাঁড়িয়ে স্মিত হাসি সৌরভের মুখে। সুনীল এগিয়ে এসে তাঁর সঙ্গে বাকি দু’জনের আলাপ করিয়ে দিলেন। উত্তমের দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘শুনুন, আপনি সেকালের দাদা, আর এ একালের।’

হাসলেন দুজনেই। সৌরভ দেখলেন, মহানায়কের ঠোঁটের কোণে চেপে ধরা সিগারেট। কথা বলছেন, অথচ পড়ে যাওয়ার চান্স নেই। সেই রূপোলি পরদায় যেমনটি দেখেছিলেন, আজও তেমনই।

মন্দ্র স্বরে মানিকবাবু বললেন, তা সৌরভ, বাঙালির কী হালচাল বলো?

-আমি আর কী বলি! কী কুক্ষণে যে বাপি বাড়ি যা বলেছিলাম। তা আজকাল বাঙালি ‘বাপি’রা দেখি সব বাড়িতেই থাকে। বুক চিতিয়ে কেউ আর বাইরে বেরতে পারে না। তবে ক্যাপ্টেন ছিলাম তো। তাই আশা ছাড়ি না। এই তো ঋদ্ধিমানটা যা হোক…

-তাহলে আশা আছে বলছ ?

সৌরভ মৃদু হেসে বললেন, উত্তমবাবুর লিপেই তো সেই গানটা আছে, আশা ছিল ভালবাসা ছিল, ওটাই মাঝে মধ্যে আওড়ে নিই।

-আমি অবশ্য এখন আর কিছুই আওড়াই না।

নতুন কণ্ঠস্বরে তিনজনেই ফিরে তাকালেন। সৌরভ অস্ফুটে উচ্চারণ করলেন, নোবেলজয়ী।

-এসো অমর্ত্য। বাঙালির হাল তোমার থেকে ভাল আর কে জানে। তা তোমার নোবেলটা আছে তো? কবিগুরুরটা তো…

অমর্ত্য হেসে বললেন, ‘এখনও আছে। চোরে বোধহয় টের পায়নি। তা কী নিয়ে কথা হচ্ছে, বাঙালি বুঝি?’

-হ্যাঁ, বোশেখের পয়লা তো। তাই বাঙালির পাঁচালিতেই ডুব দিয়েছি সবাই। তা তোমাকে নিয়ে তো গর্বের শেষ নেই বাঙালির, না কি?

– গর্ব বলে গর্ব! এই তো প্রায় বিকিয়েই দিয়েছিল। আমি অবশ্য দুঃখ পাইনি। গুরুদেবকেও অপমান করেছিল, আমি তো কোন ছার…

পাঁচ বাঙালিই একটু গম্ভীর। সত্যিই তাহলে বাঙালি ভাল নেই। অন্তত সবাই যেরকম বলছে, তাতে তো ছবিটা ভাল ঠেকছে না। অথচ এই তো সেদিন, পয়লা বোশেখ মানেই বসুশ্রীতে জলসা বসেছে। এসেছেন সবাই।

শিল্পীরা তো বটেই, রুচিমান শ্রোতারাও। একে অপরের সঙ্গে দেখা হচ্ছে। গুরুজনদের পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করছে ছোটরা। চলছে মিষ্টিমুখ, কুশল বিনিময়। ওদিকে দোকানে দোকানে পুণ্যাহ। এই পুণ্যাহকেই ক্ষয়িষ্ণু জমিদার বিশ্বম্ভরের হাত ধরে ফিরিয়ে এনেছিলেন সত্যজিৎ। তিনি মনে মনে ভাবছেন, তাহলে সেই ক্ষয়িষ্ণু ছবিটাই কি ফ্রিজ শট হয়ে গেল বাঙালির ঘরদুয়ারে !

এই তো সেদিনও হইহই করে কত নতুন ছেলে-মেয়ে নতুন লেখা নিয়ে ভিড় জমাত মেঘমল্লারে, ভাবছেন সুনীল। কত উৎসাহ, কত প্রাণ! সব কি ঝিমিয়ে গেল? সব পথ এসে কি মিশে গেল শেষে ভারচুয়াল রিয়ালিটিতে! এ বাঙালি কি আটকে গেল সময়ের সার্কাসে, রিয়ালিটি শোয়ের নকল সোনার লোভে বাঙালি কি হারিয়ে ফেলল বাংলাকে?

ভাবছেন সকলেই। কিন্তু কেউ কিছু বলছেন না।

এমন সময় চর্চিত গলায় উত্তম গেয়ে উঠলেন, আবার দেখা যদি হল সখা প্রাণের মাঝে আয়…

পিয়ানোর রিডে হাত রাখলেন সত্যজিৎ। গলা মেলালেন বাকিরা।

মেঘলা কাটিয়ে রোদ উঠল বাঙালির নববর্ষে।

(সরোজ দরবার)

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

16 + five =